জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, যার অসাধারণ ব্যক্তিত্বের জন্য বাংলাদেশ আজ বিশ্বের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত, যার বীরত্বে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্টিত হয়েছে, তার ভিত্তিমূলে ছিলেন এই অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধুমাত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রাখাননি, তিনি দেশ ও জাতির সঙ্কটাপন্ন সময়ে দেশ ও জাতিকে বিপদ থেকে উদ্দার করেছেন।
অন্যায় ও অগণতন্ত্রের বিরুদ্ধে যিনি ছিলেন এক প্রতিবাদী কণ্ঠ, ধর্মীয় সহনশীল, সত্য ও ন্যায়বিচারের পথ থেকে এক ইঞ্চিও সরে দাঁড়াননি। ওসমানী একজন প্রতিভাধর পিতার এক উপযুক্ত পুত্র, যিনি সারা জীবন কখনও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। আলোকিত পরিবারের বংশধর হওয়ায় তিনি একজন অসাধারণ প্রতিভার আধিকারি ছিলেন ও চারিত্রিক গুণাবলী তার পারিবারিক ঐতিজ্য থেকে ধারণ করেছিলেন। তিনি তার হৃদয়্য অন্তরালে আধ্যাত্মিক বিচিত্র চিন্তায় অত্যন্ত কোমল ছিলেন।
গণতন্ত্রের প্রতি আজীবন শ্রদ্ধাশীল, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, জাতির পথ প্রদর্শক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মোঃ আতাউল গনি ওসমানী ১৯১৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বৃহত্তর সিলেট
জেলার সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম আতা। তার পৈত্রিক নিবাস সিলেট জেলার বালাগঞ্জ থানার অন্তর্গত দয়ামীর গ্রামে। তার পিতা খান বাহাদুর মফিজুর রহমান ও মাতা জোবেদা খাতুন। তার পিতা তৎকালীন সুনামগঞ্জ মহকুমার এসডিও (মহকুমা প্রশাসক)। মফিজুর রহমান পরিবার নিয়ে তখন মহকুমা প্রশাসকের বাস ভবনে বাস করতেন। এই বাস ভবনেই জন্ম হয় বীর সৈনিক ওসমানীর।
সিলেট বিজয়ী হযরত শাহ জালাল (রঃ) এর সাথী ৩৬০ আওলিয়ার অন্যতম সাথী শাহ নিয়ামউদ্দীন ওসমানীর বংশধর। ওসমানী ছিলেন তার পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। তাই আদর যত্নের কমতি ছিল না। ধীরে ধীরে শিশু ওসমানী বড় হতে লাগলেন। শৈশবে ওসমানী কোন স্কুলে ভর্তি হননি। তবে ১৯২৩ সালে তার বিদূষী মায়ের তত্ত্বাবধানে গৃহ শিক্ষকের সাহায্যে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়।
তার বয়স যখন এগারো তখন ১৯২৯ সালে আসাম প্রদেশের গৌহাটি জেলার অন্তর্গত কটন স্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। জীবনের প্রথম দিকের দিনগুলি তিনি জয়হাট প্রদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব চার্লস রোডসের সন্তানদের সংগে কাটিয়েছিলেন।
১৯৩২ সালে তিনি আসাম থেকে সিলেটে চলে আসেন এবং সিলেট সরকারী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকে তিনি ১৯৩৪ সালে প্রথম বিভাগে মেট্টিক পরীক্ষা পাশ করেন। পরীক্ষায় অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য ওসমানী প্রিটোরিয়া বৃত্তি লাভ করেন।
১৯৩৪ সালে উচ্চ শিক্ষা লাভ করার মানসে পিতার আদেশে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম ছাত্রদের সুযোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া হত। তাই আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি তাঁর মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেন।

আলীগড় তার উপরে যে প্রভাব ফেলেছিল তা বাড়িয়ে না বললেও, ওসমানীর জীবন ও কর্মে এই শিক্ষা প্রতিষ্টানের অবদান প্রতিফলিত হয়। ১৯৩৬ সালে তিনি আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আই এ এবং ১৯৩৮ সালে বিএ ডিগ্রী অর্জন করেন। ১৯৩৯ সালে ভূগোলে এমএ শেষ পর্ব সমাপ্ত না করেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তার পূর্বে অবশ্য তিনি দিল্লীতে অনুষ্ঠিত ফেডারেশন পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
অধ্যয়নরত থাকা কালে ওসমানী ইউ ও টিসির সার্জেন্ট এবং স্যার সৈয়দ হলের উপদেষ্টা ও পরপর দু’ বৎসর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টরিয়েল মনিটর হিসেবে নিযুক্ত হন। আর সেখান থেকেই ওসমানী জীবনে সৈনিক হবেন বলে স্থির করেন। শৈশবকাল তাঁর মা তাঁর উপর প্রচণ্ড প্রভাব ফেলেছিলেন। তিনি তাঁর পিতা-মাতার কাছ থেকে সমস্ত অনুপ্রেরণামূলক উপদেশগুলিকে কাজে লাগিয়েছিলেন, যা পরবর্তী জীবনে প্রতিফলন ঘটে। যেমন জীবনের উদ্দেশ্য, নিয়মানুবর্তিতা, সময়ানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলাবদ্ধতার এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত তার জীবন ও কর্মের মধ্যে রেখে গেছেন।
ওসমানী তার পিতার ইচ্ছা পূরণের জন্য ১৯৪৫ সালে আই সি এস পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন এবং উক্ত পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। কিন্ত সিভিল সার্ভিসে যোগ না দিয়ে সেনাবাহিনীর চাকুরিতে নিয়োজিত থাকেন। সেনাবাহিনীতে যোগদানের পর ১৯৪০ সালের ৫ই অক্টোবর ওসমানী- ইন্ডিয়ান মিলিটারী একাডেমী দেরাদুন থেকে সামরিক শিক্ষা লাভ করেন।
ঐ সময় তিনি বৃটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কমিশন প্রাপ্ত হন এবং দ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্যাপটেন এবং ১৯৪২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মেজর পদে উন্নীত হন। তিনি ছিলেন তৎকালীন বৃটিশ সাম্রাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ মেজর। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সবচেয়ে কম বয়সী মেজর হয়েছিলেন।
তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা, ইরাক এবং মিশরের বিভিন্ন সেক্টরে ইউনিট পরিচালনা করে তাঁর যোগ্যতা এবং দক্ষতা প্রমাণ করেছিলেন এবং একটি ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক হয়ে তিনি সামরিক ইতিহাসে রেকর্ড সৃষ্টি করেছিলেন।
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পরে, তিনি পাক আর্মিতে যোগদান করেছিলেন। ওসমানী কোয়েটা ষ্টাফ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে সামরিক বিভাগের উচ্চতর পি এস সি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালের মে মাসে মিলিটারী অপারেশনের ডেপুটি ডাইরেক্টর পদ লাভ করেন। তার কিছু দিন পর লেফটেন্যান্ট কর্ণেল পদ এবং ১৯৫৭ সালে কর্ণেল পদে উন্নীত হন। ওসমানী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সামরিক পরিকল্পনা বৈঠকে বিদেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন।
১৯৬১ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান মুখপাত্র মনোনীত হন এবং পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির পূর্ণ বিবেচনা ও তৎসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৪ সালের আধুনিক যুদ্ধ বিদ্যা সম্পর্কে ধারণা লাভের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে তিনি ডেপুটি ডাইরেক্টর হন এবং মিলিটারীর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। চাকুরি জীবনের শেষ দিকে তিনি সেনাবাহিনীর ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

পাকিস্তানের শুরু থেকে তিনি তার রাজ্যের প্রতি অটল আনুগত্য ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কিন্তু তিনি বিস্মিত হলেন, যখন দেখলেন পাকিস্থান সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালীদের চরম ভাবে বর্ণ বৈষম্য করা হত।
তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে বাঙ্গালীদের মাইক্রোস্কোপিক প্রতিনিধিত্বের জন্য আফসোস করেছিলেন। মার্শাল রেসের কলঙ্ক বাঙালীদের উপর প্রয়োগ করা হচ্ছিল।
অর্থনীতির ক্ষেত্রের অন্যান্য বৈষম্যও তিনি অনুতপ্ত ছিলেন। এই কারণগুলি ছিল, যা পাকিস্তানের নিয়মের প্রতি তার আন্তরিকতা এবং আনুগত্যকে ক্ষুণ্ন করেছিল।
তিনি পাকিস্তানের দুই পক্ষের মধ্যে বিদ্যমান সুস্পষ্ট বৈষম্য শাসকদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু তিনি কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে সদুত্তর পাননি বিধায় তিনি অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি উপলব্ধি করেন তাঁর পশ্চিম পাকিস্তানি সহকর্মীরা এব্যাপারে অনেকেই ভুল ব্যাখ্যা করেছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে একীভূত করার জন্য তাঁর তীব্র ইচ্ছা ছিল, যা তিনি নন-মার্শাল রেস হওয়ার কলঙ্ক দূর করার লক্ষ্যে বাঙালি অফিসার ও কর্মচারীদের দ্বারা পরিচালিত হতে চেয়েছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী ও চিন্তাশীল বাঙালি সৈন্যরা লাহোর সেক্টরের ১৯৬৫ যুদ্ধে তাদের সাহসী ভূমিকা প্রমাণ করেছিল।
বহু বছর ধরে তিনি রাওয়ালপিন্ডি ক্লাবে বসবাস করেন, যেখানে তিনি তার সেনাবাহিনীমুখী জীবনযাত্রার জন্য জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়েছিলেন। তিনি তার জন্ম সম্পর্কে কোনও সংরক্ষণ বা বাধা রক্ষা করেননি; বরং নিজেকে মাটির সন্তান হিসাবে ঘোষণা করতে তিনি প্রচুর গর্ববোধ করেন।
দীর্ঘ দশ বছর কর্নেল পদে দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৬৭ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল তিনি বাঙালি। সুতরাং অন্যান্য অবাঙালি অফিসাররা দ্রুত পদউন্নতি পেলেও, তার ভাগ্যে তা আর জুটেনি। সৈনিক জীবনে ওসমানী সবচেয়ে বেশী কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তার নিজের জীবন বাজি রেখে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ‘বেঙ্গল রেজিমেন্ট গ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসও প্রতিষ্ঠা করেন। তাই তিনি সেনানিবাসে টাইগার গনি নামে পরিচিত ছিলেন।
তাঁর মধ্যে বিপ্লবী চেতনা ও জাতিগতভাবে বর্ণ বৈষম্য কারণে এবং ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের দাবীর প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে তিনি আওয়ামী লীগের সাথে নিজেকে জড়িত করেছিলেন। তাই ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে ওসমানী রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং একই বৎসরের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচনী এলাকা থেকে (বালাগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ) বিপুল সংখ্যক ভোটের ব্যবধানে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তখন থেকে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সুদৃঢ় করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের ডান হাত হয়ে কাজ করেছিলেন।
১৯৭১ সালে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল এম এ জি ওসমানীকে মনোনীত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে। ১৭ই এপ্রিল কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার একআম্রকাননকে মুজিবনগর নাম দিয়ে মুজিব নগরেই নবগঠিত বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করেন। এবং ঐদিন কর্ণেল ওসমানীও আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
উত্তাল ও তীব্র বেদনাদায়ক রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তত্কালীন পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তিনি একটি নিয়মিত এবং গেরিলা সেনা সংগঠিত করেছিলেন। এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে কর্নেল এমএজি ওসমানী একজন বিপ্লবী জেনারেল হিসাবে রূপান্তরিত হয়েছিলেন।
দীর্ঘ নয় মাস ওসমানী অক্লান্ত পরিশ্রম করে হানাদার পাকিস্তানী বাহিনীকে দুর্বল করে তুলেন। অবশেষে পাকিস্তানী বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে এবং বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্থান লাভ করে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ছিলেন এবং তার চৌকস ও সক্রিয় নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত হয়েছিলো।
স্বাধীনতা লাভের পর বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা ওসমানীকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বঙ্গবীর উপাদিতে শ্রদ্ধা জানায়। জাতি তার সেবার স্বীকৃতির জন্য ওসমানীকে জেনারেল পদে উন্নীত করেন এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর থেকে তা কার্যকরী হয়। ১৯৭২ সালের ৭ই এপ্রিল সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এর পদ বিলুপ্ত হলে জেনারেল ওসমানী সামরিক বাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে এম পি হিসাবে আসন গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ চলাচল ও বিমান মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
তিনি গণতন্ত্রের কট্টর সমর্থক এবং গণতান্ত্রিক রীতিনীতি প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি গণতান্ত্রিক মতবাদের উপর ভিত্তি করে ৭২ সংবিধানের অন্যতম স্থপতি ছিলেন।
১৯৭২ সালের ৭ই মার্চ অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তার নির্বাচনী এলাকা থেকে শতকরা ৯০ ভাগ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন । পূর্বের মতো এবারও তিনি বাংলাদেশ সরকারের জাহাজ ও বিমান চলাচল মন্ত্রী নিযুক্ত হন। তিনি কিছুদিন ডাক তার ও টেলিফোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এবং এক নেতা এক দেশ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেন, আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তখন গণতন্ত্রপ্রেমী ওসমানী শেখ মুজিবের এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন ।
তিনি ১৯৭৪ সালের জুলাই মাসে মুজিব সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র নীতিশাস্ত্রের উপর সর্বোত্তম উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন। তার কিছুকাল পর ১৯৭৫ সালে ওসমানী একই সাথে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় সংসদের সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি তার জীবনের উজ্জল দিক ছিল যে তিনি সত্যের একজন নিবেদিত প্রাণ সৈনিক ছিলেন। ভালোকে ভালো ও অন্যায়কে অন্যায় বলতে দ্বিধা করতেন না। গণতন্ত্র প্রতিষ্টায় তিনি ছিলেন অতন্ত্র প্রহরী। এভাবে তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্টায় তার অবদান ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
জেনারেল ওসমানী সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালের ৫ সেপ্টেম্বর “জাতীয় জনতা পার্টি” নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭৮ সালের ৩রা জুন ও ১৯৮১ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিরোধী দলের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন । তবুও ওসমানী গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বিধায় জনগণের রায়কে হাসিমুখে মেনে নেন।
জেনারেল ওসমানী মানবিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন উদার। তিনি তার সমস্ত গুণাবলীতে সমৃদ্ধ ছিলেন। প্রকৃতির দ্বারা উদার, তিনি দুটি হাত দিয়ে শুধু দিয়েছেন কিন্তু বিনিময়ে কিছুই নেননি। তিনি ছিলেন মানবিক, অপ্রত্যাশিত এবং বৈষয়িক সম্পদের প্রতি উদাসীন। সামরিক শৃঙ্খলার সাথে জড়িত, তিনি কথায় এবং কাজে উভয় ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত এবং যৌক্তিক ছিলেন। তিনি খোলামেলা, সহজ প্রকৃতির লোক ছিলেন, সোজা পথে চলতেন, নিরপেক্ষ, মজাদার, খাঁটি এবং সর্বোপরি পা থেকে মাথা পর্যন্ত নিখুঁত ভদ্রলোক ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ওসমানী ছিলেন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি। মা-বাবাসহ বড়দের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। মৃত্যুর পূর্বে বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে তার ধানমন্ডির ঢাকা-সুন্দরবন নামক বাসাটি দান করে যান। ওসমানীর জন্ম হয়েছিল সিজারিয়ান পদ্ধতিতে। সে আমলে মহিলা ডাক্তার না থাকায় পুরুষ ডাক্তার দ্বারা কাজ করানো হত। সেই কথাটি তার মা জোবেদা খাতুন ভুলতে পারেননি।
তাই তিনি মৃত্যুকালে ওসমানীকে বলে যান “নুর মঞ্জিল” এর আয় থেকে যেন গরীব ও মেধাবী দুজন মেডিকেল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি দিয়ে সাহায্য করার জন্য। মায়ের ইচ্ছে পূরণের জন্য ওসমানী নুর মঞ্জিল বাসাটিকে মেডিকেল কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের সেবায় দান করে যান। ওসমানীর এই দানটি তার মা বাবার নাম অনুসারে গঠিত হয় – “দি জোবেদা খাতুন ও খানবাহাদুর মফিজুর রহমান ট্রাস্ট”। ওসমানী ছিলেন গরিব দুঃখী মেহনতি মানুষের বন্ধু।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে যে, দেশ ও জাতির দুর্যোগকালীন সময়ে তিনি দেশপ্রেমের কারণেই দেশ ও জাতিকে উদ্ধার করেছেন। জিয়াউর রহমান হত্যার পর, তথকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার যখন বারবার ঘোষণা দেওয়ার পরও চট্টগ্রামে বিদ্রোহী সেনারা যখন আত্মসমর্থন করছিলোনা তখন সিলেট থেকে বঙ্গবীর জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর যে কত প্রয়োজন ছিলো তা সমস্থ জাতী প্রত্যক্ষ ভাবে দেখেছে।
তত্কালীণ সেনা অফিসার হুসেইন মোঃ এরশাদ সিলেট থেকে ওসমানীকে নিয়ে যান ঢাকায়। বেতার টিভিতে বিশেষ ঘোষণা দেওয়ার জন্য। এই ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘনটার মধ্যে বিদ্রোহী সেনারা আত্ম সমর্থন করতে বাধ্য হয়। তিনি চাইলে ক্ষমতায় অধিষ্টিত হতে পারতেন কিন্তু এই দেশপ্রেমী নেতা ক্ষমতা লোভী না হয়ে জাতির মুক্তিদাতা হিসাবে এগিয়ে এসে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যা আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে।
জীবনের শেষদিকে ওসমানীর স্বাস্থ্য ভালো যাচ্ছিল না। ১৯৮৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে যান। লন্ডনের সেন্টপল আসেন হাসপাতালে চিকিৎসার পর ১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি ৬৬ বছর বয়সে বঙ্গবীর ওসমানী ইন্তেকাল করেন। ওসমানীর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনী রাজকীয় সম্মানে হিথ্রো বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।
মাপের আকারে তিনি ছোট হলেও কিন্তু হৃদয়ে ছিলেন অনেক বড় । তার বড় গোঁফ স্পষ্টভাবে একটি সাধারণ সামরিক চালচলনের ইঙ্গিত দেয়। নেতৃত্বে অসাধারণ গুণাবলির অধিকারী এই কৃতি সন্তান আমাদের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকুক এই প্রত্যাশা করি।
মৃত্যুর পূর্বে মৌখিক ও লিখিত ভাবে ওসমানী তার মায়ের কবরের পাশে তাকে দাফন করার ইচ্ছা পোষণ করায় তাকে হযরত শাহজালাল (রহঃ) এর মাজার প্রাঙ্গণে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে সমাহিত করা হয়। এই মহান পুরুষ চিরকুমার ছিলেন। ওসমানী স্মৃতি রক্ষার্থে ৪টা মার্চ ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার “নূর মঞ্জিলকে” সিলেট ট্রাষ্টের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে নুর মঞ্জিলকে ওসমানী জাদুঘর হিসেবে রূপ দেন।
এছাড়া ঢাকায় ওসমানী মিলনায়তন ও ওসমানী উদ্যান এবং সিলেটে ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুর এক বছর পর ওসমানীকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি এক চিরন্তন কালজয়ী আদর্শ পুরুষ।
তিনি একজন কিংবদন্তি নায়ক, তা সকলের কাছে স্বীকৃত। তাঁর নামটি সারা বাংলাদেশে মানুষ জানে। তিনি সর্ব শক্তিমান আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রেখে সর্বদা বিবেক দ্বারা নিজেকে পরিচালিত করতেন। তিনি নিজের বিবেককে বিক্রি করে বা ইজারা দিয়ে কখনও ক্ষমতায় অধিষ্টিত হননি বা হতে চাননি।
তাঁর মৃত্যু জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। এই ক্ষতি কখনই পূরণ হবে না। তিনি আমাদের মাঝে আর নেই তবে তার আদর্শ আমাদের পথ চলার পাথেও হউক। প্রয়াত এই নেতার জন্মদিনে আমি তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। আজ আমাদের উচিত হবে এই বীর সন্তানের ধারণাগুলি এবং স্বপ্নগুলিকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি, তাহলে আমাদের গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্টিত হবে এবং জাতী সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।
লেখক পরিচিতিঃ আইনজীবী, লেখক-গবেষক, সংগঠক, রাজনৈতিক সচেতন, সম্পাদক প্রবাস বার্তা, পরিচালক – টাইগার্স ইন্টারন্যাশনাল এ্যাসোসিয়েশন।
