১। এ কথা অনস্বীকার্য যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালিত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে। যুদ্ধের কমান্ডার–ইন-চীফ বা সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানি। ৪ এপ্রিল যুদ্ধক্ষেত্রকে কয়েকটি এলাকায় ভাগ করা হলেও জুলাই মাসে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে ১০টি সেক্টরে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করা হয় পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে সুপ্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনীর দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসিক, চৌকস মেজর পদবীর অফিসারগণকে। দীর্ঘ নয় মাসে ১০টি সেক্টরে মোট ১৭ জন সেক্টর কমান্ডার যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। এঁদের প্রত্যেকেই ছিলেন স্বমহিমায় উজ্জল নক্ষত্রের মতো। তবে মেজর খালেদ মোশাররফ ছিলেন অসাধারণ মেধাবী, কৌশলী, দৃঢ়চেতা, তেজস্বী, দূরদর্শী ও চৌকস একজন সামরিক কমান্ডার।২। এপ্রিলের ৪ তারিখে জেনারেল ওসমানি এ বীর সেনানায়ককে কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলে যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। জুলাই মাসে তিনি ২ নং সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার পূর্বাঞ্চল, ঢাকা শহরসহ ঢাকা জেলার দক্ষিণাঞ্চল, কুমিল্লা ও নোয়াখালী জেলাসহ বিশাল এক এলাকা। যা ছিল সর্ববৃহৎ সেক্টর। পরবর্তীতে তাঁকে তিনটি নিয়মিত ব্রিগেডের একটি ‘কে-ফোর্স’ (যেটি তাঁর নামের ইংরেজি আদ্যক্ষর ‘কে’ দিয়ে নামকরণ) এর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সকল দায়িত্ব পালনে অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

৩। খালেদ মোশাররফ জামালপুর জেলার ইসলামপুরের মোশাররফ গঞ্জ গ্রামে ১৯৩৭ সালের ১ নভেম্বর পিতা মোশাররফ হোসেন ও মা জামিলা আক্তারের গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কক্সবাজার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করেন এবং ১৯৫৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। এরপর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে ১৮তম পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি দীর্ঘ মেয়াদী কোর্সে জেন্টলম্যান ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন।
৪। দু’বছর প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫৭ সালে সেনাবাহিনীতে পদাতিক বাহিনীতে কমিশন লাভের পর প্রায় আট বছর (১৯৫৭-১৯৬৫) তিনি বিভিন্ন ইউনিটে চাকুরি ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের সময় খালেদ মোশাররফ চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের অ্যাডজুটেন্ট হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। যুদ্ধের পর তিনি কাকুল মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখান থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি মেজর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজ থেকে পি.এস.সি. ডিগ্রি লাভ করেন। অতঃপর মেধাবী অফিসার হিসেবে তাঁকে ব্রিগেড মেজর হিসেবে খারিয়াতে ৫৭- ব্রিগেডে নিয়োগ দেওয়া হয়। জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে উচ্চতর সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৭০ সালের মার্চে ঢাকা সেনানিবাসে বদলী করা হয়। অতঃপর ১০৭১ সালের ১৯ মার্চ তিনি ৪ ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক হিসেবে বদলী হন।

৫। ২২ মার্চ তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগদান করেন। ২৪ মার্চ তাঁকে ২৫০ জন সৈনিক, বিপুল ভারী ও হালকা অস্ত্র, গোলা-বারুদ ২৬ টি গাড়িবহর দিয়ে সিলেটের শমসের নগরে পাঠানো হয়। এটা ছিল মহান আল্লাহ সুবাহানু ওয়া তায়ালার একটি বিশেষ রহমত। কেননা, তিনি যদি ঐদিন বিপুল সমর সাঁজে শমসেরনগরে না যেতেন তাহলে হয়তো কুমিল্লা সেনানিবাসে তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে হত্যার শিকার হতেন এবং মুক্তিযুদ্ধে এ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো না।
৬। পাকিস্তানী বাহিনীর গণহত্যার খবর জানার পর ২৬ মার্চ তিনি বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং ৪ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়েকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অতঃপর শুরু হলো পাকিস্তানী বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক তুমুল গেরিলা যুদ্ধ এবং তাঁর রণনৈপূন্যের কাছে পাকিস্তানিরা শোচনীয় ভাবে পরাজিত হচ্ছিল। ২নং সেক্টরের কমান্ডার, ‘কে ফোর্সের’ ব্রিগেড কমান্ডার, অধীনস্থ ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বীরত্বপূর্ণ লড়াই করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে নাস্তানাবুদ ও পরাজিত করেছেন। ২৩ অক্টোবর, কে-ফোর্সের অপারেশন করার সময় সম্মুখ লড়াইয়ে তিনি শত্রুদের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন এবং দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়েছিল সুস্থ হবার জন্য।তিনি ব্যতিক্রমী যোদ্ধা হিসাবে পরিচিত, যিনি মেলাঘরের জঙ্গলের গভীরে থেকে গেরিলা যুদ্ধের পরিকল্পনা প্রনয়ণ ও বাস্তবায়ন করেছিলেন। ২ নং সেক্টরে খালেদের কমান্ডের অধীনে পঁচিশ হাজারেরও বেশি গেরিলা যোদ্ধা লড়াই করেছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। যুদ্ধের সময়ে তিনি লেফটেনেন্ট কর্ণেল হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। স্বাধীনতার পরে কর্ণেল পদে পদোন্নতি পেয়ে সেনাসদরে ষ্টাফ হিসেবে যোগদান করেন। অতঃপর তাঁকে ব্রিগেডিয়ার পদে উন্নীত করে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদ চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।
৭। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বপরিবারে নিহত হবার পর ৩ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন। ঐ সময় তিনি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন এবং নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধান হন । ঠিক তিন দিন পর ৭ নভেম্বর আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থানে দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি নিহত হন।
৮। উল্লেখ্য যে, খালেদ মোশাররফের ভাই রাশেদ মোশাররফ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ভূমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খালেদ মোশাররফের স্ত্রী রুবি মোশাররফ এবং তাঁদের দুই কণ্যা মাহজাবিন খালেদ (Mahjabeen Khaled) ও আমিরিন খালেদ। মাহজাবিন খালেদ বর্তমানে সংসদ সদস্য।
৯। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সৌম্য-শক্তি-ক্ষিপ্রতার সাথে দুঃসাহসীক ও অনন্য সাধারণ ভুমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসে বীর উত্তম জেনারেল খালেদ মোশাররফ চির অমর হয়ে বেঁচে থাকবেন। আসুন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা-বিদ্ধেষ, লোভ ও অহংকারের উর্ধ্বে উঠে প্রকৃত দেশপ্রেমের মূলমন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাউকে অবজ্ঞা, অবহেলা বা হেয় প্রতিপন্ন না করে স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল বীর সেনানায়কগণকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করি। দুনিয়া ও আখেরাতের মালিক, সর্বশক্তিমান মহান আল্লাহ্ সুবাহানু ওয়া তায়ালার নিকট সকল বীর সিপাহসালারগণের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া করছি।
# কয়েকটি দুর্লভ ছবির জন্য স্বাধীনতা যুদ্ধের সম্মুখযুদ্ধের বীর সিপাহসালার আমার পরম শ্রদ্ধেয় জেনারেল
Jamil D Ahsan BP এর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। শ্রদ্ধেয় জেনারেলের নিকট হতে আমি সবসময় অনুপ্রেরণা লাভ করি। যে কোন অনাকাংখিত ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।
– কর্ণেল মোহাম্মদ আবদুল হক, পিএসসি (অবঃ)
