বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কতটা প্রয়োজন


বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল এমন একটি সরকার ব্যবস্থা, যেখানে  একটি অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য একটি নির্বাচিত সরকার থেকে অন্য সরকারে রূপান্তরের সময় তাদেরকে নির্বাচিত করা হত। এটা গঠত একটি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পূর্বে। ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২00৮ সালে বিদায়ী নির্বাচিত সরকার তার ক্ষমতা অনির্বাচিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে হস্তান্তর করত।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শীর্ষস্থানীয় সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব করেননি, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও দেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল বিদায়ী সরকারের কোনো রাজনৈতিক প্রভাব ছাড়াই একটি অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে এমন একটি ভারসাম্য পরিবেশ তৈরি করা।

প্রয়োজন না হলে কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানকে  প্রধান উপদেষ্টা (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জায়গায়) বলা হত এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তাকে নির্বাচিত করেছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা অন্যান্য উপদেষ্টাদের নির্বাচন করেন। প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলি সাধারণত উপদেষ্টাদের মধ্যে বন্টন করা হত। প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যান্য উপদেষ্টারা তাদের কার্যক্রমের জন্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সরকারের ভাষায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এমন একটি সরকার যা নিয়মিত নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত একটি অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য রাজ্য প্রশাসনের তত্ত্বাবধান করে। প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় ব্যবস্থায় সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে বিদায়ী সরকারকে আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে রূপান্তরের একটি রীতি রয়েছে।

এই ধরনের অস্থায়ী সরকার শুধুমাত্র প্রতিদিনের প্রশাসনিক কাজগুলি সম্পাদন করার জন্য বিদ্যমান, এবং নির্বাচনী ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে এমন নীতিগত কার্যক্রমের সাথে মোকাবিলা করার কথা নয়, এই সময়কালে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নিরপেক্ষ অবস্থা বজায় রাখে। সংসদীয় কাঠামোতে একটি মন্ত্রণালয় ভেঙে দিয়ে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচলন লক্ষ্য করা গেছে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপকার কে?
তত্ত্বাবধায়ক সরকার, ১৯৯৬

১৯৯৬ সালে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বাংলাদেশের সর্ব প্রথম সংবিধানসম্মত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে ১৪৭ আসন লাভ করে এবং জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্ক

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার (১৯৯৬ সালের) পরে বঙ্গভবনের ভূমিকা বাড়লেও রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হওয়ায় (২০০৬ সালে) এর (বঙ্গভবন) ভূমিকা বিতর্কিত হয় এবং ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার টানা দুই বছর (২০০৭-২০০৯ সাল পর্যন্ত) ক্ষমতায় থাকলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বিগত সংসদ নির্বাচনের পর (২০০৮ সাল) সংসদ সদস্যরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্বন্ধে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেছিলেন নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্বাধীনভাবে পুণ:গঠন করা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ সাধনকে সময়ের দাবি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়ে আরেকটি জরুরী অবস্থার ঝুঁকি নেয়া ঠিক হবে না।“

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার সময়ে (১৯৯৬ সালে) সন্তুষ্ট না হলেও, বিএনপি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বহাল রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদ এ বিষয়ে বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনকে যতোই শক্তিশালী করা হোক না কেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আরও ২/৩টি মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখা প্রয়োজন।

সাধারণ জনগণের প্রতিক্রিয়ায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু রাখার পক্ষেই বেশী জনমত দেখা যায়। সাধারণ জনগণের মধ্যে একজন বলেছেন, আরও ১৫ থেকে ২০ বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু থাকা উচিত। আরেকজন বলছেন, মেয়াদ পূর্তির পরপরই সরকারী দল নির্বাচন দিলে ঐ নির্বাচনে তাদের (সরকারী দলের) প্রভাব থাকে। এসময় আরেকজন নাগরিক জানান তিনি মনে করেন, দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল যদি একে অপরের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে তাহলে এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজন নেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করার মাধ্যমে এদেশের রাজনীতিকরা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছিলেন সুষ্ঠু নির্বাচন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও রাজনীতিবিদদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস অর্জিত হয়নি।

প্রয়াত নেতা আব্দুর রাজ্জাকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দাবির প্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হলেও তখন আওয়ামী লীগই কোন প্রেক্ষিতে এ সরকার পদ্ধতির বিরোধিতা করছিলো । এ প্রসংগে আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবি তুলেছিল জাতীয় নির্বাচনকে সামরিক সরকারের প্রভাব মুক্ত রাখার জন্য। একইসাথে তিনি বলেছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল ৩ মেয়াদের কথা মাথায় রেখে । তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সেই ৩টি মেয়াদ অতিক্রান্ত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির পরিবর্তনের দাবি তোলা হয়েছিলো।

আব্দুল মমিন তালুকদারের কাছে জানতে চাওয়া হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার শুরুর দিকে বিএনপি এই সরকার ব্যবস্থার বিপক্ষে থাকলেও, এখন বিএনপি এ পদ্ধতি (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) বহাল রাখার পক্ষে কথা বলছে কোন প্রেক্ষিতে । জবাবে আব্দুল মমিন তালুকদার বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ আন্দোলন করে এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন। তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রয়োজন আছে।

একই সাথে তিনি মনে করেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা স্থাপিত না হলে কোন দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন জনগণের কাছে গ্রহনযোগ্যতা পাবে না। মি তালুকদারের কথার রেশ ধরে মি রাজ্জাকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো, কোন রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশনের সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারার ক্ষমতা নিয়ে জনগণ আশ্বস্ত হবে কিভাবে । প্রয়াত নেতা মি রাজ্জাক এর উত্তরে বলেছিলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক উল্লেখ করে বলেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের জন্য জনগণ এ (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা হারিয়েছিলো।

এরপর মি তালুকদারের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো নির্বাচন কমিশনকে যদি স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হয় তাহলে বিএনপি কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির প্রশ্নটি বিএনপি কেন এত বড় করে দেখছেন । এ প্রশ্নের জবাবে মি তালুকদার বলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা না হলে, দলীয় সরকারের অধীনে এটি (নির্বাচন কমিশন) চাপের মুখে থাকবে।

সরকার যদি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন তাহলে বিএনপি কি পদক্ষেপ নিবে? এ প্রশ্নের জবাবে মি তালুকদার বলেছিলেন, জনগণের দাবি উপেক্ষা করে যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করেন তাহলে বিএনপি সংসদের ভিতরে এবং বাইরে এর বিরোধিতা করবে। বিএনপি এখন সংসদে অনুপস্থিত, এ ইস্যুতে তিনি জানান বিএনপি সংসদে যেতে চায় কিন্তু এজন্য সরকারের সদিচ্ছার প্রয়োজন।

এরপর মি রাজ্জাকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগ সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করবে কিনা । এ প্রশ্নের জবাবে মি রাজ্জাক বলেছিলেন জনতার দাবিকে অগ্রাহ্য করে সংবিধান সংশোধনের আশংকাকে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, জনতার উপর আস্থা রেখেই সব সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তিনি বলেছিলেন, সরকার নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করে নির্বাচন পরিচালনা করতে চান। একই সাথে তিনি জানান বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচন কমিশনই নির্বাচন পরিচালনা করে থাকেন।

নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করা প্রসংগে মি তালুকদারের মতামত জানতে চাইলে তিনি নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও শক্তিশালী করার পক্ষে মতামত দেন।

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *