প্রবীণ কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব আলহাজ্ব মোঃ আজমল খান


বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে প্রবীণ যে সব নেতৃবৃন্দ বিগত দিনে বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য কাজ করেছেন তাদের মধ্যেই একজন আলহাজ্ব মোঃ আজমল খান একজন প্রবীণ কমিউনিটির বর্ষীয়ান নেতা রচডেল বাংলাদেশ এসোসিয়েশন ও জালালিয়া মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব মোঃ আজমল খানের বিলেত জীবনের কিছু স্মৃতিচারণ মূলক একান্ত সাক্ষাৎকারটি আপনাদের অবগতির জন্য প্ত্রস্থ করলাম।

আজমল খান ১৯৩৯  সালে সিলেট জেলার বিশ্বনাথ থানার অন্তর্গত দৌলতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম ওয়াজেদুল হক খান এবং মাতার নাম নাজমুন নেসা খাতুন। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। বাল্যকাল মাতা পিতার সান্নিধ্যে লালিত-পালিত হয়েছেন।

বাল্যকালের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন তার পিতা যখন গ্রামের মসজিদে তাকে হাত ধরে নিয়ে যেতেন তখন বলতেন দেখো এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী। তার বাবা বলেন, তোমাকে মসজিদে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য হলো আমরা মুসলমান। মুসলমান হিসেবে দ্বীনি শিক্ষা অর্জন অপরিহার্য। মসজিদ থেকে ধর্মীয় শিক্ষার পাঠ গ্রহণ শেষে যখন ঘরে ফিরে আসতেন তখন তার মা জানতে চাইতেন কি শিখে এসেছো। ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তিনি ভর্তি হন দৌলতপুর প্রাইমারি স্কুলে। কিছুদিন এই স্কুলে পড়ালেখা করার পর চলে যান সিলেট জেলার সদর থানার অন্তর্গত বিবিদইল গ্রামে বড় বোনের বাড়িতে।

তার পিতার উদ্দেশ্য ছিল জেলা সদরের স্কুল গুলোতে ভালো লেখাপড়া হয়, তাই তার পিতা তাকে উন্নত শিক্ষা গ্রহণ করানোর জন্য সিলেট শহরে পাঠান। ভর্তি হন কালপার প্রাইমারি স্কুলে। এই স্কুল থেকে তিনি প্রাইমারি পাশ করার পর ভর্তি হন সদর থানার লালা বাজার জুনিয়র হাই স্কুলে। এই সময় তার পিতার মৃত্যু হলে তার লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটে। প্রায় এক বছর পড়ালেখা থেকে বিরত থাকেন। পরে মায়ের পরামর্শে আবার লালা বাজার হাই স্কুলে ভর্তি হন। এই সময় স্কুলটি উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। এই স্কুল থেকে ১৯৫৯ সালে মেট্রিক পরীক্ষা পাস করেন। ভর্তি হন সিলেট এমসি কলেজে। এই সময় তার চাকরি হলে চলে যান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। কাজ শুরু করেন আগ্রাবাদ এয়ার এভিয়েশনে। এই সময় তার এক শুভাকাঙ্ক্ষীর পরামর্শে একটি ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে বিলেত আসার ব্যবস্থা হয়।

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। গ্রামের মানুষ চাষাবাদ করে মূলত জীবিকা নির্বাহ করে। তার নিজ গ্রামে ও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। গ্রামের প্রধান উৎপাদন যোগ্য ফসল ছিল ধান। তখন প্রচুর পরিমাণ ধান উৎপাদন হতো। এই ধানের আয় দিয়েই সাংসারিক চাহিদা পূর্ণ হত। পাশাপাশি খাল, বিল, হাওর, পুকুর প্রভৃতি জলাশয়ে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। বাজার থেকে মাছ খুব একটা বেশি ক্রয় করার প্রয়োজন হতোনা । হাওর থেকে মাছ আহরণ করে গ্রামীণ মানুষের চাহিদা পূরণ হতো। সেই সময় এত বেশি মাছ ছিল যে, তা দেশের মানেষের প্রয়োজন মিটিয়ে বিদেশে মাছ রপ্তানি করা হতো বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিভিন্ন মৌসুমি ফলের গাছ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই ছিল।

ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করে বলেন, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আমের মৌসুমে স্কুলে যাওয়া আসার সময় বৃষ্টি আসলে পার্শ্ববর্তী বাড়িতে উঠলে মুরুব্বীরা আদর করে আম জাম খেতে দিতেন। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে খুবই মিলমিশ ছিল। তৎকালীন সময়ে হিন্দু বাড়িতে মুসলমানরা গেলে খুব সমীহ করে বসতে দিত এবং আপ্যায়ন করাতো। মুসলমানরা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হিন্দুদের নিমন্ত্রণ করতেন। তার বড় বোনের বিয়েতে হিন্দুদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়াতে তিনি ছোটবেলায় দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। এই সময় বিভিন্ন মিটিং মিছিলে অন্যান্যদের সাথে তিনিও যোগ দিতেন। তার বক্তব্য থেকে বুঝা যায় তৎকালীন সময়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের হিন্দু-মুসলিম শিক্ষকরা অতি যত্ন সহকারে ছাত্রদের ভবিষ্যতের প্রতি খেয়াল রেখে যথোপযুক্ত পাঠদান ও উপদেশ দিতেন।  ট্রাভেলস এর মাধ্যমে তার বিলেতে আসার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ঢাকা নারায়ণগঞ্জ থেকে নদীপথে স্টিমারে গোয়ালন্দ আসেন। এখান থেকে ট্রেনযোগে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন। ট্রেনটি দর্শনা হয়ে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে পৌঁছলে তার চাচাতো ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হয় ।

তার চাচাতো ভাই আগে থেকেই কলকাতা থাকতেন। বিলেতে আসার কথা শুনে তার চাচাতো ভাই কয়দিন কলকাতা থাকার অনুরোধ জানান। চাচাতো ভাইয়ের অনুরোধে কয়েকদিন কলকাতা থাকার সময় চাচাতো ভাই তাকে নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে নিয়ে জান এবং স্থায়ীভাবে কলকাতা থাকার অনুরোধ করে বলেন, কি সুন্দর কলকাতা এখানে থেকে যা, ঠান্ডার দেশ বিলেতে যাওয়ার দরকার কি? তিনি কলকাতায় থাকতে মুটেও রাজি হন নাই, কয়েকদিন পরে তিনি বিলেতের উদ্দেশ্যে কলকাতা দমদম এয়ারপোর্ট থেকে বিলেতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তার ফ্লাইটটি তেহরান হয়ে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান।

হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বাহির হয়ে ট্রেন যোগে চলে যান লন্ডনের এক আত্বীয়ের বাসায়। ওই জায়গায় দুই তিন দিন থাকার পর ট্রেনে চলে আসেন ম্যানচেস্টারে এবং তারপর বাসযোগে চলে যান আজলিংটন এলাকায় তার বড় ভাইয়ের ঘরে আসেন। এই ঘরের ভেতর দুইটি টয়লেট এবং একটি বাথরুম ছিল। তবে পানি গরম করার জন্য কোন বয়লার ছিল না তাই কেটল দিয়ে পানি গরম করে গোসল করতে হতো।

কখনো সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পাবলিক বাথে গিয়ে আড়াই সিলিং বা হাফ ক্রাউন দিয়ে গোসল করা যেত। কয়লা জ্বালিয়ে ঘরের ভেতর গরম করতে হতো। সিঙ্গল সিটের বাড়া এক পাউন্ড এবং শেয়ার করে দুজনে একটি বেডে থাকলে প্রতি জন ১০ সিলিং করে ভাড়া দিতে হতো। এভাবে একটি করে ৪০ জনের মতো লোক একত্রে থাকতে দেখেছেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। ঘরের মালিক প্রতি সপ্তাহে একদিন বেডশীট চেঞ্জ করে দিতেন । কয়েকজন মিলে ম্যাচ করে খাওয়া- দাওয়া করতেন । হালাল খাবারের জন্য দোকান থেকে মুরগি এনে জবাই করে খাওয়া হতো ।

তিনি তার বড় ভাইয়ের সাথে যে ঘরে থাকতেন এর মালিক চারজন বাংলাদেশী ছিলেন । তারা “এভারগ্রীন গ্রোসারি শপ” নামে একটি দোকান করলে, সেখানে তিনি প্রথম চাকরি পান । তারপর সেখান থেকে কাজ চলে গেলে বেকার ভাতার জন্য আবেদন করেন। বেনিফিট হিসাবে সপ্তাহে আড়াই পাউন্ড পাওয়া যেত। গ্রোসারী শপে চাকরির মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার বিলতের চাকরি জীবন।  এই সময় সপ্তাহে বেতন ছিল তিন পাউন্ড । শপের কাজের সময় ছিল সকাল ৯ ঘটিকা থেকে রাত ১০ ঘটিকা পর্যন্ত । হালাল খাবারের জন্য ফার্ম থেকে সীপ বা ল্যাম্ব জবাই করে নিয়ে নিয়ে আসা হতো । জবাই করার সময় ফার্ম থেকে একটি এপ্রোন দেওয়া হতো যেটি পরে সীপ বা ল্যাম্ব জবাই করতে হতো। এভাবে প্রতি সপ্তাহে ২ টি সীপ বা ল্যাম্ব বিক্রির জন্য আনা হতো ।

তৎকালীন সময়ে জিনিসপত্রের দাম কেমন ছিল তার উত্তরে তিনি বলেন, চারটি মুরগি এক পাউন্ড, এক পাউন্ড সীপের মাংস হাফ ক্রাউন, একটি সীপের দাম ৭-৮ পাউন্ড ছিল। প্রায় নয় মাস ঐ দোকানে কাজ করেন। প্রথম চাকরি কালীন সময় পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলেন একটি টেক্সটাইল স্পিনিং মিলে কাজ পাওয়া যেতে পারে । ঠিকানা মত গিয়ে দেখলেন ফ্যাক্টরি ভিতর বৃষ্টির পানি জমে আছে। পরে তিনি কাজের খোঁজ নিলে ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষ থাকে পানি দেখিয়ে বলা হয় প্রয়োজনীয় লোক সংগ্রহ করে ভেতরকার পানি সেচ করে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে দিতে পারবেন কিনা। তিনি ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষকে বললেন সেচ পাম্পের ব্যবস্থা করে দিলে তিনি তা পারবেন। ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ এতে রাজি হয় এবং পরের দিন লোক নিয়ে আসার জন্য তাকে বলা হয় । পরের দিন তিনি কয়েকজন লোক সাথে নিয়ে কাজ শুরু করেন এবং তিন চার দিনে পানি নিষ্কাশনের কাজ শেষ করেন। কাজের বিনিময় ফ্যাক্টরি তাদের প্রাপ্য পরিশোধ করে দেয় এবং তাকে ফ্যাক্টরিতে চাকরি দিয়ে দেয়। এই ফ্যাক্টরিতে খুব ভালো পরিবেশ ছিল ।

৮ ঘন্টার শিফট ছিল এবং আধাঘন্টা খাওয়ার জন্য বিরতি দেওয়া হতো। সপ্তাহে বেতন ছিল মাত্র ৫ পাউন্ড। প্রায় দেড় বছরের মতো এই ফ্যাক্টরিতে কাজ করেন । কাজের সময় ফ্যাক্টরির ভিতর তুলা উড়তো, তাই মুখের মধ্যে মাস্ক পরে কাজ করতে হতো। আজলিঙ্গটনে থাকাকালীন সময়ে নামাজ পড়ার জন্য কোন মসজিদ ওখানে ছিল না। ঘরে নামাজ পড়তে হত। তখনকার দিনে প্রায় ঘরে বর্তমান দিনের মতো উন্নত হিটিং ব্যবস্থা ছিল না। তাই প্রচন্ড ঠান্ডা সহ্য করে কখনো ঠান্ডা পানি দিয়ে আবার কখনো কেটল দিয়ে পানি গরম করে নামাজের জন্য অজু করতে হতো। শুক্রবারে জুমার নামাজ পড়ার কোন ব্যবস্থা ছিল না। তবে ঈদের নামাজের জন্য হল ভাড়া করে ঈদের নামাজ আদায় করা হত । তৎকালীন সময়ের শীতের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, যার ফলে খুব বেশি বরফ পড়তে দেখা যেত, বলে মন্তব্য করেন।

১৯৬৩ সালে বেশী বেতনের আশায় হাজলিংটনে থেকে চলে আসেন রচডেলে। এখানে আসার পর কাজ পেলেন স্ব এলাকার একটি ফ্যাক্টরিতে । এই ফ্যাক্টরিতে ট্রেনিং ক্লাস করানো হতো । এই সুবাদে তিনি ট্রেনিং ক্লাস করে উইভিং মেশিনের কাজ শিখে নেন । এই সময় বেতন পেতেন সপ্তাহে ৯ পাউন্ড। এরপরে চলে যান “জন ব্রাইট মিলে”। ২৩ বছর এই মিলে কাজ করেন ।  তিন সিফটে প্রায় আড়াই হাজার লোক কাজ করতেন । রচডেলে এই কোম্পানির ৭টি মিল ছিল ।

১৯৭৯ সালে কাজ ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে যান । ১৯৮০ সালের দিকে বিলেতে মিল ফ্যাক্টরি বন্ধ হতে শুরু করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। রচডেলে যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের বাইরে টয়লেট ছিল এবং গরম পানির জন্য কোন বয়লার ছিল না । কেটল দিয়ে পানি গরম করে বিভিন্ন কার্য সম্পাদন করা হতো । এ সময় থাকার জন্য সিঙ্গেল সিটের বাড়া ছিল এক পাউন্ড, দুজনে শেয়ার করে থাকলে সিট ভাড়া ছিল ১০ সিলিং । রান্নাবান্না নিজে করতে হতো।

ব্যক্তিগত উদ্যোগে রচডেলে চলে আসেন । আজলিঙ্গটনে থাকাকালেই রচডেলে তার পরিচিত লোকজন ছিল । প্রথমে বাড়াটে বাড়ীতে থাকতেন । তারপর রচডেলে ৪ বেডরুমের বাড়ি ক্রয় করেন । মাত্র ৩০০ পাউন্ড দিয়ে ঘরটি ক্রয় করেন। ১৯৬৭ সালে দেশে গিয়ে বিবাহ করেন এবং ১৯৭৬ সালে পরিবারকে নিয়ে বিলেতে আসেন । নিজের ব্যক্তিগত উন্নতির পাশাপাশি ছেলে মেয়েরা বিলেতে লেখাপড়া করে উন্নতি লাভ করেছে করতে পেরেছে এই জন্য তিনি গর্বিত।

বিলেতে দীর্ঘ চাকরি জীবনের শত কর্ম ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি কমিউনিটির উন্নয়নে ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। ১৯৬২ সালে আজলিংটনে  ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সাথে জড়িত ছিলেন । সেখানে একটি মসজিদ নির্মিত হলে তিনি সেটির ফাউন্ডার মেম্বার হন। তিনি বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের ও ফাউন্ডার মেম্বার ছিলেন । রচডেলে আসার পরও তিনি হাজলিংটন ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ছিলেন।

তিনি যখন রচডেলে চলে আসেন তখন রচডেলে ২৫ থেকে ৩০ জন বাংলাদেশী ছিলেন । বাঙালি মালিকানাধীন জনাব মকবুল হাজী সাহেবের ভাইয়ের একটি গ্রোসারি শপ ড্রেক ষ্ট্রীটে, অন্য আরেকটি বাঙালি মালিকানাধীন দোকান ছিলো ইয়র্কশায়ার ষ্ট্রীটে । যখন পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন গঠিত হয় তখন তিনি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন । কিছুদিন পর তার মনে হয় পাকিস্তানি দের সাথে থেকে হবে না, বাংলাদেশীদের আলাদা সংগঠন এর প্রয়োজন মনে করেন । তখন এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তিনি একটি মিটিংয়ের আয়োজন করেন । ওই মিটিংয়ে মানচেষ্টার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল মতিন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার আগা শাহী উপস্থিত ছিলেন। এই মিটিংয়ে যোগদানের মধ্য দিয়ে আগা শাহী প্রথম রচডেলে আসেন । মিটিং শেষে মতিন সাহেব সাহেবের নিকট বাংলাদেশীদের আলাদা সংগঠনের প্রস্তাব যখন তিনি দেন তখন তিনি তাকে বুঝিয়ে বলেন এখন প্রয়োজন নাই, সময় আসলে অবশ্যই হবে ।

১৯৬৪ সালে সোনালী মসজিদ নামে প্রথম মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি মসজিদের সাথে জড়িত ছিলেন । এই মিটিংয়ের পর শুধু বাংলাদেশীদের নিয়ে একটি মিটিং করেন । উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশীদের জন্য আলাদা সংগঠন করা। এই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন জনাব কেরামত আলী, ডাঃ কাদির, আব্দুল মোতালিব, লালা মিয়া, ওয়াজিব আলী, কাজী মনোয়ার আলী সহ আরো অনেক বাংলাদেশী যাদের নাম তইনি স্মরণ করতে পারেননি। এই মিটিং এ কোন কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া যায় নি । এভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পূর্বে শুধু বাংলাদেশীদের জন্য একটি সংগঠন দাঁড় করানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করা হয় ।

১৯৭২ সালে দেশ থেকে ফিরে এসে দেখলেন রচডেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহায্যের জন্য একটি কমিটি গঠিত হয়েছিল । এই কমিটিতে ছিলেন জনাব  লালা মিয়া, আব্দুল গনি, মান্নান তালুকদার, শফিক মির্জা, খোয়াজ আলী, আয়ুবুর রাজা, আতর মিয়া চৌধুরী, আব্দুর রশিদ মাস্টার সহ আরো অনেকে। তারপর বাংলাদেশীদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ইসলামিক সেন্টার । নির্বাচনে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন । পরে এটি রূপান্তরিত করা হয় মসজিদে । পরে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন এন্ড কমিউনিটি প্রজেক্ট গঠন করা হয় । গভর্মেন্ট থেকে একটি প্রজেক্ট প্রাপ্ত হলে প্রায় দুই থেকে আড়াই বছরে তিনি সেখানে চাকরি করেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে যখন পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের উপর জুলুমের সীমা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে যায় । শেখ মুজিবুর রহমান নির্বাচনে জয়লাভ করলেও পশ্চিম পাকিস্তানিরা শেখ মুজিবকে পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা দিতে চায়নি। শুরু হয় বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের প্রস্তুতি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এই সময় তিনি দেশে ছিলেন। শেখ মুজিবের ভোটের সময় তিনি তার পক্ষে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন এবং ভোটের সময় শেখ মুজিবকে সমর্থন জানিয়ে ভোট দেন ।

যুদ্ধের সময় সিলেট জেলার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তান বাহিনীর অনেক তান্ডব লীলা নিজ চোখে দেখেছেন । যুদ্ধের সময় এক রাতে তার নিজ গ্রামে পাকিস্তান বাহিনী হানা দিলে প্রাণের ভয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা পান । এই সময় তার চাচাতো ভাই ও ভাতিজা কে পাক সেনা দল ধরে নিয়ে বিশ্বনাথ থানা সদরে নিয়ে আসে । পরে চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় রাজাকারদের অনুরোধ করলে পাকসেনারা তার চাচাতো ভাই ও বাতিজাকে বিশ্বনাথ থানা সদর থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়। এই সময় তার এক বন্ধুর আত্মীয় ছিলেন বিশ্বনাথ থানার ওসি

যুদ্ধের সময় তিনি একটি বিশেষ পাস বিশ্বনাথ থানার ওসি সাহেবের নিকট থেকে পান । তখন সিলেট টাউনে যেতে তার অসুবিধা হতো না । তাই তিনি সিলেট হযরত শাহজালালের দরগাহ শরীফে পাকিস্তান বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যা কান্ড নিজ চোখে দেখার সুযোগ পান। যুদ্ধকালীন এইসব ঘটনা তখনকার সময় তিনি বিলেতে বসবাসরত অন্যান্য বাংলাদেশীদের জানিয়ে দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে দেশকে সাহায্য করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন । এই সময় তার পাসপোর্টের মেয়াদ চলে যায় । পরে ব্রিটিশ হাই কমিশন ঢাকায় আবেদন করে পুনরায় বিলেত আসার আনুমতি লাভ করেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বিলেত ফিরে আসেন।

নিজ চক্ষে দেখা স্বাধীনতা যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করে বলেন, যে আশা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ মাতৃভূমি বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছিল, সেই আশা-আকাঙ্ক্ষা আজও পূরণ হয়নি। বিলেতে বসবাসরত বাংলাদেশী নতুন প্রজন্ম যদি বাংলাদেশের হাল ধরার সুযোগ পায় তবে হয়তো দেশের উন্নতি হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন । কারণ হিসেবে তিনি বলেন “তারা বিলেতে উন্নত শিক্ষা ও কালচারে অভিজ্ঞ”। যদি বাংলাদেশে যাওয়ার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেওয়া হয় তবে নতুন প্রজন্ম দেশের প্রতি অবশ্য আগ্রহ দেখাবে বলে তার বিশ্বাস । তাছাড়া যারা দোষী তাদের পঙ্গু করে দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তাদের থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে, তার মতে বাংলাদেশের উন্নতি হতে পারে।

বিলেতে চাকরিকালীন সময় শনি ও রবিবারে কমিউনিটির কাজ করতেন, যেমন চিঠিপত্র লিখে দেওয়া, পত্র পড়ে শুনানু, ট্যাক্স অফিসের ফরম পূরণ ও অন্যান্য অফিসিয়াল কাজে সাহায্য করতেন। কারণ তৎকালীন সময়ে যারা বিলেতে এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগই বাংলা ও ইংরেজি পড়তে ও লিখতে পারতেন না । কখনো বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের ঘরে বেড়াতে যেতেন । এই ভাবে তার সাপ্তাহিক ছুটির দিন কেটে যেত ।

জীবন সংগ্রামে সফল এই সমাজকর্মী  বিলেতে চাকরির পাশাপাশি নিজেকে ব্যবসার সাথে জড়িয়ে ছিলেন । তিনি প্রথমে ইন্ডিয়ান খাবারের একটি টেইকওয়ে ব্যবসা করেন । এটি ভালো ব্যবসা না করায় ছেড়ে দিয়ে পরে একটি কাপড়ের দোকান দেন ।

বিলেত জীবনের স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেই সময় প্রচুর বরফ পড়ত। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বরফ পড়তে দেখেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন । যখন বরফ পড়ত তখন প্রচন্ড শীত লাগতো এবং রাস্তাঘাটে হাঁটার সময় অনেক লোকের পা খসে রাস্তায় পড়ে গিয়ে হাত পা ভেঙ্গে যেত।

জীবনে চলার পথে অত্যন্ত সফল এই মহান ব্যক্তিত্ব বর্তমানে রচডেলে বসবাস করলেও মাতৃভূমি বাংলার প্রতি রয়েছে তার অসীম মমতা । বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিস্থিতি ভালো হলে দেশে গিয়ে সময় কাটানোর ইচ্ছা রয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। সমাপ্ত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *