মিশর ও কায়রো পরিচিতি:
পিরামিডের দেশ, ফেরাউনের দেশ এবং অবশ্যই আল্লাহর নবী মুসা (আ:) এর দেশ মিশর। সরকারী নাম- জমহুরিয়া মিছর আল আরাবিয়া বা মিশর আরব প্রজাতন্ত্র । দেশটিকে বাংলায় আমরা যদিও মিশর বলি বা লেখি, কিন্তু পবিত্র কুরআনে এবং সেদেশের মানুষ একে ‘মিছর’ বলেই ডাকে। অবশ্য পাশ্চাতের দেশগুলো ও তার পন্ডিতজন এর নাম দিয়েছেন ইজিপ্ট। ভারত উপমহাদেশের নাম যেভাবে কয়েক হাজার বছর আগে আরব ও পারস্যের লোকেরাই প্রথম হিন্দ বলে প্রচার করে এবং সেখান থেকে গ্রীকদের মাধ্যম (সিন্ধিয়া> হিন্দিয়া>হিন্ডিয়া) ইন্ডিয়া নামে সর্বত্র প্রচার পায়, ঠিক তেমনি, গ্রীকরাই মিছর দেশটিকে ইজিপ্ট বলে ডাকতে শুরু করে। বর্তমানে মিশরের চেয়ে ইজিপ্ট নামটিই সর্বত্র পরিচিত।
এদের ভাষা হলো মিশরীয় আরবী। ইংরেজি সেখানে খুব একটা চলেনা। খুব কম লোকই ইংরেজি জানে। যারা অল্পবিস্তর ইংরেজি জানে, আরব উচ্চারনে বলা তাদের এ ইংরেজি বুঝা বেশ কঠিন। যেমন: পিরামিড তাদের উচ্চারণে- বিরামিড ! এমনি আরো কত কী !
মিশরের উত্তর সীমানায় রয়েছে ভূমধ্যসাগর (মেডিটারিনিয়ান সি), দক্ষিণে সুদান , পশ্চিমে লিবিয়া এবং পুর্ব সীমানায় লোহিত সাগর (রেড সি)। দেশটির পু্র্ব দিকে লোহিত সাগরের অপর পারে সৌদী আরব এবং উত্তর পুর্বদিকে রয়েছে সুয়েজ খাল, গাজা উপত্যকা এবং ইজরায়েল। আয়তনের দিক দিয়ে মিশর হলো দশ লাখ বর্গ কিলোমিটারের এক বিশাল ভূখন্ড, যা বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় দশগুন বড়। তবে দেশটির আশি ভাগের বেশী মরুভূমি। ভূমির তুলনায় জনগোষ্ঠির পরিমান কম।
নীলনদের তীরঘেষেই প্রধান প্রধান শহর নগর গড়ে ওঠেছে। জনসংখ্যা প্রায় দশকোটির কাছাকাছি মাত্র। এর মধ্যে ৯৪% মুসলীম, ৫% খৃষ্টান এবং বাকী ১% ইহুদী এবং অন্যান্য। মুসলীমদের মধ্যে সুন্নী মুসলীমের সংখ্যাই বেশী। কায়রোতে অবস্থিত আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর ২য় সর্ব প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে আজো পাঠদান চলছে। বিশ্ব জুড়ে সুন্নী মুসলিমদের চিন্তা গবেষণা ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে এটি আজো এক নির্ভরশীলতার প্রতীক। আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জামাতে মাগরিবের নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে আমাদের।
প্রাচীন কায়রো:
মিশরের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর হলো কায়রো, আরবীতে যাকে বলে-আল কাহিরাহ। মজার ব্যাপার হলো- মিশরের রাজধানী হলেও কায়রো শহরের সাথে সরাসরি ফেরাউন রাজাদের কোন সম্পর্ক নেই। কায়রো শহর গড়ে ওঠেছে ফেরাউন রাজাদের অনেক পরে। হযরত মুহাম্মদ (দ:) ইন্তেকালের পর হযরত ওমরের শাসনামলে প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আস ৬৪২ খৃষ্টাব্দে মিশর জয় করেন।
রোমান বাইজেন্টাইন সম্রাট হেরাক্লিয়াস এর শাসনাধীন মিশর, খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাব এর সময়ে এ বিজয় অর্জিত হয়। সেনাপতি আমর ইবনুল আস যেখানে তাঁর তাবু স্থাপন করেন, বিজয়ের পর সে স্থানটিতেই তাঁর প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন। এ স্থানের নামকরণ হয়-ফুসতাত।
আরবী ফুসতাত শব্দের অর্থ হলো তাঁবু। সেখান থেকে এই নাম। এখানেই স্থাপন করা হয় মিশর এবং গোটা আফ্রিকার প্রথম মসজিদ- আমর ইবনুল আস মসজিদ। আজো সে মসজিদ সেখানেই রয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখে এলাম আফ্রিকা মহাদেশের প্রথম সেই মসজিদটি। বহু সংস্কারের ফলে প্রথম যে আকারে সে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল তা আর বর্তমান নেই।
তবে সাহাবী ও সেনাপতি আমর ইবনুল আস যেখানে তাঁর তাঁবু গেড়েছিলেন, সেখানে মসজিদটি প্রতিষ্টিত হওয়ার ফলে স্থানটি আজো চিহ্নিত হয়ে আছে। ফুসতাত নামে মুসলীমদের প্রতিষ্টিত প্রথম শহর যা বর্তমানে ওল্ড কায়রো বা প্রাচীন কায়রো (মিছর এল কাদিমা) নামে পরিচিত।
ইতোমধ্যে দুই শত বছর চলে গেছে ফুসতাত শহর প্রতিষ্টার। ফাতেমীয় বংশের শাসনাধীনে চলে এসেছে মিশর। ফুসতাত নগরীর উত্তর-পুর্ব দিকে একটি নতুন শহরের গোড়া পত্তন করেন এই নতুন শাসকরা। প্রথম দিকে যা মনসুরিয়া বলে পরিচিতি লাভ করে। ফাতেমীয় শাসক মুয়িজ উদ্দীন তাঁর পুরাতন রাজধানী তিউনিসিয়া থেকে নব প্রতিষ্টিত শহর মনসুরিয়ায় নিয়ে আসেন ৯৭৪ সালে এবং এর নাম দেন- আল কাহিরাতু (বিজয়ী)।
পরবর্তীতে প্রথম প্রতিষ্টিত ফুসতাত এবং নব প্রতিষ্টিত মনসুরিয়া বা আল কাহিরাই ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে বৃহত্তর কায়রো শহরে পরিনত হয়েছে। কায়রো থেকে বর্তমানে প্রায় পচিশ কিলোমিটার দুরে রয়েছে ফেরাউন রাজাদের রাজধানী মেমফিস। সেখানেই রয়েছে বিখ্যাত সব পিরামিড।
বর্তমান কায়রো:
আয়তনে আজকের কায়রো বারোশত বর্গ মাইল যা ঢাকার চেয়ে দশগুন বড়। জনসংখ্যা দুই কোটি যা ঢাকার মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান।
কায়রো মহানগরীতেই রয়েছে বিখ্যাত ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম। তাহরির স্কোয়ারের অনতি দুরেই এর অবস্থান। বিশ্বের অন্যতম পূরাতাত্তিক সংগ্রহশালা গুলোর অন্যতম একটি হলো কায়রো মিউজিয়াম অফ এন্টিকোয়েটি। সর্বমোট এক লাখ বিশ হাজার আইটেম রয়েছে। মিশর সরকার আগামী বছরের প্রথম দিকে অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন আরেকটি মিউজিয়াম চালু করতে যাচ্ছেন।
বর্তমানে কায়রো শহরের তাহরির স্কোয়ারে অবস্থিত মিউজিয়ামটি ১৯০১ সালে প্রতিষ্টিত হয়। শত বছর পুরানো এ মিউজিয়াম বর্তমানে অনেক দর্শনীয় বস্তুর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছেনা। বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে আছে। নতুন এ মিউজিয়ামের নাম দেয়া হয়েছে- গ্রান্ড ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম (জি. ই. এম)। এটি কায়রো শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দুরে গীজা নামক স্থানে, যেখানে বিখ্যাত পিরামিড গুলো অবস্থিত, তার পাশেই স্থাপন করা হয়েছে। আগামী বছর ২০২০ সালের প্রথম দিকে এটি চালু হবে। নতুন মিউজিয়াম চালু হলে দর্শকরা আরো অনেক কিছু দেখতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
বর্তমানে তাহরির স্কোয়ারে অবস্থিত মিউজিয়ামের ভেতরেই রয়েছে বেশ ক’জন ফেরাউনের মমি বা মৃতদেহ সম্বলিত একটি কক্ষ। এটিকে বলা হয়- রয়্যাল মমি রুম। আল্লাহর নবী মুসা (আ:) এর সময়ে যে ফেরাউন মিশরের শাসক ছিল, তাঁর মৃতদেহ (এ বিষয়ে গবেষক মহলে দ্বিমত আছে ) সহ আরো বেশ কিছু ফেরাউন ও তাদের স্ত্রীদের মমি সে কক্ষে রাখা্ হয়েছে। রয়্যাল মমি রুমে অতিরিক্ত টিকেট কেটে প্রবেশ মূল্য দিয়ে প্রবেশ করতে হয়। প্রথমে যে টিকেট দিয়ে মিউজিয়ামে প্রবেশ করতে হয় তা দিয়ে রয়্যাল মমি রুমে প্রবেশ করা যায়না। অতিরিক্ত টিকেট লাগে।
রয়্যাল মমি রুমে ছবি তোলা সম্পুর্ণ রুপে নিষিদ্ধ। মিউজিয়ামে বাকী যে কোন অংশে ছবি তোলা যায়। তবে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ব্যবহার করা সব মিউজিয়ামেই নিষিদ্ধ। ইজিপশিয়ান মিউজিয়াম অব এন্টিকোয়েটি যাকে সংক্ষেপে কায়রো মিউজিয়াম ও বলা হয়, সেখানে আজ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার আগের অনেক ভাষ্কর্য সহ নানা রকম দৈনন্দিন ব্যবহার্য্য দ্রব্যাদি রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে মিশরের রাজা বা ফেরাউনদের ব্যবহৃত স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর তৈরি আসবাবপত্র যেমন: রাজমুকুট , রাজ সিংহাসন, স্বর্ণের পোশাক, স্বর্ণের পাদুকা, ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যাবে। ফেরাউন রাজা বা মিশরীয় সম্রাটদের মমিসহ তাদের স্ত্রীদের এবং অন্যান্য শ্রেণী বা পেশার কিছু মানুষের মমি এবং এমনকি পশুর মমিও কায়রো মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। ফেরাউনদের মধ্যে বেশ কিছু কৃষ্ণাঙ্গ বা আফ্রিকান তথা নুবিয়ান ফেরাউন/সম্রাটও ছিলেন। রয়্যাল মমি রুমে এদের কয়েক জনের মমি সংরক্ষিত আছে। মিউজিয়ামে রক্ষিত ভাষ্কর্য্য এবং স্বর্ণালঙ্কার অন্যান্য কারুকার্য্যময় দ্রব্যাদি দেখলে অবাক হতে হয় । আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগের কারিগরদের শিল্পকর্মে সুনিপুন দক্ষতা এবং শিল্পবোধ এক বিস্ময়ের বিষয়।
পিরামিডের পাদদেশে:
আগেই উল্লেখ করেছি- ফেরাউনদের যুগে কায়রো শহর ছিলোনা। পরবর্তীতে এটি গড়ে ওঠেছে। ফেরাউন-যুগে মেম্ফিস নামক স্থানে ছিল তাদের রাজধানী। সেখান থেকে ২৪ কি: মি: দুরে গড়ে ওঠে আজকের মিশরীয় রাজধানী কায়রো। অবশ্য শুধু মেম্ফিস ই নয় আরো অনেক স্থানেই তাদের রাজধানী ছিল।
মিশরের ইতিহাসের সাথে সাথে ফেরাউনদের ইতিহাস ও খুবই প্রাচীন। সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে সর্বমোট তিরিশটি রাজবংশ (ডাইনেস্টি) মিশর শাসন করেছে। মিশর সম্রাটদের বলা হতো ফেরাউন। পাঁচ হাজার বছরে কত ফেরাউন এসেছে আর গিয়েছে তার হিসাব নেই। তবে এদের অনেকেই মৃত্যুর পরও তাঁদের চিহ্ন রেখে গেছে পিরামিড নির্মানের মাধ্যমে। এছাড়া বিশাল আকারের ভাষ্কর্য্য/ মূর্তি নির্মান করে, তাদের নিজস্ব বর্ণমালা হায়রোগ্লাফিক লিপিতে পাথরে খোদাই করে লিখে রেখে গেছে তাদের পরিচয় ও নানা ঘটনাবলির বিস্তৃারিত বিবরন।
সবচেয়ে বেশী নিদর্শন পাওয়া গেছে খোদ পিরামিডের অভ্যন্তরে। জীবিত অবস্থায় একজন ফেরাউনের যা কিছু প্রয়োজন হতো, তার প্রায় সবকিছুই মৃত্যুর পর তাদের কবর অর্থাৎ পিরামিডের ভেতরে দিয়ে দেওয়া হতো। মনে রাখা ভালো, তিন থেকে পাঁচ হাজার বছর আগের মিশরীয় সম্রাটদের কবর হলো এই পিরামিডগুলো। কয়েক হাজার বছর ধরে পিরামিডের ভেতরে এতসব মূল্যবান স্বর্ণের দ্রব্যাদি অক্ষত থাকেনি। দস্যু তস্কর, লুটেরাদের হামলার শিকার হয়েছে। তারপরও কিছু কিছু সম্পদ রয়ে গেছে।
এই রয়ে যাওয়া সম্পদ ও ফেরাউনদের কিছু মৃতদেহের মমি মিশর সরকার সংগ্রহ করে মিউজিয়ামে রেখেছে দর্শনার্থীদের প্রদর্শনের জন্য। দস্যু তস্কররা লুটে নিলেও কিছু কিছু সমাধির সন্ধান ওরা পায়নি । ফলে সম্পুর্ণ সম্পদ অক্ষত পাওয়া গেছে। এবং তা থেকে ঐ সময়ের সম্রাটের জীবন কথা ও মৃতদেহ সমাধিস্থ করার পদ্ধতি জানা সম্ভব হয়েছে।
(চলমান…)
