যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয় ও জয়ের নায়ক আকবর আলীর আনন্দ-বেদনার কথা – মোঃ রহমত আলী


বাংলাদেশের ক্রিকেটে আইসিসির বিশ্বকাপ অর্জন ছিল অধরা স্বপ্ন। অনেকবার টাইগার ভক্তদের বুকে বিশ্বকাপের আশার আলো জ্বলে উটলেও সেই আলো নিভেছে বেশ কয়েকবার। তবে এবার অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ শিরোপা জয় সেই স্বপ্ন ধরা দিল। আর এ জয়ের নায়ক জুনিয়র টাইগারদের অধিনায়ক আকবর আলী।

পরাজয়ের মুখ থেকে টেনে দলকে জেতানো নায়কোচিত তরুণটির প্রশংসা এখন বিশ্বজুড়ে। সাথে সাথে বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছে বাংলাদেশ যুবকরা। যেখানে বড় অক্ষরে লেখা হচ্ছে আকবরের নাম। তার ব্যাটেই যে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে বাংলাদেশ যুব দল। শিরোপার লড়াইয়ের ম্যাচে ভারতের লেগ স্পিনার রবি বিষ্ণুনয়ের আঘাতে বাংলাদেশের ইনিংস যখন ওলট-পালট, তখন আলোকবর্তিকা হাতে উইকেটে ছুটে যান আকবর।

উইকেটে দেখা মেলে এক যোগ্য নেতার। কতোটা ঠাণ্ডা মেজাজে নেতার দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেটা ব্যাট হাতে প্রমাণ করে দেখান তিনি। প্রথম সারির কোনো ব্যাটসম্যান না থাকলেও রকিবুল হাসানকে সঙ্গে নিয়ে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন ৪৩ রানের হার না মানা ইনিংস খেলা ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান।

বিশ্বকাপ ফাইনাল মানেই ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তার মানসিকতা। সেখানে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক আকবর আলী যা করে দেখিয়েছেন, তা বাস্ততাকেও হার মানায়! বোনের মৃত্যু শোক ভুলে দলকে আগলে রেখে একের পর এক ম্যাচ খেলে গেছেন যুব বিশ্বকাপে। সেই আকবরের ব্যাটেই বাংলাদেশের জয় ধরা দিয়েছে।

বিশ্বকাপের প্রথম শিরোপা পেয়ে পুরো দেশ এখন উৎসবের আমেজে। সেই আমেজটা সবার চেয়ে অনেক বেশি করে ছুঁয়ে যাচ্ছে আকবরের বাবা মোহাম্মদ মোস্তফাকে। ছেলের এমন কৃতিত্বে আজ তিনি প্রথিবীর সবচেয়ে সুখি মানুষ। তার চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। আনন্দের পরিমাণ এমন যে, ছেলেকে নিয়ে কিছু বলার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। মা শাহিদা বেগমও ঠিকভাবে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছেন না। শুধু বললেন, ‘এটা সমগ্র দেশবাসীর জয়। অনেক কষ্ট করে আকবর এতদূর এসেছে। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন।’

সবখানে যখন আনন্দের জোয়ার, আকবরের মনের কোথাও যেন বিষন্ন সুর বেজে যাচ্ছে। উদযাপন করতে থাকা আকবরকে দেখে অবশ্য সেটা বোঝা যাবে না। কিন্তু তার ভেতরটা হয়তো ডুকরে কাঁদছে। যে বোনকে সুস্থ রেখে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ খেলতে গেছেন আকবর, সেই বোন এখন না ফেরার দেশে।

বিশ্বজয়ী আকবর শিরোপা নিয়ে বীরের বেশে দেশে ফিরছেন, কিন্তু সেটা আর দেখা হবে না বোন খাদিজা খাতুনের। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে গত ২২ জানুয়ারি মারা যান বাকশক্তিহীন খাদিজা। এমন খবরেও আকবর মুষড়ে যাননি, বোনকে হারানোর শোক থেকেই শক্তি সঞ্চয় করে শিরোপার পথে দলকে নিয়ে গেছেন তিনি।

আকবরদের চার ভাইয়ের একমাত্র বড় বোন ছিলেন খাদিজা। ভাইয়ের ক্রিকেট নিয়ে তার আগ্রহের শেষ ছিল না। আকবর ক্রিকেট খেলতে গেলেই জায়নামাজে বসে যেতেন খাদিজা, সব ধরনের সমর্থন দিতেন ক্রিকেট খেলার জন্য। দোয়া করতেন প্রিয় ছোট ভাইয়ের ভালো খেলা আর সুস্থতার জন্য। আকবর ঠিকই ভালো খেলে বিশ্বজয় করলেন, কিন্তু সেটা আর দেখা হলো না খাদিজার। চার ভাইয়ের মধ্যে আকবর সবার ছোট। তার বড় ভাই মুরাদ হোসেনও ছিলেন পেশাদার ক্রিকেটার। ২০১৭ সালে ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়া মুরাদ খেলেছেন ঢাকা লিগ ও খুলনা প্রিমিয়ার লিগে। তাকে দেখেই মূলত ক্রিকেটের প্রতি ঝোঁক বাড়ে আকবরের।

ছোট ভাইয়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত মুরাদ বলেন, ‘এটা আসলে ভাষায় বলার মতো না। আকবর যেটা অর্জন করেছে, এটা পুরো বাংলাদেশের অর্জন। ওকে বিকেএসপিতে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। আমিও ক্রিকেট খেলতাম। কিন্তু আমি যেটা পারিনি, আমার ভাই সেটা করেছে।’

একমাত্র বোন খাদিজার কথা মনে করাতেই মুরাদের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে। বড় ভাই মুরাদ বলেন, ‘আমাদের চার ভাইয়ের একটা বোন ছিল। বোনটা আমার কথা বলতে পারতো না, ও অনেক আদরের ছিল। এমন খবর আকবরকে আমরা জানাতে পারিনি। বোনের মৃত্যুর ১৯ দিনের মাথায় দেশকে শিরোপার আনন্দে ভাসিয়েছেন আকবর। কীভাবে শোক কাটিয়ে দুঃসময়েও দৃঢ়চিত্তে এগিয়ে যেতে হয়, আকবর সেটার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যে দৃষ্টান্ত শুধু ক্রিকেটেই নয়, জীবনের পথচলাতেও অনুপ্রেরণা হতে পারে ভবিষ্যতের আরও অনেক আকবরদের জন্য।

ছোট বেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা। যদিও বাবা-মা ক্রিকেট খেলতে দিতে চাইতেন না। তবুও ঝোঁক থামেনি, বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে ক্রিকেট খেলে যেতেন আকবর আলী। পরবর্তী সময়ে তারাই ছেলের শক্তিতে পরিণত হন। আকবরকেও আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ইতিহাস রচনার পথে এক পা করে এগিয়ে গেছেন।

১৪৩ রানে সপ্তম উইটে পতনের পরও সাহস হারাননি আকবর আর রকিবুল। অষ্টম উইকেটে অবিচল আস্থা ও আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান আকবর আলী এক পর্যায়ে ৩২ ওভার থেকে ৩৬.৪ ওভার পর্যন্ত একটি রানও করেননি। জানতেন, এখন রান করার চেয়ে উইকেটে টিকে থাকাই হবে আসল কাজ। সেই কাজটি দক্ষতার সাথে করে ৩৬.৫ ওভারে গিয়ে মিডঅফে ঠেলে প্রথম সিঙ্গেলস নেন আকবর আলী। শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন। অষ্টম উইকেটে রাকিবুলকে সাথে নিয়ে অবিচ্ছিন্ন ৩৪ রানের জুটি গড়ে জয় নিশ্চিত করলেন। আকবরের ৭৭ বলে ৪৩ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরেই লিখা থাকবে।

হাফসেঞ্চুরি কিংবা শতরানের ইনিংস নয়, কিন্তু আকবরের আলীর এই ইনিংসটি ছিল যে কোনো সেঞ্চুরি বা হাফসেঞ্চুরির চেয়েও দামি। দলের বিপর্যয়ে যেভাবে হাল ধরলেন, মনে পড়ে গেল সেই সাতানব্বইয়ের আকরাম খানকে। ২০২০ সালে এসে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ এখন নিয়মিতই বিশ্বকাপ খেলে। সেরা আটে উঠেছে দুইবার, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে খেলার রেকর্ডও আছে টাইগারদের। তাহলে ’৯৭ এর আইসিসি ট্রফিতে খেলা আকরাম খানের ঐ ইনিংসটি এত গুরুত্বপূর্ণ কেনো? কারণ হলো, আসলে আকরাম খানের হল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা ৬৮ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংসের ওপরেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সত্যিকারের ভিত গড়ে ওঠা। সে ম্যাচে না জিতলে, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপেই খেলা হতো না টাইগারদের।

পরিশেষে একটি কবিতা দিয়ে শেষ করতে চাই। কবিতার নাম- “জয়ের নায়ক আকবর আলী”

জয়ের নায়ক আকবর আলী

কেমন আছো ভাই

আমার নামটি রহমত আলী

দেখতে তোমায় চাই।

বিশ্ব যুব ক্রিকেট খেলায়

চ্যাম্পিয়ন হলো দেশ

সেই সুবাদে তুমিও হলে

ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ।

খেলা শুরুর আগে যখন

টসে জিতে গেলে

সাহস করে পাঠাও তাদের

বেটিং করার স্থলে।

১০ উইকেট শেষ করে

পেলো যত রান

৭ উইকেটে গুড়িয়ে দিয়ে

রাখলে দেশের মান।

তোমার দলের অন্যরা সব

ব্যাটিং করার কালে

আসে আর চলে যায়

তুমি টিকে থাকলে।

শক্ত হাতে তখন তুমি

দাঁড়িয়ে থাকো মাঠে

শেষ সময়ের ৭ রানে

তরি ভিড়াও ঘাটে।

 

 

 

 

 

, , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *