মা তোর বদনখানি মলিন হলে – ময়নূর রাহমান বাবুল


অনেকদিন ধরে সময় নিয়ে ফেসবুকে বসিনা। সময় হয়ে ওঠেনা। তেমন আগ্রহও নাই। আজ ভোরে ঘুমথেকে উঠেই দিনের হিসাব কষে দেখলাম, আমি আজ অবসর -স্বাধীন। অতএব জাতির পিতার শততম জন্মদিনে বসবো কাগজ কলম বা কীবোর্ড নিয়ে। কিছু লিখবো পিতাকে বিনম্র  শ্রদ্ধা জানিয়ে। আর চটিয়ে বেড়াবো ফেসবুকের পাতায় পাতায়। অনেক বন্ধুর অভিযোগ তাদের স্টেটাস আমি দেখি না। আজ খুটিয়ে খুটিয়ে ওসব দেখবো।

সকালের নাস্তাটা পাতে পড়েনি তখনও। কেবল এক গ্লাস পানি ছাড়া। এমন সময় আমার প্রিয় এক গল্প লেখকের ফোন ভাই খুব ভোরে ফোন করে বিরক্ত করছি। বললাম না না, আমিতো আরো অনেক আগেই উঠেছি। তিনি বললেন, কাল রাতে মেইল করে আমার লেখা একটা গল্প পাঠিয়েছি। ওটা পড়ে আপনার মতামত দিতে হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। বললামঃ আচ্ছা পড়ার সময়টা দাও।

এরই মধ্যে বউ এসে বসার ঘরে যোগ দিলেন একটা সুখবর নিয়ে। জাতির পিতাকে নিবেদিত বহু আগের লেখা আমার একটা কবিতা একজন বন্ধু তার স্টেটাসে নতুন করে পোষ্ট দিয়েছেন…

এবং তার সাথে হুকুম জারি করলেন, নাস্তা শেষ করেই মার্কেটে যেতে হবে। ’পঙ্গপালের’ মতো মানুষ সবগুলো খাদ্যবস্তু নিয়ে যাচ্ছে দোকান থেকে। আমরা বসে বসে পরে পস্তাবো অথবা করোনায় না মরলেও খাদ্যাভাবে উপোস করে মরবো।

হোয়ার্সঅ্যাপে যে কতো গ্রুপে এডমিন সাহেবরা আমাকে নিয়ে শরীক সংযুক্ত করেছেন, তার কোন হিসাব নাই। এতো এতো গ্রুপের সদস্য হয়ে মাঝে মাঝে মনে হয় যে, আমিতো এখন গ্রæপ অব ইন্ডাষ্টিজের মালিক। ঈদে পার্বনে বা বিশেষ বিশেষ দিনে যে পরিমান ছবি মেসেজ আর বার্তা আসে তা সাথে সাথে ডিলিট না করলে ঘন্টা দু‘য়েকের পরেই ফোন আর চলেনা -এগুলোতে ফোন জ্যাম হয়ে বসে থাকে। আবার ডিলিট করতে গেলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হয় মোনাজাতের মতো দু‘হাত টাঙিয়ে।

সেই হোয়ার্সঅ্যাপের বদৌলতে গত ক‘দিন ধরে করোনা ভাইরাস আর বাজারের অবস্থা শুনতে শুনতে কান দুটো ঝালাপালা। করোনার ভেকসিন বা প্রতিরোধক প্রতিষেধক হিসাবে নতুন নতুন দোয়া আর বড় ছোট মাঝারী উপদেশ দাতাদের প্যানার প্যানার শুনে অর্ধেক আক্রান্ত হয়েই যেন আছি। ডাক্তার পাতিডাক্তারদের কথা উপদেশ আর ভিডিও র কথা নাহয় থাক্। ইতোমধ্যে বাজারে টিসু, চাল, ডাল, মাংস নিয়ে কাড়াকাড়ি, চুলোচুলির ছবি আর সুপার মার্কেটের ফাঁকা সেল্পগুলোর কঙ্কাল দশার ছবি দেখে দেখে চোখ দুটোতো ঝাপসা হয়ে গেছে..

অতএব বন্ধুকে দেয়া কথা, তার গল্প পড়ে মতামত দেয়া আর হলোনা। প্রস্তুতি নিয়ে সস্ত্রীক গাড়ি দিয়ে বের হলাম। প্রথমেই গেলাম আসদাতে। আসদার ফার্মেসী থেকে গতমাসে কিছু প্যারাসিটামল নিয়ে ছিলাম। যা শেষ হয়ে আসছিলো। করোনার প্রস্তুতি হিসাবে বার বার হাত ধোয়ার কথাতো আছেই। উপসর্গ হলে সাথে এই প্যারাসিটামলই ভরসা। কারণ এর প্রকৃত ঔষধ পেতেতো ছ’মাস বা বছর লেগে যাওয়ার কথা শুনছি। সময় যতই লাগুক। ভেকসিন, ঔষধ এসব একদিন বের হবেই। তখন হয়তো এর ঔষধ ঘরের পাশে মুদির দোকানেও পাওয়া যাবে। অথচ এখন এ নিয়ে সারা বিশ্বে আতঙ্ক উৎকণ্ঠার শেষ নাই।

কিন্তু এই ফার্মেসীতে প্যারাসিটামল ক্রয়ে প্রথমেই ধাক্কা খেলাম। ৩২টার প্যাকেটের দাম এক পাউন্ড। যা গত মাসে এক পাউন্ড দিয়ে ২প্যাকেট নিয়েছিলাম। তাও আজ জনপ্রতি এক প্যাকেটই বিক্রি করবে এর বেশী নয়। দাম বাড়লো কেন? আপাতত এই বিতর্কে আর যেতে চাইলামনা। থাক্ -দোষতো শুধু শুনলাম বাঙালী ক্রেতা আর দোকানদারদের। এখন দেখি ফার্মেসী ওয়ালাও মূল্য বৃদ্ধির সুযোগটা হাতছাড়া করতে দ্বিধা করলোনা। হবে হয়তো আমাদের সংস্পর্শে তারাও দুষ্টু হয়ে গেছে। থাক্ মাত্র পঞ্চাশ পেণী বেশী -এইতো !

তারপর অঝউঅ র মূল দোকানে তথা সুপার মার্কেটে ঢুকেইতো চক্ষু চড়কগাছ ! গত ১০/১৫ বছর যাবৎ এখানে সওদা করি। প্রতি সপ্তাহেই কমপক্ষে একবার কখনো আরো বেশী ২/৩ বার আসতেও হয়। এরকম কখনো দেখিনি। যে বিভাগেই যাই, সেখানেই সেল্পগুলো খালি অথবা ২/১টা ভাঙ্গা-টোটা জিনিষ পড়ে আছে। আমাদের প্রয়োজনীয় কোন জিনিষই নাই। আমিতো একেবারে থ।

ইতোমধ্যে বউ ফোন করে বড় মেয়েকে খবর পৌঁছে দিয়েছেন অঝউঅ র হাল হকিকত। ওদিক থেকে সে বলে দিয়েছে তার মেয়ে (আমাদের নাতনী)র জন্য নেপী, ওয়াইপস, শিশু খাদ্য ইত্যাদি নেবার জন্য। অতএব তাড়াতাড়ি এই সেল্প থেকে ঐ সেল্প। এই বিভাগ থেকে ঐ বিভাগ। আহারে ! গত ১৫ বছরের মধ্যে আমি কখনো সেল্পে চিনির থাক টা খালি দেখিনি। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি আমি মিথ্যা বলছিনা। আমার স্পষ্ট মনে আছে, কখনো চিনি রাখার জায়গাটা খালি হয়নি। আজ যা শুন্য খা খা করছে।

একজন লোক বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। উপরে নীচে ডানে বাঁয়ে তাকাচ্ছে। এমন ভাবে তাকাচ্ছে যে হয়তো কোথাও ১টা চিনির প্যাকেট লুকিয়ে থাকলেও থাকতে পারে। অন্য কেউ হয়তো দেখেনি যা তিনিই দেখবেন এবং নিয়ে যাবেন। আমি একটু দূর থেকে তার এই খোঁজাখুজিটা পর্যবেক্ষণ করি আর মনে মনে তার জন্য আক্ষেপ করি।

আক্ষেপতো আমার জন্যও অপেক্ষা করছে তা কি আমি জানিনা ? চিনি, ময়দা, নাতনীর নেপী, শিশু খাদ্য, ব্রেড ওসব নাহয় না-ই নিলাম অন্তত দুধের বোতলতো একটা নিতে হবে। কিন্তু দুধ রাখার ন্থান বা ফ্রিজ সেল্পগুলো শুন্যতায় রোদন করছে। তাহলে খামারের সব গাভীগুলো কি…  না না, অন্তত আমি এই অলুক্ষণে কথাটা বলতে পারিনা।

হাটছি অঝউঅ র বিরাট দোকানের সাজানো বিভিন্ন অংশের শুন্য, খালি সেল্পগুলোর ফাঁকে ফাঁকে। এরই মধ্যে পেয়ে গেলাম একটা তিন লিটার দুধের ক্যান। নিজেতো নিজের চেহারা দেখা যায়না। অতএব আমি জানিনা আমার তখনকার খুশি খুশি মুখখানা দেখতে কেমন দেখাচ্ছিলো। তবে আমার স্ত্রীর বর্ণনায় তা কিছুটা অনুমান করতে পারলাম। তিনি বললেনঃ অনেকদিন পরে তোমার হাসি খুশি মুখখানা দেখতে ভালই লাগছে। মনে হচ্ছে তুমি সাত রাজার ধন পেয়েগেছ !

সত্যি কি তাই ? আমি মোবাইল বের করে এই দুধের ক্যানের ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। তিনি ধমক দিয়ে বললেনঃ কেউ এসে নিয়ে যাবে। ক্যানটা হাতে নাও। ক্যানটা হাতে নিয়ে দেখলাম, চতুর্দিক থেকে চাপে প্লাষ্টিকের ক্যানটির মুখের অংশ চাপা চ্যাপটা হয়েগেছে। নীচ দিকে বা হাতলের দিকেও চ্যাপা হয়ে গেছে। ভাবলাম ক্যান দিয়ে কী করবো ? ভেতরে দুধতো ঠিকই আছে পরিমানে এবং মেয়াদোত্তীর্নের তারিখটাও। পাত্র দিয়েতো আমার কোন কাজ নাই। আমারতো সার দরকার -খোলস নয়।

বন্ধুর গল্প পড়ে মতামত দেয়া হলোনা। কিছু লেখা হলোনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, জাতির পিতার জন্মশত বার্ষিকী নিয়ে… করোনা ভাইরাসকে মনে মনে বড় অভিশাপ দিলাম। তিরস্কার করলাম। কেন তারা সুদুর চীন দেশ ছেড়ে এই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এখানে এলো !

বার বার জন্মভূমির কথা মনে পড়তে লাগলো। আমরা যারা বিদেশ থাকি, দেশ থেকে বড় হয়ে এসেছি। তারা কারনে অকারণে দেশের কথাই ভাবি একটু বেশী। এমন বিপদে ইতালি এবং অন্যান্য দেশ থেকে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশী লোক দেশে গেছে -বড় অযাচিত ভাবে।

বার বার না না বলার পরও তারা দেশেই ফিরে গেছেন। হয়তো তারা ভাবছেন মরতে যদি হয়ও, নিজের দেশের মাটিতেই মরবো -অথবা অন্যকিছু। -করোনা ভাইরাস তাড়িত এই অসহায় লোকগুলো বিমান থেকে নেমেই যখন অনেক অনিয়মের মধ্যে নিয়মনীতির যাতাকলে আমার সেই দুধ ভর্তি ক্যানের মতো চ্যাপটা হতে থাকলো তখন দু’চারটা বাজে কথা মুখে বলেই ফেলেছিলো হয়তো।

এজন্য দেশের সাহেবজাদাগন ভদ্রতা দেখালেন তাদেরকে ’নবাবজাদা’ আখ্যা দিয়ে, তাতে ক্ষতি কী ? হারামজাদা বলেও যদি সম্ভাষণ জানাতেন তবু দেশের মানুষ, তার দেশে, তার মাতৃভূমির টানেই সেখানে যেতো। এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য প্রবাসীরাই প্রথম অর্থসাহায্য দিয়ে, অস্ত্র সাহায্য দিয়ে যার যা কিছু ছিলো তাই নিয়ে এগিয়ে এসেছিলো জাতির পিতার আহবানে দেশমাতৃকার টানে।

এই প্রবাসীরাই বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে নির্দোষ খালাস করার জন্য নিজেরা চাঁদা করে আইনজীবি পাঠিয়েছিলো। এই নবাবজাদাদের অর্থেই প্রথম বিমান ক্রয় বা লীজ নেয়ার সুযোগ হয়েছিলো এই দেশের।

এই প্রবাসীর অর্থ সাহায্যেই দেশের প্রথম রিজার্ভ তহবিল গড়ে তুলা হয়েছিলো। আজ বিমান ব্যবহার করেন সাহেবজাদাগন তাদের প্রয়োজনে। আজ হোক আর কাল হোক মানুষ একদিন করোনা ভাইরাসকে জয় করবেই।

কিন্তু বাংলাদেশের অনাবাসী নাগরিক কি চিরকালই চোখে করুণার পাত্র হয়েই থাকবে ! যদিও দেশের উন্নয়নে তাদের অবদান এখনো কোন অংশে কম নয়। রেমিটেন্স বাদ-ই দিলাম। বেসরকারী, ব্যাক্তিগত উদ্যোগে এখন পর্যন্ত দেশের রান্তা, ঘাট অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা এবং সমাজের নানাবিধ কল্যাণে প্রবাসীদের অবদান কোন্ অংশে কম ? প্রতি বছর কেবলমাত্র বিলেত থেকেই শত শত কোটি টাকা দেশের স্কুল কলেজ মাদ্রাসা মসজিদ কবরস্থান করার জন্য সাহায্য নেয়া হয়। বন্যা ঝড় প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময়ের হিসাবটা এখানে নাইবা দেয়া হলো..

পুণশ্চঃ দেশের বা সমাজের উচ্চপর্যায়ের একজন লোক যখন প্রবাসীদের নিয়ে এমন তিরস্কার সুচক মন্তব্য করলেন. তখন থেকেই দেশের আনাচে কানাচে থেকে মানুষজন হুক্কাহুয়ার মতো রৈ করে উঠলো প্রবাসীদের নিয়ে। যেন এরা উচ্চীষ্ট বা অন্য কিছু ! টং দোকানেও লিখে রাখা হলো ’প্রবাসীদের প্রবেশ নিষেধ’। ভ্রাম্যমান আদালত এসে জরিমান করলো প্রবাসীকে..।

এরপর এখনতো সোস্যাল মিডিয়ায় প্রবসীদের নাম লিখে জমা রাখার এবং দেশে গেলে তাদের উপযুক্ত জবাব দেবার প্রকাশ্যে হুমকি দেতেও দেখা যাচ্চে। .. আরও কতো কি ! অথচ .. .. .. নাঃ আর থাক.. (তবুওতো আমার দেশ, আমার মা..মায়ের বদনখানি মলিন হলে এই এককোটি প্রবাসীকেই আগে রোদন করতে হয়..)

 

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *