প্রকৃতির নিষ্ঠুর প্রতিশোধের নাম করোনা ভাইরাস – রোদেলা নীলা


প্রকৃতি বুঝি দারূন বিরক্ত হয়ে গিয়েছিল এই মানব জাতির ওপর । হবেইবা না কেন ; কম অত্যাচারতো আমরা করিনি তার ওপর । যত্রতত্র গাছ কেটে নিচ্ছি , বড় বড় ইমারত বানাচ্ছি ,কারখানার-গাড়ির কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে দিচ্ছি বাতাসে , শুধু কী তাই ; বনের একটি প্রাণীও বাদ যায় নি মানুষের খাবার তালিকায় । গুরু ছাগল খেয়েও যেন তৃপ্তি হচ্ছিল না মনূষ্য জাতির , সাপ –ব্যাঙ –শুকোর , এমন কী সমুদ্রের তিমির তেলের মধ্যেও চোখ পড়ে গেল ।

কথায় আছে – চাহিদার কোন শেষ নেই , যতো দিন যাবে ততোই তা বাড়বে । আমাদেরো হয়েছিল তাই । অস্ট্রেলিয়ার বনে আগুন জ্বলে উঠলো ; সে কী দাবানল ! এমন ভাবে আগুন লাগতে দেখেনি কেও কোন দিন ; অবশেষে মেঘ কাঁপিয়ে বৃষ্টি নেমে এলো । ধীরে ধীরে আগুন শান্ত হতে শুরু করলো , বাঁচালো কে ? সেই প্রকৃতিই যাকে আমরা যত্ন নেই না , নিজেদের বিনোদন আর সুবিধা ভোগের জন্য যখন ইচ্ছে তার বুকে কুড়োল চালাই । পাহাড়ে বেড়াতে গেলেও প্লাস্টিকের বোতল খানাও তার বুকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আসি ,

এ যেন এক উন্মুক্ত ডাস্টবিন !

চীনের উহান শহরে গত ডিসেম্বর মাসে করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে । ধারণা করা হয় সেখানকার একটি বাজার যেখানে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বিক্রি হয় সেখান থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে । ভাইরাসটির কারণে চীন এখন সংকটপূর্ণ অবস্থা কাটিয়ে উঠলেও সারা বিশ্বে তা ভয়ংকর ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে । বর্তমানে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে এই ভাইরাস যা ইতোমধ্যে ছোঁয়াচে আকার ধারণ করছে ।

করোনা শব্দটিকে বাংলায় উচ্চারণ করে এদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠি চীনাদের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করলেও করোনা নামকরণের একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে । করোনা ভাইরাস বলতে এক গোত্রের অনেকগুলো ভাইরাসকে বোঝায় , যা মূলত প্রাণীদের মধ্যে পাওয়া যায়। বার্ড ফ্লু তথা সার্স ভাইরাসও এই গোত্রের। হিউম্যান করোনা ভাইরাস এক ধরনের জেনেটিক রোগ এবং এই সংক্রমণটি প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে। কিন্তু, এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা প্রায় ছয়টি করোনা ভাইরাস সনাক্ত করেছেন , যা মানুষকে প্রভাবিত করে এবং হালকা থেকে মারাত্মক লক্ষণ সৃষ্টি করে ।

হিউম্যান করোনা ভাইরাসের প্রথম খোঁজ পাওয়া যায় ১৯৬০ সালে একজন রোগীর মধ্যে , যিনি সর্দিতে ভুগছিলেন। করোনা ভাইরাস নামটি এসেছে এর আকৃতির ওপর ভিত্তি করে। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে এই ভাইরাসটি ক্রাউন বা মুকুটের মতো দেখতে হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘করোনা’।

মানুষ প্রায়ই তাদের জীবনের কোনো না কোনো সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়, সুস্থ হয়ে ওঠে এবং কয়েক মাস পরে আবার সংক্রমিত হতে পারে। মানুষের দেহে ছয় ধরনের করোনা ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। এগুলো হলো, আলফা করোনা ভাইরাস (NL63 এবং 229E), বিটা করোনা ভাইরাস (HKU1 ও OC43) এবং বাকি দুটি সার্স ও মার্স তাদের প্রাণঘাতী লক্ষণগুলোর জন্য পরিচিত। মানবদেহে সৃষ্ট করোনাভাইরাস সংক্রমণ এড়ানোর মত কোনো টিকা বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আজও আবিষ্কৃত হয়নি ।

সূত্র ঃ https://m.somoynews.tv/

তাহলে এটা পরিষ্কার বোঝা গেল যে প্রাণিদের মাধ্যমেই এই ভাইরাস মনূষ্য শরীরে সঙ্ক্রমিত হয়েছে । তার মানে আমাদের খাদ্যাভাসে একটা পরিমিতি আনাটা জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে । ইদানিং কালে ফেসবুক স্ক্রল করলে একটি ছবিতে আমার চোখ প্রায়শই আটকে যায় । লক ডাউনের ফলে মানুষ ঘরবন্দি হয়ে জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে আছে , আর গৃহপালিত ও বন্য প্রাণিরা তাদের দেখতে ভিড় করছে বাড়ি ঘরের সামনে ।

হুম , সত্যি প্রকৃতি তার কঠিন প্রতিশোধটা অবশেষে নিয়েই নিল । আজ পুরো বিশ্বের মানুষ ঘর বন্দি , হাসপাতালের বিছানায় রোগী রাখার জায়গা নেই আর বাংলাদেশেতো বিনা চিকিতসায় রাস্তায় পড়ে মারা যাচ্ছে রোগী , জন্ম হচ্ছে মনূষ্য শিশুর । কী ভীষন ক্ষেপে ছিল প্রকৃতি তা আজ সমুদ্রে চোখ রাখলেই বোঝা যায় , তিমি আর হাঙরের অবাধ বিচরণ এখন চোখে পড়ার মতো ।

আকাশে কোন কালো ধোঁয়া নেই , চারপাশে নির্জনতা খেলা করছে , যানবাহণের কোন বাড়তি চাপ নেই , পাখিরা নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে । এটাইতো চেয়েছিল প্রকৃতি , তাই সে আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিতে এতোটুকু কুন্ঠা বোধ করেনি । ধীরে ধীরে সে ফিরে পাচ্ছে তার প্রাচীন রূপ ।

আজ অব্দি সারা বিশ্বে করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩১২৫ । আর আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাতো কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গেছে ,যারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন তারাও যে পুনরায় আক্রান্ত হবেন না সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না । প্রাণঘাতী নভেল করোনাভাইরাস সৃষ্ট কভিড-১৯ এ মৃতদের সৎকারে কঠোর সাবধানতা মানা হচ্ছে । নতুন এই ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে হওয়ার কারণেই এই ব্যবস্থা ।

মৃত ব্যক্তির গোসল থেকে শুরু করে কবরস্থানে নিয়ে দাফন-পুরোটাই হয় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে । দাফনের সময় সাধারণত পরিবারের লোকজনকে কবরের পাশে থাকতে দেওয়া হয় না । যিনি মৃত ব্যক্তির গোসল করান তার নিজেকেও অধিক বেশি সতর্ক থাকতে হয় , পিপিই পরিধাণ করা থেকে শুরু করে ক্ষারযুক্ত সাবান দিয়ে গোসল করে নেওয়াটা বাঞ্ছনীয় ।

এই যখন অবস্থা , তখন আর বুঝতে বাকি নেই আমরা প্রকৃতির সামনে কতোই না ক্ষুদ্র , আমাদ্র দম্ভ , আমাদের জ্ঞান , আমাদের অহমিকা আজ পরাভূত । তবুও বিজ্ঞানীরা প্রতি মুহূর্তে চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই কোভিড-১৯ কে ঠেকানোর কৌশল । তাদের চেষ্টা অক্ষুণ্ণ থাক , পাশাপাশি আমরাও একটু সচেতন হই । পরিবেশের ওপর , প্রাণিদের ওপর , গাছেদের ওপর অবাধ নির্যাতন বন্ধ করি ; নয়তো আমাদের লাশ দাফন করবার জন্য একটি প্রাণিও আর অবশিষ্ঠ থাকবে না এই ভ্রমান্ডে ।

 

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *