কামলা জীবনের রোজনামচা – রোদেলা নীলা


বৈশাখের শেষ বৃষ্টিতে ঘুমটা ভীষন রকম জেঁকে বসেছিলো। কিছুতেই মন চাইছিল না উঠে গিয়ে খাবার তৈরি করে বক্সে ভোরতে। আজকাল অনেকটা স্কুল গোইং বাচ্চাদের মতোন মনে হয় নিজেকে । ঠিক সকাল সাত’টায় এলার্ম বাজবে, আধ ঘন্টায় তৈরি হতে হবে।

তারপর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আরো মিনিট বিশেক, কোন রিক্সাওয়ালার যদি মনে চায় তাহলেই আপনাকে সঙ্গী করবে নয়তো অগত্যা দুই পা-ই ভরসা। স্কুলের সাথে এইসব অফিসের কেবল একটাই পার্থক্য আর তা হচ্ছে ওখান থেকে বের হবার নির্দিষ্ট একটা টাইম আছে। কিন্তু এই সব প্রাইভেট অফিসে এ্কবার যদি কেো ঢুকে পড়েছেন তো পড়েছেন, কখন বের হবেন তা নির্ভর করবে সম্পূর্ন আপনার বসের ওপর।

তা যা বলছিলাম ; নরম কাঁথার আদর সড়িয়ে উঠে পড়লাম ঝটপট। দৈনিক যা যা করতে হয় আর কী ; বাচ্চাকে স্কুলের জন্যে তৈরি করে মায়ের কাছে হ্যান্ডওভার। গৃহ পরিচারিকাকে আধ ঘন্টার মধ্যে ব্রিফিং দেওয়া। কারন, ওদের সময় আমাদের চাইতে অনেক দামী ।

তারা এক দিনে সাত সাতটা অফিসে হাজিরা দেয় আর আমাদের মতোন মহিলারা একটা অফিস করেই হাঁপাতে থাকি। এক বেলা সিঁড়ি ভাঙতেই যেখানে হাঁস ফাঁস অবস্থা আর এই মধ্যবয়সী মহিলা দিনে অন্তত সাতবার তিন তলা চার তলা করে। তাই হাজার চিৎকার করলেও ঘরের কোনায় ময়লা রয়েই যাবে, ওটা সড়ানোর বাড়তি টাইম তাদের নেই ।

দশটার মধ্যে অফিস পৌঁছুতে হবে তা ঝড় হোক আর সাইক্লোন। পর পর তিন দিন দেরি করলে একদিনের বেতন কর্তণ । আর তার ফলস্বরূপ অফিসটাইম হয়ে যাবে নয়টায়।

তার চেয়ে হাঁটু জলে বাসের জন্যে অপেক্ষা করা ঢের ভালো। বৃষ্টির ছাট এসে গায়ে লাগলে মন্দ লাগেনা, কিন্তু তার সাথে যে বোনাস হিসেবে ড্রেনের পানিও ছিটকে আসে সেটা পেতে কার ভালো লাগে বলেন ! তাও লাগতে হয়, পূর্নিমার চাঁদ আকাশে উঠলো কী উঠলো না, কার কবে জন্মদিন হয়ে গেল তা নিয়ে প্রশাসন খুব সচেতন হলেও আমাদের মালিকদের কিচ্ছু যায় আসে না। বিশেষ দিনের ছুটি এই সব কম্পানিতে নেই ।

১ লা -মের ঘটনাই বলি ; আমি বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বসকে জিজ্ঞেস করলাম- কাল কি অফিস করতে হবে স্যার?

উনি ভয়ঙ্কর রকম অবাক চোখে প্রশ্ন করলেন – কেন? কাল কি বিজয় দিবস?

আমি ততোক্ষনে আমতা আমতা করছি- না মানে কালতো ১লা মে।

বসের ঠোঁটের কোনে দুষ্টু মার্কা হাসি খেলা করছে- কেন ,আপনি কি শ্রমিক নাকি ?

আসলেইতো আমি আসলে কী ? বাসার যে মহিলা কাজ করে তাকে আমরা বুয়া বলি । বেতন দিতে একটু দেরি হলেই চিৎকার করে পাশের ফ্ল্যাটের লোক জড়ো করে দিতে পারে । তাই নিজে বেতন না পাই, তার বেতন আগে দিয়ে ফেলি। তার ওপর তারা দরিদ্র মানুষ । মে মাসের প্রথম দিন তো আছেই, সে যখন ইচ্ছা বিনা নোটিশে কাজে নাও আসতে পা্রে।

এইজন্য কিছু বলতে গেলে সে আর কাজে আসবেনা কোন রকম নোটিশ ছাড়াই। কাজ করার সময় তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম পড়ে, আমার চোখ এড়ায় না। তাই সে অবশ্যই শ্রমিক। যে কোন মহামারী বা দূর্দিনে সে বেতন পাবেই ।

যারা গার্মেন্সে কাজ করে তারাতো লিখিত শ্রমিক । বাস ,ট্রাক যারা চালায় তারাও শ্রমিক । কিন্তু আমি এই দিনে তাদেরকে গাড়ি রাস্তায় বের করতে দেখেছি। ড্রাইভারদের শিফটিং ডিউটি হয়, ছুটি ছাটা কিভাবে হয় তা কেবল তারাই বলতে পারে। তবে “ওভারটাইম পেয়মেন্ট ” বলতে যে একটা কথা আছে তা কতো জায়গায় প্রচলিত তা ঠিক বলতে পারছিনা। শ্রমিক বা কামলা কে তার ভাগীদার তার জন্যে একটা আমলনামা থাকা দরকার।

কারণ, সাতটায় অফিস ছুটি থাকার কথা নিয়োগ পত্রে লেখা থাকলেও, এমন দিন গেছে যে ইভেন্টের কাজ শেষ হয়েছে রাত্রি নয়টায় । ওটাকে ওভারটাইম না বলে আমি কী বলতে পারি !

আমরা যারা স্যুট টাই পড়ে, ভাঁজ দেওয়া শাড়ী পড়ে অফিস করতে আসি তারা হচ্ছি মধ্যবিত্ত ভদ্র কামলা । ১৮ ডিগ্রী সেন্ট্রিগ্রেডের নীচে আমাদের কপালের ঘাম কারো চোখেই পড়ার কথা না। মাঝে মাঝে আমাদের দিকে তীরের মতোন এমন সব শব্দাবলী ছুটে আসে যে নিজেকে আবিষ্কার করি ৮১ ডিগ্রীতে ঘামছি । আর সুন্দরী সিংগেল নারী হলে উপর মহল থেকে সুবিধা নেবার বাড়তি চাপ নিজেকেই সামাল দিতে হবে । কিন্তু প্রতিবাদ করবো ? কার ঘাড়ে কয়টা মাথা ?

খান গালি, যান ডেস্কে । চুপচাপ কাজ করেন, পোষালে থাকেন ;

না পোষালে আপনার থেকে কম বেতনে ফ্রেশার পাওয়া যাবে । আপনি যে ঢাকা শহরে ভদ্র মতোন একটা জব পেয়েছেন, এটা টিকিয়ে রাখাই মোদ্দা কথা । কে বাপ তুলে গালি মারলো আর কে অপমান করে ফাইল ছুড়ে দিল – এইসব নিয়ে ভাবার টাইম নেই। বেটার এডজাস্ট করে নিন, দেখবেন সব খুন মাফ । সরকারি কামলা-রা-ই কেবল জ্বী হুজুর করে ; এ কথা সব জায়গায় খাটে না ।

চাকরি থাকলে বৌদ্ধ বাবুর এমন পূর্নিমা বহু আসবে জীবনে, চাইলে বস আপনাকে পুরো চাঁদটাই হাতে এনে দেবে, মে মাস ভেসে যাবে লাল কাপড়ে, নারী দিবসে পাবেন আকর্ষণিয় গিফট । গায়ে গতরে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের হিসেব আর আপনার হিসেব আলাদা । আপনার জন্যে নির্দিষ্ট বলে কিছু নেই, কর্নধার নির্নয় করবে আপনি কতোক্ষন আছেন আর কতোক্ষন নেই। সো, এই সব আলগা ছুটি নিয়ে ভাবার কোনই প্রয়োজন নেই। ছয় ঘন্টা কী দশ ঘন্টা – কাজ দেওয়া দরকার কাজ দেন ।

যে কোন দিন ঘুম ভেঙে শুনতেও পারেন – আপনার চাকরি চলে গেছে , আপনি মোটেও অবাক হবেন না। বিনা নোটিশে হুট করে জব চলে যাবার নজির পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে । শ্রমিক কাজ চেয়ে রাস্তায় মিছিল করতে পারে, কিন্তু আপনি ইউনিভার্সিটি গ্র্যাজুয়েট হয়ে তা করতে পারেন না । আপনি মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান – এই ট্যাবু ভাঙা যাবে না ।

সঠিক যোগ্যতা অথবা লিঙ্ক থাকলে আবার আপনি নতুন উদ্যমে কামলা জীবন ফিরে পাবেন । প্রাপ্য বেতন তোলার জন্যে যাবেন নাকি উকিলের কাছে , তাহলেই সেড়েছে । কামলাদের জন্যে কোন আইন আছে ? হিউম্যান রিসোর্স কিছু বলে ? আর থেকেই যদি থাকে যারা এখনো নিয়োগপত্র ছাড়াই বছরের পর বছর কামলা খেটে যাচ্ছে তারা প্রমান দিবে কী দিয়ে ? জানেন তো ,আদালত কাগজ ছাড়া কিছুই বোঝেনা।

বি : দ্র : চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে আছি মনের সুখে নয় ,

একান্ত বাধ্য হয়েই । সবাইকে হয়তো সমঝোতা করতে হয় না ; কিন্তু কেও কেও এতোটা সুযোগ নিতে চায় যেখানে মেধার কোন মূল্যায়ন হয় না ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *