মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণ করতে না পারাটা এখনো আমাকে নিরন্তর পীড়িত করে । অথচ মুক্তিযুদ্ধের একটা দীর্ঘ সময় আমার অবস্থান ছিলো ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কুলাই বাজারে । কিন্তু পরিবেশ – পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় প্রবল সদিচ্ছা সত্ত্বেও আবেগকে দমিয়ে রাখা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না ।
হবিগঞ্জের খোয়াই সীমান্ত দিয়ে আমরা ছয় ভাইয়ের মধ্যে বড় তিনজনই এপ্রিল মাসের শেষ দিকে ত্রিপুরায় প্রবেশ করি । পরদিন বাকি তিন ভাইকে নিয়ে পিতা – মাতার খোয়াই সীমান্তে আসার কথা । সেই মোতাবেক পরদিন সীমান্তে পৌঁছে দেখি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র । এপারে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সতর্কতামূলক অবস্থান ।
ওপারে পাক সেনাদের তৎপরতা । সীমান্ত থেকে ফিরে এলাম হতাশ হয়ে । ছোট ভাইদের নিয়ে পিতা – মাতা কোথায় আটকা পড়েছেন , সেই চিন্তায় সর্বক্ষণ থাকতাম ব্যতিব্যস্ত । টানা ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু উদভ্রান্তের মতো সীমান্তে সীমান্তে ঘুরে বেড়াতাম পিতা – মাতার খোঁজ নেয়ার জন্য । এরই ফাঁকে ফাঁকে আগরতলা থেকে প্রকাশিত জাগরণ পত্রিকায় মাঝে – মধ্যে লিখতাম ।
একদিন কুলাই বাজারের একটি চায়ের দোকানে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকায় ” দু: সাহসী ইয়ামিন ” শিরোনামের একটি সংবাদ পড়ে কিছুটা নড়েচড়ে বসলাম । সংবাদটি ছিলো এরকম : সিলেটের সালুটিকর বিমান বন্দরের কাছে জেলের বেশে ২২/২৩ বছর বয়েসী মুক্তিসেনা ইয়ামিন চৌধুরীর নেতৃত্বে ৪/৫ জনের একটি সশস্ত্র দল হাতে বড়শি নিয়ে নদীর কিনারে ওঁৎ পেতে বসে থাকে ।
পাক বাহিনীর একটি সি-১৩০ বিমান বেলা একটায় বিমান বন্দরে অবতরণ করে । দুই ঘন্টা পরে বিমানটি টেক অফ করার অব্যবহিত পরেই ইয়ামিনদের এল এম জি গর্জে ওঠে । মুহুর্তে বুলেটবিদ্ধ বিমানটিতে আগুন ধরে যায় এবং ভূপাতিত হয় । এ ঘটনায় নিকটবর্তী গ্রামের লোকেরা ভয়ে পালাতে থাকে । তাদের ভিড়ে ইয়ামিন বাহিনীর মুক্তি সেনারাও হারিয়ে যায় ।
রিপোর্টটি আমাকে খুবই আন্দোলিত করে । এর কারণ , একজন ইয়ামিনকে আমি চিনতাম , এই ইয়ামিন কি আমার চেনা সিলেটের সেই ইয়ামিন ? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আমার জিজ্ঞাসার জবাব পেয়ে যাই । হ্যাঁ , আমার চেনা ইয়ামিনই সেই দু:সাহসী ইয়ামিন ।
সত্তর সালের নভেম্বর মাসের শেষ দিকে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের জলোচ্ছ্বাসে বিপন্ন জনগণের সাহায্যার্থে সিলেটে আয়োজিত একটি ভিক্ষা মিছিলের শুরুতেই এই ইয়ামিনের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সম্ভবত হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য । সিলেটের রেজিষ্ট্রারী মাঠে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রথম জনসভায় উপস্থিত ছিলেন সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী বীর উত্তম ।
সমাবেশে তিনিই অসীম সাহসী যোদ্ধা হিসেবে ইয়ামিন চৌধুরী সহ আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে পরিচয় করিয়ে দেন । সমাবেশ শেষে তার সাথে করমর্দন করে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসি ।
এরপর সম্ভবত তিয়াওর সালে ইয়ামিন চৌধুরীর সাথে ফের দেখা হয় যুগভেরী পত্রিকা অফিসে । একটি কাজে এসেছিলেন কবি দিলওয়ারকে সাথে নিয়ে । আলাপচারিতা চলে দীর্ঘক্ষণ । এভাবে ক্রমেই তার সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্কের উন্নতি ঘটতে থাকে , যে সম্পর্ক মৃত্যুর পূর্ব দিন পর্যন্ত ছিলো মধুর এবং অমলিন ।
মহান স্বাধীনতার এই সূর্য সন্তানের সাথে আমার অনেক অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে । ঢাকায় সঙ্গীতজন সুজেয় শ্যাম ( মামা)-এর মগবাজারের পেয়ারবাগ ও পল্লবীর বাসায় অনেক দিন একসাথে কাটিয়েছি । ঘন্টার পর ঘন্টা বসে শুনেছি মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিভিন্ন অপারেশনের গা ছমছম করা লোমহর্ষক কাহিনী । শুনেছি , ভোলাগঞ্জ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হবার আদ্যোপান্ত।
একবার দুর্গাপূজার সময় আমাদের মন – মেজাজ চাঙ্গা রাখতে গাঁটের টাকা খরচা করে মগবাজারের বাসার অভ্যন্তর আলোকমালায় সজ্জিত করেন । বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা প্রয়াত হারুণ মামার সাথে ছিলো তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক । সুজন সখী ছবিতে গান গাওয়ার পটভূমিও একদিন আমাদের খুলে বলেন । ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেকের সাথেই ছিলো তার সুসম্পর্ক ।
সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের চার উদ্যোক্তার অন্যতম ছিলেন ইয়ামিন চৌধুরী । এই মহতী উদ্যোগের সাথে পরোক্ষভাবে আমিও জড়িত ছিলাম । তাঁর অনুরোধে নির্মাণ কাজ চলাকালীন হ্যারল্ড রশীদের সাথে আমাকেও সেখানে অন্যান্যের সাথে তদারকির দায়িত্ব পালন করতে হয় ।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঊষালগ্নে সিলেটে গঠিত সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা এবং কলম তুলি কন্ঠ সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত থেকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন ইয়ামিন চৌধুরী । নব্বইয়ের দশকে বাবরী মসজিদ ঘিরে সিলেটে মৃদু উত্তেজনা বিরাজ করলে ইয়ামিন চৌধুরীকেও সংখ্যালঘুদের পাশে ছুটে যেতে দেখেছি ।
সিলেট স্টেশন ক্লাবের অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন তিনি । ক্লাবের শতবর্ষ পূর্তি উৎসবে ক্লাব সভাপতি মোঃ: শওকত আলী এবং ইয়ামিন চৌধুরীর অনুরোধে আমি স্মরণিকা প্রকাশ সহ বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিলাম । এসব স্মৃতি এখনো আমাকে দোলা দিয়ে যায় ।

ইয়ামিন ভাইদের ঝর্ণারপারের বাসায় আমি বহুদিন গিয়েছি । তাঁর বোন সাবেক এমপি ফাতেমা চৌধুরী ( পারু আপা ) আমাকে খুবই স্নেহ করতেন ।
‘৯৫ সালের শেষ দিকে একদিন সকালে চিত্র গ্রাহক আতাউর রহমান আতা- কে সাথে নিয়ে ইয়ামিন চৌধুরী আমার বাসায় এসে হাজির । বললেন , বন্যায় ছাতক ও কোম্পানীগঞ্জের অবস্থা শোচনীয় । কোম্পানীগঞ্জ থানা সদরে ছয়ফুট পানি । বানভাসি মানুষের অবস্থা কাহিল । এক্ষুনি যেতে হবে । যাত্রা শুরু হলো ।
ইঞ্জিন নৌকায় ছাতক হয়ে কোম্পানী গনজের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে দেখলাম । ইয়ামিন চৌধুরীর জন্য হাজার হাজার মানুষ প্রতীক্ষায় । পথে পথে ইঞ্জিন নৌকা থেকে নেমে বারকি শ্রমিকদের খোঁজ খবর নিচ্ছেন । বিপন্ন মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন । একজন তথাকথিত রাজনৈতিক নেতার চেয়ে ইয়ামিন চৌধুরী সেখানে কতোটা জনপ্রিয় ছিলেন , নিজে না দেখলে তা অবিশ্বাস্য মনে হতো ।
ফেরার পথে ইঞ্জিন নৌকায় দাঁড়ানো আমাদের দুজনের একটি ছবি নিতে বললেন আতা-কে । ইয়ামিন চৌধুরী বললেন , একদিন আমরা কেউই থাকবো না । তখন এই ছবি আমাদের কর্মের সাক্ষ্য বহন করবে । আমার কাছে আতার তোলা সাদাকালো সেই ছবিটি এখনো সংগ্রহে আছে ।

মৃত্যুর প্রায় দিন দশেক আগে তাঁর সাথে আমার শেষ দেখা ও কথা । সিলেট প্রধান ডাকঘরের সামনে গাড়ি থামিয়ে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, জরুরী কথা আছে, ফোন করে বাসায় এসো । আসার সময় আতার কাছ থেকে কোম্পানীগঞ্জের সব ছবিও আনবে । গাড়ী হাঁকিয়ে সেই যে গেলেন তো গেলেনই, আর দেখাও হলোনা তার সাথে, শোনাও হলো না কি তাঁর জরুরি কথা ছিলো ।
মৃত্যুর দিন কেবল চেয়ে চেয়ে দেখলাম , ওসমানী হাসপাতাল থেকে তার নিথর দেহ নিয়ে কয়েকটি গাড়ি ফিরছে ঝর্ণার পারের বাসভবনের উদ্দেশ্যে । আমি তখন নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় একটি দোকানে বসে চোখ মুছছিলাম ।
এই চৌহাট্টা থেকে যে রাস্তাটি বয়ে গেছে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অব্দি , সিলেট সিটি কর্পোরেশন ঐ রাস্তার একটি বিশাল অংশকে ইয়ামিন চৌধুরীর নামে নামকরণ করে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে । যখনই এই ফলকটি চোখে পড়তো, ইয়ামিন চৌধুরীর ছবি ভেসে ওঠতো চোখের সামনে ।
মনে হতো , অদূরে দাঁড়িয়ে ইয়ামিন বলছেন , ”হ্যালো , এইতো আমি ” । তখনই মনে পড়তো , ইয়ামিন চৌধুরীকে নিয়ে লেখা কবি দিলওয়ারের সেই অবিনাশী কবিতার পংক্তি :
”একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিজনে দুর্নিবার হবে / মৃত্যু তার বেঁচে রবে মৃত্যুহীন সেই অবয়বে ” ।
জীবনের জলছবি নাম : ইয়ামিন চৌধুরী (বীর বিক্রম ) । জন্ম : ১ নভেম্বর , ১৯৪৯ ইং । মৃত্যু : ২৬জানুয়ারি , ১৯৯৬ ইং । পিতা : মরহুম আব্দুল হামিদ চৌধুরী (হামদু মিয়া ) । চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের মধ্যে ইয়ামিন চৌধুরী চতুর্থ । সিলেট নগরীর নিবাস — ঝর্নারপার । বিয়ে : ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ ইং । পত্নী : সেহেলী চৌধুরী । সন্তান: সঞ্জিদা চৌধুরী , সায়না চৌধুরী ও সায়েন হামিদ চৌধুরী । মুক্তিযুদ্ধ : ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে কোম্পানি কমান্ডার এর দায়িত্ব পালন এবং ছাতক , গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ অঞ্চলে অসংখ্য দুঃসাহসিক অভিযানে অংশগ্রহণের ফলশ্রুতি ” বীরবিক্রম ” খেতাবপ্রাপ্তি ।
সত্তরের দশকে বিশিষ্ট চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব খান আতাউর রহমান নির্মিত ”সুজন সখী ” চলচ্চিত্রে স্বকন্ঠে পরিবেশিত গান : ”ডেগেরও ভিতরে ডাইলে চাউলে —-” । তিনি ছিলেন অনির্বাণ ক্রীড়া চক্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা । নিজে খেলতেন ক্রিকেট, স্মোকার ও লন টেনিস । এক সময় তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য, সিলেট জেলা ইউনিট কমান্ডের কমান্ডার এবং সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ক্রিকেট কমিটির সদস্য ছিলেন ।
স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে গঠিত সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা এবং কলম তূলি কন্ঠ সংগঠনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন । সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণের অন্যতম উদ্যোক্তা ইয়ামিন চৌধুরী বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বিপন্ন জনগোষ্ঠীর পাশে ত্রাণ কর্মীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন । যেকোনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনাকালে তাকে সংখ্যালঘুদের পাশেও দাঁড়াতে দেখা যায় । তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদান ছাড়াও ভারত , ইংল্যান্ড ও আমেরিকা সফর করেন । তিনি ছিলেন সিলটো লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ।
ইয়ামিন চৌধুরী । রেজিস্টারি মাঠের মঞ্চে তাকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলী । ‘ ৯২ সালে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পদক নিচ্ছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে । ভারতের অমৃতবাজার পত্রিকার ক্লিপিং । কোম্পানীগঞ্জে ইঞ্জিন নৌকায় ইয়ামিন চৌধুরী ও আমি।
