একটা গরুর চারটি পা। পেছনের দুটিতে মাংস থাকে বেশি। তাই কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে আমার শাশুড়ি পেছনের একটি আস্ত পা আমার ননদের ঘরে পাঠিয়ে দিলেন। দেখলাম আর মনে মনে ভাবলাম, এ কি করছেন মা (শাশুড়ি)। একটু পর আমার মামাশ্বশুর নিয়ে এলেন একটি আস্ত রান আমার শ্বশুরের জন্য।
আমার শাশুড়ি হলেন সিলেটের কুট্টি। এটা তাঁদের প্রচলিত ঐতিহ্য। তাঁরা মনে করেন, মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর তার শ্বশুরবাড়িতে গরুর আস্ত রান পাঠিয়ে দেওয়া আপ্যায়নের একটি অংশ। সব মিলিয়ে আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আমাদের মধ্যে এই নিয়ম নেই। কী করব? দুপুরের পর থেকে বাসায় তুমুলভাবে মাংস কাটা, বাছা, ভাগ করা শুরু হলো। এই ফাঁকে আব্বাকে একটি ফোন করলাম। ফোনের ওপার থেকে গুরুগম্ভীর কণ্ঠে বাবা জানতে চাইছেন, ‘কী পাঠাব মা?’ বললাম, ‘আস্ত গরুর রান।’
আব্বা বললেন, ‘তোমার আম্মার সঙ্গে আলাপ কর।’ বুঝলাম এখন আম্মা শোনামাত্রই রেগে যাবেন। তারপরও আমাকে যে বলতেই হবে। কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা রাগ, কিছুটা অপ্রস্তুত ভাব—সব মিলিয়ে খুবই বিচিত্র একটা গর্জন হলো। ‘এসব কী বলছিস? আমরা চার ভাগ করার আগ পর্যন্ত মাংসতে হাত দিই না।’
তারপরও মেয়ের কথা চিন্তা করে পাঠিয়ে দিলেন একটি আস্ত রান। কিন্তু এখানে আমার গল্পের শেষ নয়। রান তো এসেছে। তবে সামনের অংশের রান। সেটাও লজ্জার বিষয়। শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রথম রান এসেছে, তাও সামনের। আত্মীয়রা শুনলে যে লজ্জা হবে। মা(শাশুড়ি) লজ্জা ঢাকার জন্য সবাইকে বলতে লাগলেন,‘আমার বউমার বাড়ি থেকে গরুর পেছনের বড় একটা রান এসেছে।’
আমি মনে করি একটা গরুর রান দিয়ে কোনো দিন পরিপূর্ণ আপ্যায়ন হয় না। কোরবানির ঈদ ‘ত্যাগের উৎসব’। সেদিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিত। গরুর মাংসের কেজি কত আমরা সবাই তা ভালো করে জানি। সারা বছর আমাদের দেশে থাকা অনেক দরিদ্র মানুষ এই দামে মাংস কেনার সামর্থ্য রাখে না।
এই ঈদ উপলক্ষেই শুধু প্রচুর দরিদ্র মানুষ বাড়িতে মাংস রাঁধতে পারে। মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে এসব পাঠানোর নিয়ম আমার কখনোই ভালো লাগেনি, লাগবেও না। সবাই যদি মেয়ের বাড়ি থেকে এটা গ্রহণ করা থামিয়ে দিত, তাহলে দিন দিন এটা আর বাড়ত না।
আমরা সবাই যৌতুককে না বলি। অথচ অনেকেই বিয়েতে উপহারের নামে মেয়ের বাড়ি থেকে চড়া দামে আসবাবপত্র নিই। আমরা উৎসবকে হ্যাঁ বলি, কিন্তু সেই উৎসবের মূলভাব ভুলে যাই। কিংবা কেউ কেউ অন্যকে দেখে ভুল করতে শিখি। ভাবি, এমন না করলেই হয়তো ভুল করছি। সবাই যদি একসঙ্গে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে যাই, তাহলে প্রচলিত অজস্র অমূলক ধারা ও ধারণা থেমে যায়।
