শৈশবের ঈদ – মরিয়ম চৌধুরী


ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে বড় খুশির দিন হলো ঈদের দিন। এই দিনে বিশ্বের মুসলমানরা পরিশুদ্ধ হৃদয়ে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে একে অপরকে পরম আবেশে বুকে জড়িয়ে ধরে একে অন্যের মধ্যে ঈদের আনন্দ বিলিয়ে দেয়।

বছরে দুইবার এই আনন্দের দিনটা আসে। লকডাউন এর কারণে এই বছরে ঈদুল ফিতরের মতো কুরবানির ঈদটাও একেবারেই ব্যতিক্রম ভাবে পালন করতে হবে। ঈদের জামাত ছাড়া আত্মীয়স্বজন ছাড়া একদম একা একাই যার যার বাসায় পরিবারের সাথে ঈদ পালন করতে হচ্ছে।

এরকম ঘরবন্দী ঈদ মনে হয়না অতীতে কখনও পালন হয়েছে বলে। ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এই দুই ঈদের কথা। ছোটবেলার ঈদ মানেই ছিল একটি অন্যরকম অনুভূতি। তার বর্ণনা কোনোভাবেই বলে শেষ করা সম্ভব নয়! ঈদের এক-দু সপ্তাহ আগে থেকেই দিন গোনা শুরু হয়ে যেতো।

অপেক্ষা কাঙ্ক্ষিত সেই দিনটি কবে আসবে। কতোরকম পরিকল্পনা হতো ঈদ নিয়ে। ঈদের কাপড় বানানোর বিষয়টা ছিল এক বিশাল গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, জুতা চুড়ি সবকিছু মিলেয়ে কেনা হতো, তারপর সবকিছু লুকিয়ে রাখা হতো যাতে কেউ না দেখে, ঈদের কাপড় যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে মনে হতো পুরো ঈদটাই নষ্ট হয়ে গেছে।

তাই সব কাপর-চোপর আলমারিতে লুকিয়ে রাখতাম।তবে রোজ একবার করে হলেও ঈদের কাপড়, জুতা খুলে দেখতাম আর অধীর আগ্রহ নিয়ে থাকতাম ঈদের অপেক্ষায়। ঈদুল ফিতরের যেমন একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং আনন্দ আছে তেমনি ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদেরও একটি আলাদা বৈশিষ্ট্য এবং আনন্দ আছে।

ঈদুল ফিতরে নতুন জামা-কাপড়, জুতা পরা এবং সেমাই ও হালুয়া খাওয়ার আনন্দ। কিন্তু কোরবানির ঈদের মজাই আলাদা। আব্বা কোরবানির গরু-খাসি কিনতে হাটে যান। গরু কিনে সেই গরুর দড়ি ধরে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে আসেন, উঠোনে দুই তিন দিনের জন্য সেই গরু বেঁধে রাখেন, সেই গরুকে খড়, ভূষি এবং খৈল খাওয়ানো হবে সেসব নিয়ে আমাদের কতো ব্যস্ততা, সেকি এক মহা আনন্দ, সেকি এক মহা অনুভূতি!

এদিকে আমাদের মা-চাচীরা যখন ঈদের পিঠা আর রান্নাবান্না নিয়ে ব্যস্ত তখন আমরা ভাই-বোনেরা অত্যধিক আনন্দের সাথে মেহেদী মাখা আর ঈদের দিনের পরিকল্পনায় লিপ্ত। ওই রাতে আর ঘুম হতো না, কখন সকাল হবে, গরু কোরবানি হবে, ঈদের নতুন কাপড় পড়বো বেড়াতে যাব, এই সব চিন্তায়। যথারীতি ঘুম থেকে উঠেই কুয়োর পাড়ে বালতি দিয়ে পানি তুলে গোসল করার সেই মধুর স্মৃতি কখনোই ভুলতে পারব না।

ঈদের সকালে নতুন কাপড় পরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানো আর মার হাতের সেমাই পরোটা আর সুস্বাদু খাবারের কোন তুলনায় ছিলনা, সেই সব অনুভূতিটাই ছিল অসাধারণ।

ঈদের দিন সকালে যথারীতি মতো বাড়ির পুরুষরা ঈদের নামাজ পড়ে এসে একটার পর একটা গরু বা খাসী জবাই করা শেষ করেন।

তারপর সেই গরু বা খাসির চামড়া ছিলে মাংস বানানো, মগজ আলাদা করা, ভূড়ি আলাদা করা, ইত্যাদির পেছনে রয়েছে আলাদা মজা। সেই মাংস তিন ভাগ করা এবং শরিয়ত মোতাবেক আত্মীয় স্বজন এবং গরীবদের মাঝে সেটি বিলিয়ে দেওয়া। সব কাজ শেষ করে আব্বা যখন একটু রেস্ট নিচ্ছেন আব্বার পাশে বসে কুরবানির ব্যাপারে গল্প করতাম আর আব্বা তখন আদর মিশ্রিত গলায় আমাদের সব বুঝিয়ে দিতেন।

আব্বার সঙ্গে গল্প শেষ করে উকি দিতাম রান্না ঘরে দেখতাম রান্নার আর কতটুকু বাকি। সবচেয়ে বেশি ভালো লাগতো আম্মা যখন মাংস কষাতেন আর সেখান থেকে গরম কষা মাংস তুলে মুখে দিতাম। সেই কষা মাংসের স্বাদই ছিল আলাদা। এসব আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এগুলো শুধু অনুভূতির ব্যাপার।

কি যে অন্যরকম একটা আনন্দ আর উৎসব উৎসব অনুভূতি হতো তো লিখে বুঝানো যাবে না। ঈদের আনন্দের মধ্যে আরেকটা বিশেষ মুহূর্ত ছিল বিকেলে রিকশা করে খালা, মামাদের বাসায় বেড়ানোর আনন্দই ছিল আলাদা। কি আনন্দমুখর ভাবে কাটতো আমাদের ঈদের দিন।

এক অনাবিল হাসিখুশি আর উল্লাসের মধ্যে দিয়ে বয়ে যেত আমাদের ঈদ। বড়বেলায় এসে সেই আমেজটি খুঁজে পাওয়া যায় না। আগের সবকিছু এখন যেন রূপকথার মতন মনে হয়।

এখন ঈদ মানে কত দায়িত্ব রান্না-বান্না, পরিবারের সব ছোট বড় চাহিদা মেটানো। এখন শুধু মনে পড়ে ছোটবেলায় যখন আমরা মেহেদি মাখা আর ঈদের দিনে কি কি করবো এইসব পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন আমদের মা চাচীরা হাসিমুখে রান্না ঘরে কতো কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

আজ আমি বড়বেলায় ঈদের প্রস্তুতি নিতে গিয়ে এখন আমার মা চাচিদের সেই হাসি মুখ নিয়ে এতো কাজ করার রহস্য জেনেছি, হাজার কষ্টের মধ্যেও নিজের পরিবারের জন্য রান্না করে সব দায়িত্ব পালন করার পেছনের আনন্দই ছিল সেই হাসির রহস্য। নিজের পরিবারের জন্য সব কিছু করার আনন্দটা যে কি তা এখন মা হয়ে নিজের সংসার পরিচালনা করে বুঝতে পারছি।

তবে দুঃখের ব্যাপার হল, আমরা যে অনাবিল ঈদের আনন্দ পেয়ে বড় হয়েছি এই প্রজন্মের বাচ্চারা সেই অনাবিল আনন্দের কোন ধারণা জানতে পারছেনা, আমি অনেক চেষ্টা করি কিছুটা হলেও আমাদের সময়ের ঈদের অনাবিল আনন্দ উল্লাসের অনুভূতিটা ওদের ঈদের আনন্দের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে, চেষ্টা করি সেই পুরনো আনন্দধারাকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে!

জানিনা কতটুকু সফল হতে পারি। তবে আমি মনে করি আমরা সবাইকে সেই চেষ্টা করেই যেতে হবে যাতে করে কিছুটা হলেও আমাদের ছোটবেলার অনাবিল ঈদের আনন্দকে ধরে রাখতে পারি। সবাইকে পবিত্র ঈদুল আযহার শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক! _

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *