আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন উপাখ্যান – রোদেলা নীলা


মধ্যরাতের আকাশ ভরে আছে সাদা ঝকঝকে তারায় , জাহানারা ইমাম হলের চার বেডের খোলা জানালা দিয়ে উঁকি মেড়ে মুগ্ধ চোখে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম । সেই অদ্ভূত সফেদ আলোয় জ্বলজ্বল কর উঠলো প্রীতিলতা হলের খোলা লন , মাঝ বরাবর ভেসে যাওয়া বিলের জল । রিক্সা মামাদের রিক্সার টুংটাং আওয়াজ আর খালাদের অবিরত ডাকাডাকি –“ ৪১০ রুনা খালা …”

তখন পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি , এভাবে ডাকাডাকির নেপথ্যে কাহিনী । ভর্তি পরীক্ষা দিতে এসেছি এলাকার বড় আপুর সাথে , তিনি নিজে তার বিছানা ছেড়ে দিয়ে আমাকে থাকতে দিয়েছেন । বাংলা এবং ইংরেজি এই দু’টোতে পাশ না করলে যে কোন ফায়দা হবে না তা পই পই করে বলে দিয়েছেন ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি ফরম তোলার দিন নিজের চোখেই দেখেছিলাম , একটি সিটের জন্য শত শত লম্বা লাইন । কীভাবে সম্ভব পছন্দের বিষয় পাওয়া ! তার ওপরে আব্বা জাবি শোনার সাথে সাথেই বলে দিয়েছেন ,” নো ইউনিভার্সিটি , পড়লে শুধু মেডিকেল বা ইঞ্জিনিইয়ারিং ।“

তাই ভয়ে আর কমার্সের ফরম তুলিনি ,ঘুরে ফিরে আবার বিজ্ঞানেই ছিলাম । কিন্তু রসায়ন বাদে সব সাবজেক্ট পেয়ে বসে আছি । কম্পিউটার সায়েন্সে মেধা লিস্টের ১২ জনের পরে ১৩ নম্বরে ছিলাম ; আনলাকি ১৩ যেদিন ভর্তি হতে যাব সেদিন জানলাম চেয়ারম্যান স্যার ইন্তেকাল করেছেন, আপাতত ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত । তাই বাধ্য হয়ে অবশেষে কপালে জুটলো গণিত ।

জাহানারা ইমামের সেই রাত ছিল আমার জীবনে প্রথম বাড়ির বাইরে থাকার রোমাঞ্চকর রাত , হঠাৎ নিজেকে অনেক বড় মনে হচ্ছিল , কেমন যেন একটা স্বাধীন স্বাধীন ভাব যেন নিজেই সব কাজ করতে পারি আমি । সে রাত আর লেখা পড়া করে কাটাইনি আমরা । আমরা পাঁচ কন্যার হাজার রঙ্গের গল্প নিয়ে কেটে গেল ভর্তি পরীক্ষার আগের রাত । আজো স্পষ্ট কানে বাজে তাবাসসুম আপুর মায়া ভরা কন্ঠ –“ আজ জ্যোস্না রাতে সবাই গেছে বনে …।“

জাবিতে ভর্তি হবার পর আমার নিবাস হয়েছিল প্রীতিলতা হলে ; মেধাতালিকার ক্রম অনুযায়ী দুই বেডের রুম এবং চার বেডের রুম নির্ধারণ করা হয়েছিল । কিন্তু আমাদের মেয়েদের মধ্যে এই নিয়ে কোন দ্বিধা কারো মধ্যেই কখনো অনুভব করিনি । আমার জন্য প্রথম যেটি ছিল তা হচ্ছে ১১৯/বি , আমার সুইট রুমমেট সারা রাত জেগে পড়তো । ওর মতো পড়ুয়া মেয়ের অত্যাচারেতো আমার ঘরে বসে আড্ডা নিষিদ্ধ হয়ে গেল । কিন্তু আমি-কনা-আসমা আর অনু ছিলাম নিশাচর , রাত জেগে আড্ডা না দিতে পারলেতো আমাদের আর ঘুম হতোনা।

৯৬/৯৭ সালের দিকে কাওকে নামাজ রুমে বা পত্রিকা রুমে থাকতে দেবার প্রয়োজন হয়নি , প্রায় দেখা যেত আমরা টিভি রুমে বা পত্রিকার ঘরে বসে অযাচিত পায়তারা করছি , কোন কারণ ছাড়া এ ওর রুমে ঢুকে বলছি-“আজ কি রান্না করছিস রে?”

আমাদের জন্য রান্না ঘর বরাদ্দ ছিল , গ্যাসের চুলোয় বেশ আয়োজন করে আমরা রান্না করতাম । নতুন হল পেয়ে লা লা লা গানের তাল তুলে গোসল করতাম , ক্লাশ আরম্ভ হয়ে যেতে পারে এই তাড়নায় মেয়েরা বালতি হাতে ওয়াশ রুমের সামনে লাইনে দাঁড়াতো ।

এ ওকে ঠোকাঠুকি করতো , কেও হয়তো গায়ের জামা দরজার ওপর রেখে গোসল করছে ,আর একজন এসে সেটা দিত গায়েব করে দিত । তারপর আর কী মেয়েদের খুনসুটির শব্দে ঘুম ভেঙে যেত আমার ,- “কীরে তোরা একটু আস্তে ঝগড়া করতে পারিস না ?”

ওয়াশ রুমের লাগোয়া ঘর পেয়েছিলাম তাই আমি কাউন্ট করতাম কে কয়বার নিবির ঘরে আনাগোনা করে , সে এক দারূন ব্যাপার হতো যখন ডাইনিং এ খেতে বসে সেই গোপন তথ্য আমি সবার সামনে ফাঁস করে দিতাম ।
তবে যতোই খুনসুটি করি ; বড় আপারা এলে ঠিকি সামনের সিট ছেড়ে পেছনে বসে যেতাম , সেটা ঢাকায় ফেরার বাস হোক আর টিভি রুম হোক ।

টিভির রিমোট কখনো জুনিয়রদের দখলে থাকতো না , ভয় থেকে নয় আমারা ভালোবাসা ভাগ করতে জানতাম সত্যিকার অর্থেই । তবে যেদিন ফিস্ট হতো সেদিন কাওকেই মানতাম না , সবার আগে ডাইনিং এর সামনে লাইন দিতাম ,বন্ধুর জন্য সিট বরাদ্দ রাখতাম । ফিস্ট মানেই পোলাও মাংস যা বিশেষ দিনে সরকারি খরচ অংশগ্রহণ করতো৷

সব চাইতে বেশি মজা হতো যখন ঢাকায় কল করে নিজের অবস্থান বাবা মা-কে জানানোর সময় আসতো । সেই ল্যান্ড ফোনের যুগের কথা বলছি , কারো হাতে তখন মুঠোফোন নেই । কয়েন ফেলে ফেলে কথা চলছে , কারো কারো কথাতো শেষই হতে চায় না যেন হলের ভেতর ক’খানা তেলাপোকা আছে সেই খবরো বাবা মা-কে জানাতে হবে । মাঝ রাতে ঘুম ভেংগে যেত কারো কারো ফোনের ডাক শুনে ; আমরা কান ফেলে থাকতাম , কার বয়ফ্রেন্ড কোন হল থেকে ফোন দিল এতো রাতে ! এমন কতো হয়েছে কান ফেলে আমরা প্রেমিক প্রেমিকাদের টগবগে যৌবনালাপ শুনে নিয়েছি ।

পড়ুয়া বান্ধবীকে ফেলে আমি আবার ট্রান্সফার হয়ে চলে গেলাম ৩০৩ এ । কারন , তেমন কিছু না । ওই রুমের এম ফিলে পড়া আপু সারা সপ্তাহ ঢাকাতেই থাকতেন , মাঝে মাঝে এসাইনমেন্টের জন্য হলে আসতেন । সুতরাং , এমন একলা কাটানোর সুযোগ কী আর সহজে হাত ছাড়া করা যায় !

দুই প্রভোস্ট ম্যাডামের সাথেতো আমার আবার জম্মের খাতির ছিল , ডিবেট ভালো করতাম বলে তারাও খুব স্নেহ করতেন । আমি তখন সারা রাত জেগে লিখি আর মাঝে মধ্যে এই রুমে ওই রুমে ঘুরে ঘুরে সবাই ঠিকঠাক পড়ছে কীনা , ঘুমোছে কীনা এই খবর নেই এবং নিজে ঘুমাই সকাল দশটা অব্দি ।

এমন নিশিথিনীর সংখ্যা আরো ছিল ; তাদের জন্য ক্যান্টিন মামা আলাদা করে নাস্তা রেখে দিতেন , মামার এখন প্রান্তিকে “বিচিত্রা” নামে একটি দোকান আছে তাতে আমার এবং অন্যান্য সতীর্থদের বই সাজানো আছে , খুব ভালো লাগে নিজের কাছে । যে খালারা আমাদের মায়ের স্নেহ দিয়ে আগলে রাখতেন তাদের অনেকের বিয়ে হয়েছে , অনেকের বাচ্চারা বড় হয়ে গেছে । কিন্তু এতো বছর পর যখন প্রীতিলতা হলে পা রাখি তারা দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরেন ।

মনে আছে যেদিন হল ছেড়েছিলাম ; গেটের মামা থেকে আরম্ভ করে ডাইনিং এর খালারা এমন ভাবে কেঁদেছিলেন যেন নিজের রক্তের সম্পর্কের কেও বুঝি চিরকালের জন্য চলে যাচ্ছে । আসলেওতো তাই , ওইযে পাষান বন্ধুগুলা সব গিয়ে আমেরিকা ইউরোপ ঘর বেঁধেছে তারাতো আর কোন দিন ফিরে আসবে না । আর কোন দিন মাঝ রাতে ঘরের দরজায় এসে তিন টোকা দিবে না । আর কোন দিন বলবে না –“ দোস্ত চল , আজ সারারাত চাঁদ দেখি ।“

জাহাঙ্গীরনগরের গাছ- স্বর্ণলতা , ঝিল-শাপলা –পাখি , টেবিল -চেয়ার-কাঁঠাল-আম-শিমুল-কৃষ্মচূড়া –প্রান্তিক-চৌরঙ্গী –ডেইরীফার্ম- টি এস সি –ট্রান্সপোর্ট আরো যে কতো কী লিখতে গেলে আমার সকাল হয়ে যাবে ; কিছুই ভোলার নয় । এক এক জায়গায় এক এক স্মৃতি ।

শুধু কী মেয়েদের হল ,আমরা ছেলেদের হলে দল বেঁধে আড্ডা দিতাম । মাঝে মাঝে তাদের হাতের খিচুড়ি খেয়ে ডাক্তার দেখানোর মতো অবস্থা হতো , তখন প্রেমিক যুগল রুম ডেটিং এর সুযোগ পেতো যা পরবর্তি সময় নিষিদ্ধ করা হয়েছিল । আমাদের যাদের প্রেম ক্যাম্পাসে হয়নি তারা অসহায় চোখে সেই যুগলদের ক্ষণে ক্ষণে হারিয়ে যাওয়া দেখতাম ব্যাকুল নয়নে –“ আহা , আমরাও যদি পারতাম !!!”

যখন কনসার্ট থাকতো মাইলস অথবা এল আর বি ব্যান্ড আসতো, সারা রাত জেগে ভোকালিস্টদের উৎসাহ দিয়েছি নেচে গেয়ে , ক্যাম্প ফায়ারিং , মিছিল লেগেই থাকতো ।কতো বন্ধুকে দেখেছি রাজনৈতিক কোন্দলে পড়ে নিজের জীবন শেষ করে দিতে ,কতো বন্ধুকে দেখেছি নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে দরিদ্র বন্ধুদের পড়ার খরচ চালাতে ।

ছাত্র কী শিক্ষক আজো ক্যাম্পাসে গেলে সেই দিন গুলোর মতোই বট তলায় বোসে বাদশা মামার সাদা ভাত –ভর্তা –ভাজির ওপর হামলা করি । আহা ! এমন স্বাদ বুঝি রেডিসনেও পাইনি কোন কালেও !!

শুধু এই দেশে কেন বিশ্বের অনেক দেশের অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় আছে ,তাদের অনুভূতি গুলো যার যার মতো ভিন্ন ভিন্ন । কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটু ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে আমাদের জাহাঙ্গীরনগরের অনুভূতি অনেক স্বর্গিয় , অনেক বিশাল তার আয়তন আর সৌন্দর্যের কারণে ।

এক বা দুই দিনে নয় ; বছরের পর বছর তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই “জাবিয়ান “ অনুভূতি যা আমৃত্য শরীর জুড়ে মিশে থাকবে পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন!!

#জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
গল্পকার ও নাগরিক সাংবাদিক


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *