“নেই কাজ’তো খই ভাজ”। ভাজার চেষ্টা করছি, দেখি সকলের সহযোগিতায় কতটুকু কড়াই গরম করতে পারি। আমি একজন সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, কারণ সকলের দোয়া এবং আল্লাহর মেহেরবানীতে করোনাযুদ্ধে জয়ী হয়ে এসেছি। গত মঙ্গলবার দুই মাস পর ডাক্তার চেকআপ করে আমাকে বলেছেন, ‘মোটামুটি সুস্থ।’

তারপরও শারীরিক দুর্বলতার কারণে উন্নত খাবার, বাসায় বিশ্রামের প্রয়োজন রয়েছে। তখন চিন্তা করলাম সারাদেশ নয় বিশ্বের কমবেশি সবাই এখন লকডাউনে আছেন।
এরই মধ্যে বন্ধু-বান্ধব, শুভাকাঙ্খী অনেকে চাপ দিচ্ছেন অবসর সময়ে আমার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য। চিন্তা করলাম করোনার ভয়াবহতা নিয়ে শুধু আলোচনা হচ্ছে।
রোগটা অতি মাত্রায় ছোঁয়াচে, কিন্তু এই রোগ থেকে যে সিংহ ভাগের চেয়েও বেশি মানুষ বেঁচে আসে সে প্রচারণায় ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে রোগটি নিয়ে এখনও মানুষে মধ্যে আতঙ্ক এবং উদ্বেগ বিরাজমান। তবে আমি বলবো যে কোন রোগ থেকে বাঁচার জন্য মানষিক শক্তিটাও বিশেষ প্রয়োজন।
ভাবলাম আমি’তো লেখালেখির লোক নই। আমি’তো বক্তৃতার লোক। সেই এম সি এবং মদন মোহন কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা, টিএসসিসহ সারা দেশ চষে বেড়িয়েছি। সেই সোনালী দিনের আলাপ নাইবা করলাম।
যাক সেই অনুরোধে ঢেঁকি বানতে শুরু করলাম, ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। এ যাবৎ কালের বিশ্বের যত রোগ আছে তার মধ্যে অতি অল্প সময়ে ব্যাপক আলোচিত এবং মানব জাতিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কোভিড-১৯। আমি কোন বিশেষজ্ঞ নই, নতুন করে আমি সেদিকে আলোচনা না করে অসুখের সময়ের আমার অভিজ্ঞতা, কে কিভাবে আমার জন্য শুভ কামনা জানালেন, নিউইয়র্কসহ আমেরিকার অবস্থা কি ছিল?
করোনাত্তোর ধাক্কা কিভাবে এখানে সামাল দিচ্ছে। খ্যাতির বিড়ম্বনা এবং রোগীর প্রতি সাধারণ মানুষের আচরণ ইত্যাদি বিষয়ের উপরই লেখার প্রত্যাশা। ডয়েস ভেলের তথ্য মতে, ডিসেম্বরের শুরুতে ৫৫ বছর বয়সী চীনের এক ভদ্রলোক উহান শহরে করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছেন বলে সনাক্ত করা হয়। তারপরের ঘটনা, মিডিয়ায় নতুন এই রোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়, অন্যদিকে করোনার কালো থাবাও বিসৃত হতে থাকে।
প্রথমেই চীনকে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয়।তারপর মধ্যেপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ছোবল দিয়ে দেয় করোনা ভাইরাস। ২০ ফেব্রুয়ারির দিকে ইউরোপে হানা কোভিড-১৯। ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ডের আক্রমণের পর সারা পৃথিবী নড়েচড়ে বসে। আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
কয়েক দিনের মধ্যে ইতালি লাশের নগরীতে পরিণত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ করোনা মোকাবিলায় হিমশিম খায়। আমরা গভীরভাবে প্রতিদিনের এই সংবাদগুলো দেখছিলাম আর ভাবছিলাম প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণকারী ইউরোপ থেকে আমেরিকা আসে, কখন যেন আমাদের এখানে চলে আসে করোনা?
এই ভাবনার ঘোরের মধ্যে ২০ জানুয়ারি ওয়াশিংটন স্টেটের সিয়াটলে চীন থেকে আসা এক মার্কিনীর এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এই আলোচনার মধ্যেই ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে ইরান থেকে ৩৯ বছর বয়সী একজন নার্স নিউইয়র্কে স্বামীসহ আসলে তার মধ্যেও করোনা সনাক্ত হয়।
পরে অবশ্যই তিনি বাসায় কোয়ারেইন্টানে গিয়ে সুস্থ হয়ে যান। ওই ফাঁকে নিউইয়র্কের ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টিতে একজন আইনজীবীর পরিবার করোনা আক্রান্ত হয়ে কলম্বিয়া হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে থাকেন। ধীরে ধীরে একই কাউন্টির ক্রসঢেলে বেশ কয়েকজন রোগী সনাক্ত হলে নিউইয়র্ক নড়েচড়ে বসে এবং গভর্নর এন্ড্রু কোমো ১ মার্চ অফিসিয়ালি ঘোষণা দিয়ে ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টি ‘লকডাউন’ করেন।
কিন্তু এই দানবের কালো থাবা বিশ্বের রাজধানী বলে খ্যাত নিউইয়র্ক সিটিতে অতি দ্রুত সংক্রামিত হতে থাকে। মুহুর্ত্বেই সিটির সবকিছু এলোমেলো হতে শুরু করে। এর কারণ এই সিটিতে পৃথিবীর সব দেশের ইমিগ্র্যান্টরা কমবেশি বসবাস করেন। যে কারণে এই নুতন রোগ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা এবং সচেতনতার খুব অভাব ছিল।
আস্তে আস্তে সমস্ত নিউইয়র্ক স্টেটে সংক্রমণের হার দেখে গভর্নর ১৫ মার্চ সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সার্টডাউন ঘোষণা করেন। কিন্তু এতে কাজ না হওয়ায় ২৩ মার্চ থেকে নিউইয়র্কে পুরো ‘লকডাউন’ ঘোষণা দেন গভর্নর। শুধুমাত্র ফার্মেমি, গ্রোসারি ও সুপার মার্কেট, রেস্টুরেন্ট (সীমিত আকারে টেক আউটের জন্য), জরুরী সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকী সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। পাশাপাশি নিত্য প্রয়োজনী পণ্য সামগ্রী ঘরে মজুদ রাখার পরামর্শ দেয়া হয় বিভিন্ন মহল থেকে।
এ বাস্তবতার মধ্যে নিউইয়র্ক সিটিসহ আশেপাশের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ এবং মানুষের মাঝে আতংক বাড়তে থাকে। নিউইয়র্ক সিটি মেয়র বিল ডি ব্লাজিও এবং গভর্নর এন্ড্রু কোমো দিন-রাত পরিশ্রম করে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি যেমন অক্সিজেন, ভ্যান্টিলাইজারসহ সবকিছু বাড়ানোর কাজে মনোযোগী হন।
রোগের প্রাদুর্ভাব এবং নিউইয়র্কের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে মেয়র বিল ডি ব্লাজিও এবং গভর্নর এন্ড্রু কোমো যে পরিকল্পনা হাতে নেন তাতে বাধ সাদেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শুরু হয় অনেক টানাপোড়ন। এদিকে ক্যালিফোর্নিয়া, মিশিগান, ভার্জিনিয়া, কনেকটিকাট, নিউজার্সিসহ আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটে সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় ট্রাম্প প্রসাশন একটু নড়েচড়ে বসে একং ট্রাস্কফোর্স গঠন করেন। বাকী অভিজ্ঞতা আগামী সংখ্যায়।
লেখক: ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা।
