জি কে শামিমের মোবাইল ফোনে গুরুত্বপূর্ণ আলামত: টেন্ডার হলেই টাকার ভাগ পেতেন সম্রাট


প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্কঃ টেন্ডার কিং বলে ’খ্যাত গণপূর্তের ঠিকাদার জি কে শামীম অবৈধ লেনদেন সংক্রান্ত হিসাব রেখেছেন তার অফিসিয়াল খাতায় (বিশেষ লেজারবুক)। কখন কাকে কত টাকা ঘুষ বা কমিশন দিয়েছেন – তা লিখে রেখেছেন এ খাতায়। এতে নাম রয়েছে যুবলীগ, ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে প্রভাবশালী অনেক রাজনৈতিক নেতার।

দরজা খুলতে বলায় ভেতর থেকে পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। এ সময় র‌্যাব কর্মকর্তারা কৌশলগত কারণে পরিচয় গোপন করে ভিন্ন পরিচয়ে দরজা খুলতে বলেন। দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব সদস্যরা ভেতরে ঢুকে পড়েন। প্রথমেই তার অস্ত্রধারী বডিগার্ডদের আটক করা হয়। এরপর দোতলায় জি কে শামীমের কক্ষে ঢুকে পড়েন র‌্যাব সদস্যরা। নিজের অফিস কক্ষে হঠাৎ র‌্যাবের টিম দেখে হতভম্ব হন তিনি। বিচলিত হয়ে প্রভাবশালীদের ফোন করতে শুরু করেন।
জি কে শামীমের ফোনে বেশির ভাগ প্রভাবশালী সাড়া না দিলেও কেউ কেউ শামীমকে ছেড়ে দেয়ার জন্য র‌্যাব কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ থাকায় কোনো অনুরোধই কাজে আসেনি। সকাল ৯টার দিকে শামীমের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দেন র‌্যাব সদস্যরা। এরপর তার বাসায় তল্লাশি শুরু হয়। তার অফিস কক্ষসহ বাসার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিপুল অঙ্কের নগদ টাকা, ৮টি ব্যাংকের চেকবই, ২শ’ কোটি টাকার এফডিআর, অস্ত্র, গুলি ও মদের বোতল উদ্ধার করা হয়।
১০ কোটি টাকার অফার : হাতে হ্যান্ডকাফ লাগানোর পর জি কে শামীম তদবিরের হাল ছেড়ে দেন। এবার তিনি অভিযানে উপস্থিত র‌্যাব কর্মকর্তাদের ম্যানেজের কৌশল নেন। একজন র‌্যাব কর্মকর্তাকে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ১০ কোটি টাকার অফার দেন। জি কে শামীম বলেন, ‘আমাকে ছেড়ে দেন। এখনই ১০ কোটি টাকা দিচ্ছি। চাইলে আরও দেব। যেখানে যেভাবে বলবেন সেখানে টাকা পৌঁছে দেব। শুধু আমাকে এবারের মতো ছেড়ে দিন।’ কিন্তু মোটা অঙ্কের টাকার প্রলোভনেও কাজ হচ্ছে না দেখে জি কে শামীম অসুস্থতার ভান করেন। বুকে ব্যথা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তখন তাকে অফিস কক্ষেরই একটি চেয়ারে বসার অনুমতি দেয়া হয়।
র‌্যাব সূত্র জানায়, গ্রেফতারের পর শামীমকে নিচে নামিয়ে আনা হলেও র‌্যাবের গাড়িতে উঠতে তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। শামীম তার কোটি টাকা মূল্যের আলফার্ড গাড়িতে করে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তার সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। বাইরে দাঁড়ানো পিকআপে তুলে তাকে র‌্যাব কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

সূত্র জানায়, জি কে শামীম সব সময় বিশেষ নিরাপত্তা বহর নিয়ে চলাফেরা করতেন। তার গাড়িবহরে ১০-১২টি মোটরসাইকেল, দুটি মাইক্রোবাস, পুলিশের ব্যবহৃত ট্রাফিক সরঞ্জাম ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করা হতো। এছাড়া শামীমের বডিগার্ডদের গায়ে বিশেষ নিরাপত্তা ফোর্স কর্তৃক ব্যবহৃত জ্যাকেট সাদৃশ্য পোশাক দেখা যায়। যা রীতিমতো বেআইনি।

কেউ এই জিয়া : জি কে শামীম প্রভাবশালী অনেকের সঙ্গেই অবৈধ কমিশন ও ঘুষ লেনদেনের আলাপ করেন নিজের মোবাইল ফোনে। তবে প্রমাণ রাখতে অনেকের সঙ্গেই কথাবার্তা বলার পর ফোনে তা রেকর্ড করে রাখতেন। আবার অনেকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার ও ইমো ব্যবহার করে কথাবার্তা বললেও অন্য আরেকটি ফোনে তা রেকর্ড করে রাখেন। এ কারণে শামীমের মোবাইল ফোনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের ভয়েস চিহ্নিত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, জনৈক জিয়াউর রহমান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথোপকথনের একাধিক ভয়েস রেকর্ড রয়েছে তার মোবাইল ফোনে। এসব কথোপকথনের বেশির ভাগই চিত্রজগতের নায়িকা, মডেল ও শোবিজ জগতের তারকাদের ঘিরে। টেন্ডার সংক্রান্ত কাজে তিনি অনেক সময় প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করতে এসব মডেল ও উঠতি নায়িকাদের ব্যবহার করতেন।

সূত্র বলছে, জি কে শামীমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ত মন্ত্রণালয়ে দাপটের সঙ্গে ঘোরাফেরা করেন। তার পুরো নাম জিয়াউর রহমান। অথচ তিনি পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নন। আবার তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতাও নন। তবে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সর্বস্তরে তার প্রভাব চোখে পড়ার মতো। সবাই তাকে দেখলে সালাম দেয়, সমীহ করে লিফটম্যানরা তটস্থ হয়ে পড়ে। মন্ত্রীর কক্ষে ঢোকার আগেই দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকেন কর্মচারীরা।

জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে যে কয়জন সিঙ্গাপুরে মেরিনা বে ক্যাসিনোতে নিয়মিত জুয়া খেলতে যান জিয়াউর রহমান তাদের অন্যতম। সিঙ্গাপুরের ক্যাসিনোতে জিয়া হাজার হাজার ডলার উড়িয়ে দেন অবলীলায়। দেশের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় চলাফেরা করেন হেলিকপ্টারে। জিয়ার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি। রাজধানীর গুলশান-১ এ তিনি থাকেন। গুলশানের হোটেল ওয়েস্টিনে তাকে নিয়মিত দেখা যায়। এই জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ‘হট কানেকশন’ সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায়। বিএনপি আমলে তিনি বিএনপির লোক। আওয়ামী লীগ আমলে আওয়ামী লীগ।

একজন র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, জি কে শামীমের সঙ্গে এই জিয়াউর রহমানের মতো আরও অনেক প্রভাবশালীর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। যাদের কাছে টাকা-পয়সা অনেকটা গাছের পাতার মতোই মূল্যহীন বস্তু। গ্রেফতার করে গাড়িতে তোলার সময় জি কে শামীম তার কর্মচারীদের বলেন, ‘এই কয়টা টাকা দাও তো। সঙ্গে নিয়ে যাই।’ এ কথা বলে তিনি ১ হাজার টাকার নোটের কয়েকটা বান্ডিল হেলাফেলায় তুলে পকেটে ভরার চেষ্টা করেন। কিন্তু র‌্যাব জানিয়ে দেয়, গ্রেফতার হওয়ার পর সঙ্গে নগদ একটি টাকাও নেয়ার কোনো সুযোগ নেই। অগত্যা টাকাগুলো আবার যথাস্থানে রেখে দিতে বাধ্য হন তিনি।

র‌্যাব জানায়, জি কে শামীম অভিনব উপায়ে টেন্ডারবাজি করতেন। সম্প্রতি ই-টেন্ডার পদ্ধতি চালু হওয়ায় মূলত জি কে শামীমের মতো ঠিকাদারদের আরও সুবিধা হয়েছে। কারণ আগে থেকেই দরপত্রে এমন শর্ত যোগ করা হয় যাতে পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদার হিসেবে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। এজন্য সংশ্লিষ্ট দফতর ও অধিদফতরের উচ্চপর্যায়ে নীতিনির্ধারকরা নির্ধারিত রেটে কমিশন নিতেন। দীর্ঘদিন ধরে এমন কমিশন লেনদেনের ফলে জি কে শামীম অনেক কর্মকর্তারই আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। ফলে পূর্ত সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জি কে শামীমের প্রতিষ্ঠান জিকেবিপিএল যুক্ত থাকে। কোনোটি তিনি নিজেই করেন। আবার কোনো কোনো কাজ জেভি’র (যৌথ উদ্যোগ) মাধ্যমে করেন। আবার বেশ কিছু কাজ তিনি অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৫ থেকে ৭ পার্সেন্ট কমিশনে বিক্রি করে দেন।

রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের বেশ কয়েকটি কাজ নিতে জি কের প্রতিষ্ঠানকে রীতিমতো মোটা অঙ্কের কমিশন দিতে হয়। এভাবে রূপপুরে কাজ পায় সাজিন ট্রেডার্স, এনডিই, পায়েল ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স।

র‌্যাব জানায়, জি কে শামীমের বিরুদ্ধে মাদক, অস্ত্র, মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে একাধিক মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে মাদক বা অস্ত্রের যে কোনো একটি মামলা তদন্ত করবে র‌্যাব। যাতে করে আইনের ফাঁক গলে তার মুক্তি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে আসে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম শনিবার যুগান্তরকে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে জি কে শামীমকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। বিভিন্ন মহলে তার হট কানেকশনের কথা শুনেছি। তবে আইনের চেয়ে কারও হাত লম্বা নয়। সে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, অপরাধ করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে।

টেন্ডার, চাঁদা, অস্ত্রবাজি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া যুবলীগ নেতা জি কে শামীমকে পৃথক দুটি মামলায় ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি অস্ত্র মামলায় শামীমের সাত দেহরক্ষীরও চার দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের নিকেতনের কার্যালয় থেকে সাত দেহরক্ষীসহ গ্রেফতারের পর শামীমকে র‌্যাব-১ এর কার্যালয়ে নেয়া হয়। র‌্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন শামীম। ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য দেন তিনি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শনিবার দুপুরে সাত দেহরক্ষীসহ শামীমকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করা হয়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে এ থানায় অস্ত্র, মাদক এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে আলাদা তিনটি মামলা করে র‌্যাব। অস্ত্র দেখিয়ে ভীতি প্রদর্শন এবং মানি লন্ডারিং মামলায় তার সাত দেহরক্ষীকেও আসামি করা হয়। অস্ত্র ও মাদক আইনে দায়ের করা মামলা দুটি তদন্ত করবে পুলিশ। মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, শামীম একজন ‘কুখ্যাত’ চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ, অবৈধ মাদক ও জুয়ার ব্যবসায়ী (ক্যাসিনো)। তার সাত দেহরক্ষী দেলোয়ার হোসেন, মুরাদ হোসেন, জাহিদুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, কামাল হোসেন, সামসাদ হোসেন ও আমিনুল ইসলাম উচ্চ বেতনে চাকরি করতেন। তারা শামীমের দুষ্কর্মের সহযোগী। নিরাপত্তার অজুহাতে অস্ত্রের লাইসেন্স পেলেও এগুলো তারা বহন, প্রদর্শন এবং ব্যবহার করে লোকজনকে ভয়-ভীতি দেখাত। ভয় দেখিয়ে টেন্ডারবাজি, মাদক ও জুয়ার ব্যবসা, স্থানীয় বাস টার্মিনাল, গরুর হাটে চাঁদাবাজি করে স্বনামে এবং বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থের মালিক হয়েছেন।

পুলিশের গুলশান বিভাগের এডিসি আবদুল আহাদ সাংবাদিকদের বলেন, অস্ত্র ও মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলায় শামীম ও তার ৭ দেহরক্ষীকে আসামি করা হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় শুধু শামীমকে আসামি করা হয়।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম যুগান্তরকে বলেন, শামীমকে গ্রেফতারের পর তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে তাকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করার পাশাপাশি অস্ত্র, মাদক ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়। দুটি মামলায় তার সাত দেহরক্ষীকেও আসামি করা হয়েছে।

শুক্রবারের অভিযানের বিষয়ে মামলার এজাহারে বলা হয়, ওইদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শামীম ও তার সহযোগীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবৈধভাবে উপার্জন করা বিপুল পরিমাণ অর্থসহ নিকেতনের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন। এগুলো তারা পাচার করার পরিকল্পনা করছেন। অভিযান পরিচালনা করতে দেরি হলে তারা এই অর্থ সরিয়ে ফেলতে পারেন। পরে বিষয়টি র‌্যাব সদর দফতরে জানানো হয়। বেলা ১১টার দিকে র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্বে সেখানে অভিযান পরিচালনা করে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজপত্র উদ্ধার করা হয়। অভিযানে ৮টি অস্ত্র এবং ৫ বোতল বিদেশি মদ উদ্ধার করা হয়।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, শামীম একজন অস্ত্রবাজ। তার বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। একসময় আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রবাসী জিসানের সঙ্গে তিনি সখ্য গড়ে তুলে ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাট এবং সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা পরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। এ নিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এর জেরে জিসান তার সহযোগীদের কাছে একে-২২ মডেলের অত্যাধুনিক অস্ত্র পাঠায়। জুলাইয়ের শেষের দিকে জিসানের তিন সহযোগীকে একে-২২সহ গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার সঙ্গেও জিসানের গভীর সম্পর্ক ছিল। যুবলীগের পদ পাওয়ার পর ধীরে ধীরে জিসানের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়। মূলত শামীম ও খালেদকে টেক্কা দিতেই একে-২২ মডেলের অস্ত্র ঢাকায় পাঠায় জিসান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জি কে শামীমের বিশাল ক্যাডার বাহিনী রয়েছে। এই ক্যাডার বাহিনীতে আছে অর্ধশতাধিক অস্ত্রবাজ। তাদের হাতে যেসব অস্ত্র রয়েছে, এগুলো সবই অবৈধ। সরকারের বিভিন্ন দফতর এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ঠিকাদারি পেতে এই ক্যাডার বাহিনীকে তিনি (শামীম) ব্যবহার করতেন।

শামীমকে গুলশান থানায় হস্তান্তর : দুপুর ২টা ৫৬ মিনিটে জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষীকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গুলশান থানায় হস্তান্তর করে র‌্যাব। তাকে হস্তান্তরের পরই মামলা দায়ের হয়। পরে পৌনে ৬টার দিকে তাদের আদালতে পাঠায় পুলিশ। সরেজমিন দেখা যায়, শামীমকে থানায় নেয়ার পর অন্তত ২০ যুবককে থানা এবং এর আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে। শামীমকে আদালতে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন।

শামীমের রাজসিক বাড়ি নিয়ে কৌতূহল : রাজধানী ঢাকার নিকেতনের এ-ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর বাড়ির সামনে লেখা রয়েছে, জে কে বি কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড। পাঁচ তলা বাড়িটি দেখলে মনে হবে এটা যেন রাজপ্রাসাদ। ওই ভবনেই থাকতেন যুবলীগ নেতা জি কে শামীম। শুক্রবার ওই বাড়িতেই অভিযান চালায় র‌্যাব। এখন এই বাড়ি ঘিরে সাধারণ মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই।

শনিবার দুপুরে ওই বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা যায়, অনেক উৎসুক মানুষ বাড়িটির সামনে অবস্থান করছেন। তাদের আলোচনাজুড়ে ছিল র‌্যাবের অভিযান এবং বিপুল পরিমাণ টাকা উদ্ধার। মো. আজহারুল নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি গুলশান এলাকার ফুটপাতে চা বিক্রি করেন। কৌতূহলবশে তিনি এখানে এসেছেন। হাজার কোটি টাকার মালিক জি কে শামীম গ্রেফতার হয়েছেন, এটা যেন তার বিশ্বাস হচ্ছে না।

নিকেতনের একটি বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন রুবেল হোসেন। তিনি বলেন, এই বাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থা অন্যান্য বাড়ির মতো নয়। ডিজিটাল লক রয়েছে গেটে। এই বাড়ির ভেতরেও নাকি সুরক্ষিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এই বাড়িতে সব সময় ভিআইপি লোকজনের আনাগোনা ছিল। বিলাসবহুল গাড়ি আসত সারা দিনই। সবার কাছেই এই বাড়ি নিয়ে রহস্য ছিল। বিভিন্ন সময় এ নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। এখন সব বুঝতে পারছি। এখানে সব অবৈধ টাকা-পয়সার কারবার ছিল।

প্রসঙ্গত, ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার অপকর্মের বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকেই পদ হারান ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী। এরই ধারাবাহিকতায় অপকর্মে জড়িত যুবলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। যদিও শুক্রবার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগই শুধু নয়, আওয়ামী লীগের যেসব নেতা অপকর্মে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।

তথ্য সুত্রঃ যুগান্তর

, , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *