তারেক রহমানের বক্তব্য সরানোর নির্দেশ উচ্চ আদালতের – এজলাস ছাড়লেন দুই বিচারপতি


প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্ক :: বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সম্প্রতি দেয়া সব বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে  সরানোর নির্দেশ দেয়াকে কেন্দ্র করে দুই বিচারপতির এজলাস ত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকাল ১১টার দিকে বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানির সময় হট্টগোল তৈরি হলে বিচারপতিরা এজলাস ত্যাগ করেন। পরে সাড়ে ৩ ঘণ্টা পর দুপুর আড়াইটার দিকে  ফের এজলাসে প্রবেশ করেন দুই বিচারপতি। এরপর আবার বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

গতকাল সকালে তারেক রহমানের বক্তব্য ও বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে সরাতে বিটিআরসিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে রিটকারী আবেদন করেন। সকালে শুরুতেই সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিএনপি সমর্থক আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী এজলাসের ডায়াসে দাঁড়িয়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারককে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার প্রতি আমাদের অনাস্থার বিষয়টি প্রধান বিচারপতি বরাবর দিয়েছি। এই অবস্থায় আপনি কোনো আদেশ দিতে পারেন না। বিএনপি সমর্থক আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, আপনি ইনজাস্টিস করছেন। ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আদালতকে বলেন, আপনি বিচার বিভাগে অরাজকতা সৃষ্টি করছেন। এ সময় আইনজীবী গাজী কামরুল ইসলাম সজল ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের একটি ছবি সংবলিত প্রতিবেদন আদালতে প্রদর্শন করেন। ওই ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, একজন বিচারপতি আদালতের দরজায় লাথি মারছেন।

mzamin

যিনি লাথি মারছেন তিনি এই আদালতের জ্যেষ্ঠ  বিচারপতি। এরই মধ্যে হাইকোর্ট তারেক রহমানের সাম্প্রতিক দেয়া সব বক্তব্য অনলাইন থেকে সরানোর জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)কে নির্দেশ দেন। এসময় বিএনপি সমর্থক আইনজীবীরা ‘শেইম’ ‘শেইম’ বলে চিৎকার করেন। বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে তারা বলেন, আপনি অবিচার করতে পারেন না।

এভাবে চলতে থাকে হট্টগোল।  আদালত বলেন, আপনাদের বলা শেষ হলে আমরা বলবো। বেঞ্চের নেতৃত্বদানকারী বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বিএনপিপন্থি এক আইনজীবী বলেন, আপনাকে বলতে হবে যে, আপনি দরখাস্ত সম্পর্কে জানেন কিনা? একপর্যায়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তারা মিডিয়া ট্রায়াল চাচ্ছেন। আদালত বলেন, আদেশ দেয়ার আগে যদি আপনারা একটু বলতেন। এ সময় উচ্চ স্বরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলেন, ‘বলা হয়েছে। বলা হয়েছে।’ কোর্টের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা রয়েছে কেন?

হইচইয়ের মধ্যে একপর্যায়ে আদালত বলেন, আদেশ দেয়া হয়েছে, সংক্ষুব্ধ হলে আপনারা আপিল বিভাগে যেতে পারেন। জবাবে বিচারপতিকে উদ্দেশ্য করে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা বলেন, আপনি বায়াস, আপনার প্রতি আস্থা নেই। এ সময় বিচারকের উদ্দেশ্যে একজন আইন কর্মকর্তা বলেন, আপনারা আপনাদের মতো করে কোর্ট চালাবেন। ক্রমানুসারে মামলা ডাকা হোক। একপর্যায়ে আদালত বলেন, আমরা আদেশ দিয়েছি। এখন নিয়মিত আইটেমে যাই। এতে আপত্তি জানিয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ‘নো’ ‘নো’ বলতে থাকেন। আদেশ প্রত্যাহার করেন। একপর্যায়ে ১০টা ৫৫ মিনিটের দিকে এজলাস ত্যাগ করেন দুই বিচারপতি। বেলা সোয়া একটা পর্যন্ত আদালত কক্ষে বসেছিলেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

আওয়ামী লীগ-বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা যা বললেন-
আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কামরুল ইসলাম ও সানজিদা খানম। বিএনপিপন্থি আইনজীবী কায়সার কামাল, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, এম বদরুদ্দোজা বাদল, আব্দুল জাব্বার ভূঁইয়া, মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও গাজী কামরুল ইসলাম প্রমুখ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

অন্যদিকে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার ও কামরুল হক খান, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল এস আর সিদ্দিকী সাইফ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। আইনজীবী কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, নয়াপল্টনের জনসভায় তারেক রহমানের বক্তব্য মাইকে প্রচার করা হয়। ইদানীং খুব বেশি রকমভাবে আদালতের আদেশ অমান্য করে বক্তব্য প্রচার করা হয়। যার জন্য আমরা বিটিআরসি’র প্রতি একটা নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেছিলাম। আদালত আমাদের আবেদনটি অ্যালাউ করেছেন। বিটিআরসিকে ইউটিউব, সামাজিক সব মাধ্যমে তারেক রহমানের বক্তব্য, বিবৃতি, ভিডিও-অডিও প্রচার বন্ধে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। তিনি বলেন, ওরা (বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা) অযাচিতভাবে কোর্টের কার্যকলাপকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে। তারা কোনোভাবে পার্টি না (মামলায় পক্ষভুক্ত নয়)। তারা আজ ন্যক্কারজনক কাজ করেছে। বিচারপতিদের দিকে ফাইল ছুড়ে মেরেছে। পক্ষভুক্ত না হয়েও তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞার রিটে বিচারকের বিরুদ্ধে কীভাবে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা অনাস্থা দেন, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। সেদিন তারা পক্ষভুক্ত হওয়ার জন্য একটি দরখাস্ত দিয়েছিল। সেটা আদালত খারিজ করে দিয়েছেন।

জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, সকালে শুরুতেই আমরা হাইকোর্টকে বলি, বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারকের বিরুদ্ধে আমাদের অনাস্থা প্রধান বিচারপতি বরাবর দেয়া আছে। আপনি এ বিষয়ে অবগত আছেন। এই অবস্থায় আপনি শুনানি কিংবা কোনো আদেশ দিতে পারেন না। আদালতে আমরা শান্তিপূর্ণভাবে ছিলাম। হঠাৎ করেই এজলাস থেকে দুই বিচারপতি নেমে চলে গেছেন। দুপুর ১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করেছি। আদালতে বিচারপতির ওপর কজলিস্ট বা ফাইল ছুড়ে মারার অভিযোগের ব্যাপারে তিনি বলেন, আওয়ামীপন্থি আইনজীবী এডভোকেট কামরুল ইসলাম ফাইল ছুড়ে মারার যে অভিযোগ করেছেন তা সম্পূর্ণ বানোয়াট। তিনি না জেনেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অভিযোগ করেছেন। কারণ তখন তিনি আদালতে ছিলেন না। অন্তিম মুহূর্তে তিনি পিটিশনটি নিয়ে গেছেন।

প্রসঙ্গত, এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৭ই জানুয়ারি তারেক রহমানের বক্তব্য গণমাধ্যমে প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে রুল জারি করে। রুলে তারেক রহমানের বক্তব্য প্রকাশ ও প্রচার নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কেন বিবাদীদের নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। ওই রুল শুনানির জন্য সম্প্রতি হাইকোর্টে আবেদন জানায় রিটকারী পক্ষ। কিন্তু তারেক রহমানের ঠিকানা ভুল থাকায় নোটিশ সঠিকভাবে জারি হয়নি। এ কারণে ঠিকানা সংশোধন করে ফের আবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। ওই নির্দেশনা মোতাবেক তারেক রহমানের ঠিকানা সংশোধন করে নোটিশ জারির নির্দেশ দেন আদালত। এরপরই গত সপ্তাহে নোটিশ জারি করা হয়। এরপর হাইকোর্ট রুল শুনানির জন্য কার্যতালিকায় রাখেন। এরই মধ্যে তারেক রহমানের বক্তব্য ও বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউব থেকে সরাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিটিআরসি’র প্রতি নির্দেশ চেয়ে সম্পূরক আবেদন করে রিট আবেদনকারী। গতকাল ওই আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দিলেন হাইকোর্ট।

,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *