প্রবাসবার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিবেদক মোঃ ফয়জুর রহমানঃ দেশের প্রাচীনতম চা বাগান মালনীছড়া। সিলেট নগরী থেকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যাওয়ার পথে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ সড়কের উভয় পাশের বিস্তৃত উঁচু-নীচু অসংখ্য টিলা আর সমতল ভুমিতে সুবিস্তৃত নয়নাভিরাম এ চাবাগান।
অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত দেশের সর্বপ্রথম চা বাগান মালনীছড়া বরাবরই দৃষ্টি কেড়েছে পৃথিবীর নানা দেশের নিসর্গপ্রেমি আর সৌন্দর্য পিপাসুদের। ১৯৭১-এ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অম্লান স্মৃতি বিজড়িত এবং পাক হানাদারদের হাতে আত্মাহুতি দেয়া শহীদদের রক্তে রঞ্জিত মালনীছড়া টি এস্টেট-এর উর্বর মাটি।

ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনামলে তদানীন্তন আসাম প্রদেশের মধ্যে ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমা এবং সম্পদ-সম্ভাবনায় অধিকতর সমৃদ্ধ অবিভক্ত সিলেটের মালিনীছড়া এলাকায় ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজদের উদ্যোগে মালিনীছড়া টি এস্টেট-এর যাত্রা শুরু হয়। দেশের সর্বপ্রথম এ চা বাগানটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চা চাষের শুভ সূচনা ঘটে।
পরবর্তীতে এ চা বাগানের পদাঙ্ক অনুসরণ, চা চাষের কৌশল রপ্ত এবং এ ক্ষেত্রে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করেই বৃহত্তর সিলেটসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পর্যায়ক্রমে একে একে চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয়। সেইসাথে বাংলা ও আসাম অঞ্চলে চায়ের চাষাবাদের বিস্তৃতি ঘটে এবং চা উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
মালিনীছড়া চা বাগান প্রতিষ্ঠার ১শ’ ৬৫ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে ইতোমধ্যে। প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিকে এ চা বাগানের মালিকানা ও পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন একটি ইংরেজ ব্যবসায়ী গ্রুপ। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মালিনীছড়া চা বাগানের মালিকানা ও পরিচালনায় হাত বদল হয়েছে ক’বার। বর্তমানে এ চা বাগানের মালিকানা ও পরিচালনায় রয়েছে সিলেট টি কোম্পানি। এ কোম্পানীর মালিকানা ও পরিচালনায় বাংলাদেশ ও আসামে বেশ ক’টি চা বাগান রয়েছে। যার কর্ণধার ও প্রাণপুরুষ দেশের বরেণ্য উদ্যোক্তা, বিশিষ্ট শিল্পপতি-ব্যবসাী ও নন্দিত সমাজসেবী আলহাজ্ব রাগীব আলী।
কালের অমোঘ প্রবাহ আর সময়ের বিবর্তনে কতো উত্থান-পতন আর ইতিহাসের পালাবদল ঘটেছে এ সুদীর্ঘ সময়ে। কিন্তু ইতিহাস আর কালের সাক্ষী হয়ে আজও সগৌরবে টিকে আছে মালনীছড়া টি এস্টেট।

মালনীছড়া শুধুমাত্র একটি চা বাগানই নয়। এর চেয়েও বেশি কিছু। কারণ, মালনীছড়ার উর্বর টিলা ভূমিতে মিশে আছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মাহুতি দানকারী শহীদের তাজা রক্ত। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে
এ শহীদদের মহান আত্মত্যাগ ও অম্লান স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নিমিত্তে নির্মিত হয় টিভি নাটক “বাগানের নাম মালিনীছড়া”। যা’ বহুবার সম্প্রচার করা হয়েছে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে। তাই, নানা কারণে দেশের প্রাচীনতম চা বাগান মালিনীছড়া সিলেটের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের সাথে মিশে আছে।
মালিনীছড়ার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, সবুজের সমারোহ, চা বাগানের মায়াবী হাতছানি আর মহান মুক্তিযুদ্ধের গর্বিত অনুভূতির অনুরণনে গতকাল বৃহস্পতিবার চা বাগানের অভ্যন্তরে দিনের বেশিরভাগ সময় ডুবে ছিলাম আমরা দু’জন।
চা শিল্প সংশ্লিষ্ট একটি ভিজ্যুয়াল ডকুমেন্টারি নির্মাণ সংক্রান্ত কাজে মালিনীছড়ায় ছিল আমাদের গতকালের এ পরিভ্রমণ। এ অভিযাত্রায় আমার সাথে ছিলেন বিটিভি’র সাবেক প্রযোজক, তথ্য অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক এবং টেলিভিশন,বেতার, সঙ্গীত নাট্যকলা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট বন্ধুবর জামিউর রহমান লেমন ভাই।
মালিনীছড়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক এর আন্তরিক সহযোগিতা ও আতিথেয়তায় আমরা বিমুগ্ধ। আমাদের কার্য সম্পাদনে তাঁর সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের সহযোগিতাও মনে রাখার মতো।
