মতির এপ্রিল ফুল – সামছুদ্দোহা ফজল সিদ্দিকী


সকালে মতি বুলুদের বাড়ি যেতে না যেতেই ফুলি মতিকে বলল ‘চাচা,আব্বা তোমাকে গ্যাস ফিল্ডে যেতে বলেছেন তাড়াতাড়ি যাও।’ মতি ফুলিকে জিজ্ঞেস করলো ‘কেনো?’ ফুলি উত্তর দিলো ‘আমি জানি না।

আর তাড়াতাড়ি যাও আব্বা আজ সাতটায় গ্যাসফিল্ডে গেছেন।’মতি ভাবলো ‘বড় ভাই নিশ্চয়ই কোন জরুরি কাজেই বলেছেন।’মতি পিছন ফিরেই বাড়ী চলে এলো।

মতি বাড়িতে এসে মাকে বলল ‘মা, মনির ভাই সকালে ফুলিকে বলে গেছেন,উনি যে গ্যাস ফিল্ডে ঠিকাদারী করেন সেখানে যাওয়ার জন্য। মা মতিকে জিজ্ঞেস করলেন ‘কেনো?’মতি বললো ‘জানিনা।’

মার মনে খটকা লাগলো কেন মনির মিয়া মতিকে গ্যাসফিল্ডে যেতে বলেছেন। আর মতির বয়স তো সবেমাত্র তেরোতে পড়লো। আর তাকে যেখানে পাঠাবেন সেখানে কখনো মতি যায়নি।

মুহুর্তেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো মনির মিয়া উনাদেরকে যে আন্তরিক উপকার করেছেন সে উপকারগুলোর কথা। আর উনার স্বামীর ও একমাত্র বাল্য বন্ধু ও সুখ-দুঃখের সাথী। একটু পর মতিকে জিজ্ঞেস করলেন “তুই কি চিনিস বা কখনো গেছিস ওখানে?’

মতি বললো ‘না মা।’তবে যেতে পারবো। শহর থেকে  আমাদের বাড়িতে আসার সময় জায়গাটা পড়ে ।ঐ যে উপজেলা সদরে আসার আগে হাতের  ডানে যে বড় বিল মাটি ভরাট করতেছে ঠিক ঐ জায়গাটা।’
‘তো যা বাবা।”আচ্ছা মা।’

মতি এমনিতেই কম কথা বলে ও খুব বিনয়ী ছেলে।মনির মিয়ার বড় ছেলে বুলু আর মতি প্রায় সম বয়সী।দুজনেই বন্ধু। মনির মিয়ার বড় মেয়ে ফুলি শহরে নামকরা কলেজে পড়ে। সে গত বছর ১৯৮০ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করেছে।খুব ভালো মেয়ে।

রূপের গুণের শেষ নেই। এবার নাকি কলেজ বন্ধ হওয়ার আগে বান্ধবীদের সাথে আড্ডায় তারা বলেছিল কে কয়জনকে এপ্রিল ফুল বানাতে পারে দেখা যাবে। অনন্তপক্ষে একজনকে করতে হবে।না হয় ফাইন হবে।

মতি গিয়ে গ্যাস ফিল্ডে উপস্থিত।সালাম দিয়ে দাঁড়াল মনির মিয়ার পাশে। মনির মিয়া লোকদেরকে কাজ দেখিয়ে দিচ্ছেন।এদিকে মতি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। অনেকক্ষণ কাজ দেখানোর পর বললেন ‘মতি চল। ‘ মতি সাথে চলল।

মনির মিয়া মতিকে কি জিজ্ঞেস করবেন সম্ভবত চিন্তা করতে ছিলেন মনে মনে আবার ভাবতেছিলেন  স্কুল বন্ধ হয়তো কৌতুহলী হয়ে ছেলেটা গ্যাস ফিল্ডের কাজ  দেখতে এসেছে যদি জিজ্ঞেস করি ‘কেনো এসেছো ? লজ্জা পায়।’

আবার ভাবতেছিলেন এর বাবা  যদিও সম্পর্কে চাচা তারপর ও আমার বাল্যবন্ধু।আর সে ও আমার আমার বড় ছেলের বাল্যবন্ধু। লেখাপড়ায় ও ভালো।আর গ্রামে এ বয়সের  আদর্শবান দ্বিতীয় ছেলে নেই। অতি চালাক ও না আবার বোকা ও না। এ দিকে মতি তো মনে মনে বলছে কি ব্যাপার বড় ভাই ডেকে এনেছেন কেনো কিচ্ছু বলছেন না। আর যদি কিছু জিজ্ঞেস করে ফেলে বেয়াদবি হয়ে যায়।

মেসে দুপুরের খাবার খেলো দুজনে।বিকালে মনির মিয়া আর মতি একসাথে গ্যাস ফিল্ড থেকে বের হয়ে যখন বড় বাজারে আসলেন মনির মিয়া তখন মতিকে বললেন ‘মতি তুই বাড়ি যা আমার বাজারে একটা কাজ আছে বাড়ি যেতে রাত হবে।’ মতি বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো।

মা জিজ্ঞেস করলেন ‘কিরে, কেনো উনি তোকে ওখানে যেতে বলেছেন?’ ‘জানি না’ মা আবার বললেন ‘জানি না মানে?’ মতি বলতে লাগলো ‘শোন মা, গিয়েই তো পেয়ে গেলাম। লোকদেরকে কাজ দেখাচ্ছেন। সারাদিন সাথে থাকলাম।মেসে খাওয়ালেন।বড় বাজারে এসে বললেন তুই বাড়ি যা আমার বাড়ি ফিরতে রাত হবে। আমি গাড়িতে উঠে চলে এলাম।’

মা জিজ্ঞেস করলেন ‘তুই জিজ্ঞেস করিস নি কেনো মনির মিয়া ডেকেছেন?আর কেনো বলিসনি ফুলি বলেছে আপনার কাছে আসতে বলেছে?’ মাকে মণ্টু বললো  ‘উনি বুঝি জানেন না কেনো আমাকে আসতে বলেছেন।আমি তো সারাবেলা ভাবলাম উনি আমাকে  এই বলবেন এই বলবেন। পরে বড় বাজার এসে বললেন ‘তুই বাড়ি যা মতি’ আমি চলে এলাম। আর তুমি তো আমাকে জানোই  মা আমি কেমন।’

মনির মিয়া রাতে বাড়ি ফিরে দেখলেন।মনির মিয়ার বড় মেয়ে দু ভাইবোনকে তাদের পড়ার টেবিলে রেখে গল্প করতেছে।তিনি বড় মেয়েকে বললেন ‘তুই মন্টুকে আমার কাছে পাঠালো কেন? আরো ও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন’ অমনি তিনজন একসঙ্গে জোরে জোরে বলে উঠলো ‘ফুল,এপ্রিল ফুল।’ ‘ফুল,এপ্রিল ফুল।’ বেশ কয়েকবার।

মনির মিয়া হঠাৎ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন!বাচ্চাদের চিৎকারে বাড়ির আরো ‌ঘরের লোকেরা চলে আসলো। পরে তিনি ও বাড়ির লোকেরা জানতে পারলেন ব্যাপারটা কি।

স্কুলে যাওয়ার পথে মতিদের বাড়ির রাস্তা পার হয়ে যেতে হয়।পরদিন মতি স্কুলে যাওয়ার  সময় পথে রাস্তায় মতির সাথে বুলু ও তার ছোট বোন তুলির সাথে দেখা। মতির জন্য রাস্তায় অপেক্ষায়।মতিকে দেখেই বুলু মুচকি হাসতে আরম্ভ করলো।আর তুলি দাঁত একটু বের করে হাসতে লাগলো।

মতি কারণ খুঁজে পাচ্ছিল না এ রকম তো কখনো হয়না।তুলি তাকে খুব সম্মান করে।কাঁচা রাস্তা।মন্টু তার পায়ে কি জানি কি একটা কালো জিনিসকে  জোঁক ভেবে ওটা যখন ছাড়াতে মাথা নীচু করলো।তখন বুলু মুখে আঙ্গুল দিয়ে বুলিকে সতর্ক করলো যেন না হাসে।

বুলুদের রাস্তায় আসার আগে আগে মন্টু নিজেকে সামলে নিল। বাড়ী থেকে দেড় মাইল হাঁটার রাস্তার দূরত্বে স্কুল। রাস্তায় মিনিট খানেক হাঁটার পর বুলু মন্টুকে ব্যাপারটা বললো। শুনে মন্টুর চক্ষু চড়কগাছ! একটু পর মন্টু নিজেকে সামলে নিল। আর পেছনে ওর বোন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া তুলির মুখে হাসি লেগেই আছে।

রাস্তায় হেঁটে হেঁটে মন্টু একটা ফন্দি আঁটলো পেট ব্যথা বলে স্কুলে যাওয়ার আগে গেইট থেকে ফিরে আসবে।আর একটু পর থেকেই পেট ব্যথার ভান করে আস্তে আস্তে হাঁটতে থাকলো। মন্টু গেইট থেকে  বাড়ি ফিরে এলো।

পরের দিন স্কুলে যাওয়ার পর ‘ফুল,এপ্রিল ফুল’ ‘ফুল,এপ্রিল ফুল’বলে সহপাঠীদের ব্যঙ্গানি আর ঠাট্টা তামাশায় কাটলো। আজ হেড স্যারের ইংরেজির ক্লাস নেই।

চতুর্থ পিরিয়ডে স্কুলের দপ্তরী এসে মন্টুকে বললো ‘তোমাকে হেড স্যার বলেছেন এ ক্লাসের পর তুমি উনার রুমে যাওয়ার জন্য।’ স্কুলের ছোট বড় সব ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীরা হেড স্যারকে যমের মত ভয় পায়।

সবাই ভাবলো কি ব্যাপার হেড স্যার তাকে কেনো ডাকলেন প্রথম বেঞ্চের তিনজন কি যেন একটা চাওয়া চাওয়ি করে মুহূর্তেই বন্ধ করে দিল মতি বুঝতে পারলো না। মতি অনুমতি নিয়ে হেড স্যারের রুমে ঢুকলো। মতিকে হেডস্যার জিজ্ঞেস করলেন ‘গতকাল তুমি স্কুলে আসোনি কেন?

আর গতকাল তো ইংরেজির মডেল টেস্ট ছিল। তোমার সাথের বাকী চারজন আসলো তুমি আসলে না কেনো?কেনো আসা হয়নি বলো। উত্তর চাই?’

মতি কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। ঘটে যাওয়া দুদিন আগের ঘটনা কিভাবে বলবে সাহস পাচ্ছিল না। হেড স্যার মূহুর্তেই অগ্নিশর্মা হয়ে উঠলেন। হাতের কাছে রাখা দুটি বেত হাতে নিয়ে বলতে লাগলেন ভালো মানুষের ছেলে স্কুল ফাঁকি দিতে শিখেছি গেছো এই বয়সে। এইটে এই বৃত্তি দেয়া হচ্ছে না, এই বৃত্তির প্রস্তুতি হচ্ছে বলে হুংকার দিয়ে উঠলেন।’ মাথার চুলে মুষ্টিবদ্ধ বদ্ধ করে ধরে পেটাতে লাগলেন।

যখন মতির জ্ঞান ফিরলো তখন দেখলো হেডস্যারের উরুর উপর তার মাথা।স্যার কাঁদতেছেন! সাথে সাথে মতির স্মৃতিতে ভেসে উঠলো ‘এপ্রিল ফুল …!’

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *