আত্ম প্রবঞ্চনা এক প্রকার হীন মানসিক বিকার গ্রস্ততা। যার যা তা তার প্রাপ্য। যা আমার নয় তা আমার বা রঙ্গ ঢঙ্গ মাখিয়ে প্রকাশ করা দীনতারই পরিচয় বহন করে। আর এই হীনমন্যতা রাস্ট থেকে শুরু করে সমাজের পরতে পরতে দৃশ্যমান।
আমাদের এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় আইয়ুব আলি সাহেব একজন জনহিতকর সমাজ কর্মী। তৎকালীন সময়ে যাদের লেখাপড়ার ঘাটতি ছিল উনি ছিলেন তাদের জন্য নিবেদিত প্রান। উনার মাস্টার উপাধি সেই হেতু।
বিলেতের কঠিন জীবনে দাঁড়াতে মানুষকে সাহায্য করতে পিছপা হতেন না। এই বিলেতের সমাজে একজন প্রথিতযোশি কমিউনিটির অগ্রদূত হিসেবে উনার কর্ম উজ্জ্বলতায় ভাস্বর।
আমাদের আয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের জীবন নিগৃঢ় ইতিহাসের সততায় লিপিবদ্ধ। সিলেটের জগন্নাথপুর থানার সবুজ শ্যামলিমা, ধান-মাছে পরিপূর্ণ গ্রাম আছল বর্তমান নাম হাসান ফাতেমাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। উনার সঠিক জন্ম তারিখ জানা সম্ভব হয়নি।
তিনি ১৯১৩ সালে নজিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়েছিলেন। যথারীতি পাগলা ইম.ই. স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৭ সালে এম. ই. চুড়ান্ত পরীক্ষায় উনি অংশ নেন। কিন্তু নিদারুন অভাব উনাকে লেখাপড়ায় পাঠ চুকিয়ে জাহাজের নাবিক হয়ে বিদেশ মুখী হতে হয়।
উনার মত অনেক মিরাসদারের সন্তান সমাজ ও রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের শিকার হয়ে ঘর ছাড়া হতে বাধ্য হন। এই সব গৌরবান্বিত মানুষই আমাদের এই লন্ডনি সমাজের পুরোধা। বৃত্তি প্রাপ্ত মিরাসদার পুত্র জাহাজের চাকুরি (!!!!!) এর সঠিক পর্যালোচনা ও গবেষণায় বেরিয়ে আসবে আমাদের সিলেটীদের দুর্ভাগ্য।
উন্মুখ হবে আমাদের সিলেটী মুসলিম বুনিয়াদি পরিবারের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধঃপতনের মর্মান্তিক জীবনালেখ্য। যেখানে লুকিয়ে আছে আমার-আমাদেরও গৌরব। তাই তো সোচ্চার হই যদি দেখি কেউ কোন ভাবে আমাদের গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাসে কালিমা লেপন করতে যায় বা কোন কর্মের মাধ্যমে আমাদের গৌরবান্বিত ব্যক্তিদের কর্ম ও জীবনকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে।
তাই ভয় হয় যদি এই তত্ত্ব বিভ্রাট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাদেরকে প্রশ্নতুল্য করে। আমাদের উচিত উনাদেরকে এই সব শঙ্কা থেকে দূরে রাখা। আমাদের শুধু উচিতই না, মান মর্যাদা ও ঐতিহ্যের তাগিদায় একান্ত করণীয় বলে মনে করি।
পরিতাপের বিষয়, দিন দশেক পূর্বে আমার গোচরে আসল, জনৈক রুয়েল হোসেন, আয়ুব আলি মাস্টার সাহেবকে দাদা , মোফাজ্জল হোসেনের পুত্র মোতাবেক উনার পরিবারের লন্ডনে ১০০ বছর রেস্টুরেন্ট ব্যবসার প্রচার ও প্রতিবেদনে নিজে অংশগ্রহন করেন। আমাদের বিলেতের স্বনামধন্য চ্যানেল এস টিভি রিপোর্টার মেহেদি কামালের প্রতিবেদনসহ মূল খবরে তা প্রচার করা হয়।
যদিও খবরটি বছর পুরাতন কিন্ত এর প্রভাব হবে ভবিষ্যৎ ব্যাপী। সেহেতু বিষয়টা জন সচেতনতামূলক। ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও সঠিক তত্ত্ব তুলে ধরে চ্যানেল এস এর দৃষ্টিগোচরে আনার প্রচেষ্টায় এই লেখাটা সহযোগী ভুমিকা পালন করবে বলে দাবি এই লেখাটির।
এই আনুসাঙ্গিক বিষয় নিয়ে ক্ষুদ্র গবেষনায় এই বিজ্ঞ ব্যাক্তিকে নিয়ে তিন ধরণের বৈচিত্র তত্ত্ব প্রমাণ ফুটে উঠেছে।
(১) লেখক Caroline Adams সম্পাদিত, সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে বা Accross the Seven Seas and thirteen rivers বইয়ের তত্ত্ব মতে, জনাব আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেব ২০ এর দশকে লন্ডনে এসেছেন। সেটা ১৯২০-১৯২৯ যে কোন বছর হতে পারে।

(২) জনাব নুরুল ইসলাম সাহেবের লেখা বিখ্যাত বই ‘প্রবাসীর কথা’ মতে জনাব আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেব ১৯১৯-১৯৩৩ পর্যন্ত আমেরিকা ও ১৯৩৮ এর অক্টোবর মাসে বিলেত আগমন।

(৩) বিলেতে জনপ্রিয় চ্যানেল এস টিভি‘র প্রচার মতে, উনি ১৯১৯ সালে লন্ডনে প্রথম বাঙালি রেস্টুরেন্ট খুলেন। নীচে ভিডিও:
বিশেষ উল্লেখ্য যে, চ্যানেল এস টিভিতে প্রচারিত জনাব আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের নিউজ রির্পোট ও উপরে উল্লেখিত দুই বইয়ের একই ব্যাক্তি আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তাই উপরের উল্লেখিত তত্ত্বাদিতে কোন ভাবে সমর্থন করে না যে উনি ১৯১৯ সালে লন্ডনে ছিলেন।
উল্লেখিত পুস্তিকাদের তত্ত্ব মতে, জনাব আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের জীবনীর আলোকাপাত করলে এই দাবির ভিন্ন চিত্র ভেসে উঠে। যেহেতু ‘প্রবাসীর কথা’ পুস্তিকার লেখক জনাব নুরুল ইসলাম সাহেব নিজে আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের জীবন গল্প উনার মুখ থেকে শুনে লিপিবদ্ধ করেছেন তাই উনার উপস্থাপিত তত্ত্বকে সঠিক তত্ত্ব বলে আমি আমার এই লেখায় প্রাধান্য দিয়েছি।
শুধু তাই নয়, এই বইটি আমার কাছে সিলেটী ও জাহাজি ও শ্রমজীবীদের বিষাদ সিন্ধু। বাংলাদেশসহ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসুচি। আমাদের গর্ব, আমাদের সিলেট তথা বাংলাদেশসহ বিলেতে সিলেটী বাঙ্গালী সমাজের গর্ব এই বই ও তার লেখক।
আমার মতে, বিতর্কিত আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেব ১৯১৯ ইং সালে প্রথম বাঙালি রেস্টুরেন্ট শাহজালাল নামে, কমার্শিয়াল স্ট্রিট এ খুলেন এবং উনার পরিবার বলে দাবির সত্যতার একটা প্রশ্ন আমরা যারা বিলেতের মাটিতে সভ্য-সুন্দর সমাজে বাস করছি বা আমরা যারা মনে করি এই সব কৃর্তীমান পূর্ব পুরুষরা আমাদের অহংকার, তাদের উপর বর্তায়। আমরা কেউ কোনভাবেই এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারি না।

তাই এই অপরিপক্ক হাতে কলম ধরা। আইয়ুব আলি সাহেবের আংশিক জীবন চিত্র নিচে তুলে ধরার প্রয়াস করছি:
১. ফেব্রুয়ারি ১৯১৮ – ১১ নভেম্বর ১৯১৮
- চাকুরি অয়েল মেন হিসেবে, মালয়া
- ০২/০২/১৯১৮ – বাড়ি থেকে খুরশেদ আলি ইঞ্জিনিয়ার এর সাথে মালয় যাত্রা। সেখানে বাত গুজা টিন মাইনিং এ অয়েল মেন হিসাবে কাজ করেন।
২. ১১ নভেম্বর ১৯১৮ – সেপ্টেম্বর ১৯১৯ (?)
- ১২/১১/১৯১৮ – চাকুরি হিসেব রক্ষক ও এক (১) মাস এই সময়ের মধ্যে জাহাজে চাকুরী।
- ১১/১১/ ১৯১৮ – সিংগাপুরের পথে যাত্রা।
- ১২/১১/১৯১৮ থেকে ৫/৬ মাস উনি বোর্ডিংয়ে হিসেব রক্ষকের কাজে লিপ্ত। মালিক মীর মছদ্দর আলি, বাড়ি সিলেটের জলাল পুরের, রুস্তুম পুর ।
জাহাজে চাকুরি
উনার উদ্দেশ্য লন্ডন আমেরিকা। সেই হেতু ” ম্যাট্টারস” জাহাজে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত যাত্রা করে পরবর্তী ঐ দিকের জাহাজ না পেয়ে আবার এক (১) মাসের মধ্যে সিঙ্গাপুর ফেরত।
৩. সেপ্টেম্বর ১৯১৮ – ০৪ নভেম্বর ১৯১৯
জাহাজের চাকুরি- আমারিকার পথে যাত্রা
একই বৎসর আমেরিকাগামী ব্রিটিশ ‘নান্রিক’ জাহাজে ফায়ার মেনের কাজ নিয়ে দুই মাস যাত্রা শেষে ০৪/১১/১৯১৯ ইংরেজিতে উনার জাহাজ আমেরিকার, নিউইয়র্ক এর ব্রুকলিন ডকে।
৪. ০৪ নভেম্বর ১৯১৯ – ১৭ নভেম্বর ১৯২৪
আমেরিকায় বসবাস ও চাকুরি।
জনাব আইয়ুব আলি উনার বন্ধু মুছন আলি সাহেবকে নিয়ে ১ম বারের মত ১৭/০১/১৯২৪ বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বাড়িতে গিয়ে ১ম বিয়ে করেন।
১৪/০১/১৯২৫ আমেরিকার পথে আবার যাত্রা। ১৬/০৪/১৯২৫ জাহাজ নিউইয়র্ক পৌছাল।
উনি বাড়ি থেকে আমেরিকা পৌছার সময়ের মধ্যে এক পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে উনার স্ত্রী মারা যান।
৫. ১৬ এপ্রিল ১৯২৫ – ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩২
ঐ বছরগুলি তিনি আমেরিকায় কর্ম জীবন পার করছিলেন।
১৭/১২/১৯৩৩ তারিখে ‘সিটি অফ কেনবেরা‘ জাহাজ যোগে তিনি বাড়ি মুখী যাত্রা শুরু করেন ২য় বারের মত। ২৪/০১/১৯৩৩ সিলেট পৌছান। ১৯৩৩ সালের প্রথম দিকে আবার ২য় বিয়ে করেন এবং ১৯৩৮ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দেশে ঘর সংসার করেন। তাই উনার জীবন বৃত্তান্ত থেকে লন্ডনে উনার দ্বারা একশ বছর আগে আসা বা রেস্টুরেন্ট খুলা যেন সত্যের অপলাপ মনে হচ্ছে।
পুস্তিকার তত্ত্ব মতে, আইয়ুব আলি সাহেব জাহজের চাকুরি নিয়ে ১৯৩৮ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডন আসেন এবং বালাগঞ্জের বল্লভপুরের সোয়াব উল্লা সাহেবের ঘরে উঠেন। তারপর প্রথম চাকুরি নেন পিকাডেলির হিন্ধুস্থান নামক রেস্টুরেন্টে।
তাহলে উনি কিভাবে ১৯১৯ এ লন্ডনে আসলেন আর ঐ বৎসর ব্যবসা শুরু করেন?
মিঃ রুহুল হোসেন যে দাবি করেছেন, আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেব উনার দাদা, সেটা আমার রিসার্চ এর সাথে মিল খুজে পাচ্ছি না। আরো একটু পরিস্কারভাবে বোঝার সুবিধার্তে নিচে আইয়ুব আলি সাহেবের পরিবারের বিবরণ তুলে ধরা হলো:
আইয়ুব আলি ও ১ম স্ত্রীর একমাত্র সন্তান- আছুব মিয়া ওরফে আসাফুল হক।
আইয়ুব আলি সাহেবের ১ম পক্ষের ছেলে (আছুব মিয়া ওরফে আসাফুল হক) থেকে ৯ নাতি – নাতনি:- ( ১. বজলু ২. নার্গিস ৩. এনাম ৪. শেলি ৫. শামিম ৬. শাহিন ৭. খালেদ ৮. শাহেদ, ৯. আবিদ)
আইয়ুব আলি ও ২য় স্ত্রীর ছেলে- আহবাব মিয়া (আহবাব হোসেন) ও মেয়ে সিদ্দেকা বেগম।
উনার ২য় পক্ষের ছেলে (আহবাব মিয়া) থেকে নাতি-নাতনি ৪ জন:- ( ১. নজমুল ২. মকবুল ৩. জেবুনেছা ৪. বদরুনেছা) এবং মেয়ের পক্ষ থেকে নাতি-নাতনি ৩ জন-(১. নাজ ২. জাকির ৩. সাদি)
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এখানে রুহুল সাহেবের দাবি অনুযায়ী, লিথিত দলিল হিসেবে প্রকাশিত বই খুজে উনার পিতা মোফাজ্জল সাহেবের নাম খুজে পাওয়া যায় নি বা উনার কোনো উপস্থিতি দেখা যায় নি। যাক সেটা রুহুল সাহেবের ব্যাপার, কিন্তু বাংলাদেশী কমিউনিটির গর্ব আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের সাথে কোথায় যেন একটা বেমানান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
মোদ্দাকথা, আইয়ুব আলি মাস্টার সাহেবের এই বিলেতে আগমন অক্টোবর ১৯৩৮ এর আগে নয়। তাই ইতিহাসের সন তারিখের ব্যর্থতায় আমাদের এই গর্বিত পুরুষের বিলেতের ইতিহাস ভবিষ্যতে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে পড়ে কি না সেই শঙ্কা থেকে যায়।
তাই যারা এই বিলেতে বসবাসরত বাংলাদেশী সমাজের গর্বিত অংশীদার তারা যে যার অবস্থান থেকে যেন এই বিষয়টা গুরুত্ত্বের সাথে দেখবেন। সুপ্রিয় পাঠকদের উদ্যেশে আমার এই দীর্ঘ লেখাটি এই আর্থিই রাখে।
লিখিত দলিলাদির তত্ত্ব সুত্র:
১. প্রবাসীর কথা, নুরুল ইসলাম।
২. Accross the Seven Seas and thirteen rivers, edited by Caroline Adams.
৩. জনাব এনামুল হক, পারিবারিক সুত্র (পিতা- আসুফুল হক, দাদা- আইয়ুব আলি মাস্টার)।
লেখক: মোহাম্মদ ছালিকুর রহমান, এডভোকেট, ২নং বার, জজ কোর্ট সিলেট, M.S.S (D.U), LLM. (U.E), LONDON)। বর্তমানে বিলেত প্রবাসী।

