আধুনিক বাবা হবার মন্ত্র – রোদেলা নীলা


মুঠোফোন কানে ঠেকিয়ে প্রশ্নটা করেই বসি – ” অফিস শেষ করে তুই কোথায় ফিরবি? ” ওপাশে থাকা পুরুষ বন্ধুটি একটু হকচকিত হয় ; কিন্তু খুব বেশি সময় নেয় না উত্তর করতে -” কেন বাসায় ফিরবো “।

আমি অনেকটা শান্ত গলায় আবার জানতে চাইলাম –
” কেন বন্ধুদের আড্ডায় যাবি না? ”
এমন প্রশ্ন সবির কখনোই আশা করেনি। বেশ অবাক হয়ে উত্তর দিল –
” সারাদিন কাজ করে আবার বন্ধুদের সাথে গল্প করবো কীরে, বৌ বাচ্চাদের সময় দিতে হবে না? ”
– ‘কেন তুইতো ইউরোপে থাকিস, ওইখানে কাজ শেষ করে সব ছেলেরাই কি বাসায় ফিরে ; কতো রকমের বন্ধু আছে – ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধু ; তাদের কাছে সময় দিতে যায়। কারন ওদের কাছে গেলে কোন স্ট্রেস নাই, বৌ- বাচ্চা মানেইতো ঝামেলা! ”

– ” কী সব কথা বলিস ; যারা অমন উন্নত দেশে থাকে তারাতো কাজ করে সময়ি পায় না, বৌ জামাই সবাই বাইরে কাজ করে। বাকি সময় যা পায় পুরোটাই দেয় ফ্যামিলিকে, আর বন্ধুদের সাথে সময় কাটায় পরিবারের সবাই এক সাথে হয়ে । আলাদা করে কাওকে বাড়তি সময় দেবার মতো সময় কারো হাতে নেই। ”

আমি আবার জানতে চাইলাম, ” এইযে বাংলাদেশে ওলিতে গলিতে এতো বিবাহিত পুরুষ অফিস থেকে ফিরে সরাসরি বাসায় না গিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা চা – সিগারেট টানে , তোমার কি মনে হয় তারা সুখী দম্পতি নয় ; ঘরের প্রতি তাদের টান কমে গেছে?

একেতো ঢাকার রাস্তায় অসহ্য ট্রাফিক জ্যাম, এলাকায় ফিরতেই রাত ৯ টা ; তারপরো তারা বাইরে সময় দিচ্ছে, তোমার কি মনে হয় না ওদের বৌরা ঘরে বসে ফেসবুক চালাচ্ছে অথবা জি- বাংলা নিয়ে ব্যস্ত। আর বাচ্চারা আছে ইন্টারনেটে ভিডিও গেমস নিয়ে।”

এবার আমার বন্ধুটির প্রশ্ন – ” তাহলে ওদের বৌরাও ঘুরতে চলে যাবে বন্ধুদের সাথে.. ”

এবার আমি ওকে থামাই, -” আচ্ছা ধরে নিলাম কারো বৌ সন্ধ্যা ৭ টায় তার বান্ধবীর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গেল ; তার খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত ১২ টা। ওই সময় যদি বাচ্চাদের কাছে খুব বিশ্বস্ত কেও না থাকে তাহলেতো বৌটি কোথাও যেতে পারবে না। কারন বাংলাদেশের বেশিরভাগ স্বামী এই ভরা সন্ধ্যায় বৌদের বাইরে যেতে দিতে অনিরাপদ বোধ করেন এবং বৌয়ের বান্ধবীর বাড়িতে নিজে যেতেও চান না। সেক্ষেত্রে দু’টো পথ খোলা থাকে,

১। বৌ’টি সন্ধ্যার পর বন্ধুদের সাথে বাইরে না যাওয়া
২। যদি যেতে চান তবে বাচ্চাদের আগে তৈরি করা এবং স্বামীকে বলে দেওয়া অফিস থেকে ফেরার সময় নিয়ে আসতে।

এখন বাস্তবতা হচ্ছে, স্বামীর অফিস থেকে ফেরার সময় এবং বাচ্চাদের অনিরাপত্তা জনিত কারনে অধিকাংশ বৌ’দের তেমন কোথাও যাওয়াই হয় না। যেটুকু হয় তা হচ্ছে সকাল বেলা বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে ভাবিদের সাথে আড্ডা, পার্লার এবং শপিং।

বিষয়টা নারীবাদির সুর ধরে বলছি না ; বলছি বিয়ের পর একটি মেয়ের স্বপ্ন – আনন্দ – ইচ্ছে কীভাবে বিসর্জিত হয় তারি গল্প। এই মেয়েটাই একদিন ক্যাম্পাসের ক্যাফেটেরিয়াতে টেবিল চাপকাতে চাপকাতে বলেছিল, ” বিয়ের পর আমার জামাইরে দেখিস, আমারে ছাডা সে কিছুই বুঝবে না ; আমি হবো তার ফার্স্ট প্রায়রিটি ।

কিন্তু বিয়ের পর সে জানলো ফার্স্টতো অনেক দূরে তার মেইল ইগোগ্রন্থ স্বামী তাকে ধারাবাহিকভাবে কিছু দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন।

১। বিয়ের পর চাকরি করবার দরকার নেই
২। শাশুড়ির সাথে কোন ভাবেই তর্কে যাওয়া যাবে না
৩। সন্ধ্যার পর বাইরে যাবার খুব প্রয়োজন নেই
৪। কাপড় পরিধানের সময় হিজাব বা বোরখা পড়তে হবে
৫। রাত যতোই হোক স্বামীর কলিগ বা বন্ধুরা বাড়ি এলে টেবিল সাজানো চাই

এই হলো মাত্র ৫ টি মূল শর্ত, এর বাইরে অদেখা অনেক শর্ত আছে যা বাংলাদেশের মেয়েদের শুধু দেশে নয়, আমেরিকাতে – ইংল্যান্ডে বসেও মানতে হয়।

ঢেকি স্বর্গে গেলে ধান ভানে, এই কথাটি যেমন সত্য ; মেয়েরা পারিবার নামক একটি প্রতিষ্ঠিত কারখানার বেতনবিহীন পার্মানেন্ট কর্মচারী এটাও সত্য।

শর্ত কিন্তু মেয়েরাও দেয় -” শাড়ি দিবা, গয়না দিবা, লক্ষ লক্ষ টাকা দিবা, ইত্যাদি ইত্যাদি.. ” এর বাইরে কোন মেয়ে যদি স্বামীকে চাপ প্রয়োগ করে তাহলে সেই ইন্ডাস্ট্রি (!!) ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

তাই বাংলার মধ্যবিত্ত কন্যারা জাহাজটাকে ভাসিয়ে রাখবার জন্য কান্ডারীর ভূমিকা পালন করেন তা তিনি যতো বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ডিগ্রীই নেন না কেন !
এখন আমাদের পুরুষতান্ত্রিক স্বামীরা সেই মেয়েগুলোর বিসর্জনকে যদি দূর্বলতা ভাবেন তবে ভুল করবেন।

বেশিরভাগ ছেলেরা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন, তাদের মায়েরা ঘরের কাজ করেন আর বাবা অফিস থেকে ফিরে চায়ে চুমুক দিয়ে বাইরে চলে যান। এই দৃশ্যের বাইরেও আরো সুন্দর দৃশ্য আছে ; এই দেশের বাবারা বাচ্চাদের নিয়ে পার্কে ঘুরতে বের হন, তাদের সাথে ভিডিও গেমস খেলেন, তাদের নিয়ে অফিস ট্যুরে যান,পড়তে বসান।

যেদেশে এতো মায়ায় ভরা বাবা আছেন তাদের কাছ থেকে নিশ্চই ছেলে শিশুরা শিখবে – ” ঠিক কী কাজটা করলে মেয়েদের সন্মান দেখানো হয় । ”

আমরা দেখেছি মেয়েরা বাবা ঘেষা হলেও ফলো করে মা’দের, তার মতো করে লিপস্টিক লাগায়- শাড়ি পড়ে আর ছেলেরা বাবাদের মতো করে টাই বাঁধে, জুতো পড়ে।

তাই প্রতিটি বাবা তার সন্তানের কাছে একজন আদর্শ বাবা হতে পারেন, শুধুমাত্র কিছু ছোট খাটো বিষয়ের মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দেওয়া যে তিনি কতোটা সন্মান করছেন তার স্ত্রীকে।

ব্যস, এইটুকুইতো ! শাড়ি – গহনা- চুড়িতো অনেক হয়েছে, পয়সা হলেই ওসব কিনে দেওয়া যায় । কিন্তু আপনার ঘরের বৌ’টি, ঘরের বোনটি, আপনার মেয়ে সন্তানটি আপনার কাছ থেকে কী সঠিক যত্ন পাচ্ছে? একটু ভেবে দেখুন না প্লিজ…

, , ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *