মায়ের মত নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর কে দিবে? মা বাবা ছাড়া দুনিয়ার সব সম্পর্কই হয় শর্ত যুক্ত অথবা দেনা পাওনা সম্পর্কিত।
এমন একজন মা যে সন্তান প্রসব থেকে শুরু করে লালন পালন করে স্কুল থেকে কলেজের বারান্দায় পর্যন্ত পৌছানোর যে সময়টা , সেই কথা নিয়ে আজকের এ লিখা। দুনিয়ার সব মায়ের এক স্বপ্ন থাকে কিভাবে তার নবজাতক শিশুকে একজন মানুষ হিসাবে বড় করবে। যে কোন পরিস্তিতিতে সন্তানের প্রতি সর্বদা নজর রাখেন এক মাত্র একজন, তিনি হচ্ছেন মা।
একজন মা, তার সন্তানকে লালন পালন করতে কোন ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না।। সন্তান লালন পালন একজন মায়ের এমন একটা সহজাত গুন যা কেবল মাত্র একজন মা বা নারীর ই থাকে।

পাঠশালার জীবনের কথা বলতে গেলে বলতে হচ্ছে, স্কুল থেকে বাড়িতে আসা মাত্র বই খাতা ছুঁড়ে ফেলে এক দৌড়ে কড়া রৌদ্রের মধ্যে লাফ দিয়ে পুকুরে পরে গোসল করা এবং সাতার কাটতে কাটতে চোখ এক সময় হয়ে যেত রক্তের মতো টক টকে লাল।
ভাতের হাড়ি থেকে এক মুঠো ভাত হাতে নিয়ে বড়শীতে গেঁথে ছিপ ফেলে পুকুরের পাড়ে বসে থাকা । মাছ বড়শিতে ধরা পরুক আর না পরুক। রাত্রে পড়ার টেবিলে বসে ঘুম আসলে কথা নাই কিছু উত্তম মধ্যম। তখন মা বলতেন দিনের বেলায় হিসাব থাকে না দুষ্টামি করতে।
পাঠশালার জীবন শেষ করে গভর্মেন্ট পাইলট স্কুলে ভর্তি হই। কিন্তু সেখানে গিয়েও দুষ্টুমির অন্ত ছিলনা। যার কারণে ট্রান্সফার নিয়ে এইডেড হাই স্কুলে ভর্তি হতে হলো। মেট্রিক দুই বারে পাশ করা হলো। মায়ের অনেক আশা ভেঙ্গে দিলাম।
যদি ও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মেট্রিক পাস সেকেন্ড ডিভিশনে। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কোন কিছু হতে পারবো না। তাই সেচ্ছায় কলা (মানবিক) বিভাগে ভর্তি হলাম। তাও আবার অতিরিক্ত যুক্তিবিদ্যা সাবজেক্ট নিলাম। শেষ পর্যন্ত ভাল রেজাল্ট সহকারে পাস করা হলো।
খুব ছোট থাকতে বাজার করতে হতো আমাকে। যেহেতু বাবাকে হারিয়েছি ১৯৭৮ সালে। অনেক সময় মা বাজারের ফর্দ (লিস্ট) লিখে দিতেন। ভুল বশত লিস্টে পান না লিখলে ও পান নিয়ে আসতাম। ঘরে বাজার থেকে আসার পর উনি মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, বাবা আমি তো পান নিয়ে আসার জন্য লিখতে ভুলে গেছি! আমি বলতাম আম্মা আপনি না লিখলেও পান নিয়ে এসেছি। কারণ আমি আপনার পানের কথা কখনো ভুলতে পারবো না। আপনি আমাকে ছোট বেলায় সময় মতো মুখে দুধ দিতে ভুলতেন না। তাই আমি ও আপনার পান আনতে ভুলি কেমনে!
কখনো কোন কুটুম বাড়িতে গেলে রিকুয়েস্ট করতেন আমাকে যেন মুরগির বুকের মাংশ দেয়া হয়। ঘরে যখন খেতে বসতাম বড় মাছের মাথা খাওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করতাম। ভাই বোন আটজনের মধ্যে অগ্রাধিকার আমার থাকতো। কিন্তু বড় বোন রুবি আপা(বুবু) আম্মাকে বলতেন “ওকে কল্লা বেশি খেতে দিলে বেশি কল্লা দরাজি (তর্কও) করবে। কারণ উনি ও মাছের মাথা খেতে পছন্দ করতেন। শেষ পর্যন্ত পালাবদল করে মাথা খেতে দিতেন।
কলেজে পড়ার সময় বড় বোন রুবি আপা (বুবু) উনার হাতের তৈরী কারুকার্যে ভরা পকেট রুমাল উপহার দিলেন। আম্মা ৮৫ সালে রোগে আক্রান্ত হলে ভর্তি করা হয় সিলেট মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে। একদিন বৃষ্টির মধ্যে ৫০ শি শি হোন্ডা দিয়ে আম্মার খানা নিয়ে যাচ্ছি,মধু সহিদ মাজারের পাশে গেলে রাস্থা পানিতে ভরা একটা গর্তের মধ্যে হোনাডার চাকা পরে গেলে দুর্ঘটনা ঘটে।
দুর্ঘটনায় বাম হাতে আর ডান পায়ে (রাস্তার ছোট পাথরে) গর্ত হয়ে যায়। পথচারী রিক্সা দিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তখন জরুরী বিভাগে কর্তব্যরত ডাক্তার ছিলেন এনাম ভাই (FB ID Enamul Chowdhury)। উনি দেখে আশ্চর্য্য হয়ে ঘটনা জেনে নিলেন। এনাম ভাইকে জানতাম ছাত্র ইউনিয়ন করার সুবাদে।
শরীরের এই অবস্থা নিয়ে কেবিনে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ইমার্জেন্সি রুমের ওয়ার্ড বয় এর কাছে বোনের দেয়া রুমাল দিয়ে কেবিনে পাঠিয়ে দেই। শিখিয়ে দেই বলতে যে দারোয়ান আমাকে উপরে যেতে দিচ্ছে না। বোন যেন নিচে এসে আম্মার খাবার নিয়ে যান। যাই হোক উনি এসে আমাকে ইমার্জেন্সি রুমের শুয়ে থাকতে দেখে উনার চোখে জল নেমে আসে।
বোন আমাকে ইমার্জেন্সি রুমে দেখে হতবাক। উনাকে বলে দিলাম আম্মা যেন না জানেন আমার দুর্ঘটনার খবর।
চিকিৎসার সময় আমার আম্মার শরীরে রক্তের প্রয়োজন হলো। ভাই বোনের রক্তের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেল শুধু আমার আর বুবুর রক্তের গ্রুপ মিলে গেছে। সবার চিন্তা হলো যে বোনের রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের পার্সেন্টেজ কম থাকবে। তাই আমাকে বলা হল আমি যেন আম্মার জন্য রক্ত দিয়ে দেই।
আমি তো মহা আনন্দে যেহেতু যে মায়ের রক্তে গড়া আমার শরীর আর সেই মাকে আমি আজ উনার চিকিৎসার জন্য রক্ত দিতে পারছি । ব্লাড ব্যাংকের শুয়ে আছি আর দেখা গেল মিনিট দশের মধ্যে এক ব্যাগ রক্তে ভরে গেল। আম্মা জিজ্ঞেস করেছিলেন রক্ত কে দিলো। উনাকে জানানো হয়নি কারণ দুশ্চিন্তা করবেন। তাই বলা হলো আমার ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা রক্ত দিয়েছে।
১৯৮৫ সাল থেকে জীবন যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেক ডলার-পাউন্ড কামিয়েছি। কিন্তু সৌভাগ্য হয় নাই যে আম্মাকে একটা কাপড় বা কোন কিছু উপহার দেওয়ার। ১৯৮৫ সালের আগস্ট মাসে উনি দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেলেন। এখন জীবন চলার পথে প্রত্যেকটা মুহূর্তে বারবার মনে হয় আম্মার সাথে স্মৃতি জড়িত অনেক কথা। সেই স্নেহ, ভালবাসা,আদর এখন ও ভাবলে আবেগাক্রান্ত হয়ে পরি। মায়ের মত নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর কে দিবে? মা বাবা ছাড়া দুনিয়ার সব সম্পর্কই হয় শর্ত যুক্ত অথবা দেনা পাওনা সম্পর্কিত।
