সম্প্রতি আলজাজিরা টেলিভিশনে বাংলাদেশের উপর নির্মিত ডকুমেন্টারি সম্পর্কে ভিন্ন মহল সঠিক তথ্য না জেনে অযৌক্তিক তর্কে লিপ্ত হচ্ছেন এবং এ বিষয় নিয়ে দেশে ও বহিঃ বিশ্বে প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। যারা সঠিক তথ্য না জেনে তথ্য বিভ্রাট ঘটিয়ে সাধারন মানুষ কে বিভ্রান্ত করছেন। তাদের জন্য আমার এই প্রতিবেদন।
আপনারা কি জানেন সোদি আরব ও আরব আমিরাত কী কারণে ‘আল জাজিরা’ চ্যানেল বন্ধ করার জন্য কাতার অবরোধ করেছিল ? সৌদি আরব ও আরব আমিরাত যে কারণে কাতারের উপর অবরোধ আরোপ করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম কারণ ছিল আল জাজিরা টেলিভিশন। সৌদি-আমিরাত বলয়ের দাবি ছিল, আল জাজিরা টেলিভিশন বন্ধ করে দিতে হবে। তবে বর্তমানে সৌদি-আমিরাত বলয় সেই দাবি থেকে সরে এসে কাতারের উপর থেকে সমস্ত অবরোধ প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে, আল জাজিরা প্রতিষ্ঠার পেছনে কাতারকে প্রত্যক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে খোদ সৌদি আরব!
৯০ এর দশকে সৌদি আরব একটি আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন আরবি নিউজ চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করতে চাইল। সে লক্ষ্যে সৌদি আরব ব্রিটিশ মিডিয়া বিবিসির সাথে একটি চুক্তি সম্পন্ন করল, যে বিবিসি তাদের কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ দিবে।
চুক্তি অনুসারে বিবিসি সৌদি আরবের সেই চ্যানেলটির টেকনিশিয়ানদের প্রশিক্ষণ দেয়। আর এই টেকনিশিয়ানদের মধ্যে অধিকাংশরাই ছিলেন আরব ফিলিস্তিনি। টেলিভিশনটির সিইও হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় একজন ব্রিটিশ নাগরিককে। সেই ব্রিটিশ নাগরিক দায়িত্ব নেওয়ার পূর্বে বাদশাহকে দুটি শর্ত দেন। প্রথম শর্তটি হল, সৌদি রাজপরিবার এই টেলিভিশনের উপর কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ চালাতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, এই টেলিভিশনটাকে কোনো ভাবে রাজপরিবারের মুখপাত্র বানানো যাবে না। সৌদি রাজ পরিবার তার শর্ত মেনে নেয় এবং টেলিভিশনের (চ্যানেলটির নাম এই মুহুর্তে স্মরণ করতে পারছি না) আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
কিন্তু কার্যক্রম শুরু হওয়ার মাস তিনেকের মধ্যেই রাজপরিবার শর্ত ভঙ্গ করল। তারা এই চ্যানেলটিকে রাজপরিবারের মুখপাত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করল। ফলাফলস্বরূপ, সেই ব্রিটিশ সিইও, সমস্ত কর্মকর্তা ও টেকনিশিয়ানরা একযোগে পদত্যাগ করল। আর এই সুযোগটাই গ্রহণ করলেন কাতারের আমির শেখ হামাদ বিন খালিফা আল থানি।
কাতারের আমির হামাদ আল থানি সেই ব্রিটিশ সিইওসহ সমস্ত টেকনিশিয়ানকে কাতারে আমন্ত্রণ জানালেন। তারপর ১৩৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করে আল জাজিরা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেন।
আল জাজিরা প্রতিষ্ঠার সময়েও সেই ব্রিটিশ সিইও একই শর্ত জুড়ে দেন। কাতারের আমির সেই শর্ত মেনে নেন এবং সংবিধানে আইন করে আল জাজিরার উপর কোনো ধরণের প্রভাব খাটানো বা নিয়ন্ত্রণ করবার ক্ষমতা রহিত করেন। যার প্রমাণস্বরূপ ২০০১ সালে আল জাজিরা ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার প্রচার করলে, আমেরিকা ভীষণ চটে যায়। ফলাফলস্বরূপ, আমেরিকা আল জাজিরা বন্ধ করার প্রস্তাব জানায়। কিন্তু কাতার সাংবিধানিক কারণ দেখিয়ে আমেরিকার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আল জাজিরা স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশ করে যাচ্ছে। আল জাজিরা তার কার্যক্রম দিয়ে বার বার প্রমাণ দিয়েছে, তারা সত্য ও সুন্দরের পক্ষে। আর এই সত্য প্রকাশ করতে গিয়ে আল জাজিরা বারবার স্বৈরাচারদের রোষানলে পড়েছে। মিশরের স্বৈরশাসক সিসির কারাগারে আল জাজিরার তিন সাংবাদিক আজও কারারুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
আল জাজিরার বিরুদ্ধে সারাবিশ্বের স্বৈরাচারদের অপপ্রচার স্বত্বেও এটি আরবদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নিউজ চ্যানেল। এই জনপ্রিয়তা এখন আরবগন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এই জনপ্রিয়তা এখন সারা বিশ্বে।
লেখক: আবুবকর ফয়েজী সুমন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here