এমসি কলেজের শত বছরের গৌরবগাথা গত এক দশকে একাধিক ঘটনায় কালিমালিপ্ত হলো। ২০১২ সালে কলেজের ছাত্রাবাস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় ৪২টি কক্ষ ছাই হয়ে যায়। সেই আগুনে সেদিন ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাস পোড়েনি; সিলেটের মানুষের অন্তর পোড়ে।

ওই বছর ৮ জুলাই ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের জের ধরে ছাত্রাবাসের কক্ষগুলোতে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। কক্ষের দরজা-জানালা, টিনের ছাউনি ও চৌকাঠ পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আসাম প্যাটার্নের স্থাপত্যরীতিতে তৈরি কলেজ ছাত্রাবাসের পুড়ে যাওয়া ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তখনকার শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ চোখের জল ফেলেছিলেন। পোড়া ভবন দেখতে এসে সরকারের তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন।
দুই মন্ত্রী কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তাদের গৌরবময় শিক্ষা জীবনের নানা স্মৃতি ছড়িয়ে আছে কলেজ চত্বরে। প্রভাবশালী মন্ত্রীদের চোখের জল ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া, সিলেটের মানুষের অন্তরের দহন এবং ছাত্রাবাস পোড়ানোর ন্যক্কারজনক ঘটনায় দেশজুড়ে ওঠা নিন্দার ঝড়েও তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। দুস্কৃতকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
সিলেটের মানুষ ছাত্রাবাস পোড়ানোর ঘটনায় সেদিন তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। সর্বমহলে দাবি উঠেছিল অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কঠোর সাজা দেওয়ার। যদিও বিচারিক আইনে কঠোরভাবে সাজা দেওয়ার আলাদা কোনো বিধান নেই। প্রতিটি অপরাধের একটি সর্বোচ্চ সাজা রয়েছে।

অভিজ্ঞরা দোষীদের সর্বোচ্চ সাজা চেয়েছেন, পাশাপাশি দাবি তুলেছেন দুর্বৃত্তদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের খুঁজে বের করার। এদের হাত থেকে এমসি কলেজকে রক্ষা করা জরুরি দাবি ছিল। কিন্তু দুর্বৃত্তদের সাজা তো হয়নি বরঞ্চ এমসি কলেজে তারা পাকাপোক্তভাবে আসন গাড়ে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় কলেজের আশপাশ এলাকায় এরা নির্বিচারে চাদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জায়গা দখল ও ছিনতাই করেছে।
এদের বিরুদ্ধে হত্যা ও নারী নিপীড়নের গোপন অভিযোগ রয়েছে। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সম্পর্কে সবাই ওয়াকিবহাল কিন্তু লাগাম টেনে ধরার মতো অভিভাবক সিলেটের রাজনীতিতে নেই। তাই দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো ঐতিহ্যবাহী ছাত্রাবাসটি পুড়িয়ে দেওয়ার পরেও দুর্বৃত্তদের দমন করা হয়নি। বরঞ্চ পুড়ে যাওয়া ভবন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ কাজে এই দুর্বৃত্তদের পকেট মোটাতাজা করা হয়েছে।
২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্নির্মিত ছাত্রাবাস উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রাবাস ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এককভাবে ছাত্রাবাস ছাত্রলীগের আস্তানা হয়। তাদের দাপটে সাধারণ ছাত্ররা তটস্থ থাকে। তারা আবাসিক অন্যান্য ছাত্রের বসবাস নিজেদের মর্জিমাফিক নিয়ন্ত্রণ করত।
যদিও এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। সিলেটে জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিও কেন্দ্র থেকে স্থগিত রয়েছে। এই কমিটি না থাকার অন্যতম কারণ ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ করছে দুর্বৃত্তরা আর এই দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ করছে ক্ষমতাসীন দলের কিছু মাফিয়া।
আমরা ছাত্রাবাস পোড়ানোর জন্য যারা দায়ী তাদের শাস্তি দেওয়া তো দূরের বিষয়, তাদের রাজনীতিতে আরও সামনে যাওয়ার পথ করে দিয়েছি বা দিচ্ছি। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা যারা ঘটিয়েছে তাদের নাম সামনে এসেছে। তাদের ছবিও সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। অধিকাংশকে ইতোমধ্যে ধরে ফেলা হয়েছে। সবাইকেই হয়তো ধরে ফেলা হবে।
আদালতে নেওয়া হবে। রিমান্ডে নেওয়া হবে। মামলা চলবে। ধীরেও চলতে পারে। আবার মামলা দ্রুত চলার ব্যবস্থাও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই ধর্ষকরাই কি আসল দোষী? এদের এমন বেপরোয়া কে বানাল? ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষকদের শিক্ষাগুরু কারা?
আগুনের পোড়া গায়ে ধর্ষণের ক্ষতচিহ্ন খোঁজার মতো এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে লাভ হবে না। জবাব পাওয়াও যাবে না। আর জবাব পাওয়া গেলেও কাকে শোনাব? শোনার কেউ নেই।
আব্দুল করিম কিম
পরিবেশ কর্মী ও নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক

