করোনা দিনের লেখা ।?
যে জীবন মানুষের ১????????????
আমার শহর
তবু বৈশাখ প্রিয় বৈশাখ???
আমাদের জেলা শহর তখন রাজধানীর সাথে পাল্লা দিয়ে চলা একটি শহর। সেই শৈশবে দেখেছি সকাল সাড়ে আটটার ফ্লাইটে ঢাকা থেকে সব জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সিলেটে এসে হাজির। শহর থেকে এয়ারপোর্ট বেশী দূরে নয় বলে সাত সকালে হকারদের ঘরে ঘরে খবরের কাগজ পৌঁছে দেয়া সারা ।
সুরমার তীরে জেগে ওঠা শহরের বাড়ীতে বাড়িতে তখন ফুল ফোটানোর খেলা। হিন্দু বাড়ীতে পূজোর অর্ঘ্য ফুল ।ঝুমকো জবা , লাল টুকটুকে রক্ত জবা আলো ছড়ায়। সে ফুলের দিকে চোখ পড়লেই নজরুল কে মনে পড়ে যায় ।’ বলরে জবা বল / কেমন করে পেলিরে তুই মায়ের চরণ তল ।”

জুঁই, চামেলী, বেলী, টগর, বকুল, রজনীগন্ধা আর হলুদ গাঁদা ফুলের পাপঁড়ি সূর্যের দিকে ভালবাসার আঁখি মেলে রাখে ।গানের শহর প্রানের শহরে ঘরে ঘরে হিন্দু মেয়েরা গান শেখে। নাচ শেখে। আধুনিক মুসলমান পরিবারের মেয়েরা ও পিছিয়ে থাকেনা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির আলোকের ঝরণা ধারায় রবীন্দ্র, নজরুল, সুকান্ত নিয়ে অনুষ্ঠান হয় । নাচে, গানে, আবৃতি, নাটকে মুগ্ধ হয় শ্রোতা দর্শক। রথের মেলায় রথ টানে সোনালী রূপালী পোষাক পরা পরীর মতো ফুটফুটে মনিপুরী মেয়েরা ।
চা বাগানের শ্রমিক নারীরা গোড়ালীর একটু উপরে রং বেরং এর শাড়ী, পায়ে রূপার খাড়ু, নুপুর, গলায় হাঁসুলী পরে মেলাকে রাঙ্গিয়ে তোলে । খোঁপায় গোঁজা টকটকে রক্ত জবায় তাদের কালো বরন রূপকে আলোর প্রজাপতি মনে হয়। আমরা আমাদের ছোট চুলের পনিটেলকে কোন মতে পেঁছিয়ে খোঁপার মতো করে রক্ত জবা গুঁজে দেই। তখনো শিখিনি,” খোপার মতো কোন ফুল দানী হয়না।” শুধু জানি আমাদের বোনদের রক্তজবা টানে ।
আমরা শ্রমিক নারির রূপে আকুল । আরো কত আকুলতা পিছু ছাড়েনা ।স্কুলের অনূষ্ঠানে মেয়েরা কাঠগোলাপের মালা গলায় দিয়ে নাচে,” শুকনো পাতার নুপুর পায়ে নয়ত মোমের ও পুতুল মোমের দেশের মেয়ে “। ‘আমরা বাড়ীতে সেজে গুজে ভুল মুদ্রায় নাচি, তা তা থইথই । গলায় কাঠগোলাপের মালা । আহারে আমাদের স্কুলের রূপবতী মেয়েরা । বালিকা কিশোরী হয় । লম্বা কেশে স্কুলের নির্ধারিত ফিতের ফুল, সাদা পোষাকেও কি অপুর্ব ।
ঠোঁটে রং নেই, চোখে হাতে বানানো কাজল রেখা। চিরুনীর তিন দাঁত মাপে কাজল লাগিয়ে চোখের কোনে টেনে দেয়া । কপালে ম্যাচের কাঠির বারুদে কাজল লাগিয়ে ছোট্ট টিপের ছোঁয়া । ভুরুতে কক্ষনো নেই কালো পেন্সিল বা কাজলের টান । সিলেটের বাইরে থেকে আসা ছাত্রীরা মুগ্ধ সুরে বলে, এই শহরের মেয়ে গুলো এতো সুন্দর কেন।

সেই শহরেই কিনা তখন বৈশাখী মেলার আয়োজন নেই। নববর্ষ হয় হাল খাতায় । সেতো কেবল লাল সূতোতে মোড়ানো ব্যবসায়ীদের নতুন খাতার উৎসব ।দোকানে দোকানে ব্যবসায়ীরা মিষ্টি রাখেন । সেই মিষ্টির ভাগ নেয় পুরষরা ।মেয়েরা জানতে ও পারেনা সেটা কেমন আনন্দ । আমরা কিছুটা টের পাই কোন কোন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী যখন আব্বার নামে মিষ্টির প্যাকেট পাঠিয়ে দেন ।
বাড়ীতে বাড়ীতে কোন উৎসব আমেজ সৃষ্টি হয়না । হিন্দু পরিবারে ,তিতা , শাকপাতা , নিরামিষ হয়তো রান্না হতো । আমার শিক্ষিকা আম্মা এলোপ্যাথি ,হোমিওপ্যাথি , কবিরাজী সব নিয়ে বেশ উতসাহী ।সুতরাং চৈত্র শেষের খাবার হিসেবে বাসায় ফুল গাছের আড়ালে আবডালে বেড়ে ওঠা নানা প্রকার শাক আর নিতান্ত নিজস্ব মনোভঙ্গির কারণে বছরের প্রথম দিন মাংস রান্না করতেন ।
মনিপুরী মহিলার কাছ থেকে বিভিন্ন মাপের কদমা ,আমরা বলি তিলু , তিলের নাড়ু , , তিলের চাক্তি কিনে দিতেন ।সংগে থাকতো ভোলা গঞ্জের পাতলা বড় সাইজের চিড়া ।মহিলারা এগুলো বাসায় এনে বিক্রি করতেন । কচি আম থেতো করে টিউব ওয়েলের ঠান্ডা পানি দিয়ে সরবত , নয়তো আম দুফালি করে চিনির সিরায় জ্বাল দিয়ে মোরব্বা বানাতেন ।মুকুল থেকে একটু গা ছাড়া কচি আমের ঘ্রাণ মন উতল করে দিতো ।

তবে চৈত্র সংক্রান্তিতে ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম পড়তো ।আমাদের শহরের লোকজন , ছেলেরা প্রচুর ঘুড়ি ওড়াতেন । মাঞ্জা দেয়া , নাটাইতে সুতো পেছানো নিয়ে খুব হই চই হতো ।ভাইদের সংগে কাঁচ গুড়ো করা ,রং মাখানো ,সূতো আঠালো করার কাজ করলেও নাটাই হাতে পাইনি কোনদিন ।ঘুড়িটাকে দু’ হাতে ধরে উড়িয়ে দেয়া যাকে আমরা ঝারাঙ্গি বলি , তারা আমাকে দিয়ে দিব্বি করিয়ে নিতো ।
৮০ র দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে প্রথম বৈশাখী মেলার সাথে পরিচয় ।রোকেয়া হল থেকে বাংলা একাডেমিতে চলে যাওয়া । তখনো এতো ভিড় ভাট্টা নেই । হাল্কা পাতলা মেলা প্রাঙ্গণ। তখন থেকে আমার জন্ম শহরেও মেলার শুরু । মেয়েরা প্রজাপতির মতো রক্ষনশীলতার বেড়া ডিঙ্গিয়ে আনন্দ কুড়নো শিখলো । তারপর তো ইতিহাস । মেলার আনন্দ শহর , নগর ছাড়িয়ে গ্রামের হাটে মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে ।
এবার মেলার মাঠ নেই । এবার করোনার জালের ভেতর আটকে গেছে বৈশাখী মেলা ।কিন্তু মনের মাঠতো উতল হাওয়ার সুর ভোলেনি । আগামী বৈশাখে আমরা বাঁশীর সুর শুনবো ।”ওগো দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো।”
