গোলাম মোস্তফা চৌধুরী – ম আ মোশতাক


প্রবীণ রাজনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী গোলাম মোস্তফা চৌধুরী ম্যানচেস্টার তথা নর্থ ওয়েস্ট ইংল্যান্ডের অত্যন্ত  সুপরিচিত ব্যক্তি । তার পিতার নাম আলহাজ্ব শামসুল আলম চৌধুরী । তিনি ১৯৪৬ সালে নবীগঞ্জ থানার অন্তর্গত বদবদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ।

তিনি প্রথম বদবদী প্রাইমারি স্কুলে, পরবর্তীতে নবীগঞ্জ জে, কে হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত, হবিগঞ্জ হাই স্কুলে নবম ও দশম শ্রেণীর সমাপনী করার পর মৌলভীবাজার সরকারি হাই স্কুল থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশ নেন  ১৯৬৩ সালে।

পরীক্ষার ফলাফল বাহির হওয়ার পূর্বেই ১৯৬৩ সালের ২৭শে নভেম্বর বিলেত চলে আসেন। তার বাবা কৃষি কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। তাছাড়া ছোটখাটো ব্যবসা ছিল। তা দিয়েই তার বাবার পরিবার অনায়াসে খরচাপাতি চালিয়ে যেতেন।

তিনি বলেন, তখনকার দিনে শিক্ষাব্যবস্থা ভালো ছিল । ১৯৬৩ সালে সর্বপ্রথম আঠারো মাসে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ।  তিনি আরো বলেন, আগেকার দিনে স্কুলগুলোর পাঠ্যসূচিতে যেমন বাংলা, ইংরেজি, অংক আবশ্যিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল ।

কিন্তু পরবর্তীকালে ইংরেজি বিষয়কে অপশনাল বিষয় হিসেবে পরিবর্তিত করা হয় । আগেকার দিনে লেখাপড়ার মান উন্নত ছিল । তিনি বলেন পূর্বের একজন এসএসসি পাশ লোকের শিক্ষাগত মান বর্তমান বিয়ে বা এমএ সমতুল্য হবে ।

তিনি বিলেতে কিভাবে আসলেন এর জবাবে তিনি বলেন, তার ভাই রব্বানী চৌধুরী তার জন্য লেভার ভাউচারের ব্যবস্থা করেন । তার দাদা ছিলেন পরিবারের কর্তা ব্যক্তি এবং তিনি তার দুই নাতিন এর যাতায়াত খরছের পুরো অর্থ প্রদান করেন ।

বিলেতে আসার সময় তেমন কোনো লক্ষ্য ছিল না, যেহেতু তার বড় ভাই তাকে নিয়ে আসতেছেন তাই তিনি অনেকটা নিশ্চিত হয়ে তাঁর হাত ধরেই বিলেতে আগমন করেন । তখন তার বয়স প্রায় ১৮ বছর ছিল ।

তিনি ও তাঁর বড় ভাই লন্ডন হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণের পর ট্যাক্সি যোগে ওয়েস্ট লন্ডনের গুড প্লেইস আসেন । এখানে তার বড় ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয় থাকতেন । যে বাড়িতে এসে প্রথম বসবাস শুরু করেন।

সেখানে প্রায় ১৪টি থাকার রোম ছিলো । কিছু লোক সকালে ঘুমাতো আর কিছু লোক রাতে নিদ্রা যাপন করতো । তারপর তার বড় ভাইয়ের চাচাশ্বশুর তাদেরকে সাউথ-অন-সিতে নিয়ে যান ।

সেখান থেকে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন । তার বড় ভাইয়ের চাচা শ্বশুরের নাম ছিল গোলাম মোস্তফা রাজা মিয়া । তিনি তাকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য লন্ডনে স্থানীয় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করে দেন।

তিনি পার্ট টাইম হিসাবে এক বছর সেখানে অধ্যয়ন করে চলাফেরার জন্য যেসব ভাষা শিক্ষার প্রয়োজন তা তিনি শিখে নেন । তিনি স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে প্রথম তিন চার মাস কিচেন পোর্টার হিসেবে ও পরে কমি অয়েইটার ও ম্যানেজার পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে নিজ তত্ত্বাবধানে ব্যবসা শুরু করেন।

যখন তিনি কিচেন পোর্টারের কাজ করেন তখন তার সাপ্তাহিক বেতন ছিল ৪ পাউন্ড ৫০ পেনি। তিনি যথাক্রমে এলাহাবাদ, তন্দুর মহল ও বোম্বে রেস্টুরেন্টে কাজ করেন । লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে তিনি কমিটির নেতৃবৃন্দ যেমন তাসাদ্দুক আহমেদ, গউস খান এবং মিনহাজ উদ্দিন প্রমুখের সান্নিধ্য লাভ করেন।

১৯৬৫ সালে ইন্ডিয়া পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হলে, কমিউনিটি নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের জন্য তহবিল সংগ্রহ করেন । তখনকার সময় তাসাদ্দুক আহমেদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সমিতি গঠন করা হয় এবং তাসাদ্দুক আহমেদ সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন ।

এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন সংগঠনের জন্য তহবিল সংগ্রহ করে যাচ্ছেন । তিনি বলেন, পূর্ব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি সমাজকর্মে একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন ।

১৯৭৩ সালের নভেম্বর মাসে তিনি সর্বপ্রথম ব্যবসা শুরু করেন যা আজ অবধি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তিনবার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে । সর্বপ্রথম ব্যবসার নাম ছিল “মমতাজ রেস্টুরেন্ট” এরপর “কারী কুইন” এবং বর্তমানে “সওদাগর রেস্টুরেন্ট” নামে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন ।

১৯৭৩ থেকে ২০১১ দীর্ঘ ৩৮ বছর তিনি সফলভাবে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। তিনি একজন সফল ব্যবসায়ী বলা চলে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৬৭ সালের যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়ানো হয়, তখন ১৯৬৮/৬৯ সালে তাদেরই উদ্যোগে থেকে আইনজীবী পাঠানো হয়।

তাদেরই প্রচেষ্টায় শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি লাভ করেন এবং তাদের সাথে সাক্ষাত করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান বিলেত (লন্ডন) আসেন। তিনি আরো বলেন ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ছয়দফার আন্দোলনের ডাক দেয় তখন থেকেই তিনি ছয় দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ।

১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান যখন লন্ডনে আসেন তখন তিনি দলের পক্ষ থেকে একটি লিমুজিন গাড়ি নিয়ে হোটেলে যান। হোটেলে যাওয়ার পর তার সাথে সাক্ষাৎ হয় । তিনি যখন রুমের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বসে আছেন, তখন তিনি একটি প্রশ্ন করেছিলেন, যে মামা আপনারা যখন জেলে যান তখন কি সাধারণ বন্দীদের মতো আপনাদের সাথে ব্যবহার করা হয় কিনা।

এর উত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, আমি কোন জেলের কথা বলব, কারন আমি তো সারাজীবন জেলেই কেটেছি ।

গোলাম মোস্তফা চৌধুরী শেখ মুজিবুর রহমানকে মামা সম্বোধন কেন করেছিলেন এর জবাবে তিনি বলেন গউস খানকে তিনি মামা ডাকতেন এবং গউস খান শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন ।

তিনি ১৯৬৯ সালে লন্ডন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১২ আসন বিশিষ্ট একটি গাড়ি শেখ মুজিবুর রহমানকে উপহার দেওয়া হয়েছিল । তিনি এই গাড়িটি তার পাসপোর্টে এনডোর্স করে দেশে নিয়ে যান ।

তিনি বলেন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তখন ছিল ৫২ নবাবপুর রোড, ঢাকা । সেখানে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাত করার পর, শেখ মুজিব তাঁর দলের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা গোলাম সরোয়ার সাংগঠনিক সম্পাদক কে নির্দেশ দেন এই মর্মে যে, তুমি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী কে নিয়ে চট্টগ্রাম যাও এবং সেখান থেকে তুমি গাড়িটি ছাড়িয়ে নিয়ে আসো ।

পরের দিন তিনি গোলাম সরোয়ার কে সাথে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে গাড়ি নিয়ে এসে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করেন । একই সাথে লন্ডন আওয়ামী লীগ ফরিদ গাজীর নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ১০,০০০ টাকা হস্তান্তর করেন ।

১৯৭১ সালের ২৩শে মার্চ তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু দেশের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য বিবাহ অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন করতে দেরি হয় । ঐদিনই তিনি একটি টেলিগ্রাম পেয়ে ঢাকা চলে যান ।

প্রথমে তিনি পার্টি অফিসে যান । সেখানে মাত্র ৪-৫ জন লোক তারাও সবাই এই অবস্থা দেখে তাকে নিয়ে সোনারগাঁও হোটেলে যান । ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ যুদ্ধ শুরু হয় । সবাই নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নেন । ঐসময় তিনি ইসমত চৌধুরী ও ফরিদ গাজীর সাথে সাক্ষাৎ হয় । তখন তাদের পরামর্শ ক্রমে তিনি বাড়ির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন ।

ঐসময় যুদ্ধ চলছিল তাই বাড়িতে পৌঁছাতে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায় । বাড়িতে পৌঁছার পর বিনা আনুষ্ঠানিকতায় তিনি নববিবাহিতা স্ত্রীকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। তার এক আত্বীয় হবিগঞ্জ জেলার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ।

তার নিকট থেকে তিনি একটি পত্র পান। এই পত্রে উল্লেখ ছিল “তুমি এই পত্রটি পাওয়া মাত্র বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র একটি নিরাপদ জায়গায় চলে যেও”। ঐসময় তাদের বাড়িতে ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা আলী আমজাদ (মৌলভীবাজার), আব্দুস সালাম ও সুরত মিয়া (হবিগঞ্জ)।

তারপর তিনি তাদেরকে নিয়ে বাড়ি ত্যাগ করে নিরাপদ জায়গায় চলে যান । এক পর্যায়ে তিনি অন্য কোন উপায় না পেয়ে বিলেত চলে আসেন । তখন ১৯৭১ সালের জুন মাস হবে । একই সালে আগস্ট মাসে তিনি অন্যান্যদের সাথে বিমানযোগে ফ্রান্স যান এবং সেখানে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন, যাতে পাকিস্তানকে কোন অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদান না করা হয়।

তিনি ১৯৭৩ সালের মানচেষ্টার গেটলী এলাকায় আব্দুল মতিন ও আনিস উল্লাহকে পার্টনার করে মাত্র ১৮ হাজার পাউন্ড দিয়ে রেস্টুরেন্ট ব্যবসা শুরু করেন । ১৯৯৪ সাল থেকে তিনি কর্মবিরতি হিসাবে অবসর জীবনে পদার্পণ করেন ।

তার পার্টনার দুজনই মৃত্যুবরণ করেছেন বিধায় তাদের ছেলেরা এই ব্যবসা পরিচালনার সাথে জড়িত। ১৯৭৪ সালে তিনি দেশে চলে যান এবং সেখানে দীর্ঘ ৬ বছর অবস্থানের পর ১৯৮০ সালে আবার বিলেত ফিরে আসেন

১৯৮০ সালে ফিরে আসার পর ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন । ১৯৮৫ সালে যখন গ্রেটার ম্যানচেস্টার বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন তিনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসাবে জিএমবি’র সাথে জড়িত হন । অন্যদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল মতিন, এম এম বক্স, কবির আহমেদ সহ আরো অনেক।

তারই ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১০ জন পার্টনার নিয়ে ঢাকায় উসমানী হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন । হোটেল করার নেপথ্যে ছিল এক ভিনধর্মী উদ্যোগ, ১০ জন পার্টনার প্রতি সপ্তাহে ১০ পাউন্ড করে তহবিলে টাকা জমা করতেন এবং পরবর্তীতে তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল হিসাবে ওসমানী হোটেল প্রতিষ্ঠা করা হয় ।

আরোও বলেন জেনারেল এমএজি ওসমানী ১৯৮২ সালে বিলেত সফরে আসলে এই ব্যবসায়ীদের সাথে এক পর্যায়ে দেখা হয় এবং জেনারেল ওসমানী তাদের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন “আমি তোমাদেরকে হোটেল করার জন্য ঢাকায় একটি জায়গা ক্রয় করে দিব, তবে তোমরা সব অর্থ যোগান দিতে হবে” । ঐসময় তারা ওসমানীর হাতে তুলে দেন ।

১৯৮৪ সালে বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী  আবার বিলেত আসলে তার সাথে করে জায়গার দলিল নিয়ে আসেন । ঐসালে বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী মৃত্যুবরণ করেন । ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার ব্যবসায়িক পার্টনার আব্দুল মতিন ও মৃত্যুবরণ করেন ।

এরপর তিনি ম্যানেজিং ডাইরেক্টার হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ক্রয়কৃত জায়গা দখলের জন্য দেশে চলে যান । অনেক সংঘাতের বিনিময়ে জায়গা দখল করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে বিল্ডিং কন্সট্রাকশন এর কাজ শুরু করেন।

১৯৯০ সালের দিকে ৭তলা বিশিষ্ট হোটেলটির কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হন । ১৯৯০ সালের ২৫শে মার্চ হোটেলটি উদ্বোধন করা হয় । বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ এই হোটেলটির উদ্বোধনের কথা থাকলেও ব্যস্ততার কারণে ভাইস প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ হোটেলটির শুভ উদ্বোধন করেন ।

ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী । উল্লেখ্য এই হোটেলটি “প্রবাসী হোটেল” করার কথা থাকলেও বঙ্গবীর ওসমানীর অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি প্রবাসী হোটেল নামকরণ না করে ওসমানী হোটেল করেন ।

১৯৬৭ ও ১৯৬৯ সালে সিলেট টিবি হাসপাতালের ডাক্তার আমিন উদ্দিন  বিলতে তহবিল সংগ্রহের জন্য আসলে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনেক অর্থ সংগ্রহ করে দেন ।

১৯৮০ সালে তিনি মাঞ্চেশটারস্থ শাহজালাল মসজিদের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত হন। ১৯৮২ সালে তিনি সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন । তারপর তিনি পর্যায়ক্রমে সাধারণ সম্পাদক, ভাইস চেয়ারম্যান ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন ।

১৯৯৮ ও ২০০০ সালে দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবার পর শাহজালাল মসজিদের প্রকৃত উন্নয়ন হয় । তারই নেতৃত্বে প্রায় ৮০০ হাজার পাউন্ড খরচ করে মসজিদের উন্নয়ন কাজ শুরু হয় যা আজ অবধি অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে মসজিদের মূল কাজ সম্পন্ন হয়েছে । বর্তমান কমিটি মসজিদের অন্যান্য কাজ যেমন হল রুমের উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে ।

১৯৮৫ সালে তার বাইপাস সার্জারি হওয়ার পর তিনি যখন হাসপাতাল থেকে বাহির হলেন, তখন তিনি ভাবলেন আমি তো কয়েক ঘন্টা দুনিয়াতে ছিলাম না, যদি অপারেশন চলাকালীন সময়ে আমি মরে যেতাম তাহলে আমার ছেলেমেয়েরা এতিম হয়ে যেত ।  তখন তাদের কি হতো ?

এই দুনিয়ায় যারা আছে তারা কিভাবে চলছে ? এই ভাবনা থেকেই ঠিক করলেন এতিমদের জন্য কিছু করবেন । ঘরে ফিরেই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেন দেশের বাড়িতে তিনি একটি এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করবেন ।

প্রায় ৩০০ ডেসিম্যাল জায়গা নিয়ে তিনি “দাইমুদ্দীন এতিমখানা ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা” প্রতিষ্ঠা করেন । তাঁরই উদ্যোগে তার বাবা-চাচার সম্পত্তিতে সবার সর্বসম্মতিক্রমে প্রথমে জায়গার কাগজপত্র ঠিক করেন ।

১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে এতিমখানা চালু করা হয় । এই এতিমখানা পরিচালনার জন্য তিনি আরোও ২০ কেয়ার (প্রায় ৬০০ ডেসিম্যাল) ধানী জমি রয়েছে, খালি জায়গায় অনেক গাছপালা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিক্রয় করে অর্থ উপার্জিত হবে ।

তাছাড়া ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট একাউন্ট খোলা হয়েছে । এই অ্যাকাউন্ট থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এতিমখানা ও মাদ্রাসা পরিচালনা করা হচ্ছে । এছাড়াও তিনি ওল্ডহ্যামে একটি ইসলামিক শিক্ষা কেন্দ্র মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে যথেষ্ট অবদান রয়েছে ।

তিনি দুই ছেলে ও তিন মেয়ের জনক সবাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত । ১৯৮৪ সালে প্রথম হার্ট অ্যাটাক হওয়ার পর কিছু কিছু কাজ করলেও ১৯৯৬ সাল থেকে তিনি ডাক্তারের পরামর্শ ক্রমে কাজ থেকে কর্মবিরতি গ্রহণ করেন ।

এছাড়াও তিনি ম্যানচেস্টার রুসুম এলাকায় ৫০ জন ব্যাবসায়ীকে নিয়ে “বাংলাদেশ ক্যাশ এন্ড ক্যারি” নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন । পাঁচ বছর পর দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হলে,  ক্যাশ এন্ড ক্যারি বিক্রি করে ফেলেন ।

তিনি অবসর সময় তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে ও সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত থেকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে থাকেন ।  তিনি বলেন এদেশে না আসলে বেশি হলে ডিগ্রী অর্জন করতে পারতেন এবং ভালোভাবে কোন চাকরি হয়তো পেতেন না ।

কিন্তু বিলেত আসার ফলে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ উপার্জন ও বিভিন্ন সমাজকল্যাণ মূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সমর্থ হয়েছেন । বর্তমানে তার জন্মভূমি হবিগঞ্জ শহরে একটি ডায়াবেটিক হাসপাতাল স্থাপন করতে যাচ্ছেন । এর জন্য প্রায় ৪ কোটি টাকা খরচ করে তিন তলা বিশিষ্ট একটি ভবন তৈরি করেছেন ।

তিনি বলেন ডায়াবেটিক হাসপাতালে পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরিকল্পনা ও তাদের রয়েছে । তিনি আরো বলেন এতিমখানা স্থাপনের পূর্বে তার গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না । তারই উদ্যোগে সর্বপ্রথম বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চালু করা হয় । এতে গ্রামবাসী সবাই উপকৃত হয়েছে ।

তিনি আরও বলেন বাংলাদেশী কমিউনিটি সামগ্রিকভাবে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছেন। তিনি বলেন কমিউনিটির বিরাট অংশ তাদের ছেলে মেয়ে লেখাপড়া করে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার সহ অনেক পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশী কমিউনিটির অর্জিত সাফল্য বলা চলে ।

তার বড় ছেলে এয়ারক্রাফট ডিজাইনার হিসেবে একটি স্কেচ অনুমোদনের অপেক্ষায় । দ্বিতীয় ছেলে হিমালয়ের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহন করেছে । এগুলো তাদের সাফল্য ।

কারী ব্যবসা সম্পর্কে তিনি মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা থাকার কারণে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভালো করতেছে না, কিন্তু সামগ্রিকভাবে কারী ব্যবসা বিলেতের অর্থনীতিতে এক ভালো অবস্থানে রয়েছে ।

তিনি আরো বলেন, আমাদের ছেলেরাও এগিয়ে আসছে এই কারী ব্যবসাকে আঁকড়ে ধরার জন্য। তারাও আমাদের আমাদের মতো আপ্রাণ চেষ্টা করে এই ব্যবসাকে আরো সাফল্যের দিকে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী ।

তিনি তার দুই ছেলেকে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় জড়িত হতে উৎসাহিত করেন নাই । তিনি বাংলাদেশী কমিউনিটির সবাইকে সমাজকল্যাণ মূলক কর্মকাণ্ডের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান । বিশেষ করে গ্রামে-গঞ্জে তাদের নিজ নিজ এলাকায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সহ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ জানান ।

এছাড়াও তিনি নব প্রজন্মকে রাজনীতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করার জন্য সবিনয় আহ্বান জানান।

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *