প্রতিরাতের মতো দুঃস্বপ্ন দেখে আজও মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল রাহেলার।সাথে সাথে উঠে অযু করে,তাহাজ্জুদ নামাজ পড়লেন।ফজরের ওয়াক্ত হলে নামাজ সেরে তেলাওয়াতে বসলেন।অনেক কান্নাকাটি করে ছেলের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর দরবারে মিনতি জানালেন।
হিজলতলী গ্রামের প্রাক্তন পোষ্টমাষ্টার বরকতউল্লাহ সাহেবের স্ত্রী রাহেলা খানম।দুই সন্তান নিয়ে বাস করেন।স্বামী বিয়োগের পনের বছর গত হলো।অল্প বয়সে বিধবা হয়েও স্বামীর ভিটে আঁকড়ে ধরে আছেন।ছেলে মেয়ে দুটোকে কষ্ট করে মানুষ করেছেন।স্বামীর পেনশনের টাকা দিয়ে সংসার চলেনা,নিজে সেলাইয়ের কাজ করে বাড়তি কিছু আয়ের চেষ্টা করেন।

বড়ছেলে ডিগ্রি পাশ করে বিভিন্ন অফিসে একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে চলছে,কিন্তু চাকুরী মিলছে না।তার না আছে ঘুষের টাকা,না আছে মামা।মায়ের কষ্টে ছেলেটির মনে ব্যথা লাগে।একদিন এক বন্ধুর মারফত জানতে পারলো,কয়েক লক্ষ টাকা দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার একটা সুযোগ আছে।ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একসাথে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
অভি কথাটা মাকে এসে বললো।রাহেলা খানম কথাটা শুনেই বললেন,বাবা বিদেশ যাওয়ার দরকার নাই।আমার কলিজার টুকরাকে আমি চোখের আড়াল করতে চাইনা।তাছাড়া দালালের মারফতে বিদেশ যাওয়াটা কতটুকু নিরাপদ?আমার মনে সায় দিচ্ছেনা।অভি মাকে বুঝিয়ে বললো,মাগো বিদেশ না গিয়ে কি করবো?
অনেক তো চেষ্টা করলাম,দেশে চাকুরী পেলামনা।আর কতদিন বসে থাকবো?তুমি আর কত কষ্ট করবে?এদিকে বোনটাও বড় হচ্ছে,ওকেও বিয়ে দিতে হবে।ছেলের কথা মা ফেলতে পারলেন না,আসলেইতো কথাগুলো যুক্তিসংগত।

তারপর কিছু সঞ্চিত টাকা আর কিছু ধার দেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর ব্যবস্হা হলো।নির্দিষ্ট দিনে গ্রামের কয়েকজন বন্ধুর সাথে অভি ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো।
অবৈধ অবস্হায় বিদেশ যাওয়া যে কত দুঃসাধ্য।যারা এ পথে পা বাড়িয়েছে,তারা জানে।দালালেরা প্রথমে এ কষ্টের কথা কাউকে বলেনা।একদম সহজ বলে যাত্রীদের আগ্রহী করে তুলে। তারপর যখন যাত্রা শুরু হয় তখন টের পাওয়া যায়।

এক দেশ থেকে আরেক দেশ হয়ে,কখনো আকাশ পথে, কখনো জলপথে,কখনো পাহাড় অতিক্রম করে পায়ে হেটে রোদ,বৃষ্টি উপেক্ষা করে,অনাহারে,অর্ধাহারে কেউ হয়তো কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে,আবার কেউ কষ্ট সহিতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কথায় বলে সন্তানের বিপদের খবর কেউ না জানালেও,সেটা মায়ের কানে পৌছে যায়।আর তাই প্রতিরাতে রাহেলা খানম স্বপ্নে দেখেন,নৌকা ডুবি হয়ে অভি মারা গেছে।তার সেই স্বপ্ন আসলেই বাস্তব।ইউরোপ যাওয়ার পথে সঙ্গী সাথী সহ অভিদের জাহাজ ডুবে যায়।
সাথের ২/১ জন কোনরকমে বেঁচে গেলেও অভি সহ আরো কয়েকজনের লাশ পাওয়া গেছে।এই খবর গ্রামের অনেকেই জানলেও রাহেলা খানমের কাছে কেউ দিতে পারছেনা।অথচ রাহেলা খানম প্রতিদিন ছেলের নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাচ্ছেন।
যুক্তরাজ্য প্রবাসী
