আজ পঁচিশে মার্চ। গতকাল ব্যস্ততায় লেখা হয়নি। ঘুম থেকে উঠে বুকের বাম পাশে আবারও ব্যথা অনুভব করলাম।অবশ্য তার আগের রাতে খুব ব্যথা করছিলো

সকাল আনুমানিক সাড়ে আটটায় হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানোর জন্য মোবাইলে ফোন দিলাম(উনি আমার সব সময়কার ডাক্তার)। হার্ট স্পেশালিস্ট ডাক্তারের এটেনডেণ্ড ওপার থেকে বললো ডাক্তার আমেরিকায় আছেন। উনার পরিবর্তে একজন ডাক্তার দিয়ে গেছেন চাইলে উনাকে দেখাতে পারি।বললাম ঠিক আছে। ওপার থেকে বলা হলো সন্ধ্যা ছটায় আসবেন। সিরিয়েল নম্বর ছয়।

হঠাৎ মনে হলো তিন বছর আগের স্মৃতি। সাথে সাথে গা শিউরে উঠলো! স্মৃতিতে ভেসে উঠলো এক করুন কষ্টকর অভিজ্ঞতা। যা মনে হলে মনের ভেতর কেনো জানি মোচড়ে উঠে! আজ ও মোচড় দিয়ে উঠলো। এ ডাক্তার (হার্ট স্পেশালিস্ট) তিন বছর আগে আমেরিকায় থাকা অবস্থায় একজন ডাক্তারকে দিয়ে গিয়েছিলেন উনার চেম্বারে দায়িত্ব পালনের জন্য।

উনাকে দেখানোর পর আমার মায়ের যে কি কষ্ট হয়েছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আগের ডাক্তারের চিকিৎসার সব উল্টো। পরে সাথে সাথে অন্য ডাক্তার দেখালাম। মার তো কষ্ট হলোই। আমার মতে আমার মা পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্ট সহিষ্ণু মা। আমার মার মতে যদি অসুস্থ বলি তবে আমার বাচ্চাদের টাকা খরচ হবে।অতএব যত পারো সহ্য করো। বাচ্চাদের টাকা থাক।সম্ভবত দুনিয়ার সব মা-ই এ রকম। আমাদের ডাক্তার পাল্টানোতে টাকা শ্রম কষ্ট উৎকণ্ঠা আর মার শরীরের উপর দিয়ে যে কি দখল গেছে তা বর্ণনাতীত!

আমি এক মিনিট পর আবার ফোন দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ডাক্তার সাহেব কবে গেছেন।ওপাশ বলা হলো প্রায় একমাস আগে। জিজ্ঞেস করলাম আসবেন কবে ওপার থেকে বলা হলো ঠিক নেই করনা রোগের জন্য আটকে গেছেন। কবে আসবেন ঠিক বলতে পারছি না। জিজ্ঞেস করলো সিরিয়েল নাম্বার রাখবে কিনা। বললাম রাখেন।

মোবাইল রেখেই ফোন দিলাম আমাদের গোলাপগঞ্জ হাসপাতালের পাশে ফার্মেসির একজন ব্যবসায়ীকে। জিজ্ঞেস করলাম আমাদের স্থানীয় হাসপাতালে কোন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন কিনা। উনি বললেন নেই।

বললাম,আচ্ছা আমাদের এলাকার একজন হার্ট স্পেশালিস্ট আছেন উনার নাম্বারটা আছে কি না। বললেন উনি বর্তমানে আমেরিকায় আছেন। কি করি কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। উনি আমাকে বলে দিলেন আপনি গুগলে সিলেটের হার্ট স্পেশালিস্ট লেখে সার্চ দিলে সব ডাক্তারের ফোন নাম্বার ও মোবাইল নম্বর সহ সিরিয়েল যারা দেয় তাদের নাম্বার ও পাবেন। সার্চ দিয়ে পেয়েও গেলাম।

মনে মনে ভাবলাম আমাদের বাড়ির কাছের তো কবির আছে সিলেটে ইবনে সোনা হাসপাতালে ভালো চাকরি করে তাকে ফোন দিয়ে দেখি হার্ট স্পেশালিস্ট ওখানে কে কে আছেন। ওকে বললাম আজকে দেখাবো। ও বললো চাচা, একটু লাইনে থাকেন আমাদের তো দুজন হার্ট স্পেশালিস্ট আছেন। এবং খুবই ভালো। পরে বললো উনারা আজ চেম্বারে বসবেন না। মানে? বুঝতে পারলাম করনা আতংক!

গুগলে সার্চ করে পাওয়া ডাক্তারদের মধ্যে প্রথমে দিলাম আমার মতে সবচেয়ে ভালো ও সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের এক সময়ের হৃদরোগ বিভাগের প্রধানকে বেশ কয়েকবার ফোন দেয়ার পর কোন সাড়া শব্দ পেলাম না। বিফল মনোরথ হয়ে দিলাম আর ও একজনকে বেশ কয়েকবার। ফল একই!

পরে চিন্তা করলাম ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন শাহী ঈদগাহ-এ ফোন দেই। দিলাম বেশ কয়েকবার। কিন্তু কেউ ধরে না। এটার পাশে তালতো ভাইয়ের ফার্মেসী আছে উনাকে ফোন দিলাম।বললাম ভাই, সমস্যায় পড়েছি আমার বুকের বাম পাশে ব্যথা করছে আজকে হার্টের ডাক্তার কে কে আছেন। বললেন একটু লাইনে থাকেন আমি জেনে দিচ্ছি। আচ্ছা ঠিক আছে। উত্তর আসল আজকে উনারা করনার জন্য হাসপাতাল ক্লোজ করে দিয়েছেন!
আচ্ছা ভাই।
আমার তো কষ্ট আর উৎকণ্ঠার শেষ নেই!

ভাবলাম আমার মনে হয় চিকিৎসা হবে না!

পরে রাগিব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে কাজ করেন আমার এক বন্ধুকে মোবাইলে বললাম উনাদের ওখানে এক নাম করা হার্ট স্পেশালিস্টকে কিভাবে দেখাতে পারি। বললেন রোগী ভর্তি হলে দেখেন। না হয় দেখেন না।বললাম উনার মোবাইল নাম্বারটা দেন। দিলেন। মোবাইলে ফোন দিলাম ওপাশ থেকে উত্তর পেলাম এটা না। অন্য নাম্বারে ফোন দেন। বললাম ভাই নাম্বারটা কি দেয়া যাবে। দিলেন। ফোন দিলাম। ফোন ধরে বললাম অমুক স্পেশালিস্টের চেম্বার। ভাই স্যার আছেন? না নাই? আছেন।

জিজ্ঞেস করলাম আজ কি রোগী দেখবেন? ওপাশ থেকে উত্তর পেলাম দেখতে ও পারেন না দেখতে ও পারেন। এটেনডেণ্ট ওপাশ হন থেকে আমাকে বললেন আপনি সাড়ে তিনটায় ফোন দেন। ভাই একটা সিরিয়েল দেন। না না ভাই এখন না। আপনি বরং চলে আসেন।আমি তখন শহরেই। চিন্তা করলাম যদি ডাক্তার চেম্বারে সাড়ে তিনটায় না আসেন।বেশ কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করলাম ব্যাপার কি! সবাই বললেন করনার জন্য ডাক্তাররা চেম্বার করছেন না।

চিন্তায় আমার বুকের বাম পাশের ব্যথা আরও বাড়তে লাগলো! আমি মারাত্মক অসুবিধায় পড়লাম! কি করব খুঁজে পাচ্ছি না! এ দিকে আমার ছোট ভাইয়ের এক বন্ধুকে আনুমানিক এগারোটায় ফোন করে সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়েছিলাম।এবং একটা রিকোয়েস্ট ও করে রেখেছিলাম স্থানীয় একজন ডাক্তারের চেম্বারে যেন আমাকে দেখানোর ব্যবস্থা করেন। উনি করেও ছিলেন।

সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। উনাকে দেখাবো। শহর থেকে ফিরলাম। উনার চেম্বারের সামনে রোগীর খুব ভীড়। এক সময় আমার সিরিয়েল আসলো। ভিতরে ঢুকলাম।বসতে বলে বললেন। বসলাম। বললেন আপনার সব অসুবিধা বলেন।সব বললাম ও আগের ডাক্তারের সব কাগজপত্র ও দেখালাম।

উনি আমার শারীরিক অবস্থা অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেন এবং সময় করে অনেকক্ষণ কথা বললেন।ভালো করে চেক আপের পর বললেন একটা ইসিজি করে নিয়ে আসেন।পরে আমি দেখবো কি হয়েছে।

ইসিজি রিপোর্ট নিয়ে গেলাম।দেখে বললেন আপনার হার্টের অবস্থা ভালো।কিচ্ছু হয়নি আপনার সব ঠিক আছে। এই তো এই তো সব ঠিক! আমি যেন নতুন জীবন পেলাম!

আমাকে আর ও বললেন আমি শহর থেকে আসি মানুষের সাথে ভালোবাসা আছে বলে।আমি প্রতিদিন আসি, মানুষের জন্য আসি।আসব শুধু মানুষের জন্য আসব। এ চরম বিপদের সময় মানুষকে যদি সেবা করতে পারি। তবে সেটাই হবে আমার বড় দায়িত্ব এ চরম বিপদে মানুষ যাবে কোথায়?।

বিপদের সময় যদি মানুষের পাশে দাঁড়াতে না পারি দাঁড়াবো কখন? অনেকে চেম্বার বন্ধ করে দিয়েছেন আমি দেইনি। পারবো ও না। শোনেন আমার টাকা পয়সা সবই আছে। আমি মানুষের ভালোবাসা চাই। এটাই আপনার পাওনা আর কিছু নয়। কোন সমস্যা হলে আমাকে ফোন করবেন।কোন সমস্যা নেই।আমি সব সময় রেসপন্স করব।

মন অজান্তেই বলে উঠলো হায়রে শহর! হায়রে সভ্যতা…!

বার বার মনে অনুরণিত হচ্ছিল ‘দাও ফিরে অরণ্য, লও এ নগর…!’

কলমে: সামছুদ্দোহা ফজল সিদ্দিকী
২৫-০৩-২০২০ সময় রাত ১২:৫৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here