প্রবাস বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম আমেরিকা প্রতিনিধি ইব্রাহীম চৌধুরী :: নভেম্বর মাসটা দ্রুতই কড়া নাড়ছে। পুনর্নির্বাচনের জন্য যেমন মরিয়া প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, হাঁপিয়ে ওঠা লোকজন তেমনি বীতশ্রদ্ধ। অনেকেই মনে করছে, নভেম্বরের নির্বাচনে জয় পাওয়া ট্রাম্পের জন্য কঠিন হয়ে আসছে।

আমেরিকার রাজনীতিতে মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচিত জো বাইডেনের সমর্থন বাড়ছে। করোনাভাইরাস, নাগরিক আন্দোলনসহ আমেরিকার রাজনৈতিক মাঠ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর গত চার বছরের ক্ষমতাকালের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেকায়দা অবস্থায় আছেন বলেই মনে করা হচ্ছে।

একের পর এক ঘটনায় বেশ কাবু হয়ে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্চ মাস থেকে করোনাভাইরাসের আক্রমণে নাকাল হওয়া আমেরিকার অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতাও এখন আলোচনার সামনে চলে এসেছে। মিনিয়াপোলিসে পুলিশের হাতে জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি রীতিমতো নাজুক হয়ে ওঠে। জেগে ওঠা নাগরিক আন্দোলনে ট্রাম্পবিরোধী আওয়াজ পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সমার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের জন্য সুপ্রিম কোর্ট স্বস্তির জায়গা বলে মনে করা হতো। সেখানে রক্ষণশীল বিচারপতিদের প্রাধান্য থাকলেও একের পর এক উদারনৈতিক রায় এখন ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোনীত দুই বিচারকের অনুমোদনেই দুটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত এসেছে সম্প্রতি। গত সপ্তাহে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গদের সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে। মার্কিন আইনে এখন কর্মক্ষেত্রে সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের লোকজনকে কোনো বৈষম্য করা যাবে না। আমেরিকার রক্ষণশীলদের অবস্থানের বিপক্ষে এ রায়কে ঐতিহাসিক বলে মনে করা হচ্ছে।

১৮ জুন বুধবার সুপ্রিম কোর্ট আরেকটি ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ের ‘ডিফার্ড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস’ বা ডাকা কর্মসূচি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

এ ঘোষণায় অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে আমেরিকায় আসা প্রায় সাত লাখ লোকের অভিবাসন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্প প্রশাসনের বিপক্ষে রায় প্রদান করেছেন।

সিনেটে রিপাবলিকান দলের নেতাদের মধ্যেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিরূপ মনোভাব লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। গত বুধবারে রিপাবলিকান দলের সিনেটররা পুলিশ সংস্কারের বিল উপস্থাপন করে মাস্ক পরেই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন। টেনেসি থেকে নির্বাচিত সিনেটর লামার আলেক্সান্ডার উদ্বেগের সঙ্গে করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় দফা আক্রমণ হবে বলে আশঙ্কার কথা জানান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার বলছেন, আমেরিকা দক্ষতার সঙ্গে করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও এখন অর্ধেক আমেরিকাজুড়ে করোনাভাইরাসের আক্রমণ বেড়ে যাওয়ার রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। এ সপ্তাহান্তে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওকলাহোমাতে নির্বাচনী প্রচারে নামছেন। সেখানে সমর্থকদের বিরাট সমাবেশ হবে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির এ সময়ে এমন সমাবেশ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বলে সমালোচনা শুরু হয়েছে এরই মধ্যে।

এদিকে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনও এখন ট্রাম্পের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

হোয়াইট হাউসে থাকাকালীন নানা তথ্য নিয়ে লেখা বইয়ের প্রকাশনার কথা শুনেই ট্রাম্প প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের যেন ঘাম ছুটে যাচ্ছে।

বোল্টনের বইয়ের পাণ্ডুলিপি ফাঁস হওয়ায় তা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসন বিচারেও আলোচনা হয়েছিল। এবার জন বোল্টনের ওই বইয়ের প্রকাশ আটকে দিতে আদালতে মামলা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। জন বোল্টন এখন গণমাধ্যমে তাঁর বইয়ের নানা কথা, রাশিয়া, চীন এমনকি উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে নানা কথা বলে বেড়াচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাবেক এ গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি মনে করেন ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদের জন্য যোগ্য লোক নন।

সিএনএন পরিচালিত সর্বশেষ জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতীয়ভাবে ১৪ পয়েন্টে পিছিয়ে রয়েছেন। আমেরিকার নির্বাচনের জন্য যেসব অঙ্গরাজ্যের ভোটে ট্রাম্পকে অবশ্যই এগিয়ে থাকতে হবে, সেসব অঙ্গরাজ্যেও একইভাবে বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে পড়ছেন ট্রাম্প।

বছরের শুরুতে ইমপিচমেন্ট নিয়ে বিতর্কের সময়ের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একের পর এক দুঃসংবাদই তাড়া করছে। ট্রাম্পের কথায় অবশ্য এসবের কোনো রেশ নেই।

ফক্স নিউজের সেইন হেনরিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজের প্রচারশিবিরে রীতিমতো উদ্দীপনা বিরাজ করছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জো বাইডেনকে ‘স্লিপি বাইডেন’ উল্লেখ করে জনমত জরিপে বাইডেন পিছিয়ে আছেন বলে শুনেছেন বলেও উল্লেখ করেছেন। করোনাভাইরাস নিয়ে কিছু বলতে তাঁর উৎসাহ নেই উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, ভাইরাসের সংক্রমণ কমে আসছে।

অভিবাসন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, যারা নিজেদের রিপাবলিকান বা রক্ষণশীল মনে করেন, তাদের জন্য সুপ্রিম কোর্টের এ সিদ্ধান্ত একটা চপেটাঘাত! বলেছেন, আরও নতুন বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। নভেম্বরের নির্বাচনের আগে বিচারপতি মনোনয়নের জন্য তাঁর কাছে তালিকা দেওয়ার জন্যও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে তিনিটি বিতর্ক হয়ে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। ১৮ জুন ট্রাম্পের প্রচার শিবির থেকে জো বাইডেনের সঙ্গে চারটি বিতর্কে নামার অভিপ্রায়ের কথা জানানো হয়েছে। টিভির সামনে সর্বদা সাবলীল ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বিতর্ক মঞ্চকে প্রাধান্য দেওয়াকেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ভিন্নভাবে দেখছেন।

ইমপিচমেন্টের পর তাঁর সমর্থকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়া শুরু করে। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে আমেরিকার রাজনৈতিক মাঠও দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ট্রাম্পের এক ধরনের গোরা সমর্থকেরা সরে দাঁড়িয়েছে এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। এ সমর্থকেরা অবশ্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে কাউকে পুনর্নির্বাচিত করার জন্য যথেষ্ট নয়।

নির্বাচনের জন্য যেসব অঙ্গরাজ্যের ভোট কখনো রিপাবলিকান, কখনো ডেমোক্র্যাটদের বাক্সে যায়, সেসব সুইং স্টেটের ভোটারেরা এবারেও নির্ধারণী শক্তি হয়ে দাঁড়াবেন। এখনো নির্বাচনের চার মাসের কিছু বেশি দিন বাকি। এরই মধ্যে নিশ্চিত কিছু বলা যাবে না। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে ট্রাম্পকে এখন অনেক বেশি বৈরী পরিস্থিতি অতিক্রম করতে হবে। এমনসব বৈরী পরিস্থিতি মোকাবিলা করে ট্রাম্প দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করবেন—এমন মনে করার লোকও আমেরিকায় বিরল নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here