প্রবাস বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম আমেরিকা প্রতিনিধি শাহ্‌ আহমেদ :: মাত্র কয়েক বছর আগেও আমেরিকার মূলধারার রাজনীতিতে কোনো বাংলাদেশি আমেরিকানের সম্পৃক্ততা, নির্বাচন করা ছিল স্বপ্নের মতো বিষয়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে ধীরে ধীরে বাংলাদেশিরা এগিয়ে যাচ্ছে। ড. নিনা আহমেদ, শেখ রহমানের পথ ধরে এবার কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট, স্টেট সিনেট, অ্যাসেম্বলিতে, কমিটিওম্যান, কাউন্টি লিডারসহ বিভিন্ন পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে (প্রাইমারি) দাপটের সঙ্গে লড়ছেন বাংলাদেশিরা।
কোন কোন এলাকায় একই পদের জন্য লড়ছেন একাধিক স্বদেশি প্রার্থী। কমিউনিটির অনেকে মনে করছেন, কমিউনিটি হিসেবে বাংলাদেশিরা নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক দলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করলে অনেক প্রার্থীরই উতরে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।

উপরের বাঁ দিক থেকে বদরুন নাহার খান,মেরি জোবাইদা,জয় চৌধুরী,ফারজানা চৌধুরী,জামিলা আকতার ও ইশতেহাক চৌধুরীউপরের বাঁ দিক থেকে বদরুন নাহার খান,মেরি জোবাইদা,জয় চৌধুরী,ফারজানা চৌধুরী,জামিলা আকতার ও ইশতেহাক চৌধুরী

ভোটের মাঠে এবার মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন আগামী সাধারণ নির্বাচনে নিউইয়র্ক কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট-১৪–এ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী বদরুন নাহার খান। সেই লক্ষ্যে তিনি কয়েক মাস ধরে চষে বেড়াচ্ছেন তাঁর নির্বাচনী এলাকা। বলছেন, এই আসন থেকে তাঁকে দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করলে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের বাড়ি, কর্মসংস্থান, বেসিক ইনকামসহ ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবেন। এ জন্য ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিসেবে তাঁকে নির্বাচিত করার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।

ডিস্ট্রিক্ট-১৪ থেকে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে মনোনয়ন পেতে মোট চারজন প্রার্থী লড়ছেন। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বদরুন খান ছাড়া অন্য তিন প্রার্থী হলেন এই আসনের বর্তমান কংগ্রেসওমেন আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ, মিশেল ক্রোসিও কাভেরা এবং স্যাম স্ল্যাওন।

আগামী ২৩ জুন অনুষ্ঠিত ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে দলীয় ভোটাররা এই চারজনের মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে। যিনি নির্বাচিত হবেন তিনি আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির হয়ে নিউইয়র্ক কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট-১৪ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। নিউইয়র্কে ডেমোক্রেটিক দলের প্রাইমারিতে জয় মানেই সাধারণ নির্বাচনে জয় পাওয়াটা অনেকটাই নিশ্চিত।

জয় চৌধুরী
নিউইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলিতে ডিস্ট্রিক্ট-৩৪–এ লড়ছেন জয় চৌধুরী। প্রথম প্রজন্মের তরুণ অভিবাসী হিসেবে নিজের অবস্থান মোটামুটি দৃঢ় করেছেন ভিন্ন ভাষা-বর্ণের মানুষের মধ্যেও। এটিই তাঁর সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। জ্যাকসন হাইটস, উডসাইড, ইস্ট এলমহার্স্ট ও করোনা এলাকা নিয়ে গঠিত এই ডিস্ট্রিক্টে ভোটারদের সিংহভাগ হলেন হিসপ্যানিক, নেপালি, চায়নিজ বংশোদ্ভূত। খুবই কমসংখ্যায় রয়েছেন বাংলাদেশি ও ভারতীয়। দীর্ঘদিন নানাভাবে সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার সন্তান জয় চৌধুরীর তৎপরতা ইতিমধ্যেই সবার মধ্যে সাড়া জাগিয়েছে।

জামিলা আকতার উদ্দিন
অন্যদিকে স্টেট অ্যাসেম্বলিতে ডিস্ট্রিক্ট-২৪–এর কমিটিওম্যান পদে মাঠে নেমেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জামিলা আকতার উদ্দিন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বাংলাদেশি, ভারতীয়, জ্যামাইকান, চায়নিজ বংশোদ্ভূত এবং শ্বেতাঙ্গের আধিক্য রয়েছে। ব্রঙ্কসে জন্মগ্রহণকারী শ্রমিক ইউনিয়ন লিডার মাফ মিসবাহ উদ্দিন ও কমিউনিটি অ্যাকটিভিস্ট মাজেদা এ উদ্দিন দম্পতির মেয়ে জামিলা পার্কচেস্টারে ১০৬ পাবলিক স্কুল হয়ে সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের জন জে কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছেন। আরবান প্ল্যানিং নিয়ে এমবিএ করেছেন ব্রুকলিন কলেজ থেকে।

উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পরই ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামার ইয়ুথ কো-অর্ডিনেটর, ২০১৩ সালে সিটি মেয়র নির্বাচনে জন ল্যুর সাউথ এশিয়ান ডিরেক্টর, ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের ফিল্ড ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন জামিলা।

২০১৯ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির নিউইয়র্ক সিটির ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালনকালে সব ভাষা-বর্ণ-গোত্রের মানুষের সঙ্গে চমৎকার একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছে সাংগঠনিকভাবে অভিজ্ঞ জামিলার। তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে কুইন্স কাউন্টি ডেমোক্রেটিক পার্টি। দুবছর মেয়াদি এ পদে জয়ী হতে পারলে জামিলাকে এই স্টেটের দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারণার ব্যয়ভার মনিটরিং করতে হবে। একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক সুসংহত করার পাশাপাশি ডেমোক্রেটিক পার্টির জাতীয় কমিটির মেম্বার বাছাই করতে হবে। এ ছাড়া, দলের পক্ষ থেকে যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থনদানের কাজটিও করতে হবে নিরবচ্ছিন্নভাবে।

মেরি জোবাইদা
অ্যাসেম্বলিওম্যান পদে লড়ছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেরি জোবাইদা। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির জনপ্রিয় মুখ তিনি। অঙ্গরাজ্য সরকারের অ্যাসেম্বলিওম্যান পদে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই আমেরিকান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যাথরিন নোলেন। তিনি নিউইয়র্কের পশ্চিম কুইন্স থেকে দীর্ঘদিনের নির্বাচিত প্রতিনিধি। মেরি জোবাইদা তাঁর প্রার্থিতার মাধ্যমে গত ৩৫ বছর ধরে প্রতিনিধিত্বকারী ক্যাথরিন নোলানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ২০২০ সালে অনুষ্ঠিতব্য ওই নির্বাচনে বিজয়ী হলে মেরি জোবাইদা যাবেন নিউইয়র্কের রাজধানী আলবেনির প্রতিনিধি সভায়। প্রতিনিধিত্ব করবেন নিউইয়র্কের ডিস্ট্রিক্ট-৩৭ এর।

অন্যান্য বাংলাদেশি আমেরিকান প্রার্থী

অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন পদে লড়ছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান প্রার্থী। নিউইয়র্ক অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-২৪ বি (জ্যামাইকা এলাকার একাংশ) থেকে ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রার্থী ইশতেহাক চৌধুরী। প্রযুক্তিবিদ ইশতেহাক চৌধুরীকে সমর্থন জানানো হয়েছে কুইন্সে বরো প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচনে প্রার্থী অ্যান্থনি ম্যারিন্ডার প্রচারণা শিবির থেকে।

এ প্রার্থীর পক্ষে বাংলাদেশি ছাড়াও কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্পানিকদের সমর্থন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গে একই নির্বাচনী এলাকা অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-২৪বি থেকে ফিমেল ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রার্থী ফারজানা চৌধুরী, অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট-৩২–এ থেকে ফিমেল ডিস্ট্রিক্ট লিডার প্রার্থী মোবাশ্বেরা বেগম, ডিস্ট্রিক্ট লিডার পদে অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট–৫৪ থেকে নাফিস আই চৌধুরী, কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট–৫ থেকে সানিয়াত চৌধুরী, অ্যাসেম্বলি ডিস্ট্রিক্ট–২৪ থেকে মাহফুজ ইসলাম, একই ডিস্ট্রিক্ট থেকে ডিস্ট্রিক্ট লিডার পদে মৌমিতা আহমেদ, মাহতাব খান, ডিস্ট্রিক্ট–৩২–এ মোহাম্মদ চৌধুরী, ডিস্ট্রিক্ট–৩৯ থেকে সাঈদা আখতার, ডিস্ট্রিক্ট–২৪ থেকে জুডিশিয়াল ডেলিকেট পদে মোহাম্মদ এম রহমান প্রমুখ নির্বাচনে লড়ছেন।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রাইমারিতে এর এগে এত বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি আর কখনো নির্বাচন করেননি। তবে সমস্যাটি হচ্ছে, কোন কোন নির্বাচনী এলাকায় একাধিক বাংলাদেশি আমেরিকান একই পদে লড়ছেন। ফলে কারও জয়ের সম্ভাবনা থাকলেও একাধিক প্রার্থীর কারণে কমিউনিটির ভোট ভাগ হয়ে যাবে। অনেকেই বলেছেন, কমিউনিটি হিসেবে বাংলাদেশিদের সমন্বয়ের অভাবে এমন হয়েছে।

কোন কোন এলাকায় বাংলাদেশিরা অভিবাসীদের মধ্যে নিজেদের বন্ধু খুঁজে নিয়েছেন প্রার্থী হিসেবে। ডিস্ট্রিক্ট–৩৬–এ অ্যাসেম্বলিম্যান প্রার্থী জহরান মাদানির পক্ষে বাংলাদেশি আমেরিকানদের ব্যাপক প্রচারণায় যোগ দিতে দেখা গেছে। জহরান মাদানি ইষ্ট আফ্রিকান উগান্ডার মুসলিম সম্প্রদায়ে জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়সে সপরিবারে আমেরিকায় আসেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here