পদক বা এওয়ার্ড সমাচার


‘হুজগে বাঙালী’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। অর্থাৎ একটি কাজ কেউ শুরু করলে বা শুরু করার পরিকল্পনা করলে এর ভালমন্দ দিক বিবেচনা না করে অন্যরাও সাথে সাথে এ কাজে উদ্যোগি হয়ে যায়। এর ফলে সামগ্রিক পরিকল্পনাটি বিতর্কের জন্ম দেয়।

অনেক সময় ভাল কাজ হলেও সেটার হয়ে যায় অপমৃত্যু বা সেটি হয়ে যায় কালিমালিপ্ত। যেহেতু আমরা এদেশে যারা বসবাস করি তারা সে সমাজেরই অংশ তাই আমরাও এ হুজুগের বশবর্তী হয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কাজে এমনভাবে করি যা শেষ পর্যন্ত উপহাসে পরিণত হয়ে পড়ে। যেমন ইদানিং পদক দেয়া-নেয়া এমনভাবে শুরু হয়েছে যাতে মনে হচ্ছে- আমাদের যেন খেয়ে-দেয়ে আর কোন কাজ নেই। এটিই যেন এখন আমাদের মূল কমিউনিটি ওয়ার্ক।

পদককে ইংরেজিতে (Medal) বলা হয়ে থাকে। তবে মেডেল শব্দটিও বাংলায় বহুল প্রচলিত। আজকাল এ শব্দের আরো একটি অভিধা যুক্ত হয়েছে। যাকে বলা হয় এওয়ার্ড। সাধারণতঃ গোলাকৃতি বস্তুবিশেষ যা ব্যক্তি, দল কিংবা প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ পুরস্কৃত করার লক্ষে হস্তান্তর করা হয় । যেমন একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, আজীবন সম্মান্না পদক, মরনোত্তর পদক, মাদার থেরেসা পদক, শান্তি রক্ষা পদক, ইত্যাদি। বিশেষ বিশেষ পদক ছাড়াও দৌড়বিদ, সামরিক বাহিনী, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও গবেষণা,  বিভিন্ন স্থরে অবদানের জন্য ব্যক্তি কিংবা সংস্থাকে পদক প্রদানের মাধ্যমে মূল্যায়ণ করা হয়।

পদক সাধারণতঃ গোলাকৃতি হলেও কখনো কখনো চতুর্ভূজ আকৃতিরও তৈরী করা হয়ে থাকে, যাকে প্লাক নামে অভিহিত করা হয়। চতুর্ভূজ আকৃতির পদকগুলো বৃহৎ ধরণের। এতে সাধারণতঃ যে-কোন প্রতীক, প্রতিকৃতি কিংবা অন্য কোন চিত্রকে পদকে প্রতিস্থাপন করা হয়। খোঁদাই করে, ছাঁচে ঢেলে, ছাপ প্রয়োগ করে অথবা অন্য কোনভাবে ছাপ মেরে পদককে আকর্ষণীয় ও স্মারক হিসেবে রাখা হয়। সতন্ত্র কোন ব্যক্তি কিংবা ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যেও পদক তৈরী হতে পারে। এছাড়াও শৈল্পিক চিত্রকর্মের অভিব্যক্তি, বিমূর্ত ভাবনা বা প্রতিচ্ছবি পদকে প্রকাশ করা হয়।

সচরাচর পদকের সম্মুখদিকই দৃশ্যমান ও সুশোভন করা হয়। এতে প্রতিকৃতি, দৃশ্যমালা অথবা অন্য কোন চিত্র খোদাই করা কিংবা কোন কিছু লেখা থাকে। পদকের উল্টোভাগ ব্যবহার করা হয় না বিধায় সাধারণতঃ খালি থাকে অথবা গুরুত্বহীন বিষয়াদি থাকতে পারে। প্রয়োজনে পদকের কিনারে গোপন চিহ্ন, প্রতীক, ধারাবাহিক নম্বর ইত্যাদি লুক্কায়িত অবস্থায় রাখা হয়ে থাকে।

এদিকে পদক অনেকভাবে প্রদান করা হয়ে থাকে। কোনটি সুন্দর করে টেবিলে রাখার উপযোগি করে, কোনটি একটি বক্সের মধ্যে রেখে আবার কোনটি পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তির গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। অবশ্য এ জন্য চিকন ফিতা ব্যবহারের করতে হয়। এছাড়াও, পোষাকে পদক গেঁথে দেয়ার জন্য নিরাপদ পিনও ব্যবহৃত হয়।

পদক বিভিন্ন ধাতুর মাধ্যমে অথবা এক ধরনের উজ্জল ব্রোঞ্জ পদার্থের মাধ্যমেই তৈরী হয়ে থাকে। সুবিধাজনক আর্থিক সীমারেখা, দীর্ঘস্থায়িত্বসহ সহজপ্রাচ্যতাই এর মূল কারণ। কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় সিলভার বা রৌপ্য, প্লাটিনাম এবং সোনা ব্যবহারের মাধ্যমে পদক তৈরী লক্ষণীয়। এছাড়াও, কাঁচ, পোর্সেলি, কয়লা, কাঠ, কাগজ, এনামেল, প্রভৃতির সাহায্যেও পদক তৈরী করা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি বিলেতে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবিশেষের প্রচেষ্টায় এওয়ার্ড প্রদানের হিড়িক পড়তে দেখা যায়। প্রায় প্রতি মাসেই দু’একটি এওয়ার্ড অনুষ্ঠানের খবর সংবাদ পত্রে প্রকাশিত হয়। আর এ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় আয়োজনকারী ও সম্ভাব্য এওয়ার্ডপ্রাপ্তদেরকে। কোন কোন সময় পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েও এরুপ এওয়ার্ডের নমিনেশন আহবান করা হয়। এরপরও সাড়া না পাওয়া গেলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ করা হয়। এ থেকেই প্রতিয়মান হয় যে, এওয়ার্ড গ্রহিতা ও এওয়ার্ড প্রাপ্তদের মধ্যে নেপথ্যে কোন দরকষাকষি হয় কি না।

তবে সব সংগঠন বা এওয়ার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এভাবে করছে না। তারা নমিনেশন আহবান করে এর বাছাই এর জন্য নিয়োজিত প্যানেল বোর্ডসহ আরও অনেক কিছু যথানিয়মে সম্পাদন করেই তা প্রদান করছে। আর এর ফলে প্রকৃত যারা এওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য তারাই এওয়ার্ড পাচ্ছেন। আর মাধ্যমে আমাদের কমিউনিটির খ্যাতিমান ব্যক্তিদের পরিচিত সহ নানা কার্যক্রমের প্রমাণ আমরা জানতে পারছি। এওয়ার্ড পাওয়ার পর তারা তাদের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ নিজেদের মেধা ও যোগ্যতার আলোকে কমিউনিটিতে নতুন উদ্দীপনায় রেখে যাচ্ছেন। যার ফলে দেশ জাতী ও সমাজ গবেষনার ক্ষেত্রে তারা বাঙালী জনগোষ্ঠীর মানমর্যাদাকে আরো উচুতে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে হতাশার কথা এ ধরণের লোককে খুব কমই মূল্যায়ন করতে দেখা যায়। প্রকৃত যারা এওয়ার্ড পাওয়ার অধিকারী তাদেরকে কেউ খোঁজ খবর নেন না। বা তাদের এওয়ার্ড প্রদানের জন্য তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়না। অথচ কমিউনিটিতে কোন কর্মকান্ডের সামান্যতম স্বীকৃতি নেই। এমন অনেকের হাতেই তুলে দেয়া হচ্ছে এ সমস্ত এওয়ার্ড। কিছু কিছু এওয়ার্ডর্ প্রদানকারীও কোন ব্যক্তিবিশেষ অথবা সমাজে পরিচিত নেই এমন অনেক মাধ্যম। তারা কেবল নিজেদেরকে জাহির করা বা এর মাধ্যমে টু-পাইস কামাইয়ের জন্য এ সমস্ত আয়োজন করে থাকেন।

আমাদের সমাজে অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা কখনও পদক, সনদ বা এওয়ার্ডের প্রত্যাশী নন কিন্তু তাদের বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কার্যক্রম আমাদেরকে আলোকিত করে যাচ্ছে। সুতরাং প্রকৃত মানদন্ডে তারাই এওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য।

কিন্তু বাস্তবে ইদানিং যা চলছে তা যদি শুধু নাম জাহির আর টু-পাইস কামাইয়ের জন্য এ অবস্থায় চলতে থাকে তাহলে একদিকে যেমন প্রকৃত এওয়ার্ডপ্রাপ্তকারীরা তাদের কাজকর্ম করতে উৎসাহিত হবেন না। অন্যদিকে তেমনি এওয়ার্ডের মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুন্ন হবে।

ভবিষ্যতে এধরণের পরিকল্পনা এওয়ার্ড প্রদানের ব্যাপারে কেউ উৎসাহিত হবে না। প্রকৃতপক্ষে যারা এওয়ার্ড প্রদানের যোগ্য তারাও লজ্জায় আর এদিকে অগ্রসর হবেন না। সুতরাং আসুন আমরা আমাদের কমিউনিটির স্বার্থে এবং এওয়ার্ডের মানমর্যাদা সমুন্নত রাখতে এমনভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করি যা থেকে আমাদের কমিউনিটি উপকৃত হয় এবং অন্য কমিউনিটির কাছে আমরা মাথা ইচু করে দাড়াতে পারি।

আমাদের মনে হয় এর সাথে আমাদের কমিউনিটির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা যদি এসমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করি তাহলেই কেবল এ বহুজাতির সংস্কৃতির দেশে আমাদের পর আমাদের প্রজন্মের উত্তরাধিকার সঠিক পথেই অগ্রসর হবে।

তারা আজকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করে যাচ্ছে। সুতরাং তাদের যদি আমরা এভাবে মূল্যায়ন করি তাহলে আমাদের কমিউনিটির অগ্রযাত্রা দিন দিন সামনের দিকে সফলভাবে এগিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে টাওয়ারহ্যামলেট কাউন্সিল ও বাংলাদেশ হাইকমিশন সহ আরো অনেকে তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি দিতে এওয়ার্ড প্রদান সহ নানাভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

সুতরাং এসমস্ত কাজের দিকে সবাইকে দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন। ভবিষ্যতে যাতে এর ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় সেজন্য আমাদের কমিউনটির লোকজনকেই বিভিন্ন পর্যায়ে শীর্ষপদে রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালাতে হবে। না হলে এদের খবর অন্য কেউ তেমনভাবে করার প্রয়োজনবোধ করবে না। যার ফলে আমাদের কমিউনিটি একদিন হারিয়ে যাবে এর মূল ধারার আবর্তে। বাংলা, বাঙালীর কৃষ্টি-কালচারের যতই লালন করা হবে ততই আমাদের কমিউনিটির পরিচয় দীর্ঘস্থায়ী হবে।

ইদানিং আরো এক ধরনের এওয়ার্ড প্রধানের আলামত দেখা যাচ্ছে। এতদিন দেশ থেকে এখানে এসে প্রবাসীদের জীবনচিত্র সংবলিত বইপত্র প্রকাশ করার প্রচেষ্টা চালানো হতো। এখন দেখা যাচ্ছে, দেশ থেকে লাগেজ ভর্তি করে পদক নিয়ে আসা হচ্ছে এবং তা ব্যতিক্রমী অনুষ্টানের মাধ্যমে বিতরণ করা হচ্ছে। এওয়ার্ড প্রদানকারীদের মন্তব্য এতে নাকি প্রবাসীদের আরো বেশী মূল্যায়ন করার হচ্ছে। তাদের ভাষায়, আমাদের প্রিয় প্রবাসীরা কেন দেশে গিয়ে কষ্ট করে এসব নিয়ে আসবেন। আমরাই কষ্ট করে তা এখানে এনে তাদের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছি। মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

লেখক- প্রবীন সাংবাদিক ও লন্ডন থেকে প্রকাশিত দর্পণ ম্যাগাজিনের সম্পাদক।


One response to “পদক বা এওয়ার্ড সমাচার”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *