মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যা কখনও ভুলা যায়না। আবার এমন কিছু ঘটনাও ঘটে যা স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। কারণ, এসব ঘটনা মন-মানসকে তেমন নাড়া দিতে সক্ষম হয় না। আর যেসব স্মৃতি হৃদয়কে দোলা দেয় বা আন্দোলিত করে, কেবল সেগুলোই বারবার ভেসে উঠে স্মৃতির পর্দায়। এমনই কিছু স্মরনীয় স্মৃতির উল্লেখ করছি এখানে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীর সাথে আমার পরিচয় ও ঘনিষ্টতা তাঁর প্রতিষ্ঠিত জাতীয় জনতা পার্টির মাধ্যমে। ১৯৭৬ সাল। আমি তখন কলেজে অধ্যয়ন করছি। আর তখন থেকেই আমি জেনারেল ওসমানী প্রতিষ্ঠিত জাতীয় জনতা পার্টির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রফ্রন্ট’-এর সিলেট শাখার যুগ্ম আহবায়কের দায়িত্ব লাভ করি।
এ সুবাদে তাঁর সাথে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে যেতে হতো, অন্যদিকে সিলেটের বিভিন্ন কলেজে সংগঠনের সমাবেশে যোগদান করতে হতো সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্যে। সাংগঠনিক কার্যক্রমে খুবই উদ্যমী ভূমিকা পালন করায় বঙ্গবীরের ঘনিষ্ট সাহচর্য পেতে সময় লাগেনি।
তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহের চোখে দেখতেন এবং তথাকথিত ছাত্ররাজনীতির যে নোংরা পরিমন্ডল তার বাইরে থেকে কাজ করার পরামর্শ দিতেন। নীচে তাঁর সাথে কিছু স্মৃতির কথা তুলে ধরা হলো।
ওসমানী সাহেব সিলেটে অবস্থানকালীন অবসর মুহুর্তে তার নাইওর পুলের বাসায় আমরা যেতাম। তখন তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনা ও পরবর্তীতে ‘৭৫এর পট পরিবর্তনসহ জিয়াউর রহমান ও খন্দকার মোস্তাকের নানা ঘটনা বর্ণনা করতেন। খালেদ মোশাররফ এর ব্যাপারে জিয়াউর রহমানের কার্যক্রমে প্রচন্ড ক্ষোভ ছিল তার। জেনারেল এরশাদ ও জেনারেল মঞ্জুর ঘটনায় বিব্রত ছিলেন তিনি। তিনি সব সময় বলতেন জীবনে ক্ষমতায় যাওয়ার অনেক সুযোগ ছিল কিন্তুু তিনি কখনও পিছনের দরজা দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার পক্ষপাতি ছিলেন না।
সেনাবাহিনীর লোক হলেও ওসমানী ছিলেন একজন খাটি গণতান্ত্রিক প্রকৃত দেশপ্রেমিক ব্যক্তি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ন ও অতিথি বৎসল। কেউ তার বাসায় গেলে সম্ভব হলে নিজের হাতে চা বানিয়ে দিতেন ও বিদায় নেয়ার সময় নিজে দরজায় এসে দাঁড়াতেন। জেনারেল ওসমানীর নাইয়রপুলের বাসার কাছাকাছি তখন ‘পলাশ’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ছিল। প্রায় সময় নেতা-কর্মীরা সেখান থেকে ফ্লাক্সে করে চা নিয়ে আসতেন।
তবে একদিন ওসমানী সাহেব বললেন যে, তিনি সবাইকে চা পানে আপ্যায়িত করবেন। এ কথা শুনে আমাদের মধ্যে চা পানের আগ্রহটা বেড়ে যায়। তবে চা নিয়ে আসাতে আসতে লোকজন ছিল ক্রমান্বয়ে তা বাড়তে থাকে। এভাবে বিকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চায়ের পালা চলে। এতে তার কয়েকশত টাকা চলে যায়। পরে তিনি অবশ্য এক ফাঁকে বলেছিলেন যে, তাঁর আর তেমন কোন সম্বল নেই। এ জন্য মন চাইলেও সবাইকে সব সময় চা পানে আপ্যায়ন করাতে পারেন না।
অনেকেই কৌতুহলী ছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর আতাউল গণি ওসমানী কেনো বিয়ে করেন নি। কিন্তু ওসমানীকে এ প্রশ্নটি করার মত সাহস কারো ছিলনা।  আমি তখন যে কলেজে পড়তাম সে কলেজের কয়েকজন সহপাঠি আগ্রহী হলো জাতীয় জনতা পার্টির  ছাত্র সংগঠনে যোগ দিতে। ওদের আমি নিয়ে গেলাম সিলেট শহরের নাইওর পুলস্থ ওসমানী সাহেবের বাসভবনে।
সাক্ষাৎ পর্বের শুরুতেই এক সহপাঠি ওসমানীকে প্রশ্ন করে বসলো: ‘স্যার, যদি বেয়াদবী না নেন, তাহলে একটা প্রশ্ন করবো। আর প্রশ্নটা হলো, আপনি কেনো বিয়ে করেন নি? প্রশ্ন শুনেই ওসমানীর বিগড়ে যাওয়া মেজাজ তাঁর অভিব্যক্তিতে ফুটে উঠলে সহপাঠি বেচারা আমতা আমতা করে ফের বললো: ‘স্যার, আমরা তো আপনার পার্টি করবো। কিন্তু পার্টির কাজ করতে গেলে নিশ্চিত যে, অনেকেই এ প্রশ্নটি আমাদের করবে। তখন কি জবাব দেবো মনে করেই প্রশ্নটা করলাম।
কিন্তু আমার তখন ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি’ অবস্থা। কারণ আমি এখানে তাদের নিয়ে গিয়েছি। তাই তারা চলে যাবার পর আমাকে ্এ জন্য খেসারত দিতে হবে। কিন্তু ওসমানী সাহেব তখন কিছুটা ভাবগম্ভির সুরে আমার সহপাঠিকে জিজ্ঞেস করলেন  ‘তোমার নাম কি? তুমি কলেজে কি পড়ছো, ইত্যাদি। এরপর বললেন, রাজনীতি করতে এসেছ, রাজনীতির প্রশ্ন করো-ব্যক্তিগত প্রশ্ন কেন করবে? আমি তখন হাফ ছেড়ে বাঁচি।
এবার অন্য একটি ঘটনা। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার দশঘর ইউনিয়নের নোয়াগাও থেকে একই উপজেলার অন্য একটি গ্রামে আমারই বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বঙ্গবীর ওসমানী। ওসমানীর মেজাজ-মর্জির কথা জানেন না এমন এক ব্যক্তি বিয়ে বাড়িতেই হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে- স্যার, এখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন? ওসমানী খটমট করে লোকটার দিতে তাকিয়ে বল্্লেন, ‘বিয়েতে এসেছি, রাজনৈতিক প্রশ্নের জবাব দিতে নয়। লোকটি তখন খুব লজ্জা পায় ও সেখান থেকে তাড়াতাড়ি সরে পড়ে। অন্যান্য সবাইও তখন সতর্ক হয়ে কোন প্রশ্ন করা থেকে বিরত থেকে তাড়াতাড়ি আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে থাকেন।
সিলেটের একটি প্রাইভেট হসপিটালে জেনারেল ওসমানীর সাথে আমরা একজন রুগীকে দেখতে গিয়েছি। সে সময় সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্যরা এসে আমাদের স্বাগত জানালেন। আমরা সবাই যখন ভিতরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন ওসমানী তাদের পারমিশন নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন কয়জন ভিতরে যাওয়া যাবে? উত্তরে কর্মকর্তারা জানালেন, আমরা যারা তিনির সাথে গিয়েছি সবাই যেতে পারবো।
জেনারেল ওসমানী তখন সবাইকে জুতা খুলে ফেলার জন্য বল্লেন। এরপর রোগীর কাছে গিয়ে কোন কথাবার্তা না বলার কথাও জানিয়ে দিলেন। সাথে সাথে সাংবাদিকদেরও প্রবেশাধিকারে নিষেধ আরোপ করা হলো। এর পরেও শেষ নয়। তিনি একসাথে সবাইকে রুগী দেখতে গিয়ে ভীড় না করার জন্যও বল্্লেন। তাই একজন একজন করে আমাদের সেখানে যেতে হলো। এমতাবস্থায় প্রথমে তিনি দেখতে গেলেন ও পর্যায়ক্রমে যাদের দেখার ইচ্ছা তারা গেলেন। কিন্তু ততক্ষণ তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করলেন। কাউকে ফেলে চলে আসলেন না।
কিন্তু আজকাল আমরা কী দেখতে পাই। পারমিশন নেয়াতো দূরের কথা নেতা নেত্রীর সাথে থাকা অনুসঙ্গীদের  জটলা ও ছবি তোলার যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। এজন্য অনেক সময় দায়িত্বরত ষ্টাফরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন। অসুস্থ রুগীর চাইতে নেতার পাশে ছবি তোলার জন্য যেন সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রুগী তখন অসহায়ের মত শুধু ফেল ফেল করে চেয়ে থাকে।
সিলেটের নাইয়রপুলে ওসমানী সাহেবের বাসার (বর্তমানে যাদুঘর) পিছনে একটি নিমগাছ ছিল। সবাই জানেন নিম গাছের পাতা, ডাল এমনকি ছাল পর্যন্ত খুবই উপকারী। তাই স্থানীয় লোকজন প্রায় সময় যার যেটা প্রয়োজন সেটা কেটে নিয়ে যেত। আর সেটা হতো তিনি যখন বাসায় থাকতেন তখন বেশী। কারণ অন্য সময় গেইট বন্ধ থাকতো।
কোন কোন সময় বাসার দারোয়ান তাদের নিষেধ করতো। কিন্তু এতে তিনি দারোয়নের উপর অসন্তুষ্ঠ হতেন এবং বলতের যতক্ষণ পাতা, ডাল ও ছাল আছে ততক্ষণ নিতে দাও নিষেধ করবো না। দারোয়ান বুঝাতে চাইলো যে এভাবে এগুলি নিতে নিতে গাছের অবস্থা কঙ্কালের মত হয়ে গেছে। ওসমানী তখন বল্লেন, গাছটি যতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে ততক্ষণ এগুলি নিতে দাও। এ গাছের সাথে তাঁর মায়ের অনেক স্মৃতির কথা তিনি বলতেন। এতে অনুমান হয় তিনি কতটুকু জনদরদী ছিলেন।
একদিন এক ব্যক্তি তার অসুস্থ ছেলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে ওসমানী সাহেবের কাছে তদবিরের জন্য আসলো। তিনি তখন সেই ব্যক্তির কথা পরম মনযোগ সহকারে শুনলেন। ওসমানী সাহেব তখন জানতে চাইলেন যে, সেই ব্যক্তি রুগী নিয়ে কি পূর্বে হাসপাতালে গিয়েছিল। উত্তর হ্যা সূচক হলে তিনি জানতে চাইলে, তাহলে কেন ভর্তি করা হলো না। সেই ব্যক্তি তখন জানালো যে, হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, সেখানে কোন সিট খালি নেই।
ওসমানী সাহেব তখন সেই ব্যক্তিকে সহযোগিতা করা যাবে না বলে জানালেন। এর যুক্তি তুলে ধরে তিনি বল্লেন, যদি সিট খালী থাকতো তা হলে নিশ্চয়ই তাকে ভর্তির সূযোগ দেয়া হতো। এখন যদি তিনি হাসপাতালে ফোন করেন তবে নিশ্চয়ই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার ছেলেন জন্য একটা সিট বরাদ্দ করবেন, কারণ ওসমানী সাহেব যোগাযোগ করেছেন।
কিন্তু যে রোগীকে ডিসচার্জ করে সে সিট খালি করা হবে সেই রুগী যখন জানতে পারবে যে, ওসমানী সাহেবের টেলিফোনের কারণে তার সিট কাটা গেছে তখন কি হবে? সেই রুগীর অন্তরের বেদনা কি এই রুগীর চাইতে বেশী হবে না। এতেই বুঝা যায় যে, জেনারেল ওসমানী কতটুকু দূরদর্শী ছিলেন।
আজকালকার নেতানেত্রীরা কি সে সমস্ত বিষয় চিন্তা করেন। নিজের দল আর ঘনিষ্ঠ লোকদের কথাই বেশী চিন্তা করেন। দেশের জনগণ বা সাধারণ মানুষের কথা কে কতটুকু চিন্তা করেন বা গুরুত্ব দেন। একটি প্রবাদ আছে যা হলো ‘আপনে বাছলে বাপের নাম‘। আর সেটাই যেন হয়ে গেছে আমাদের জনপ্রতিনিধিদের আসল কাজ।
যুদ্ধ কালীন সময়ে সিলেটের কিনব্রিজের এক পার্শ ধংশ হয়ে যায়। এক সময় তা মেরামতের কাজ চলছিল। এ সময় গাড়ী চলাচলের জন্য ওয়ানওয়ে সিস্টেম চালু করা হয়। এমতাবস্থায় জেনারেল ওসমানী একবার তাঁর এক আত্মীয়ের গাড়ীতে করে পুল অতিক্রম করছিলেন। সেই গাড়ীর ড্রাইভার মনে করলো ওসমানী সাহেব গাড়ীতে আছেন তাই ট্রাফিক মানা প্রয়োজন কি।
তাই উল্টোদিকে ট্যাফিক থাকলেও সে তার তোয়াক্কা না করে সোজা পুল অতিক্রম করতে রওয়ানা দিল। আর যখই ড্রাইভার তা শুরু করলো তখন তিনি প্রচন্ডভাবে ক্ষেপে গিয়ে ড্রাইভারের গতিরোধ করলেন। সাথে সাথে তিনি এটাও বল্লেন যে, আর কোনদিন তিনি এ গাড়ী চড়বেন না। শেষ পর্যন্ত অনেক চেষ্ঠা করেও তাঁকে আর সে গাড়ীতে উঠানো যায়নি।
লেখকঃ লন্ডন থেকে প্রকাশিত মাসিক দর্পণ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ও যুক্তরাজ্যের প্রবিন সাংবাদিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here