মরহুম মোহাম্মদ আবদুল মতিন চৌধুরী (এমএ মতিন)

ম্যানচেস্টারের বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা ব্যবসায়ী মরহুম আব্দুল মতিন সাহেবের দেশের বাড়ি জগন্নাথপুর থানা অন্তর্গত শ্রীরামিশি গ্রামে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন । তার পিতার নাম মৌলানা আবদুল আজিম চৌধুরী তার মায়ের নাম শামসুন্নাহার চৌধুরী ।

আবদুল মতিন পরিবারের মধ্যে একমাত্র সন্তান ছিলেন । তিনি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেন । দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই যে আব্দুল মতিন ছোটবেলায় তার বাবাকে হারান যার কারণে তিনি লেখাপড়া আর বেশি এগোতে পারেননি ।

এসএসসি পরীক্ষার পর তিনি স্থানীয় প্রাইমারি স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন । ১৯০০ শতকের প্রথম দিকে আব্দুল মতিন সাহেবের দাদা নবীগঞ্জ এলাকা থেকে শ্রীরামিশি আসেন ।  ১৯৪৯ সালের দিকে তিনি ইউকেতে আসেন । প্রথমে তিনি বার্মিংহামে এবং পরবর্তীতে তিনি ম্যানচেষ্টারে স্থায়ীভাবে ভাবে বসবাস করেন। তিনি পাসপোর্ট এর জন্য আসাম যান এবং করাচী থেকে যুক্তরাজ্যে এসে পৌঁছান । ১৯৬৪ সালে মতিন সাহেব সৈয়দা নুরুন্নাহার বেগমকে বিবাহ করেন । তাদের ছয় সন্তান এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে । তিনি প্রথম ভিক্টোরিয়া পার্ক এর পরবর্তীতে চিতামহিল তারপরে ১৯৭৪ সালে ডিজবারীতে  আরেকটি বাড়ি কিনে ওই জায়গায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওইখানেই বসবাস করতেন ।

যুক্তরাজ্যে আসার পর তিনি প্রথম রেস্টুরেন্টে কাজ করেন এবং লাল মিয়া কে পার্টনার করে ছোট একটি কফি শপ খুলেন । তারপর তিনি ম্যানচেস্টারে চলে আসেন এবং অক্সফোর্ড রোডে ওরিয়েন্টাল রেস্টুরেন্ট নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠা করেন । এই রেস্টুরেন্ট যখন ভেঙ্গে ফেলা হয় তখন তিনি মানচেষ্টার ডিন্সগেইট এলাকায় মতিঝিল নামে আরেকটি রেস্টুরেন্ট করেন ।

১৯৬৪ সালে তিনি লিডস চলে যান এবং সেখানে তাজমহল নামে একটি রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন । ১৯৬৭ সালে তিনি ম্যানচেস্টার ফিরে আসেন এবং এখানে আসার পর প্রথম এশিয়ান ফুড ষ্টোর নামে বাংলাদেশি গ্রসারির দোকান প্রতিষ্ঠা করেন, যা প্রথমে স্টকপোর্ট রোডে এবং পরবর্তীতে ফেলোফিল্ডের ল্যান্ডক্রস রোড স্থানান্তর করা হয় । ১৯৭১ সালে অক্সফোর্ডে তিনি সিলেট ট্রাভেল সার্ভিসেস নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন । যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে এবং অনেক সুখ্যাতি অর্জন করেছে এবং এটাই ছিল বিমান অনুমোদিত বাংলাদেশের বাইরে ইউকেতে প্রথম ট্রাভেল এজেন্ট।

যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া সম্পর্কে তিনি দেখেছেন আবহাওয়া সবসময় ঠান্ডা থাকত এবং তখনকার দিনে কয়লা দিয়ে রুম গরম করা হত । প্রচুর ঠান্ডার কারণে তুষারপাত এবং রাস্তায় বরফ জমে থাকত । তখনকার দিনে মানুষের মধ্যে ভালো আন্তরিকতা ছিল। একে অন্যকে সাহায্য করত; যদি কেউ মারা যেত তখন কমিটির সব লোক দাফন-কাফনের ব্যবস্থা করত। প্রয়োজনে দাফনের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতো এবং চাঁদা তুলে মৃতদেহ কে বাংলাদেশ পাঠাতে সাহায্য করতো ।

আব্দুল মতিন সাহেব বাংলাদেশ কমিউনিটি কে ঐক্ষবদ্ধ করার জন্য অত্যন্ত পরিশ্রম করতেন । তিনি মনে করতেন যে দেশে এবং বিদেশে বাংলাদেশি কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ রাকা তার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য । ১৯৫১সালে তিনি বার্মিংহামে পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি মানচেস্টার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা । তিনি পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন ফর ব্রিটেনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন । তিনি বারমিংহামে প্রথমবারের মত মৃত ব্যক্তিদের দাফন-কাফনের জন্য একটি ফিনারেল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করেন ।

১৯৫৫ সালে তিনি ঐতিহাসিক একটি জনসভার আয়োজন করেন । ঐ জনসভায় হোসেন শহীদ সরোয়ারদি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মওলানা ভাসানী প্রধান ও বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ।  লন্ডনের সেন্ট পানক্রাস হলে এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখান থেকেই প্রথম বাঙ্গালীদের আন্দোলন শুরু হয়েছিল ।

১৯৬৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসাবে প্রেসিডেন্ট পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসাবে তিনি আইয়ুব খানের সাথে একটি সভার আয়োজন করেন । তিনি পাকিস্তানের বাঙ্গালীদের জন্য ক্যাটারিং সার্ভিস ভাউচার ভিসার ব্যাপারে সুষ্ঠু ভাবে বন্টনের জন্য জোর দাবি জানান এবং ঢাকায় ইমিগ্রেশন কাস্টম ব্যবস্থা চালু করার জন্য জোর দাবি উত্থাপন করেন। যা তখনকার সময়ে ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস করাচিতে হত তারই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ঢাকা বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন এবং কাস্টমস চালু হয়েছিল ।

১৯৬৬ সালে তিনি ঐতিহাসিক প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন, যা আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছিল। ১৯৬৮ সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রতিবাদে লন্ডনে বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন ।

১৯৬৯ সালে লন্ডনের হাইড পার্কে ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে এক বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেন। তখন পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি হিসাবে তিনি ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বঙ্গবন্ধুকে মুক্তির দাবি করেন। ১৯৬৯ সালের তিনি জনসাধারণের সুবিধার জন্য বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ যাতে সহজে বাংলাদেশে তাদের পরিবারের কাছে অর্থ প্রেরণ করতে পারে সেজন্য ম্যানচেস্টারে হাবিব ব্যাংকের একটি শাখা খেলার জন্য জোর দাবি জানান । সেখানে তিনি কাজ করেছেন, এবং লক্ষ্য রেখেছেন যেন জনগণ ব্যাংকের সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং এই ব্রাঞ্চ খোলায় দেশ ও জাতি উপকৃত হয় তা তিনি স্বচক্ষে দেখার চেষ্টা করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পূবালী ব্যাংক ম্যানচেষ্টারে একটি শাখা খুলে যার কার্যক্রম লন্ডনের পরেই ম্যানচেস্টারের অবস্থান ছিল।

তিনি উপলব্ধি করেন বাংলাদেশি মুসলমানদের জন্য একটি উপসনালয় স্থাপন করা, তিনি পাকিস্তান মুসলিম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ম্যানচেস্টারে একটি বিল্ডিং ক্রয় করে শাহজালাল ও ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শাহজালাল মসজিদের উন্নয়নের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। শাহজালাল মসজিদ এন্ড ইসলামিক সেন্টারের প্রতিষ্টায় যারা প্রথম জড়িত ছিলেন তারা হলেন বসরত আলী, মালিক বক্ত, সৈয়দ আব্দুল হান্নান, এম এ মতিন প্রমুখ । তিনি তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে একত্র করে জাগরণ নামে একটি বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত করেন ।

১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়, তখন তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্তরাজ্যের মধ্যে আন্দোলন সংগ্রাম কে জোরদার করার জন্য জনমত গঠন এবং স্বাধীনতার পক্ষে বিভিন্ন সভা সমিতি করার উদ্যোগ নেন। তিনি অন্যান্য নেতাদের সমন্বয়ে ১৯৭১ সালের ২৪শে এপ্রিল “একশন কমিটি ফর বাংলাদেশ ইন ইউকে” নামে একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা করেন। যে সংগঠনের উপদেষ্টা হিসাবে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কে নিয়োগ দেওয়ার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন।

ঐসময় এসব কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত ছিলেন তারাই বলতে পারবেন আব্দুল মতিন সাহেব সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য যথাসাধ্য কাজ করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি ল্যাঙ্কাশায়ারে একশন কমিটি গঠন করেন গঠন করেন এবং এই অ্যাকশন কমিটির মাধ্যমে নর্থ ইংল্যান্ডের মধ্যে সভা-সমিতি ও বিক্ষোভ মিছিলের আয়োজন করেন। ঐসময় বেশিরভাগ সভা শালিমার ও ম্যানিলা রেস্টুরেন্টে অনুষ্ঠিত হতো। তিনি সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশী কমিউনিটিকে আশ্বস্ত করতে পেরেছিলেন যে মুক্তি সংগ্রামে সাহায্যের জন্য তাদের অর্জিত এক মাসের বেতন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র কেনার জন্য দান করতে উৎসাহিত করেছিলেন। ১৯৭১ সালে ল্যাঙ্কাশায়ার একশন কমিটি সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সাহায্য প্রদান করেন অনুদানের চেক লন্ডনের হোটেলে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে চেক প্রদান করা হয়েছিল।

১৯৭২ সালের ৮ই জানুয়ারিতে এই চেকটি লন্ডনের ক্লারিজ হোটেলে এক ঐতিহাসিক সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হাতে হস্তান্তর করেন। আব্দুল মতিন সাহেব বিচক্ষণতার সহিত উপলব্ধি করেন যে বাংলাদেশীদের জন্য একটি এসোসিয়েশন গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। তার উদ্যোগে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। যা পরবর্তীতে গ্রেটার ম্যানচেস্টার বাংলাদেশ এসোসিয়েশন নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশী লোকদের কাছে পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিল এবং অনেক বাংলাদেশী জনসাধারণ কাগজপত্র না দেওয়ার কারণে বাংলাদেশী পাসপোর্ট তৈরিতে জটিলতা দেখা দিয়েছিল। আব্দুল মতিন সাহেবের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছিল যে বাংলাদেশী প্রমাণের ক্ষেত্রে যদি কমিউনিটি প্রবীণ নেতৃবৃন্দ কাউকে শনাক্ত করে দেন তাহলে তাদেরকে যাতে বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেওয়া হয় এ ব্যাপারে যাতে কোনো ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে না হয়, এ ব্যাপারে তিনি সচেষ্ট ছিলেন।

তিনি আওয়ামী লীগ থেকে বাংলাদেশ প্রথম অফিশিয়াল ভিজিটে নেতৃত্ব দেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তার অবদানের কথা শেখ মুজিবুর রহমান কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। বাংলাদেশের বাইরে মানচিত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশনার এস এ সুলতান কে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয় ।

এই গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন ল্যাঙ্কাশায়ার আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব এম এ মতিন এবং এই সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাঞ্চেষ্টারের ফ্রি ট্রেড হলে। ১৯৭৫ সালে তিনি পূবালী ব্যাংক, বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং বাংলাদেশ বিমানের অফিস এর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে ম্যানচেস্টারে অফিসগুলো আনতে সক্ষম হয়েছিলেন।

শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর তিনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা লক্ষ্য করেন। তিনি তইবুর রহমানকে সাথে নিয়ে জাতীয় জনতা পার্টিতে যোগদান করেন এবং ইউকে কোডিনেটর হিসাবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি উপলব্ধি করতে পারেন বাংলাদেশের ইমেজ কিভাবে বাড়ানো যায়।

১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে সরকারের সাথে কাজ করেন এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়ায়ুর রহমানের জন্য রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনার আয়োজন করেন। ১৯৮১ সালে এমএ মতিন শেখ হাসিনার সাথে এক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

১৯৮৩ সালে তারই উদ্যোগে ম্যানচেস্টারের লংসাইটে বাংলাদেশ এসোসিয়েশনের জন্য একটি বিল্ডিং ক্রয় করেন। তিনি বিভিন্ন শহরে বিশেষ করে হাইড, ওল্ডহ্যাম, রচডেল, লিডস, ব্রাডফোর্ড, বির্মিংহাম,  লন্ডন শহরে বাংলাদেশ এসোসিয়েশন গঠনের জন্য বাংলাদেশী কমিউনিটি কে সাহায্য করেন।

১৯৮৪ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি যখন বঙ্গবীর জেনারেল এমএজি ওসমানী লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন তখন তিনি উসমানী সাহেবের মরদেহ বাংলাদেশ নিয়ে গিয়েছিলেন। ঐসময় বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ।

এম এ মতিন ১৯৮৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তার নামাজে জানাজায় দুই হাজারেরও বেশি লোক সমাগম হয়েছিল। তার জানাজাটি শাহজালাল মসজিদের পাশে প্লাটফিল্ডে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাকে দেশে তার জন্মস্থান জগন্নাথপুরের শ্রীরামিসী গ্রামে দাফন করা হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতায় এম এ মতিন তিনি একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সাথে, বাংলাদেশী মানুষের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ঐক্ষ্যবদ্ধ করে সভা-সমিতি বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন।

এইজন্য ম্যানচেস্টার সহ যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ কমিউনিটির মাঝে আব্দুল মতিন এর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ এবং প্রচুর রক্ত ক্ষরণের পর বাংলাদেশ নামে নতুন একটি জাতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা বাংলায় কথা বলব আমাদের সংস্কৃতি আমরা চর্চা করব এবং একে অন্যের সাথে আমরা বাংলায় যোগাযোগ করব।

তিনি বলেন ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান ইন্ডিয়া থেকে আলাদা হয়েছিল, তখন থেকেই মূলত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নদেখা ও স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল। ১৯৫২ সালে ছাত্ররা যখন ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেছিল এবং তারা তাদের জীবন বিসর্জন দিয়েছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ এই তিন বছরে আন্দোলন খুবই শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে উঠেছিল এবং তখন ইয়াহিয়া খান নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়েছিল।

১৯৭০ এ যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তানের নেতারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করেন। পাকিস্তান তখন সংসদ অধিবেশনের আয়োজন করেনি। তখন তারা পরিকল্পনা করেছিল যে বাংলাদেশীদের তারা মেরে শেষ করে দিবে এবং পাকিস্তানি আর্মি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থান) বর্তমান বাংলাদেশ আক্রমণ করলো, এবং দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন বিসর্জন দিল। তখন দেশের জনগণ অনেকে হতভম্ব হয়েছিলেন, কি করবেন সবাই ভাবতেছিলেন ।

বাংলাদেশি মানুষ বসে থাকেনি এবং তাদের সামনে নিরীহ মানুষকে হত্যা করা দেখে, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা বাংলাদেশের জন্য, স্বাধীনতার জন্য তারা মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এম এ মতিন, ডাক্তার কবির চৌধুরী, সমুজ মিয়া, মকসুদ আলী তারা একসাথে কাজ করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশী কমিউনিটিকে ঐক্ষ্যবদ্ধ করার জনা  এম এ জি ওসমানী ও আব্দুস সামাদ আজাদ যুক্তরাজ্যে আসেন। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যুক্তরাজ্যে আসেন এবং বাংলাদেশী কমিউনিটিকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য এবং সহযোগিতার আহ্বান জানান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগ্রামে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এজন্য তিনি যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশী কমিউনিটির মাঝে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। এম এ মতিন সাহেব তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন এবং একজন সচেতন সমাজকর্মী ছিলেন এবং তাঁরই উদ্যোগে বাংলাদেশী কমিউনিটির মধ্যে সভা-সমিতি সেমিনার করা সম্ভব হয়েছিল। তারই মাধ্যমে ব্রিটিশ এমপি মিনিস্টারদের নিকট থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য লবিং করেছিলেন।

হাইড পার্কে যখন বিরাট জনসভার আয়োজন করা হয় তিনি ওই জনসভায় অন্যান্য সকল সংগঠকদের মধ্যে তিনি একজন সফল সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি খুব জনপ্রিয় নেতা হিসাবে নর্থওয়েস্ট এবং ইউকের মধ্যে খ্যাতি লাভ করেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ইউকে তে নেতৃত্ব নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল, তিনি কমেন্ট্রিতে একটি সভার আয়োজন করেন। ঐসভায় প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট উপস্থিত ছিলেন।

তখনকার সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে কি পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল তার সঠিক তথ্য জান না থাকলেও বাংলাদেশী কমিউনিটি ৭৫ হাজার পাউন্ডের মত অর্থ সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এই তহবিল বিশেষ করে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যাতে করে যুদ্ধের জন্য অস্ত্র, খাদ্য এবং ঔষধ ক্রয় করতে পারে, এইজন্য এই সাহায্য প্রদান করা হয়েছিল। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১১টি বিক্ষোব সভা যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত হয়।

মঞ্জিল এবং শালিমার রেস্টুরেন্ট এই দুই জায়গায় বিশেষ করে ম্যানচেস্টারের সভাগুলো অনুষ্ঠিত হতো । এখান থেকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধের খবরা-খবর আপডেট করা হতো এবং পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হতো। তিনি আরো বলেন পাকিস্তানের জনগণ যখন বাংলাদেশী জনগণের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত হতো তখন তিনি তা সমাধানের চেষ্টা করতেন। ঐসময় টেলিফোন, টেলিভিশনের অপ্রতুল ছিল। যুদ্ধের সংবাদ জানার জন্য জনগণ তাদের বাসায় আসতো। কিছু লোক একত্র হয়ে যুদ্ধের সংবাদ শোনার জন্য একটা পুরাতন টেলিভিশন ক্রয় করেন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো সঠিকভাবে সন্নিবেশিত করা হউক। ষাট – সত্তর দশকের দিকে খুব কম সংখ্যক বাংলাদেশি যুক্তরাজ্যে বসবাস করতেন। তাদের সাহায্যে আজ বাংলাদেশী কমিউনিটির এখানে থাকার সুযোগ-সুবিধা করে গেছেন তা কল্পনাতীত। তার জীবনের অভিজ্ঞতায় বোঝা যায় যে, তিনি একজন দেশপ্রেমী লোক ছিলেন, মানুষকে ভালোবাসতেন, মানুষের সেবা করতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য একজন নিবেদিত প্রাণ সংগঠক ছিলেন। যার অবদান কোনভাবেই অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশি কমিউনিটি তার অবদানের কথা স্মরণ রাখবে বলে আমি মনে করি। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে উপলব্ধি করছি যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে, মুক্তিসংগ্রামে অবদান রেখেছেন তাদেরকে সরকার আজ পর্যন্ত তাদের স্বীকৃতি প্রদান করেনি।

মতিন সাহেবের মত আরো হাজারো নেতা কর্মী ইহজগৎ ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের খবর কে জানে। কিন্তু আমি মনে করি, মতিন সাহেবকে মরণোত্তর সম্মাননা দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিসংগ্রামের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে পুরস্কৃত করা হোক।

আমরা দেখতে পাই যারা সমাজের ক্ষতি করে তারা পুরস্কৃত হয় কিন্তু যারা সমাজের সেবা করে তারা যদি পুরস্কৃত না হয় তাহলে সমাজসেবায় আগামীতে কেউই এগিয়ে আসবে না। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই মতিন সাহেবের মত নাম না জানা অনেক নেতা-কর্মী রয়েছে, যারা দেশের জন্য, জাতির জন্য, স্বাধীনতা সংগ্রামে, মুক্তিসংগ্রামে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। কিন্তু আমরা এও লক্ষ্য করছি যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে তাদেরকে সন্নিবেশিত করা হয়নি। তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, তাদেরকে পুরস্কৃত করা হয়নি। আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করছি, আব্দুল মাতিন সাহেবের মত যারা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে অবদান রেখেছেন তারা যদি এ দুনিয়াতে নাও থাকেন তাহলে তাদের মরণোত্তর পুরস্কারে পুরস্কৃত করার জন্য। যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার জন্য। যদি তা না হয় তাহলে আমরা বঞ্চিত হব, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রবাসী বাংলাদেশের ইতিহাস জানা থেকে দূরেই থেকে যাবে।

তারা জানতে পারবে না, দেশ কিভাবে স্বাধীন হয়েছিল । প্রবাসী বাংলাদেশিরা তখন মতিন সাহেবের মত কিরকম অবদান রেখেছিলেন, যার কারনে অতি অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশ স্বাধীন হতে সক্ষম হয়েছিল। আমরা যদি তাদেরকে ভুলে যাই তাহলে আমি মনে করি যে, আমরা একটা অকৃতজ্ঞ জাতি। আমি যে সময় মতিন সাহেবের এই লেখাটীর জন্য তথ্য সংগ্রহ করেছি, তখন মতিন সাহেব এই জগতে নাই। তার একমাত্র পুত্র হাসান মতিন চৌধুরী আমাকে তার পিতার অবদান বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমাজসেবা তথ্য দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন এবং ছবিগুলো দিয়ে তার একটা প্রমাণ তুলে ধরবার চেষ্টা করেছেন, এই জন্য আমি তার কাছে চির কৃতজ্ঞ।

গ্রেটার ম্যানচেস্টারে বাংলাদেশীদের ইতিহাস শিরোনামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে এবং এটি গ্রন্থাগার, স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিতরণ করা হবে। প্রবাসবার্তার পক্ষে আমরা বিলেতে বাংলাদেশী সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি জানাই। সমাজকর্মে ও স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক স্বীকৃতি ও পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির জোর দাবী জানাচ্ছি।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here