প্রবাস বার্তা টুয়েন্টিফোর ডটকম ডেস্ক রিপোর্ট :: বাবরি মসজিদের জমির মালিকানার পক্ষে সব ধরনের প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছেন মামলার মুসলিম পক্ষের আইনজীবী। ভারতের কেন্দ্রীয় সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের এক আইনজীবী বলেন, উত্তর প্রদেশের আজকের অযোধ্যায় ১৫২৮ সালে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
জায়গাটিতে হিন্দু দেবতার জন্ম নিয়ে যে দাবি করা হয়েছে, তার ভিত্তি নেই বলেও তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লি থেকে টেলিফোনে বার্তা সংস্থা আনাদুলুকে তিনি বলেন, বাবরি মসজিদের ভেতরে নামাজ আদায় থেকে মুসলমানদের বিরত রাখতে পারবে না।
যেখানে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে কোনো মূর্তি ছিল এমন দাবিও কেউ করতে পারবে না। এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বলেন, ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে মুসলমানদের কিছুটা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সেই মাসেই মসজিদের ভেতরে হিন্দু দেবতার মূর্তি পাওয়া যায়।
ভারতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমাতে বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা স্বাভাবিক বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তিনি জানান, মসজিদের ভেতরে মুসলমানদের নামাজ আদায়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের সেখানে পূজার জন্য নিয়োগ দেয়া হয়। তারা প্রথানুসারে দেবতাদের দেখভাল করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মসজিদ এখন সাধারণ মানুষের সীমার বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
https://www.facebook.com/musha.dewan.3/videos/1004603879887259/
শহীদ বাবরি মসজিদ মামলার বৃত্তান্ত (১৫২৮-২০১৯)
১৫২৮: মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপ্রধান মীর বাকী বাবরের নামানুসারে বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন।১৮৮৫ : মহন্ত রঘুবীর দাস এক কট্টর হিন্দু বাবরি মসজিদের বাইরে একটি অস্থায়ী মন্দিরতৈরির দাবি জানান। ফৈজাবাদ কোর্ট সেই আবেদন খারিজ করে দেয়।
১৯৪৯: বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে কেন্দ্রীয় ডোমের নীচে রামলালার মূর্তি স্থাপন করা হয়।
১৯৫০: জনৈক গোপাল সিমলা বিশারদ রামলালার মূর্তি পূজার জন্য জানিয়ে ফৈজাবাদ জেলা কোর্টে আবেদন জানায়।
১৯৫৯: এলাকার অধিকার দাবি করে নির্মোহী আখড়া মামলা করে।
১৯৬১: উত্তরপ্রদেশের সুন্নী ওয়াকফ বোর্ডও এলাকার অধিকার জানিয়ে পাল্টা আবেদন করে। ১৯৮৬ (১ অক্টোবর): স্থানীয় আদালত সরকারকে এক নির্দেশে হিন্দুদের পূজা করার অনুমতি দিয়ে রামলালা যেখানে রয়েছে তার গেট খুলে দিতে বলে।
১৯৮৯: ভগবান শ্রী রামলীলা বিরাজমানের পক্ষে তার সখা এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি দেওকী নন্দন আগরওয়াল আদালতে মামলা করে। ১৯৯০(২৫ সেপ্টেম্বর): অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মানের লক্ষ্যে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতা লালকৃষ্ণ আদবানী গুজরাটের সোমনাথ থেকে দেশব্যাপী রথযাত্রা শুরু করে।
১৯৯২ (৬ ডিসেম্বর): কট্টর হিন্দুত্ববাদী বিজেপি নেতারা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী বাবরি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ করে। যেখানে পরিকল্পিতভাবে কট্টর হিন্দুত্ববাদী ও মুসলিম বিদ্ধেষী ১৫০,০০০ জনের সম্মিলিত একটি দল মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিসাৎ করে শহীদ করে।
১৯৯৪ (২৪ অক্টোবর): সুপ্রিম কোর্ট ইসলাম ফারুকির মামলার রায়ে জানায় , মসজিদ মুসলমানদের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়।
২০০২(এপ্রিল): এলাহাবাদ হাইকোর্টে বিতর্কিত স্থানের মালিকানা সংক্রান্ত মামলার শুনানী শুরু করে।
২০১০ (৩০ সেপ্টেম্ব): এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২:১ সংখ্যাধিক্যের রায়ে বিতর্কিত জমিকে সুন্নী ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রামলালার মধ্যে তিনভাবে ভাগ করার নির্দেশ দেয়।
২০১১ (৯ মে): সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার ভূ’মি বিবাদ নিয়ে এলাহাবাদ হাইকের্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয়। ২০১৭ (২১ মার্চ): সুপ্রিম কোর্টেও তৎকালীন
প্রধান বিচারপতি জে এস খেহার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে কোর্টের বাইরে সমাধান খোঁজার কথা বলেন। ২০১৭ (১ ডিসেম্বর): ২০১০ সালের এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ৩২. জন সিভিল রাইটস অ্যক্টিভিস্ট মামলা করে।
২০১৯ (৮ জানুয়ারি): সুপ্রিম কোট অযোধ্যারবিতর্কিত ভূমি বিবাদ মামলার শুনানীর জন্য প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, শরদ অরবিন্দ বোরদে, এন ভি রমন, ইউ ইউ ললিত ও ধনঞ্জয় ওয়াই চন্দ্রচূড়কে নিয়ে ৫ সদস্যের সংবিধান বেঞ্চ গঠন করে।
২০১৯ (২৫ জানৃুয়ারি): বিচারপতি ইউ ইউ ললিত এই মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোয় সুপ্রিম কোর্ট সংবিধান বেঞ্জ প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, শরদ অরবিন্দ বোরদে, এস আব্দুল নাজির, অশোক ভ’ষন ও ধনঞ্জয় ওয়াই চন্দ্রচূড়কে নিয়ে পুনর্গঠন করে।
২০১৯ (২৬ ফেব্রুয়ারি): সুপ্রিম কোর্ট মধ্যস্থতার কথা জানায়। তিন সদস্যের মথ্যস্থতাকারী কমিটি তৈরি করে দেয়। ২০১৯ (৯ মে): মধ্যস্থতাকারী কমিটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করে।
২০১৯ (১ আগষ্ট): মধ্যস্থতাকারী কমিটি সিলকরা ঘামে আদালতে তাদের রিপোর্ট জমা দেয়।
২০১৯ (৬ আগষ্ট): সুপ্রিম কোর্ট বাবরি মসজিদ ভূমি বিবাদ মামলার প্রতিদিন শুনানীর কথা ঘোষনা করে। ২০১৯ (১৬ অক্টোবর): শুনানী শেষে ঘোষনা করে আদালত রায় সংরক্ষিত রাখে। ২০১৯ (৯ নভেম্বর): চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপ্রধান মীর বাকীর নির্মিত মুসলিম ঐতিহ্যের সাক্ষরবাহী এ বাবরি মসজিদের জমিকে হিন্দুদের জমি বলে ঘোষনা করে।
বাবরি মসজিদ মা’মলার রায়ের বিরু’দ্ধে আপিল করবেন মুসলিমরা

২০১৯, শনিবার বাবরি মসজিদ মা’মলার রায়ের বিরু’দ্ধে আপিল করবেন মুসলিমরা বহুল আলোচিত অযোধ্যার বিতর্কিত বাবরি মসজিদ মা’মলার রায় দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যেখানে আগে বাবরি মসজিদ ছিল, সেখানে তার আগে রাম মন্দির ছিল বলে দাবি করেছিল হিন্দু সংগঠন।
এবার বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের অনুমতি দেওয়ার জন্য মুসলিমদের জন্য মসজিদ নির্মাণে শহরের অন্য জায়গা পাঁচ একর জমি দানের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, বাবরি মসজিদ নিয়ে দেওয়া রায়কে ‘অন্যায্য’ অভিহিত করে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন মুসলিমরা।ভারতের কেন্দ্রীয় ওয়াকফ বোর্ড আপিল করার চিন্তা করছেন বলে জানিয়েছেন তাদের আইনজীবী জাফারিয়াব জিলানি।
তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি এটা অনায্য …আমরা এই রায় মানতে পারছি না। আমরা রায়ের সব অংশের সমালোচনা করছি না।’ তিনি বলেন, “সমস্ত জমি অন্য পক্ষকে দেওয়া ঠিক নয়।আমরা শীর্ষ আদালতকে সম্মান জানাই, আমাদের রায়ের সঙ্গে সহমত না হওয়ার অধিকার আছে। শীর্ষ আদালতে অনেক মা’মলারই রায় বদলে গেছে। এ রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন জানানোর অধিকার আমাদের আছে”।
১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলেন উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা।তাদের বিশ্বাস, ভগবান রামচন্দ্রের জম্মভূমির ওপর তৈরি করা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষে ওপর মসজিদ করা হয়েছে। এ মসজিদটি ভেঙে ফেলার পর সৃষ্ট হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় ২০০০ এরও বেশি মানুষের মৃ’ত্যু হয়েছিল। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ১০দিন পর, লিবারহেন কমিশন তৈরি করা হয় ঘটনার তদন্তে।
২০০৯-এ কমিটি রিপোর্ট জমা দেয়। তাতে নাম ছিল একে আডবানি, অটলবিহারী বাজপেয়ি এবং অন্যান্য বিজেপি নেতাদের, প্রায় ১৭ বছর পর শুরু হয় তদন্ত। ১৫২৮ সালে অযোধ্যায় তৈরি হয় এই বাবরি মসজিদ। হিন্দু সংগঠনের দাবি, একটি মন্দির ধ্বংস করে তার জায়গায় মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে।১৮৫৩ সালে প্রথমবার এই জায়গাটিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িক হিংসা হয়।
১৮৫৯ সালে ইংরেজ প্রশাসন ওই জায়গাটিতে হিন্দু এবং মুসলিমদের প্রার্থনা জন্য ফেন্স লাগিয়ে দেয়, প্রায় ৯০ বছর ধরে এটি ছিল। ১৯৪৯ সালে প্রথমবার জায়গাটিকে নিয়ে মা’মলা হয় মসজিদের পাশে ভগবান রামচন্দ্রের মূর্তি লাগানোর পর। পরে ১৯৮৪ তে রামমন্দির নির্মাণের জন্য একটি কমিটি তৈরি করে হিন্দু সংগঠন। তিন বছর পর, পাঁচ দশক পর মসজিদের গেট খোলার নির্দেশ দেয় জেলা আদালত, এবং “বিতর্কিত নির্মাণের” পাশে হিন্দুদের প্রার্থনার অনুমতি দেওয়া হয়।
১৯৮৯ সালে মন্দির নির্মাণের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয় “বিতর্কিত নির্মাণ” সংলগ্ন জায়গায়। ১৯৯০-এ তৎকালীন বিজেপি সভাপতি লালকৃষ্ণ আডবানি ওই জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের জন্য সমর্থন চেয়ে দেশজুড়ে রথযাত্রা বের করেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস করার অভিযোগ ওঠে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বিরু’দ্ধে। ২০০৩ এর সেপ্টেম্বরে, একটি আদালত জানায় যে, সাতজন হিন্দু নেতা, তারমধ্যে কয়েকজন বিজেপি নেতা, বাবরি মসজিদ ধ্বংসে জন্য বিচারবিভাগের সামনে আসতে হবে।
তবে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী আডবানির বিরুদ্ধে কোনও চার্জ আনা হয়নি। এক বছর পর, উত্তরপ্রদেশের একটি আদালত জানায়, আদালতের দেওয়া ছাড় পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বিজেপি নেতা মুরলি মনোহর জোশী এবং উমা ভারতী বিরু’দ্ধে মা’মলার শুনানি শুরু করে লখনউ আদালত।জুনমাসে, মামলার শুনানি করা বিচারকদের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় সুপ্রিম কোর্ট।
রায়দানের জন্য ৯ মাসের সময়সীমা দেওয়া হয়। ২০০২-এর এপ্রিলে, এলাহাবাদ হাইকোর্টের ৩ বিচারপতির বেঞ্চ, কার হাতে জায়গাটি থাকবে সেই মা’মলার শুনানি শুরু করে। ২০১০ এর সেপ্টেম্বরে, রায়দান করে এলাবাহাদ হাইকোর্ট।সেখানে বলা হয়, বাবরি মসজিদকে তিনভাগে ভাগ করা হবে, একটি যাবে নির্মোহি আখরা, একটি রামলালা এবং অপরটি থাকবে উত্তরপ্রদেশের সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের।
একমাসের মধ্যে, হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় হিন্দু ও মুসলিম সংগঠন। ২০১১ এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট।বেশীদিন নয়, শীর্ষ আদালত জানায়, এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় আশ্চর্যজনক। সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত তিন সদস্যের দল মধ্যস্থতায় ব্যর্থ হওয়ার পর, ৬ অগস্ট দৈনিক শুনানি শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ।
৪০দিন শুনানির পর, ১৬ অগস্ট দৈনিক শুনানি শেষ হয়। এদিকে, রায়ের পর বিশৃ’ঙ্খল পরিস্থিতি যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য ভারতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। জারি করা হয়েছে সতর্কতা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন।
অযোধ্যা মামলা নিয়ে যাতে কোনো গুজব ছড়ানো না হয়, সেদিকে নজর রাখতে প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস দলের বৈঠকের পর বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের রায় যা-ই হোক না কেন, এতে যেন দেশের শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট না হয়।
তিনি সবাইকে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছেন। গত ২০ অক্টোবর থেকে অযোধ্যা শহরে জারি রয়েছে ১৪৪ ধারা।১০ নভেম্বর থেকে এই শহরে জারি হচ্ছে কারফিউ। এই সান্ধ্য আইন অযোধ্যা মা’মলার রায় ঘোষণার পর চার দিন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অযোধ্যার নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে ৪০ কোম্পানি আধা সেনা। উত্তর প্রদেশের ধর্মীয় জায়গাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
