বাড়িতে হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার


উলফাত আরা তিন্নি

নিহতের চাচা হেলাল উদ্দিন জানান, তিন্নির বড় বোন মিন্নির একই গ্রামের নুরুদ্দীনের ছেলে শেখপাড়া বাজারের ব্যবসায়ী জামিরুল ইসলামের সঙ্গে বিয়ে হয়।
সংসারে অশান্তি থাকায় প্রায় এক বছর হলো তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। বিচ্ছেদের কিছুদিন পরই জামিরুল তাঁর স্ত্রীকে আবার ঘরে নিতে চান। কিন্তু মিন্নি এতে রাজি ছিলেন না।
এ কারণে জামিরুল ইসলাম ওই পরিবারের ওপর অত্যাচার–নির্যাতন চালিয়ে আসছিল। বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকায় পরিবারটি একপ্রকার অসহায় হয়ে পড়েছিল।

বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনার বিষয়ে চাচা হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে জামিরুল ইসলাম বেশ কয়েকজন নিয়ে তিন্নিদের বাড়িতে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে তাঁরা ফিরে যান। প্রায় দুই ঘণ্টা পর আবারও জামিরুলরা ওই বাড়িতে আসেন। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় থাকা তিন্নির ঘরে প্রবেশ করেন।

পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তাঁরা তিন্নিকে একা পেয়ে তাঁর ওপর নির্যাতন চালান। তাঁরা তিন্নিকে ধর্ষণ করে হত্যা করেন। হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর জন্য ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে যান। কিন্তু তাঁর পা খাটের সঙ্গে লাগানো ছিল। হেলাল উদ্দিনের দাবি, এভাবে ঝুললে কেউ মারা যাবে না। তাঁকে হত্যার পর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

ঘটনার দিন সে সন্ধ্যার দিকে কুষ্টিয়া থেকে এক বান্ধবীর বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে বাড়ি ফেরার পথে জামিরুল ইসলাম তাকে হুমকি দেয়। সে তাকে ক্ষতি করবে বলে জানায়। তিন্নিকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। হালিমা বেগম, উলফাত আরার মা

বড় বোন মিন্নি বলেন, জামিরুল ইসলাম ও তাঁর লোকজন দোতলায় উঠে তিন্নির সঙ্গে খারাপ কিছু করেছে। তাঁরা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা অবস্থায় তিন্নিকে পেয়ে দ্রুত কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, তাঁকে নিয়ে আসার আগেই তিনি মারা গেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যুর পর বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের আহাজারি। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে।

বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর মৃত্যুর পর বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের আহাজারি। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার শেখপাড়া গ্রামে।পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে ওই ছাত্রীর মৃত্যুর পর কুষ্টিয়া সদর থানার পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এদিকে ঝিনাইদহ পুলিশের একটি দল ছাত্রীর বাড়ি পরিদর্শন করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ছাত্রীর বাড়ির দরজায় কোপানোর চিহ্ন, জানালার গ্লাস ভাঙা দেখতে পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চারজনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।

তিন্নির মা হালিমা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে খুবই মেধাবী। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত নিচ্ছিল। ঘটনার দিন সে সন্ধ্যার দিকে কুষ্টিয়া থেকে এক বান্ধবীর বিয়ের অনুষ্ঠান সেরে বাড়ি ফেরার পথে জামিরুল ইসলাম তাকে হুমকি দেয়। সে তাকে ক্ষতি করবে বলে জানায়।’ তিনি দাবি করেন, তিন্নিকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে আত্মহত্যা। তবে কিছু আলামত পাওয়া গেছে। সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা–নিরীক্ষা পর জানা যাবে আরও কোনো ঘটনা আছে কি না। রুমন রহমান, লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক

তিন্নিরা তিন বোন। তাঁর বাবা ইউসুফ আলী ছিলেন সেনাসদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। তিন্নি বড় বোন আঁখির বিয়ে হয়েছে। মেজ বোন মিন্নির বিয়ে হয়েছিল গ্রামেই। সংসার না হওয়ায় বর্তমানে বাবার বাড়িতেই থাকেন। আর ছোট বোন তিন্নি পড়ালেখা করছিলেন। আশা ছিল, বিসিএস দিয়ে সরকারি বড় কর্মকর্তা হবেন। ঘটনার পর থেকেই জামিরুল ইসলাম পলাতক থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক রুমন রহমান লাশের ময়নাতদন্ত করেন। তিনি সন্ধ্যায় সংবাদকর্মীকে বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে আত্মহত্যা। তবে কিছু আলামত পাওয়া গেছে। সেগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষা–নিরীক্ষা পর জানা যাবে আরও কোনো ঘটনা আছে কি না। ওই প্রতিবেদন পেলে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।

বিষয়টি নিয়ে শৈলকুপা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম জানান, তিন্নির মৃত্যুটি এখনো রহস্যজনক। তাঁর পরিবারে যে সমস্যা চলছিল, তা পুলিশকে আগে বলা হয়নি, জানলে এ–জাতীয় ঘটনা হয়তো ঘটত না। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতের ঘটনাও প্রথমে পুলিশকে জানানো হয়নি, পরে তাঁরা খবর পেয়ে সেখানে গেছেন।

এখন তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ডাক্তারি পরীক্ষার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে, কীভাবে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঘটনার আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে যাঁরাই জড়িত থাক, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *