☆ সেদিন (৪ এপ্রিল ‘৭১) যদি জেনারেল ওসমানীর নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দুর্ধর্ষ, দুঃসাহসী, নির্ভীক, নিখাঁদ দেশপ্রেমিক তরুণ বাঙালী অফিসারগণ সম্মিলিত হয়ে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে বৈঠক করতে না পারতেন, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের পুরো নেতৃত্ব হয়তো ইন্ডিয়ান আর্মীর হাতে চলে যেতো বলেই আমার বিশ্বাস।☆ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ব্যতীত ইন্ডিয়ার পক্ষে পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা এত সহজসাধ্য কখনো হতো না। দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধে এক সময় ধৈর্য্যহারা হয়ে যে কোন পক্ষ রণেভঙ্গ হয়ে পিছ পা হতো এবং জাতি হিসেবে আমরা কোন অবস্থায় থাকতাম তা কেবলমাত্র সৃষ্টিকর্তাই ভাল জানবেন।
☆ তাই, হে আমাদের অগ্রজ দুঃসাহসী, নির্ভীক, নিখাঁদ দেশপ্রেমিক সেনা অফিসারগণ ! অজস্র শ্রদ্ধা, সম্মান, হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা তোমাদের প্রতি। তোমাদের তথা সেনাবাহিনীর সে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মত্যাগের ৠণ এ জাতি কোনদিন শোধ করতে পারবে না। মহান আল্লাহ্ সুবাহানু ওয়া তায়ালা তোমাদেরকে ইহজগতে ও পরকালের জীবন পরম সুখে-শান্তিতে ভরপুর রাখুন, আমীন। Syed Muhammad Ibrahim; Azizur Rahman Bir Uttam, Alm Fazlur Rahman, Jamil D Ahsan BP, M Shamsul Amin, Maj Gen AR Rokonuddawla, M Abdul Hai.

☆☆ পাকিস্তানি শাসন-শোষণের নাগপাস হতে মুক্ত হয়ে স্বাধীন হবার আকাঙ্খা তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়া শুরু করলো ৭ই মার্চ তারিখে সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর। রাজনৈতিক আন্দোলন যেমন এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ছাত্র ও রাজনীতিবিদগণ, সামরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি বেগবান করে যাচ্ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যগণ। যার নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল মুহাম্মদ ইশফাকুল মজিদ ও কর্ণেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানি। এ দু’জন পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের বিভিন্ন গোপন খবর গোপণে জানতে পারছিলেন পাকিস্তানে অবস্থানরত সিনিয়র বাঙালী জেনারেল খাঁজা ওয়াসিউদ্দিনের কাছ হতে। তাঁরা গোপণে গোপণে বহু বৈঠক করে যাচ্ছিলেন এবং অবসরপ্রাপ্তদের ঐক্যবদ্ধ করতে শুরু করেছিলেন সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য। জেনারেল মজিদ ও কর্ণেল ওসমানী যখন বুঝতে পারলেন যে, বঙ্গবন্ধুর সাথে ভূট্টো ও ইয়াহিয়া খানের বৈঠক কেবল পাকিস্তানিদের সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য সময় ক্ষেপনের পন্থা,তাই ২৩শে মার্চ জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকারমের উত্তর প্লাজায় তাঁরা অবসরীদের নিয়ে আয়োজন করলেন স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিশাল এক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। দু’জনের জ্বালাময়ী বক্তব্যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হলো সকলের মধ্যে। দেশ ম্বাধীন করার দৃপ্ত শপথের পর তাঁরা মার্চপাস্ট করে রওনা দিলেন ৩২ ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের উদ্দেশ্যে। বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিলেন স্বাধীনতার তরবারি। এরপর পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেফতার হলেন জেনারেল ইশফাকুল মজিদ। কোন রকমে গ্রেফতার এড়িয়ে ২৫শে মার্চ রাতে ওসমানি পালিয়ে গেলেন কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় এবং সেখান থেকে কুমিল্লা, ব্রাম্মনবাড়িয়া হয়ে আগরতলা।

☆☆ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ঘোষণা: ২৫শে মার্চ গভীর রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে আক্রমণ চালায় নিরীহ জনগণের উপর এবং শুরু করে নির্বিচারে গণহত্যা। এ সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৮টি ব্যাটালিয়নের মধ্যে মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের লাহোর,করাচিতে ছিল তিনটি ব্যাটালিয়ন, বাকি ৫টির অবস্থান ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। এই ৫টি ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়কদের মধ্যে দু’জন ছিলেন বাঙালী। বাকি তিনজন পাকিস্তানী উর্দুভাষী অবাঙালী। বাকি দুই ব্যাটালিয়নের দুই অধিনায়কই পাকিস্তানীদের কাছে প্রচন্ড চাঁপের মুখে আত্মসমর্পণ করেন এবং বহু সদস্য পাকিস্তানীদের হাতে শহীদ হন। কিন্তু বাকি বাঙালী অফিসার ও সৈনিকদের নিয়ে এ ৫টি ব্যাটালিয়নই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গল, জয়দেবপুরে ২য় ইস্ট বেঙ্গল, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল,২৮ মার্চ সৈয়দপুরে ৩য় ইস্ট বেঙ্গল গণহত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং প্রতিরোধ সংগ্রামে লিপ্ত হয়। চট্টগ্রামে ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ৫টি ইউনিট পাঁচ স্থানে। যুদ্ধ তো এতো সহজ বিষয় নয়। একটি শক্তিশালী দানবের মতো শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ তো বিচ্ছিন্ন ভাবে চালিয়ে যাওয়া যায় না।সফলকাম হওয়া বা শত্রুকে পরাজিত করার অদম্য লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন করার জন্য একক নেতৃত্বের অধীনে ঐক্যবদ্ধ ভাবে মোকাবেলা করার ভীষণ প্রয়োজন ছিল সে সময়ে। তদুপরি, যুদ্ধের ময়দানে তখন পাঁচটি ইউনিটের কমান্ডই ছিল মেজর ও ক্যাপ্টেনগণের হাতে। তাঁদের জন্য মহান আল্লাহ্-র অশেষ রহমতে সে সুবর্ণ সুযোগের সৃষ্টি হয়। জেনারেল ইশফাকুল মজিদ গ্রেফতার হবার ফলে তখন সর্বজ্যেষ্ট সামরিক অফিসার ছিলেন কর্ণেল ওসমানী। যিনি ২য় বিশ্বযুদ্ধ,কাশ্মিরযুদ্ধ ও ৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কমান্ডার। তিনি এবং অন্য সকল অফিসারগণ একটি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সরকারের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে ৪ঠা এপ্রিল একত্রিত হবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

☆ উল্লেখ্য যে, ২৫শে মার্চের পর বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হবার আগে থেকেই সকল রাজনীতিবিদগণ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া শুরু করেছিলেন। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার পর পুরো জাতিই নেতৃত্ব শূণ্য হয়ে এক মহা-অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। এমনই এক পরিস্থিতিতে মহান আল্লাহ্-র রহমত নাজিল হয় বাংলাদেশের উপর।
☆☆ ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়ার ঐতিহাসিক দিন: ২৫শে মার্চের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ৪ঠা এপ্রিল ও ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল তেলিয়াপাড়া। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মাধবপুর থানার অন্তর্গত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক কিংবা তেলিয়াপাড়া রেলস্টেশন থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার অভ্যন্তরে ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা স্থানে অবস্থিত তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ম্যানেজার বাংলো। এ বাংলোয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বৈঠক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ম্যানেজারের নাম মুহাম্মদ আবদুল করিম এবং আরেকজন করিৎকর্মা ব্যক্তি ছিলেন মুহাম্মদ আবদুর রফিক (যার ছেলে এম এ মোনায়েম বর্তমানে পদ্মা সেতুর কন্সালটেন্ট ইঞ্জিনিয়ার পদ্মা), যিনি কো-অরিডনেটরের ভুমিকা পালন করেন। এখানে উপস্থিত হন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উধ্বর্তন কর্মকর্তাসহ ২৭জন বীর সেনানী, যারা ছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠক অকুতোভয় সিপাহ্সালার।
☆ পূর্ব থেকেই এখানে অবস্থানরত মেজর খালেদ মোশারফ স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা দেওয়ান আশ্রাফ আলীকে তেলিয়াপাড়া চা-বাগান হতে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে যাওয়ার মত একটি রাস্তা তৈরি করার নির্দেশ দেন। নির্দেশ মতো চা-বাগানের শ্রমিকদের দিয়ে জঙ্গল কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়। ২ এপ্রিল কর্ণেল ওসমানী প্রথম সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলায় পৌঁছেন। ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশারফ তাঁর সদর দপ্তর প্রথমে মাধবপুর ডাকবাংলায় স্থাপন করেন। সেখান থেকে পূর্ব যোগাযোগের ভিত্তিতে সীমান্ত এলাকায় তেলিয়াপাড়া বিওপি-এর কাছে ভারতীয় বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় হয়। উভয় পক্ষের আলোচনায় ৪ এপ্রিল তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার বাংলোতে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। তিনি ভারতীয় বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডের সহযোগিতায় বাংলাদেশেরে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সেনা কর্মকর্তা ও ভারতীয় সরকারের প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করেন। তাঁর আহবানে সাঁড়া দিয়ে প্রথমে ২য় ইস্ট বেঙ্গলের অধিনায়ক মেজর কে এম সফিউল্লাহ ১লা এপ্রিল তেলিয়াপাড়া এসে ৪র্থ বেঙ্গলের সাথে যৌথভাবে সদর দপ্তর স্থাপন করেন। ইতোমধ্যে তেলিয়াপাড়ায় কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা সমবেত হন।
☆☆ ১লা এপ্রিল বিকেলে ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে তেলিয়াপাড়া হেড কোয়ার্টারে লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম রেজা, মেজর কে এম সফিউল্লাহ,মেজর খালেদ মোশাররফ ও মেজর শাফায়াত জামিলের সঙ্গে দেখা করে কর্নেল ওসমানীর সীমান্ত অতিক্রম ও ৮ম ইস্ট বেঙ্গলের বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী মেজর জিয়াউর রহমানের রামগড়ে অবস্থান নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাবার সংবাদ দেন। ২রা এপ্রিল তেলিয়াপাড়া সীমান্তের ‘নো ম্যানস্’ ল্যান্ডে বিএসএফ-এর আইজি এবং আগরতলার ডিসি মিঃ সায়গল এসে মেজর খালেদ মোশারফ এবং মেজর শাফায়াত জামিলের সাথে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করেন। ৪ এপ্রিল সকালের মধ্যেই সেনা কর্মকর্তাদের সকলে তেলিয়াপাড়া বাংলোতে উপস্থিত হন। ১০টার দিকে ভারতীয় বিএসএফ-এর পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে ও আগরতলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমেস সায়গল বেঙ্গল রেজিমেন্টের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীকে সঙ্গে নিয়ে তেলিয়াপাড়াস্থ সেনা সদরে এসে উপস্থিত হন। সকাল ১১টায় শুরু হয় ঐতিহাসিক সভার কার্যক্রম ।
☆ ঐতিহাসিক ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন কর্নেল ওসমানী, এমএনএ, লেঃ কর্নেল (অবঃ) এম এ রব, এমএনএ, লেঃ কর্নেল সালাউদ্দীন মোহাম্মদ রেজা, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর কাজী মুহাম্মদ সফিউল্লাহ,মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন নাসিম, ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিন, ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুইয়া, লেঃ হেলাল মোর্শেদ খান, লেঃ নাসিরউদ্দিন, লেঃ মাহবুব, লেঃ আনিস, লেঃ সেলিম, লেঃ সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহীম প্রমুখ। এ ছাড়াও এখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিদ্রোহী মহুকুমা প্রশাসক কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ (পরবর্তীতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার)। ভারত সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএসএফের পূর্বাঞ্চলীয় মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভি সি পাণ্ডে, ব্রিগেডিয়ার শুভ্রমানিয়ম,কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী এবং আগরতলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ওমেস সায়গল। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মৌলানা আসাদ আলী, এমএনএ, মোস্তফা আলী, এমএনএ, মানিক চৌধুরী এমএনএ, এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, এমএনএ ।
☆☆ সভার কার্যক্রম শুরু হলে এর লক্ষ্য ও বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ। ঐতিহাসিক এ সভায় সর্বসম্মতিক্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়,যা ছিল নিম্নরূপ:
১. অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ: সভায় উপস্থিত সেনা কর্মকর্তাগণ সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্রিগেডিয়ার পান্ডের কাছে অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এবং রেশন সরবরাহের আবেদন জানান। এ ব্যাপারে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি সাপেক্ষে সীমিত আকারে হালকা অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ সরবরাহের আশ্বাস দেন।
২. সীমান্তবর্তী ভূখন্ড ব্যবহারের অনুমতি: মুক্তিকামী হাজার হাজার ছাত্র ও যুবকের সামরিক প্রশিক্ষণদানের লক্ষে সীমান্তবর্তী ভারতীয় ভূখন্ড- ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় আসে। এ ব্যাপারে সভায় উপস্থিত আগরতলার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব সায়গাল ভারতীয় ভূখন্ডে মুক্তিবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং শরনার্থী শিবির স্থাপনের ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
৩. সর্বাধিনায়ক হিসেবে কর্নেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে নির্বাচিত ও একক কমান্ড চ্যানেল প্রতিষ্ঠা: সভায় বিদ্রোহী বাহিনীর সদস্যদের একটি কমান্ড চ্যানেলে এনে সমম্বিত প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। সর্বসম্মতিক্রমে বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল ওসমানীকে সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়।
৪. মনিটরিং সেল গঠন: ব্রিগেডিয়ার পান্ডে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় যুদ্ধরত বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কোথায় কী ধরনের সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চলছে তা নিয়মিত মনিটরিং করার দায়িত্ব নেন। তিনি সীমান্তবর্তী বিএসএফ-এর কর্মকর্তাদের বিদ্রোহী বাহিনীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সাহায্যের নির্দেশ দিবেন বলেও আশ্বাস দেন।
৫. চারটি সামরিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা: উপস্থিত বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাগণ এদিনের কনফারেন্সে দেশটিকে ৪টি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করে প্রতিটি অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার জন্য একজন করে সেনা কর্মকর্তা নির্বাচিত করেন।
৬. দায়িত্ব বন্টন: বৃহত্তর চট্টগ্রাম,পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার পূর্বাঞ্চল নিয়ে গঠিত এলাকার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর জিয়াউর রহমানকে। বৃহত্তর কুমিল্লা,ঢাকা ও নোয়াখালী জেলার পশ্চিমাঞ্চল নিয়ে গঠিত অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর খালেদ মোশাররফকে। বৃহত্তর সিলেট এবং ময়মনসিংহ জেলার পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর সফিউল্লাহকে। বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর ও ফরিদপুর জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর আবু ওসমান চৌধুরীকে।
৭. জিয়াউর রহমানের সৈন্য বৃদ্ধি: চট্টগ্রাম বিদ্রোহে নেতৃত্বদানকারী মেজর জিয়াউর রহমানের সাহায্যার্থে ঐদিনই ক্যাপ্টেন মতিনের নেতৃত্বে ৪ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘বি’ কোম্পানি এবং ক্যাপ্টেন এজাজের নেতৃত্বে ২ ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘সি’ কোম্পানি রামগড়ের উদ্দেশ্যে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার পান্ডে ঐ রাতেই বিএসএফ-এর গাড়ি দিয়ে এ দু’টি কোম্পানিকে ভারতীয় এলাকা হয়ে রামগড়ে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেন।
৮. প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রস্তাব: উক্ত সভায় বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর বাঙালি সেনা সদস্যদের বিদ্রোহকে আইনানুগ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য সীমান্ত অতিক্রমকারী জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
৯. কর্নেল ওসমানীকে রাজনৈতিক সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব অর্পণ: সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কর্নেল এম এ জি ওসমানী একজন নির্বাচিত এমএনএ বিধায় তাঁকে শীঘ্রই সীমান্ত অতিক্রমকারী অন্যান্য গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়। ভারতীয় বিএসএফ প্রধান রুস্তামজী, ব্রিগেডিয়ার ভি সি পান্ডে এবং আগরতলার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট এ ব্যাপারে কর্নেল ওসমানীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন বলে জানান।
১০. পরবর্তী পর্যালোচনা বৈঠকের সিদ্ধান্ত : এ বৈঠকে আলোচ্য বিষয়গুলোর কার্যকারিতা পর্যালোচনার জন্য ১০ই এপ্রিল একই স্থানে আরেকটি কনফারেন্স অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
☆ এ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ সরকার গঠনের আগে। তাই নিকট অতীতে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার উদাহরণ বিশ্লেষণ করে সভার লিখিতাকারে কোনো সিদ্ধান্ত সংরক্ষণ করা হয়নি। মৌখিকভাবে বাহিনীর সংগঠন, নেতৃত্ব ও যুদ্ধ পরিচালনার যে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পায়। ১১ এপ্রিল নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেতার ভাষণে এই সভার সিদ্ধান্তের কিছু অংশ উচ্চারিত হয়েছিল। পরে এই সভার সিদ্ধান্তগুলোকে পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংশোধন, সংযোজনের মাধ্যমে আরও সময়োপযোগী করে তোলা হয়। এ সভা আমাদের বাহিনীকে সাংগঠনিক ধারণা দেয় এবং তা মুক্তিবাহিনী পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
☆☆ ওই বৈঠক শেষে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী নিজের পিস্তল থেকে ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। দেশকে স্বাধীন করার শপথবাক্যও সকলকে পাঠ করান তিনি। এই সভাতেই একটি রাজনৈতিক সরকার গঠনের উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
☆☆ তেলিয়াপাড়ায় দ্বিতীয় সেনা বৈঠক:
☆৪ঠা এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্তানুযায়ী ১০ই এপ্রিল তেলিয়াপাড়ায় ২য় সেনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১ম সভায় উপস্থিত প্রায় সকলেই উক্ত সভায় উপস্থিত ছিলেন। এ সভাটি ১ম সভার সিদ্ধান্ত মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল। উক্ত সভার সিদ্ধান্ত ছিল :
☆ সভার শুরুতেই কর্নেল এম এ জি ওসমানীর কাছে গণপ্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠনের ব্যাপারে তিনি কতদূর অগ্রসর হয়েছেন,তা জানাতে অনুরোধ করা হলে তিনি জানান,এ বিষয়টি নিয়ে সীমান্ত অতিক্রমকারী বেশ কিছু সংখ্যক এমএনএ এবং এমপিএ-এর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। অধিকাংশ গণপ্রতিনিধিই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছেন। জনাব তাজউদ্দীন আহমেদ শীঘ্রই একটি বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দিবেন বলে তাঁকে আশ্বস্থ করেছেন।
☆ বিক্ষিপ্ত সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধটিকে সমম্বিত এ্যাকশনে রূপ দেয়া এবং কমান্ড চ্যানেলে আনার লক্ষ্যে এদিন পুরো দেশটিকে ৪টির স্থলে ৬টি সামরিক অঞ্চলে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন দু’টি সামরিক অঞ্চলের মধ্যে বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অংশ বিশেষ নিয়ে গঠিত অঞ্চলের যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয় ক্যাপ্টেন নওয়াজেশ উদ্দিনকে। বৃহত্তর রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়া জেলা নিয়ে গঠিত অঞ্চলের সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ চালিয়ে নেবার দায়িত্ব দেয়া হয় মেজর নাজমুল হককে। ৬টি অঞ্চলের কমান্ডারদেরকে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার বিদ্রোহী বাহিনীর সদস্যদেরকে একটি কমান্ড চ্যানেলে এনে সমম্বিত এ্যাকশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।
☆ সভায় ভারতীয় প্রতিনিধিগণ জানান যে, এরই মধ্যে বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার ছাত্র ও যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করার লক্ষ্যে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় অবস্থান নিতে শুরু করেছে। এদের জন্য ইতোমধ্যেই অস্থায়ীভাবে বেশ কিছু ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে। শরনার্থীদের জন্যও ক্যাম্প স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। বিভিন্ন রণাঙ্গনে বিএসএফ-এর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীকে বেশ কিছু অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ সরবরাহ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও বিএসএফ-এর সৈন্যরা বিদ্রোহী বাহিনীর সহযোগিতায় অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠনের পর পরই ভারতীয় পক্ষ থেকে সাহায্যের পরিমাণ বাড়বে বলে ব্রিগেডিয়ার পান্ডে সকলকে অবহিত করেন।
☆ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির ব্যাপারটিও ঐ দিনের আলোচনায় ছিল। এ ব্যাপারে ভারতীয় প্রচার মাধ্যম গুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশ্বাস দেয়া হয়।
☆☆☆ চরম দূর্দশাগ্রস্থ দেশের ক্রান্তিকালে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানে অনুষ্ঠিত সেই সভা দু’টি কেবল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে কেবল সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রথম সমম্বয় সভাই নয়, বরং মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ভিত রচনার ক্ষেত্রে প্রথম মাইলফলক হিসেবেও চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তরেুণ সেনা অফিসারগণের অত্যন্ত দূরদর্শী ও তড়িৎ সিদ্ধান্ত দেশকে স্বাধীন করার জন্য নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তেলিয়াপাড়া চা-বাগান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিসাক্ষী ও টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চির উজ্জ্বল করবে ইতিহাসের পাতাকে।
☆ যে কোন অনিচ্ছাকৃত ভুলকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য অনুরোধ করছি।
সুত্র: রণাঙ্গণের সম্মুখসারীর মুক্তিযোদ্ধাগণের সাক্ষাৎকার, তাঁদের রচিত বই ও পুরাতন পত্রিকায় ছাঁপানো বিভিন্ন প্রবন্ধ অবলম্বনে।
-কর্ণেল মোহাম্মদ আবদুল হক, পিএসসি (অবঃ)
-২২শে মার্চ ২০২১
Like
Comment
