১ম পর্ব:
☆ ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সামরিক সরকারের নীতি নির্ধারণী বডির মধ্যে এমন একজন সিনিয়র দূরদর্শী বাঙ্গালি সামরিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি দেশ নিয়ে, দেশের স্বাধীকার নিয়ে, আমাদের অধিকার নিয়ে, পরাধীনতার গ্লানী হতে দেশকে মুক্ত করার জন্য নিজের জীবনের রিস্ক নিয়ে পরিকল্পনা করেছিলেন যুদ্ধ ব্যতিত দেশকে স্বাধীন করার। তিনি অনেকের আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইয়াহিয়া ও কুচক্রী ভূট্টো গংরা পাকিস্তানের নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যার পরিকল্পনা নিয়ে সময় ক্ষেপণ করছিলেন । বিজ্ঞ রাজনীতিকগণ তা বুঝে উঠতে না পারলেও সুদক্ষ সামরিক নেতা ও বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি ও নিকটস্থ সহকর্মীগণ তা স্পষ্ট ভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। আর সামরিক পোষাকের দুঃসাহসী নিঁখাদ দেশপ্রেমিক সেই ব্যক্তিত্বটি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুর রহমান মজুমদার। যিনি এম আর মজুমদার নামেও পরিচিত। বঙ্গবন্ধু যদি তাঁর পরিকল্পনাটি অনুমোদন করতেন, তাহলে স্বল্প সংখ্যক পাকিস্তানি সেনাদলকে বন্দী করে একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতেই হয়তো দেশ স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল !
☆ ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরিরত সর্বজ্যেষ্ট বাঙালি অফিসার ছিলেন চারজন । জ্যেষ্টতাক্রমে তাঁরা হলেন:
১. লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসি উদ্দিন (২০ মার্চ ১৯২০- ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৯২);
২. মেজর জেনারেল মুহাম্মদ ইস্কান্দার আল করিম (এম আই করিম), জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (২৩ নভেম্বর ১৯২৪- ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮) ।
৩. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহমুদুর রহমান মজুমদার (২৫ ডিসেম্বর ১৯২২ – ১৯ ডিসেম্বর ২০১১);
৪. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমান (১ জানুয়ারি ১৯২৭-২০ এপ্রিল ২০০৯)।
☆ ইতোপূর্বে প্রথমজনকে নিয়ে লিখেছি; এবার তৃতীয় জনকে নিয়ে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে আমাদের সেনাবাহিনীর অনবদ্য অবদানে অনন্য ও অসাধারণ ভুমিকা রেখেছেন মরহুম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম আর মজুমদার। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে চট্টগ্রামের সামরিক আইন প্রশাসক, ফর্মেশন কমান্ডার, স্টেশন কমান্ডার, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কমান্ড্যান্ট ছিলেন। সে সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তথা সামরিক সরকারের মধ্যে তিনি ছিলেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং পূর্ব পাকিস্তানে জ্যেষ্ঠতম বাঙালি সামরিক অফিসার। ফর্মেশন কমান্ডার হিসেবে তিনি সরকারের অনেক অতি গোপনীয় তথ্য জানতে পারতেন।

শুরুতে পাকিস্তানিরা এটি টের পায়নি বা বুঝতে পারেনি; ফলে ততদিনে তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রায় প্রস্তুতি পর্যন্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক বা প্রস্তুতি পর্যায়ের তিনি হলেন অন্যতম পরিকল্পনাকারী। দেশের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সকল দুঃসাহসীক কাজই উনি নির্দ্ধিধায় করেছেন। তিনি ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানি স্বল্পসংখ্যক সামরিক উপস্থিতির সময় তাদেরকে বন্দী বা হত্যা করে স্বাধীকার অর্জনের পরিকল্পনা, সেনাবাহিনীর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করে “সোয়াত” জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস না করে বিঘ্ন সৃষ্টি ও বিদ্রোহের পরিকল্পনা করার কারণে শুধু অপসারিতই হননি, এর জন্য তাঁকে জীবনের অত্যন্ত কঠিন মাশুল দিতে হয়েছে। তাঁর উপর এমন অকল্পনীয়, অবর্ণণীয়, নির্মম, নিষ্ঠুর ও নৃশংস অত্যাচার চালানো হয়েছে যা আমেরিকা কর্তৃক গোয়ান্তানামো বে কারাগারের বন্দী নির্যাতনকেও হার মানায়।
☆ ১৯২২ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারিখে তৎকালীন ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাড় জেলার কাঠিহড়া থানার চন্ডিনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এম আর মজুমদার মজুমদার। তার পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায় কসকনকপুর ইউনিয়নের বলরামের চক গ্রামে। পিতার নাম ওয়াজেদ আলী মজুমদার। বাবা ওয়াজেদ আলী মজুমদারের ছিল ছয় ছেলে। বড় ছেলে সাজ্জাদ মজুমদার ছিলেন ডেপুটি কমিশনার; ব্রিগেডিয়ার মজুমদার ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে সিলেট এম.সি কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। শিক্ষা জীবন শেষে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে দ্বিতীয় গ্রাজুয়েট কোর্সে যোগদান করেন এবং পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৪৯ সালের ৩০ জুলাই পাঞ্জাব রেজিমেন্টে কমিশন কমিশন লাভ করেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিনি একজন সুদক্ষ পেশাদার, চৌকস অফিসার হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে শিয়ালকোট সেক্টরে দুর্ধর্ষ সমরনায়ক হিসেবে বীরত্ত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং মারাত্মক ভাবে আহত হন। অসম সাহসীকতার জন্য রা রাষ্ট্রীয় সম্মানসূচক “টিকিউ” (তগমায়ে কায়েদে আযম) পদক লাভ করেন। ১৯৬৯ সালে ব্রিগেডিয়ার পদে পদোন্নতি লাভ করেন।
☆ ১৯৭১ সালে তিনি চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের (ইবিআরসি) কমান্ড্যান্ট হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন এবং ব্রিগেডিয়ার মজুমদারই ছিলেন সেসময়ে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা কর্মকর্তা এবং একমাত্র বাঙালি ফর্মেশন কমান্ডার। জ্যেষ্ট সামরিক কমান্ডার হিসেবে পাকিস্তান সরকারের অনেক অতি গোপনীয় (Top Secret) তথ্য জানতে পারেন। তাছাড়া পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত সিনিয়র বাঙালি অফিসার লেঃ কর্ণেল মুহাম্মদ খলিলুর রহমানও (পরবর্তীতে মেজর জেনারেল ও মহাপরিচালক বাংলাদেশ রাইফেলস) অনেক তথ্য তাঁকে জানাতেন। যা তিনি জেনারেল ওসমানির মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সাথে শেয়ার করতেন। সেনা কর্তৃপক্ষের অগোচরে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা সংক্রান্ত অতি গোপনীয় চিঠির একটি কপি তার হস্তগত হয়; যা তিনি বঙ্গবন্ধুর নিকট পাঠিয়ে দেন।

ফলে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সামরিক সরকারের গোপণ পরিকল্পনা অবহিত হয়ে সহজে নিজস্ব পরিকল্পনা প্রণয়ন করতেন । মরহুম এম আর মজুমদারের নিজস্ব বর্ণনা, “পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ছয় দফা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য ঢাকায় আসেন।
শেখ মুজিবের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেন তিনি। ইয়াহিয়া ছয় দফা মেনে নিতে মৌখিকভাবে রাজি হন। করাচি ফেরার পথে ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘শেখ মুজিবই পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী।’পাঞ্জাব রেজিমেন্টে তথা পশ্চিম পাকিস্তানে আমার দীর্ঘ ১৮ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে এ কথা বিশ্বাস করতে পারলাম না।
ভাবলাম, ২৩ বছর ধরে বাঙালিদের ওপর প্রত্যক্ষভাবে আধিপত্যকারী পশ্চিম পাকিস্তানি আমলা ও সেনা কর্মকর্তারা খাঁটি বাঙালি শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফাভিত্তিক একচ্ছত্র শাসন কক্ষনো মেনে নেবে না! করাচি ফিরে ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর আমন্ত্রণে সপারিষদ সিন্ধু প্রদেশের লারকানা শহরে গেলেন। আমার মনে সন্দেহ হলো যে, লারকানায় ভুট্টোর রাজকীয় আতিথেয়তার আড়ালে নিশ্চিয়ই বাঙালি ও মুজিববিরোধী কোনো অভিযানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
লেঃ কর্নেল খলিলুর রহমান এ সময় জিএইচকিউ ট্রেনিং উইংয়ে জিএসও-১ ছিলেন। উনি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খুবই আগ্রহী এবং উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাঁর সাথে টেলিফোনে প্রায়ই কথাবার্তা হতো। উনি আমাকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাধারণত জিএইচকিউতে আসেন না। অথচ লারকানা থেকে ফিরে ইয়াহিয়া খানকে দু-তিন দিন ধরে জিএইচকিউতে দেখতেছি। এখানে জেনারেল হামিদ, পিরজাদা, গুল হাসান এবং ওমরকে নিয়ে রুদ্ধ কামরায় মিটিং করেছেন। নিশ্চয় ওরা কিছু একটা ঘোট পাকাচ্ছে।’
এ অবস্থার মধ্যে একদিন জিএইচকিউ থেকে দীর্ঘ দুই পাতার একটি টপ সিক্রেট চিঠি পেলাম। চিঠি পড়ে মর্মাহত হলাম। চিঠিতে লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগের ছয় দফার ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব মেনে নিলে বাঙালির প্রাধান্যে এটি একটি তৃতীয় শ্রেণীর সেনাবাহিনীতে পরিণত হবে। বিস্তৃতভাবে এসব কথা বর্ণনার পর উপসংহারে লেখা হয়েছে, এমতাবস্থায় শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া যায় না।

তাহলে আমরা আর পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে থাকব না, আমরা স্বাধীন হব। প্রয়োজনে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনবো- এ ছিল আমার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। আমার একান্ত বিশ্বস্ত চিফ ইন্সট্রাক্টর লেঃ কর্নেল মুজিবর রহমান চৌধুরীকে আমার অফিসে ডেকে পাঠালাম। তাকে চিঠি পড়তে দিলাম। এ নিয়ে দুজনে আলোচনা করলাম। ঠিক হলো, কর্নেল (অব.) এম এ জি ওসমানীর মাধ্যমে শেখ মুজিবকে যথাশিগগির বিষয়টি অবহিত করতে হবে।”
☆ অতঃপর ব্রিগেডিয়ার মজুমদার পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সামরিক বাহিনী, ইপিআর, পুলিশ ও আনসার বাহিনীর চাকরিরত ও অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি সদস্যদের একটি তালিকা প্রণয়ন করেন। যাদের নিয়ে মাত্র কয়েকশ’ পাকিস্তানি সৈন্য (জানুয়ারি ’৭১) বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও তাদের ওপর আক্রমণ করার দুঃসাহসীক এক পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন এবং সেটা অনুমোদনের জন্য কর্নেল ওসমানীর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠান। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হয়তো বৃহত্তর বিবেচনায় তা অনুমোদন করেননি।
এ প্রসঙ্গে এম আর মজুমদারের বক্তব্য হলো, “ওসমানী সাহেবকে টেলিফোনে সিলেটি ভাষায় কিছু ইঙ্গিত দিয়ে যত শিগগির সম্ভব চট্টগ্রাম শহরে লেঃ কর্নেল রবের বাসায় গোপনে আসতে বলি। পূর্ব পাকিস্তানে তখন পূর্ব পাকিস্তানি ও পশ্চিম পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও অবস্থানের মৌখিক হিসাব কষতে বসলাম আমরা। দেখা গেল, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ, আনসার মিলে তাৎক্ষণিক স্ট্রাইকিং ফোর্স পশ্চিম পাকিস্তানিদের চেয়ে আমাদের সাত-আট গুণ বেশি।

অতএব, স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য অবিলম্বে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। দুই দিন পর ওসমানী সাহেব এলেন। তাঁকে আমি জিএইচকিউ থেকে পাওয়া টপ সিক্রেট চিঠির বিষয়বস্তু জানালাম। বললাম, ইয়াহিয়া, মুজিব, ভুট্টো বৈঠক ও কাঁদা ছোড়াছুড়ি করে একে অন্যকে খেপিয়ে সংসদ অধিবেশন বিলম্বিত করার আড়ালে বাঙালিদের সামরিক বাহিনী দিয়ে দমন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে জিএইচকিউ। পশ্চিম পকিস্তান থেকে রিইনফোর্সমেন্ট আনার আগেই অকস্মাৎ আমাদের আক্রমণ করতে হবে।”
☆ রাজনৈতিক নেতা ও সামরিক নেতার সমস্যা সমাধানের মধ্যে পার্থক্য হলো, প্রথমজন আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান চান; আর দ্বিতীয়জন চান যত দ্রুত সম্ভব শত্রুকে ঘায়েল করে সমাধান। তবে ’৭১ সালের জানুয়ারির পর হতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে কেবল সময়ক্ষেপণ করছিলেন সামরিক প্রস্তুতি নেয়ার জন্য, প্রকৃতপক্ষে এটা ছিল একটি সামরিক সমস্যা, যা সামরিক উপায়েই সমাধান করতে হয়। এবং এটি ব্রিগেডিয়ার মজুমদার একজন সামরিক নেতা হিসেবে বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং জেনারেল ওসমানীর মাধ্যমে তা বঙ্গবন্ধুর নিকট তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কুটচক্রী ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনার নাম করে এমন ভাবে ব্যতিব্যস্ত রেখেছিলেন যে, বঙ্গবন্ধু যাতে জেনারেল ওসমানী বা তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী কারোরই সাথে একান্ত আলোচনা বা মত বিনিময়ের সময় না পান।
☆ ২৫শে মার্চ অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে গণহত্যা চালানোর জন্য ‘সোয়াত’ নামক জাহাজে করে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারূদ পাকিস্তান হতে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে মার্চের মাঝামাঝি। সেসময়ে বাঙালিদের তুলনায় পাকিস্তানি সৈন্যসংখ্যা ছিল একেবারেই কম। এ বিশাল অস্র ভান্ডার যাতে খালাস করা না হয় সে জন্য এমআর মজুমদার নানা টালবাহানা করছিলেন, যা পাকিস্তানিরা বুঝতে পেরেছিল। ফলে ২৪শে মার্চ পাক সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কোয়ার্টার মাষ্টার জেনারেল (কিউএমজি)আবু ওসমান মিঠা খান চট্টগ্রামে চলে আসেন এবং এম আর মজুমদারকে নিয়ে বন্দরে আসেন।
মেজর জেনারেল মিঠা এম আর মজুমদারকে অস্র ভান্ডার খালাস করার জন্য চাঁপ প্রয়োগ করলে তিনি জানান যে, “সোয়াত’ হতে এখন অস্ত্রশস্ত্র নামাতে গেলে শ্রমিক ও জনতার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এ ক্ষেত্রে উত্তেজিত জনতা যদি জেটি বিধ্বস্ত করে ফেলে বা তাতে অগ্নি সংযোগ করে, তাহলে খাদ্যশস্যসহ হাজার হাজার টন মালামাল বিনষ্ট হবে।” উত্তরে জেনারেল মিঠা খান চরম উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে বলেন, “If the fire engulfs the entire country and blood fills the Karnaphuli river, I don’t care. I want my arms unloaded.” অর্থা “আগুন যদি সারা দেশকে গ্রাস করে এবং কর্ণফুলী নদী যদি রক্তে ভেসেও যায়, তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
আমি চাই আমার অস্র খালাস হোক।” এরপরও এম আর মজুমদার আদেশ পালন করেননি। নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর গুলি বর্ষণে অস্বীকৃতি ও এমভি সোয়াত এর বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারূদ খালাসের কাজের আদেশ তিনি কৌশলে অমান্য করেন। এম আর মজুমদারের ভাষায়, “আমার কাছে খবর এল যে প্রায় ১০ হাজার টন অ্যামুনেশন নিয়ে এমভি সোয়াত চট্টগ্রাম পোর্টে আসছে, ডকিং করবে। আমি সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রাম পোর্টের শ্রমিক সমিতির সভাপতি মান্নান সাহেবকে ডাকলাম। উনাকে বললাম, ‘আপনি এই জাহাজ আনলোডিং করতে দিবেন না।’ উনি বললেন, ‘আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, যা লেবার আছে ওদেরকে সরিয়ে দিব।’আমি যত দিন চট্টগ্রাম ছিলাম অর্থাৎ ২৪ মার্চ পর্যন্ত সোয়াত থেকে অ্যামিউনেশন আনলোড করতে দিইনি।”
☆ চলবে…………
☆ যে কোন অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী এবং সংশোনের জন্য পরামর্শ কাম্য।

– কর্ণেল মোহাম্মদ আবদুল হক,
পিএসসি (অবঃ)
– ১৫ জুলাই ২০২১