সিকিম: রোমাঞ্চকর পথের ইতিবৃত্ত – রোদেলা নীলা


সবার ছুটি এক সাথে মিলে যাবে , কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে এমন আশা করাতা ভীষন মুশকিল । কিন্তু চার বন্ধু একদিন কথায় কথায় ঠিক করে ফেললো –এবার ছুটি নিয়ে সিকিম যাবে, কবে না জানি ভারতীয়রা ওখানে যাবার পার্মিশন বন্ধ করে দেয় ।

সিকিমের নাম প্রস্তাব করার সাথে সাথেই সবাই একমত হয়ে গেল – নভেম্বরে বরফ পড়া শুরু হলেই সোজা সিকিম । কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ছুটি পাওয়া নিয়ে , লুবনা আর রবিন দু’জনি ব্যাংকে কাজ করে , রবিনের ৭ দিনের ছুটি মঞ্জুর হয়ে গেল ; লুবনারটা ঝুলেই রইলো । বস আছেন ঢাকার বাইরে ; ছুটির দরখাস্তে তার সাইন চাই ।

তারেক নিজেই ব্যবসা করে ; তার ছুটি ছাটা নিয়ে কোন ঝামেলা নেই আর মিতা এন জি ও-তে কাজ করে , আপাতত ডিসেম্বরের আগে নতুন প্রোজেক্ট নেই তাই ছুটি নিয়ে চিন্তা নেই ।

বাংলাবান্ধা এবং বুড়িমারী –দু’টি পথেই শিলিগুড়ি হয়ে গ্যাংটক অর্থাৎ সিকিমের রাজধানীতে যাওয়া সম্ভব । কিন্তু সবার ভিসাই বুড়িমারী দিয়ে ।
মিতা সবাইকে নিয়ে ঢাকার ব্যস্ত রাস্তার ধারে একটি রেস্তোরাঁয় বসলো ট্যুর প্ল্যান করতে । রবিন বললো- ‘এতো বুকিং দেওয়া লাগবে না ,আমরা গ্যাংটক নেমে কোন না কোন হোটেল পাবোই ।“

মিতাতো মহা বিরক্ত- “দেখ, যেন তেন হোটেল হলে কিন্তু আমি থাকতে পারবো না।দুই দিন জার্নি করার পর হেঁটে হেঁটে হোটেল বের করা চরম বিরিক্তিকর !”

এবার যোগ করলো লুবনা –“তোরা ট্যুর প্ল্যান কর,আমারে কিন্তু ঠিক মতো ঘুমাতে দিস। আমি এতো টেনশান নিয়া ট্যুরে যেতে পারুম না ।“

ওদিকে আতিক ট্যুর অপারেটেররের ওয়েব সাইট থেকে যতো গুলো প্যাকেজ আছ সেগুলো নামিয়ে হিসেব করতে লেগে গেল ; সাত রাত ছয় দিনে কতো খরচ হবে সবার ।

চার বন্ধু মিলে এমন ভাবে প্ল্যান করতে লাগলো ; যে কেও দেখলে মনে করবে এরা ঘুরতে যাচ্ছে না , যাচ্ছে হিমালয় জয় করতে ।

শেষ অব্দি তাদের এই মাস খানেকের প্ল্যান সফল হলো না , লুবনার ছুটি যাওবা মিললো , হঠাত করে এমন ব্যথা পেল পিঠে যে ডাক্তার বলেই দিলেন-“ আগামী এক মাস পুরো রেস্ট , নো জার্নি , নো মুভমেন্ট ।“
আতিক ঘুরে ঘুরে ঢাকা শিলিগুড়ির টিকেট কেটে নিয়েছিল , শেষ অব্দি তাও ফিরিয়ে দিতে হলো ।লুবনাকে সবাই স্বান্তনা দিল-“দোস্ত ,আগে সুস্থতা ,পরে ঘুরোঘুরি ।“

মুখে বলে দিলেও মনের মধ্যে অস্থিরতা চলছিল মিতার , সেই সাথে যোগ দিল আতিক-“চল ,দু’জন মিলে চলে যাই।“

মিতার কন্ঠে উৎকন্ঠা- সেটা না হয় গেলাম , কিন্তু সাংগু লেক , নাথুলা , জিরো পয়েন্ট এই সব যেতে তো প্যাকেজ নিতে হবে । শুনেছি ৮ জনের নিচে প্যাকেজ ব্য্যবহুল হয় । অভয় দিল আতিক-‘আমরা ওপাড়ে গেলে অনেক বাংলাদেশি পেয়ে যাব , প্যাকেজ নিয়ে তোর ভাবতে হবে না । তুই শুধু ডলার এন্ডোজ করে নে।‘

নভেম্বরের প্রথম দিন , ঢাকায় তেমন শিত পড়েনি তবুও অনেক শিতের কাপড় নিল মিতা , শুনেছে সিকিমে খুব শিত ; বরফ দেখাও মিলতে পারে তাই মোজা নিতেও ভুলে গেলনা সে । ভাড়া করা কাপড় পড়ার চাইতে নিজের কাপড় সাথে নেওয়া ভালো।

শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে শ্যামলি পরিবহণ ছেড়ে দিল রাত ৯ টায় , মাঝে খাবার বিরতি পরলো ফুড ভিলেজে । সেখানেই দু’জন ভাত আর সবজি খেয়ে নিল ; মিতা বললো-“শোন, আগামী সাত দিন আমরা শুধু সবজি খাব , নো মিট ; ওজন কমাতে হবে কিন্তু ।“

আতিক হাসলো –“তোর জিহবা মানলে হয় ।“
ট্রাভেল ট্যাক্স আগে থেকে ওদের দেওয়া ছিল তাই বুড়িমারীতে নেমে তেমন কোন ঝামেলা হয়নি , বর্ডার ক্রস করবার আগেই মুখে পানি দিয়ে ডিম ভাজি আর দুটো পরোটা খেয়ে নিল ।

চেংড়াবান্ধা হেঁটে যেতে হয় , মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ । ও পাশে খুব সময় লাগেনি , চেক ইন করে ওরা শ্যামলির একটি এসি বাস পেয়ে গেল । সেটা ধরেই সোজা শিলিগুড়ি । মিতা আগেও বহুবার এই পথে এসেছে , দার্জিলিং গিয়েছে , তাই শহরে নেমে রেস্টুরেন্ট পেতে সময় লাগেনি । সমস্যা হচ্ছে , এবার সংগি খুঁজে নিতে হবে গ্যাংটক যাবার জন্য ।

জিপের মালিকদের সাথে যখন ভাড়া নিয়ে তাদের দর কষাকষি চলছে তখন মিতাকে পেছন থেকে কেও একজন ডাক দিল –“আপু …”
মিতা উলটো ঘুরে দেখে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে সুদর্শন আকাশ ।
-তোমরাও গ্যাংটক যাচ্ছো ?
আকাশ হ্যাঁ সূচক উত্তর করলো-একটা গানের শ্যুট করতে যাচ্ছি আপু ।
-তোমাদের দলে ক’জন?
-এইতো সব মিলিয়ে ১২ জন হবে ।
-বাহ , বেশ হলো ।আমরা এক সাথে গ্যাংটক যাই চলো ।
-তাহলে এস এন টি ( Sikkim Nationalised Transport) থেকে পার্মিশান নিয়ে নেই আপু ।

সিকিম যেতে হলে যে পার্মিশান নিতে হয় তা তাদের জানা ছিল , তাই বেশি করে পাসপোর্ট –ভিসা জিরক্স এবং ছবি নিতে ভুল করেনি । লম্বা একটা ফর্ম ফিল আপ করে যার যার নিজের স্বাক্ষর দিয়ে পার্মিশন পাওয়া গেল এবং সাথে গ্যাংটক শহর যে কতোটা পরিছন্ন তা বলে দিতেও ভুল করেন নি এস এ্ন টি’র নারী কর্মকর্তা ।
অসাধারণ প্রাকৃতিক সম্ভারের পাশাপাশি আধুনিক শপিং কমপ্লেক্স, সাইবার কাফে, নাইট ক্লাব , পুল পার্লার এবং নানা পকেটের অসংখ্য হোটেল ও রেস্টুরেন্ট নিয়ে গ্যাংটক পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য । এম জি মার্গ এখানকার ধর্মতলা , তবে সেখানে গাড়ির প্রবেশ নিষিদ্ধ । তাছাড়া এই অঞ্চল নোংরা করা বা থুথু ফেলা দণ্ডনীয় অপরাধ।

গ্যাংটক শহরে ঢুকতে ঢুকতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো । রাতের যাত্রার পর আবার দিনের পথ চলা , কিছুটা ক্লান্তি থাকলেও রাস্তার দু’পাশের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে । কিছুক্ষণ পর পর ছেলেরা গাড়ি থামিয়ে মূত্র বিসর্জনে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে , যে শহরে থুতু ফেলা নিষিদ্ধ সেখানে ইউরিন জমা হচ্ছে ; মন্দ না ।

Rangpo-তে এসে সবাই পাসপোর্ট হাতে নেমে গেল চেক ইন সিল নেবার জন্য । এবার মেয়েরা নামলো গাড়ি থেকে , প্রকৃতি মেয়েদের সেই স্বাধীনতা দেন নি যে খোলা আকাশের নীচে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাবে । শুরু হয়ে গেল পাবলিক টয়লেট খোঁজাখুঁজি । অন্ধকার শহর আর পাহাড়ি এলাকার শরীর ঘেষে সাজানো আছে শহর। অল্পবিস্তর আলো জ্বলছে চারিদিকে । এর মধ্যে মিতা আর সানজিদা পেয়ে গেল স্বস্তির আঁধার । বাকী চার কন্যা তখন কফি হাতে ব্যস্ত ।

রাংপোতে নেমে বেশ খানিক সময় কেটে গেল ; কেও এটা খাচ্ছেতো কেও ওটা । এবার ড্রাইভার ভীষন বিরক্ত ; হিন্দি ভাষাতেই বলে দিল-“ তুম সবকো এধারমে ছোড়কে মে চলা যায়েঙ্গা ।“

আকাশ জিজ্ঞেস করলো-“আর কতোক্ষণ লাগবে গ্যাংটক যেতে ?’
উত্তর এলো – আধ ঘন্টা ।
সেই আধ ঘন্টা শেষ হলো রাত ১১টায় । গাড়ি এসে থামলো এম জি মার্গে । দিনের বেলা এখানে গাড়ি উঠতে দেওয় হয় না ।
চৌদ্দ জনের এই দলের কেও হোটেল বুকিং দিয়ে আসেনি ; এখন এই রাতে ৮,০০০ ফিট উপরে কী করে হোটেল পাওয়া যায় সেটাই ভাব্বার বিষয় ।
ড্রাইভারকে বহু অনুনয় করে নিচের দিকে লাল বাজারের সামনে নিয়ে যাওয়া হলো , ওখানেই ব্যাগ বোস্কা নামিয়ে দিয়ে হিন্দিতে রাগে গজগজ করতে করতে ড্রাইভার বিদায় নিলেন ।

ভাজরা সিনেমা হলে হাউজফুল৪ ঝুলছে ; কিন্তু এখন সিনেমা নিয়ে ভাবলে চলবে না ।তাই দু দলে ভাগ হয়ে সবাই হোটেল খুঁজতে নেমে গেল ।
সে রাতের জন্য কমের মধ্যে বেশ ভালো মানের হোটেল মিলে গেল ; প্রথম রাত যেভাবেই হোক কাটাতে হবে । সকাল হোক , পরে শহর ঘুরে ঘুরে থাকার জন্য ভালো হোটেল খুঁজে নেওয়া যাবে ।

দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙ্গে গেল মিতার । ঘরের পর্দা সড়িয়ে বাইরে তাকাতেই জগতের বিস্বয় ধরা পড়লো তার চোখে ; এতো সুন্দর কোন শহর হয় ! পাহাড়ের শরীর ছুঁয়ে জেগে উঠেছে ইটের বাড়ি , তার মাথায় রোদ্দুরের খেলা । ক্যামেরা বন্দি করলেও এই সৌন্দর্য কোন ভাবেই ধরে রাখা যায়না চোখের লেন্স ছাড়া ।
সবাইকে বলা হয়েছিল সামনের রেস্তোরাঁতে নাস্তা করতে । লুচি আর আলুর দম –দুধ চা দিয়ে সকালের নাস্তা ,খুব মন্দ না । এবার গ্যাংটক শহর দেখার পালা ।

শহর থেকে ৮ কিমি উত্তরের তাসি ভিউ পয়েন্টে পৌঁছতে খুব সময় লাগলো না । সেখানে সবাই মিলে সেলফি করতেই অনেক সময় কেটে গেল , তার পরে চলে গেল গনেশ টক। সেখানে কাফেটেরিয়ায় বসে গ্যাংটক ও সংলগ্ন জায়গাটার পুরো দেখা যায় ,, দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা ও সিনিয়লচু শৃঙ্গ। পরের গন্তব্য হলো শান্ত ও নির্জন দূষণহীন পরিবেশে ৭,২০০ ফুট উচ্চতার হনুমান টক। সেখানে হনুমান মন্দির দর্শনের পাশাপাশি আবারও কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখা গেল , তবে অন্য রূপে।

সেলেপ ওয়াটার ওয়ার্কসও চোখে পড়লো , যেখান থেকে শহরে জল সরবরাহ করা হয়। কাছেই রাজপরিবারের সমাধিক্ষেত্র। নির্জন পাহাড়ের মাথায় শান্ত পরিবেশে বিশ্ববিখ্যাত নামগিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ টিবেটোলজি। এখানে লেপচা , তিব্বতি ও সংস্কৃত পুঁথি , মূর্তি ও বিরল থাঙ্কার অভাবনীয় সম্ভার রাখা আছে।
গ্যাংটক থেকে ২৩ কিমি পাহাড়ি পথে তিব্বতি বৌদ্ধধর্মের অন্যতম পীঠস্থান ও সিকিমের বৃহত্তম মনাস্ট্রি রুমটেক। সিকিমের গ্রামীণ পটচিত্রের মাঝখান দিয়ে পাহাড়ি ধানখেতকে সঙ্গী করে , সুন্দরী ঝর্নাকে পাশ কাটিয়ে ঘন সবুজের মধ্যে দিয়ে এ এক অসামান্য গন্তব্য । তিব্বতি স্থাপত্যের অনবদ্য নমুনায় তৈরি এই মনাস্ট্রি দেখার মতো ।

ষোড়শ শতাব্দীতে নবম কর্মপা লামা ওয়াংচুক দোর্জে বুদ্ধ ধর্মের প্রচার ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের থাকার জন্যেই এই বিশাল মঠ নির্মাণ করেন। এখানে বৌদ্ধধর্মের কিছু বিরলতম নিদর্শন রাখা আছে। সমস্ত দেয়াল , প্রার্থনা গৃহ, ছাত্রাবাস ও অন্যান্য স্থানে তিব্বতের নিজস্ব রীতিতে আঁকা বিভিন্ন বৌদ্ধ মুরাল ও ফ্রেস্কো চোখ কেড়ে নেবে। কাছেই নেহরু বটানিক্যাল গার্ডেন , সবুজের মধ্যে এ এক প্রানান্ত সময় ।

শহরের আশে পাশে আছে আরও নানা দ্রষ্টব্য। যেমন, এনচে মনাস্ট্রি, দোদ্রুল চোর্তেন, বটানিক্যাল গার্ডেন , ব্ল্যাক ক্যাট মিউজিয়াম, চোগিয়াল পার্ক, ওয়াটার গার্ডেন, সারামসা গার্ডেন, হাইকোর্ট মিউজিয়াম ইত্যাদি । হাতে সময় থাকলে ওগুলো দেখা নেওয়া যেত । কিন্তু আজ এ অব্দি থাক । কাল বেরুতে হবে লাচুং এর উদ্দেশ্যে ।

বান ঝাকরি ফলস এর জলের ছাটের মধ্যেই দুপুরের খাবার খেতে খেতে বিকেল গড়িয়ে এলো , মোমো আর নুডলস । সূর্যকে ধরে রাখা যায় না পাহাড়ি এলাকায় ,গাড়ি ছুটছে হোটেলের পথে আর পুরো সিকিম শহর উঠে আসছে দু’চোখের পাতায় ।

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্হিত ঘুমন্ত ছোট রাজ্য সিকিম ছবির ন্যায় নিখুঁত । আকর্ষণীয় আলপাইন সৌন্দর্যের জন্য একে প্রায়ই “পূর্বের সুইজারল্যান্ড” হিসেবে অভিহিত করা হয়।
চীন , নেপাল ও ভুটান সীমান্তে উঁচু পাহাড়ঘেরা সিকিম রাজ্যের বেশ কিছু এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে ।

শীতের সময় বরফ ও পর্বত দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখ লাখ পর্যটক ছুটে এলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ছিল । গত ২০ নভেম্বর এসব স্থানগুলো বাংলাদেশিদের জন্য খুলে দেওয়া হয় । ওই দিন তৎকালীন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা ঢাকার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিকিম উন্মুক্তের ঘোষণা দেন । তারপর থেকে বাংলাদেশের পর্যটক ও ভ্রমণপ্রেমীরা ঘুরতে পাড়ি জমাচ্ছেন অনিন্দ্যসুন্দর সিকিমে।

হিমালয়ের হিমবাহ থেকে সৃষ্টি হওয়া সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৩ হাজার ফুট ওপরে তিস্তা নদী প্রায় ১৭০ কিলোমিটার জুড়ে সিকিম রাজ্যে বয়ে চলেছে । এই পানি পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং , জলপাইগুড়ি হয়ে বাংলাদেশে আসে। পর্যটন অঞ্চলের মধ্যে উত্তর সিকিমের লাচুংয়ের ছাঙ্গু লেক , কাটাও , নাথুলা , ইয়ামথাং ভ্যালি বা জিরো পয়েন্ট ও গুরুদোকমার লেক রয়েছে । একই এলাকায় জিরো পয়েন্ট ১৫ হাজার ৫০৩ ফুট এবং ইয়ামথাং উপত্যকা ১১ হাজার ৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ।

যারা সিকিম ঘুরতে যান তাদের লিস্টের সুরুতে লাচুং এবং জিরো পয়েন্ট থাকবেই । যেহেতু জীবনের প্রথম বরফ দেখার আয়োজন ,তাই মিতার মধ্যে অন্য ধরণের রোমাঞ্চ কাজ করছে । ঘুরোঘুরির তৃতীয় দিনেও সে ক্লান্ত নয় একদমি । গাড়ি চলছে পাহাড়ি পথ ধরে , এতোটা ভাংগা আর উঁচু নিচু যে প্রায়ি মনে হচ্ছে খাদের মধ্যে পড়ে যাবে । আর খাদ বলতেতো যা তা নয় ; দশ থেকে এগারো ফিটের নিচে , ধীরে ধীরে তা বাড়ছে ।

চার থেকে পাঁচ ঘন্টার পথের মধ্যে দেখা হয়ে গেল তিন খানা ঝরণার সাথে –নাগা ফলস , সেভেন সিস্টার ফলস এবং অমিতাভ বচ্চন ফলস । সস্তিক ব্রিজ পাড় হয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে উপরের দিকে । আবার সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে এ পথে , উত্তর সিকিম ঢোকার পার্মিশন নিতে হবে । ড্রাইভার দ্রুত ব্রেক করলেন গিয়ার ,আমাদের পাসপোর্টের কপি নিলেন নিজের হাতে ।

চারদিকে যতোদূর দেখা যায় কেবল সেনাবাহিনীর ক্যাম্প , গাড়ি এমন জায়গায় থামলো যেখানে প্লাস্টিক বোতলের খালি বোতল ভরাট করে রাখা , গাড়ি থেকে নামতে নামতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন-“ অর কুছ পানিকা বোতল তোমহারি পাছ হ্যা্য ? ফেক দো , আগার হে আর্মিলোক পাকারকে লে যায়েগা ।”
আমরা সবাই না সূচক মাথা নাড়লাম । এতো কঠিন এদের আইন , পাহাড়কে সুরক্ষিত রাখাবার সব ধরনের কঠিন প্রস্তুতি তাদের আছে ।

শুধু আমাদের গাড়ি একা নয় , সারি সারি করে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে জনা ত্রিশেক গাড়ি ,তাদের সামনে লেখা-“টুরিস্ট ।“
কেও কাউকে ছেড়ে এ পথ দিয়ে যাবে না , চেক ইন হয়ে যাবার পর অন্ধকারের মধ্যে হঠাত বুঝতে পারলাম সামনের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে ; তখন ঘড়ির কা্টায় সন্ধ্য ৭ টা । ওই গাড়ির ড্রাইভারকে হেল্প করবার জন্য অন্য সব গাড়ি এই ঢালু রাস্তার মধ্যে থেমে গেল ।
আমাদের সহযাত্রি পুরুষরা পুনরায় মূত্র বিসর্জনে ব্যস্ত হতে লাগলেন ; মেয়েরা উতকন্ঠার মধ্যে সময় কা্টাতে লাগলো –“কখোন পৌঁছাবো লাচুং এ ?”

লাচুং (Lachung) ভারতের নর্থ সিকিমের একটা গ্রাম যা গ্যাংটক শহর হতে ৯ হাজার ৬০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত। প্রকৃতির নৈসঃর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্যে নিঃসন্দেহে খুব উপরের দিকেই জায়গা করে নেবে। লাচুং শব্দের অর্থ ‘ছোট গমনোপযোগী অঞ্চল’।

প্রকৃতির কোলে ছবির মতো সেজে আছে লাচুং নামের এই পাহাড়ি গ্রাম। জনবসতি খুবই কম। পাহাড় ও বনভূমি নিঝুম। এগাঁয়ে আকাশ ছুঁয়েছে পাইন, ফার আর ধুপিগাছের সারি। আর আছে নানান প্রজাতির রডোডেনড্রন। পাশে বয়ে চলেছে তিস্তা । এই তিস্তারই শাখা প্রশাখা নদী লাচুং ও লাচেন।

১৮৫৫ সালে বিখ্যাত ভ্রমণিক জোসেফ ডালটন হুকার দ্য হিমালয়ান জার্নালে লাচুংকে সিকিমের ‘ছবির মতো গ্রাম’ হিসেবে আখ্যা দেন। লাচুঙের কাছে ফুনিতে স্কিইং করার ব্যবস্থা আছে।
দূর্ঘটনা কবলিত গাড়ি মেরামতের পর গাড়ি ছুটে চললো আরো উপরে ,হাতের ডান পাশে তাকাতেই চোখে লেগে গেল জগতের বিস্বয় ,আলোয় ভরা তিস্তা ব্যারেজ । ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বললেন-“ মে পাচ মিনিট রুকংগি ,আপ সব চা পিলো ।“

চা –সিগারেট কোনটাই বাদ গেল না । ফ্রেসরুম থাকাতে মেয়েরা এ যাত্রা স্বস্তি পেল । ব্যারেজের ছবি তেমন পরিস্কার না এলেও দেখতে বেশ লাগছিল । পাহাড়ের অতো উপরে আলোকময় তিস্তা ; আহারে এই পানি যদি সময় মতো বাংলাদেশে পৌঁছানো যেত !

মিতাদের গাড়ি প্রায় রাত আটটার দিকে লাচুং পৌঁছালো ; ওখানে গিয়ে দেখা গেল আরো দুটো গাড়ি ওদের আগেই পৌঁছে গেছে । “টেমপারেচার কতো ? জিজ্ঞেস করতেই কেও একজন বলে উঠলো –“নয় হবে ।“ এতোক্ষণ গাড়ির ভেতর শিত কাকে বলে বোঝা যায়নি , এবার খোলা জায়গায় পা রাখতেই এক দমকা হাওয়া তাদের জেকে ধরলো ।

পাশেই কাঠে আগুন জ্বালিয়ে গরমের উষ্মতা পোহাচ্ছে বেশ কিছু ছেলে মেয়ে । সাথে ছোট বাচ্চারাও আছে । এতো পাহাড়ি এলাকায় চার পাঁচ মাস বয়সি বাচ্চাদের নিয়ে আসার সাহস যে বাবা মা’য়েরা পান সত্যি তাদের সাহসের প্রশংসা করতে হয় ! তবে এমন ঝুঁকি নেওয়া সত্যি নিরাপদ নয় ; কোন ইমার্জেন্সি হলে এই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে মরে গেলেও মেডিক্যাল সেন্টার পাওয়া যাবে না ।

বাবুর্চি এসে হাতে গরম চা দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো-“ভেজ নাকি নন ভেজ ?”
মিতাতো নন ভেজ বলবার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল , কিন্তু পাশ থেকে আতিক এসে দিল খোঁচা –“ ওটা দেরি হবে , ভেজ বল, ইন্ডিয়ানদের সাথে খেয়ে ফেলি ।“
মিতা বিরক্ত-“সারাদিন আপ ডাউন করে শুধু সবজি দিয়ে খাবো?”
আতিক মনে করিয়ে দিল-“তুইতো কইসিলি সাত দিন খালি নিরামিষ খাবি ।“

অনেক মন খারাপ নিয়ে মিতা খেতে বসলো ,এরা রান্নায় মনে হয় পিঁয়াজ দেয় না , সব কিছুতেই পাঁচ ফোড়নের গন্ধ । গরম পানি আছে সাথে ,খুব মন্দ যে লাগলো তা নয় । কষ্ট শুরু হলো খাওয়ার পর হাত ধুঁতে গেলে ,কলের পানি খুলতেই মনে হলো কেও ফ্রিজ থেকে আইস নামিয়ে দিয়েছে । ওহ কীযে ঠান্ডা ,শক্ত হাত নিয়ে আগুনের পাশে বসতে হলো নরম করতে ।

গুগল থেকে নিউজ পাওয়া গেছে রাতে লাচুং এ বরফ পড়বে ; শুনে একদিকে যেমন শিহরণ জাগছে অন্যদিকে ঠান্ডার ভয় । ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে জিরো পয়েন্ট যাবার জন্য ; তাই তাড়াতাড়ি লেপ মুড়ি দিল সবাই । কিন্তু ঘুম কী আর আসে , ঠান্ডায় বরফ হয়ে যাবার জোগাড় । কাঠের আগুন নিয়েতো আর বিছানায় ঘুমানো যায় না , সে রাত কেটে গেল দারুন এক উত্তেজনায় ।

পরদিন ভোরে চোখ খুলতেই মিতা বুঝতে পারলো আর কলের পানি ধরা সম্ভব নয় । সে একটি গ্লাশে করে গরম পানি নিতে গেল বাবুর্চির কাছে ,তখনি চোখ গিয়ে পড়লো পাহাড়ের ওপর । সত্যিইতো সাদা সাদা বরফের পিন্ড জমে আছে গাছের শাখায় শাখায় ।কীযে অদ্ভূত সেই দৃশ্য ! মিতা ক্যামেরা বের করলো , ক্লিক ক্লিক শব্দে ধরা পড়লো নান্দনিক সেই দৃশ্য !

জিরো পয়েন্ট নামার জন্য আগেই ভাড়া করা হয়েছিল বুট , হাতের গ্রাফস এবং জ্যাকেট । ওগুলো পড়ে সবাই রেডি , এমন কী চার মাসের বাচ্চাটিও ।
পাউরুটি আর দুধ চায়ে চুমুক দিয়ে সবাই উঠে বসলো দু’টো জীপে ভাগ হয়ে ইয়াম থাং ভ্যালির উদ্দেশ্যে । ওখান থেকেই আরো এক ঘন্টার পথ জিরো পয়েন্ট ।

লাচুং থেকে বেরিয়ে রাস্তা ক্রমশ পাথুরে , বোল্ডারময়। কাছে এবং দূরে বিভিন্ন আকারের পাহাড়ের রঙ ধূসর থেকে বাদামী হয়ে ক্রমশ কালো । অন্যান্য পাহাড়ী পথের মতই এঁকেবেঁকে ক্রমশ উঠতে থাকে গাড়ি । কিন্তু এই পথ রুক্ষ। পথের দু’পাশে রডোডেন্ড্রন গাছের চিহ্ন আছে বটে , কিন্তু এই প্রবল শিতে ফুলের কোন অস্তিত্বই নেই । ড্রাইভার বললেন-‘ফুল দেখনিকে লিয়ে এপ্রিল মে তক আনা পাড়েগা।‘

সেই সময় নাকি পুরো ইয়ামথাং ভ্যালিই রঙের বন্যায় ভাসতে থাকে। তাই একে ‘ভ্যালি অফ ফ্লাওয়ার্স’ও বলে।
স্থানীয় ভাষায় “থাং” অর্থাৎ ভ্যালি বা উপত্যকা। ‘চুং’ মানে ছোট এবং ‘ইয়াম’ মানে বড়। তাই চুংথাং হল ছোট উপত্যকা এবং ইয়াম থাং হল বড় উপত্যকা। ইয়াম থাং-এর দিকে যেতে যেতেই চোখে পড়ল রাস্তার ধারে বরফ পড়ে আছে। দূরে পাহাড়ের গা থেকে ঝুলে আছে বরফ জড়ানো ঝর্ণা । পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে চলেছে “কিপ ছ ” নদী। তার পান্নাসবুজ জলের বুকে সাদা বরফের ভেসে বেড়ানো ,মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবার মতো ।

সারাক্ষণ চলতে থাকলো ভিডিও , এভাবে দেখতে দেখতেই এক ঘন্টায় পৌঁছে গেল লাচুং থেকে ২৪ কিমি. দূরে ইয়াম থাং (১১,৮০০ ফুট)। সেখানে নেমেই আকাশ তার দলবল নিয়ে শ্যুটিং-এর কাজে নেমে গেল । মডেলরা মেকাপের কাজ সাড়ছে গাড়িতে বসেই ,পুরো ভ্যালি জুড়ে আছে লোকে লোকারণ্যে ।

মিতার গলা শুকিয়ে কাঠ ততোক্ষণে , এতো শিত বাইরে যে ঠিক করে ক্যামেরায় হাসির পোজ দিতে পারছে না । আতিক ডি এস আর হাতে হাসছে-“তুই কি একটু কফি খেয়ে নিবি ?”
মিতা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো । ভ্যালির একাধারে থরে থরে রেস্তোরাঁ সাজানো , সিকিম সরকার নারী কর্ম দক্ষতাকে কী পরিমান কাজে লাগিয়েছেন তার জ্বলোজ্যান্ত প্রমান এই রেস্তোরাঁগুলো , অধিকাংশ দোকানি নারী। কী কর্মঠ তাদের জীবন ব্যবস্থা , মিতা হা করে সেই মেয়ে গুলোকে দেখছে শুধু ভাষা জানে না বলে জিজ্ঞেস করতে পারেনি –“তোমাদের এতো উপরে ভয় করে না?”
এখানেও বিদ্যুৎ আছে ,ভাবা যায় ?
আতিকের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মিতা ।
আতিক হাসলো –“দোস্ত আমরা এখন ভারতে ,বাংলাদেশে না ।“
মিতার মন খারাপ হয়ে গেল, সে প্রতি মুহূর্তে তার নিজের দেশের কথা ভাবছে । আহা , একই তারের বেষ্টনিতে গাঁথা দুটো দেশ সম্পূর্ণ দু’রকম !

এখানে বেশি সময় নিলে জিরো পয়েন্ট দেখা যাবে না –এমন কথার প্রেক্ষিতে সবাই দৌড়ে গাড়িতে উঠলো , কেবল রয়ে গেল শ্যুটিং-এ ব্যস্ত ইউনিট । প্যাকেজে এই পর্যন্তই ছিল তিন হাজার টাকায় দুই রাত একদিন , কিন্তু জিরো পয়েন্টের জন্য সবাইকেই আলাদা করে রুপি দিতে হলো ড্রাইভারকে । মিতাদের সংগি ছিল একটি ভারতীয় পরিবার ; ওরা এসেছে হায়দ্রাবাদ থেকে ।

ইয়াম থাং থেকে প্রায় ১৯ কিমি. দূরে ১৫,৩০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত ইউমেসেমডং চীনা সীমান্তের একেবারে কাছেই । রডোডেনড্রন গোত্রীয় অ্যাজালিয়া ফুলের গাছ ভর্তি এখানে। এর সুমিষ্ট গন্ধে চারিপাশ মাতোয়ারা হয়ে থাকে। ইউমেসেমডং-এই শেষ বসতি। তাই একে ‘জিরো পয়েন্ট’ বলা হয়।

জিরো পয়েন্ট উঠবার বেশ আগ থেকেই গাছের সংখ্যা কমতে থাকে , ধীরে ধীরে দু’পাশে দূর্গের মতো কঠিন পাহাড় জেগে উঠে । যতো উপরে ওঠা যায় ততোই অন্য রকম একটি পরিবেশের সৃষ্টি হতে থাকে । মনেই হবে না যে এতোক্ষণ সবাই সবুজ বনানীতে ঘেরা ছিল ।

এবার শুরু হয়ে গেল কেবল সাদার দৌরাত্ব । পাহাড় মাটি আকাশ সব সাদা , বরফ দিয়ে জড়ানো জিরো পয়েন্টের কাছাকাছি যতোদূর চোখ যায় কেবল সাদা পাহাড় । ভালো লাগা উত্তেজনা ভয় সব এক সাথে এসে জরো হচ্ছে । গাড়িতে উক্ত ইন্ডিয়ান ফ্যামিলির সাথে দু’টো ছোট বাচ্চাও ছিল , ড্রাইভার বাচ্চাদের নামাতে নিষেধ করলেন কারন এখানে অক্সিজেনের পরিমান কম ।

বড়রা জিরো পয়েন্টে পা দিতেই ফিরে গেল শৈশবে ,বরফ দিয়ে খেলা শুরু করলো, কেও করছে স্কেডিং আর কেও একে ওকে বরফ ছুঁড়ে মারছে । সে এক দেখার মতো দৃশ্য , কিন্তু মিতা বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলো না ; তার নিঃশ্বাসে কষ্ট হচ্ছিল । সে গাড়িতে এসে বসলো ,কিছু সময় পর অন্যরাও চলে আসলো । কিন্তু গাড়িটি প্রায় দশ মিনিট এগুবার পর সেই দুই বাচ্চার বাবা হঠাত বলে উঠলো-“জারা রুকিয়ে ।“

সবাই অবাক হয়ে পেছনের দিকে তাকালো , ছেলেটি গাড়ি থেকে নেমে সেই যে বমি শুরু করলো ; কিছুতেই থামছে না । তার স্ত্রী তাকে বমির ওষুধ দিল , হজমি দিল কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না । ওদিকে ড্রাইভার তাড়া দিচ্ছেন –“ সাম পাঁচ বাজতাক এই এলাকা ছোড়না পাড়েগা , নাহিতো লাচুং থাকনা পারেগা ।“

এখান থেকে সোজা গ্যাংটক না পৌঁছলে এই প্যাকেজ সম্পূর্ণ হবে না । একজন দু’জন নয় এই দশ জনকেই তার জায়গা মতো পৌঁছে দিতে হবে । কোন রকম ছেলেটিকে পিছনের সিটে শুয়ে দেওয়া হলো । কোন মেডিকেল সেন্টার নেই যে তাকে প্রাথমিক চিকিতসা দেওয়ায় যাবে ।

ড্রাইভার একটি আর্মি ক্যাম্পে আবার গাড়ি রাখলেন-“এধারমে জারা রুকো , কুছ খাও , মুখে ধোলো , ফির চ্যালেংগি ।“ সবার পেটেই তখন রাজ্যের ক্ষুদা । বিগ সাইজের সমুচা আর কফি পেটে দিয়ে সে যাত্রা স্বস্তি । কিন্তু গাড়িতে উঠলেও পথ আর শেষ হয় না, এমন অসুস্থ মানুষ যে কীনা সারাটা পথ বমি করছে তাকে নিয়ে কী আর ভ্রমণ আনন্দদায়ক হয় ।

সেদিনো লাচুং-এ দুপুরের খাবার খেয়ে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত । গ্যাংটক ফিরেই মিতা সিদ্ধান্ত নিল –“আর না , আমি সাংগু লেক যাব না । তুই আমাদের ফেরার ব্যবস্থা কর।“
আতিক নিজেও খুব অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল , এক দিকে লম্বা জার্নির ধকল অন্য দিকে কেও যদি নিজের শারীরিক অবস্থার কথা মাথায় না রেখেই অন্যদের সাথে ঝাপিয়ে পড়ে তবে তাকে বোঝানো মুশকিল । যার ডায়বেটিস সে যেমন মিষ্টি খাবে না যে উচ্চতা নিতে পারেনা সে অতো উপরে উঠবে না , এটাই স্বাভাবিক । কিন্তু ভিন দেশি সংগিকে এটা বোঝাতে যাওয়া মুশকিল ।

সিকিমের কোন ট্যুর দু’জনে নিলে সেটা ব্যয় বহুল হবে । নিম্নে ৮ জন লাগবেই । তাই কারো সাথে সময় শেয়ার করতে ইচ্ছে করলোনা । জিরো পয়েন্টে কাটানো রোমাঞ্চকর মুহূর্ত গুলো বুকের মধ্যে ধারণ করে আতিক আর মিতা পরদিন ফিরে চললো নিজের দেশে –বাংলাদেশে । আকাশ রয়ে গেল তার গানের শ্যুটিং এর পুরো দল নিয়ে , ওদের হাতে অনেক কাজ ; তাই নিজেদের মতো করে সময় দরকার ।
ভারতীয় বর্ডার পাড় হতে কোন বারই ঝঁক্কি পোহাতে হয় না , কাস্টম অফিসার শুধু জিজ্ঞেস করেন –“কী নিয়েছেন সাথে ?”

এবার মিতা হেসে বললো –“ব্যাগ ভর্তি চকলেট আর চোখ ভর্তি স্মৃতি ।“
অফিসার মুচকি হেসে ছেড়ে দিলেন কিন্তু বিপত্তি ঘটলো এপাড় এসে , সোজা ল্যাগেজ খুলে বসে আছেন একজন বিজিপি সৈনিক , তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মেয়েদের ব্যাগ খোলার ।
মিতা বিরক্ত-‘আপনি একজন মহিলাকে ডাকুন, তিনি আমার ল্যাগেজ খুলবে ।“
লোকটি আমতা আমতা করছে-“এখানে কোন মহিলা নাই ।“
-তাহলেতো আমি ল্যাগেজ খুলবোনা সব ছেলেদের মধ্যে ।
-আপনার ব্যাগ আমাকে দেখতেই হবে যদি কোন অবৈধ কিছু থাকে । এই বলেই সে ব্যাগ খুলে হাত ঢুকিয়ে দিল ।
মিতা হতভম্ব , এমন চেকিং হয় নাকি !! শুধু তাই নয় শ্যামগঞ্জ থানার সামনে শ্যামলি পরিবহন থামিয়ে একজন পুলিশ সিভিল পোসাকে নিজের পরিচয় না দিয়েই সবার ল্যাগেজ খুলে খুলে শাড়ি কাপড় বের করছেন ।
পুলিশ তল্লাশি করবে কিন্তু এমন নগ্ন তল্লাশি বোধ করি এই বাংলাদেশেই সম্ভব !

বাস শুদ্ধ সব যাত্রি ক্লান্ত , এলেংগাতে আবার বাস দূর্ঘটনা ; তাই তিন ঘন্টা ধরে বাস দাঁড়িয়ে আছে একই জায়গায় । ট্রেন –বাস দূর্ঘটনা এখানে নিত্য নৈমত্যিক ব্যাপার , আর যানজট নতুন কিছু না তাই চোখ বুজে ঘুমানোর ব্যর্থ চেষ্টা ; এরি মধ্যে কেও কেও আছেন যারা বাসে বসেও নাক ডাকেন , তারা ধরেই নেন এ যাত্রা এখানেই কাটাতে হবে তাই ঘুমানোই ভালো ।

অবশেষে বারো ঘন্টার পথ বিশ ঘন্টা কাটিয়ে বাড়ি ফিরলো মিতা আর আতিক । বিদায় নেবার সময় মিতা বললো –“দোস্ত ,আর সিকিম যামুনারে অনেক কষ্ট !!”
বাড়ি ফিরে সাত ঘণ্টাও কাটেনি , সকালে ঘুম থেকে উঠেই মিতার ফোন –“দোস্ত ,আমরাতো পেলিং যাই নাই , নেক্স টাইম লাচেন -পেলিং –সাংগুলেক –বাবা মন্দির-নাথাং ভ্যালি একটা ট্যুর নিসতো ।“
আতিক খানিক হেসে বললো-“দোস্ত ,আমরা সিকিমের অনেক কিছুই দেখি নাই । তুই কদিন বিশ্রাম কর । আমি দেখছি ডিসেম্বরে আর কী কী ট্যুর নেওয়া যায় ।
মিতা তৃপ্তির হাসি দিয়ে ফোন রেখে দিল ।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *