সিলেটের এম সি কলেজের ছাত্র রাজনীতির একাল সেকাল – গোলাম কিবরিয়া


১ম পর্ব
১৯৮৩-৮৪ শিক্ষাবর্ষে এম সি কলেজে যখন ছাত্র ছিলাম। উচ্চশিক্ষা নিয়ে মানুষের মতো মানুষ হবার ব্রত হয়ে কলেজে পদার্পণ সবার। বেশিরভাগ ছাত্র ই কোনো না কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িত হয়ে যায়। জড়িত হবার অনেক কারণ থাকে। আগামী দিনে একজন ছাত্র সমাজের দুর্দশা লাঘবের জন্য রাজনীতির চর্চা শুরু করে। অতীত ইতিহাস ঘাটলে অনেক কিছু উদাহরণ দেওয়া যায় ছাত্রসমাজ কতটুকু শক্তিশালী ছিল।
আইউব বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে শুরু করে৫২ সালের ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্রদের অবদান অপরিসীম। ছাত্র রাজনীতি করা কোন অন্যায় মনে করিনা। সমাজে বিপ্লব ঘটাতে হলে ছাত্র সমাজের শক্তি দরকার। একজন কৃষক তার ন্যায্য শ্রমের মর্যাদা না পেলে এই ছাত্রসমাজই কৃষকের পক্ষে দাঁড়িয়ে দুর্বার আন্দোলন তৈরি করতে সচেষ্ট। তাই একজন ছাত্রের পক্ষে ছাত্র রাজনীতি থেকে দূরে থাকা অসম্ভব।
কলেজে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আলাউদ্দিনের ক্যান্টিনে বসে রাজনৈতিক কথাবার্তা ছিল আড্ডার মূল উদ্দেশ্য। নিজ নিজ দলের ছাত্রদেরকে নিয়ে কিভাবে কলেজে শক্তিশালী একটা সংগঠন দার করতে হয় এসব নিয়ে তালিম দেয়া হত। সব সময় সিনিয়র ভাইগণ নবীন ছাত্রদেরকে বুঝাতেন। তারমধ্যে থেকে নিজ নিজ দলের নেতৃত্ব দেওয়ার ছাত্র ঠিক করে দিতেন। বড় ভাইগণ যা বলতেন ছাত্ররা তখন সেটাই মেনে চলত। নবীন আর প্রবীনদের মধ্যে একটা বন্ধুত্বের সেতু তৈরি হত।
চতুর্থ পিরিওড শেষ হবার সাথে সাথে এক ঘন্টার জন্য কলেজে চলত গলা ফাটাইয়া নিজ নিজ দলের পক্ষে স্লোগান দেওয়া। দেখা যেত এক গ্রপ ছাত্র সংগঠন সিঁড়ি বেয়ে নিজের দিকে যাচ্ছে, আবার অন্য গ্রুপ সিঁড়ি বেয়ে উপর দিকে যাচ্ছে। মনে হতো ট্রেইন একটা যাচ্ছে ঢাকা দিকে আবার আরেক ট্রেন সিলেটের অভিমুখে যাচ্ছে। কোন ধরনের সংঘর্ষ না হয় রাজনৈতিক স্লোগানে মুখরিত হত এই একটা ঘন্টা।
ছোট দল হোক আর বড় দল হোক সবার মনে একটা ভয় থাকতো। যদি সংঘর্ষ বাধে তাহলে শুধু এই সংঘর্ষ এই কলেজের সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইহা ছড়িয়ে যাবে সিলেটের বিভিন্ন কলেজে। তাই এরকম ভয় ভীতি নিয়ে চলত কলেজের ছাত্র রাজনীতি।
আমার সময় দেশে সামরিক শাসন। সামরিক সরকার হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ থাকাকালীন সময়ে কলেজে কোন ধরনের সংসদ নির্বাচন হয় নাই। তবে যার যার দলের সম্মেলন হত। কলেজের প্রবীণ ছাত্ররা নবীনদের কে বরণ করতো হাসিমুখে। এত শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার জন্য একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।
নিরীহ প্রকৃতির ছাত্র-ছাত্রী যারা ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল না । ওরা কিন্তু তাদের এক ঘন্টা সময় লাইব্রেরীতে গিয়ে বসে থাকতো। পঞ্চম পিরিয়ড শুরু হওয়ার সাথে সাথে কলেজে নেমে আসে সুন্দর একটা শিক্ষার পরিবেশ। যার যার ক্লাসে যাবার জন্য ছোটাছুটি পরিলক্ষিত হতো।
কলেজে যে দৈনিক মারামারি হতো ছাত্রসংগঠনের মধ্যে তা হয় নাই কলেজে। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ এবং ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের সময় তেমন শক্তিশালী ছিল না।ছাত্র রাজনীতি করা সবার গণতান্ত্রিক অধিকার থাকলেও নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ এবং ছাত্রশিবিরকে মাথা উঁচু না করে বদ্ধপরিকর ছিল অন্যান্য ছাত্র সংগঠন। কারণ ওদের ছাত্রসংগঠন যদি শক্তিশালী হয়ে যায় তাহলে অন্যান্য সংগঠনের মাঠ খারাপ হয়ে যাবে। তাই এইসব নোংরা রাজনীতি শিকার হতে হয়েছিল নতুন বাংলা ছাত্র সমাজ এবং ইসলামী ছাত্রশিবির।
দুই বৎসর কলেজে থাকাকালীন সময়ে একমাত্র নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের একটা ছাত্র (নাম দিচ্ছি না) ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয় আলাউদ্দিনের ক্যান্টিনে। ইহার কারণ আছে। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের ছাত্র নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের কর্মীকে সতর্কতা করে দিয়ে বলছে দুপুরের তোমাদের অর্থাৎ নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের কোন শ্লোগান চলবে না কলেজে। তখন সেই নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের কর্মী একটু গরম মাথায় বলেছিল” লারি বেটির পোয়া পাইছনি”(সিলেটি আঞ্চলিক ভাষা) অর্থাৎ বাবা ছাড়া মায়ের সন্তান। তখনই প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের কর্মী ছুরি দিয়ে আঘাত করে সেই নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের কর্মীকে। ঘটনা যখন ঘটলো তখন পুলিশের ডি আই বি তালেব আলী এসে প্রিন্সিপালের (নুরুল গনি) সাথে সাক্ষাৎ করে। যে ছাত্র ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে নাম ঠিকানা নেওয়ার জন্য। মরহম নুরুল গনি স্যার তখন ভুলবশত একটা ঠিকানা দিয়েছিলেন। যার কারণে পুলিশের নজর এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয় ছুরি দিয়ে আঘাতকারি ছাত্র।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের কলেজ সম্মেলন হচ্ছে। সেদিন প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের একজন ছাত্র দেখে সিলেট মেডিকেলের ছাত্র শিবিরের লোকজন হকিস্টিক সহ কলেজে আসছে সম্মেলনকে সফল করার জন্য। এরকম অবস্থা দেখে দুইটা বাম ছাত্র সংগঠন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় কলেজে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্মেলন করতে দিবে না। জোহরের নামাজের আগে দুই বাম ছাত্র সংগঠনের ছাত্র কলেজের পিছনদিকে ছোট খাল পাড়ি দিয়ে চলে যায় ডিগ্রী কলেজের ক্যান্টিনে (এখন যাহা বিশ্ববিদ্যালয়)।
সেখানে গিয়ে সিনিয়র ভাইদের সাথে যোগাযোগ করলে উনারা বলে দেন ওদের সম্মেলন করতে দাও। আলাপ হয় সিনিয়র অনেক ভাইদের সাথে। কারণ হলো তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ইসলামী ছাত্রশিবির সংহতি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই দুই বাম ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা উনাদের কথা উপেক্ষা করে নীল নকশা তৈরি করে সাথে সাথে। যেহেতু এম সি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সংসদ নির্বাচন নিয়ে চিন্তা। যাই হোক সম্মেলন চলাকালীন সময়ে করিডোরে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার প্লেকার্ড থাকলেও বাম ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা (বাসদ এবং ছাত্র ইউনিয়ন) গন্ডগোল বাঁধার জন্য অনেক চেষ্টা করে।
কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছেলেরা মাথায় হাত দিয়ে বুকে হাত দিয়ে বাম ছাত্র সংগঠনের ছেলেদেরকে নিয়ে সম্মেলন কক্ষে (অডিটরিয়ামে) নিয়ে যায়। ছাত্র শিবিরের ছেলেরা কোন ধরনের সংঘাতে যেতে রাজি ছিল না। ইসলামী ছাত্রশিবিরের মেডিকেল থেকে আগত সিনিয়র ভাইগণ সুন্দর ভাবে বুঝাতে চেষ্টা করে বাসদ এবং ছাত্র ইউনিয়নের ছাত্রদেরকে।
কিন্তু শরীরে তখন ছাত্রদের রক্ত টগবগে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছেলেরা যখন টিলাগড় মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে যাচ্ছে, ঠিক তখনই কলেজের গেইট পাড়ি দেওয়ার সাথে সাথে গেইট জিঞ্জির দিয়ে তালাবদ্ধ করে ফেলে। কারণ শিবিরের ছাত্ররা যেন পাল্টা আক্রমণ করতে না পারে। এরমধ্যে খবর ছড়িয়ে গেল পাশের ডিগ্রী কলেজে। যেসব সিনিয়র ভাইগণ বাধা দিয়েছিলেন গ্যাঞ্জাম না করার জন্য শেষ পর্যন্ত উনারাও শরিক হয়ে গেলেন এমসি ইন্টারমিডিয়েট কলেজের সাথে।
একদিকে ইন্টারমিডিয়েট কলেজ আর অন্যদিকে ডিগ্রি কলেজ আর মধ্যখানে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছাত্ররা । ইট , হকি স্টিক ইত্যাদি ছিল তখনকার সময়ের আক্রমনের অস্ত্র। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ছাত্ররা মসজিদে আত্মরক্ষা করতে গেলে মসজিদের ভিতরে চলে যায় । সেখানে গিয়েও ইসলামী ছাত্রশিবিরে উপরে আক্রমণ চলে।
সেই দিনের মারামারিতে দুইটা ছাত্রশিবিরের ছেলে আহত হয়। একটা ছেলের (নাম দিব না) সুনামগঞ্জের দিরাই। সোনার পাড়ার একটা বাড়ির লজিং মাস্টার হিসাবে থাকতো। আজ ও চোখে ভাসে ওর শরীরের অবস্থা মাইর খেয়ে শরীরটা ফুলে গিয়েছিল। আরেকটা ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী ওসমানী মেডিকেল কলেজের ইন্টার্নি ডাক্তারের(নাম দিব না) চোখে আঘাত হয়। সম্ভবত ইহা ইটের আঘাত। ৮৩ থেকে ৮৫ পর্যন্ত সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে ইসলামী ছাত্রশিবির তেমন শক্তিশালী ছিল না। সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাট পরিবর্তন ঘটে ১৯৮৬ সাল থেকে।
কিন্তু আজ হতবাক হয় যখন দেখি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংগঠন গুলোর মারামারি। আমাদের সময় আমার জানা মতো সিলেট শহরে কোন মা বাবা সন্তান হারাতে হয় নাই। কিন্তু আমরা কি ফিরে যেতে পারব না আগের দিনে। মারামারি করব ঘুষাঘুষি করব এই পর্যন্ত। আজ দেখা যায় এই এম সি কলেজ এলাকা গড়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের গড ফাদারদের আধিপত্য। ইতিমধ্যে টিলাগর এলাকায় গত দুই বছরে প্রাণ হারিয়েছে অনেক ইয়াং ছাত্র লীগের ছেলে।
ওদের মৃত্যুর কারণ হল দুই প্রভাবশালীদের মধ্যকার ফাটাফাটি জন্য। স্বনামধন্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির নামে আর কত মায়ের কুল খালি করলে খুশি হবেন। ছোট ছোট ভাইদেরকে দলীয় স্বার্থে হাতে অস্ত্র দিয়ে লালন পালন না করে ,ওদেরকে সুন্দর একটা পরিবেশে বড় হবার চেষ্টা করতে আপনাদের অসুবিধা কেন?
আজ ছাত্র নামদারী কিন্তু কাজকর্মে দেখা যায় টাকা উপার্জন।
হ্যাঁ ছাত্ররা পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে কিছু টাকা যদি রোজগার করে ,তাহলে অন্ততপক্ষে নিজের পকেটের খরচ বহন করতে পারবে। আগে ছাত্ররা নিজে পড়াশোনা করত সাথে সাথে বাইরে টিউশনি করে কিছু অর্জন করতে পারতো। এখন দেখা যায় নামে ছাত্র আর কাজে-কর্মে অস্ত্রের ঝনঝনানি দিয়ে টেন্ডারবাজি করতে। আমাদের শিক্ষাবর্ষে অথবা আমাদের পূর্বের শিক্ষাবর্ষের ছাত্ররা ছিল সমাজের কাছে একটা মুকুটস্বরূপ। কিন্তু আজ সেই গৌরব বিলীন হয়ে গেছে দুষ্টু এবং স্বার্থপর রাজনীতি চর্চা করার ফলে। এখনো ও সময় আছে হাতে অস্ত্রের বদলে বই খাতা-কলম নিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করা।
কিবরিয়া
লস অ্যাঞ্জেলেস
১১ অক্টোবর ২০২০ ইংরেজি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইনশাআল্লাহ আগামী কাল দ্বিতীয় পর্ব লিখবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *