প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সিলেটে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি শহরের কেন্দ্রস্থল হাওয়াপাড়া পয়েন্টে অবস্থিত। এর আগে পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালে সিলেটের এম সি কলেজ প্রাঙ্গণে নির্মান করা হয়েছিল সিলেটের প্রথম শহীদ মিনার। পরবর্তিতে ১৯৬৯ সালে মদনমোহন কলেজ চত্বরে নির্মিত হয়েছিলো ২য় শহীদ মিনারটি।
হাওয়াপাড়া পয়েন্টে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এলাকার তরুনদের উদ্যোগে স্বাধীন বাংলাদেশে সিলেটের প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এই শহীদ মিনার নির্মানের অন্যতম উদ্যোক্তা শহীদ মিনারের সংলগ্ন পশ্চিম দিকের “নাহার মঞ্জিল”এর আবদুল হাই আজাদ ও শামসুন্নাহার আজাদ এর সন্তান আবদুল আজাদ কয়েস। তারা কয়েকজন মিলে এই শহীদ মিনারটি তৈরী করেন।

এখানে শহীদ মিনার তৈরীর পেছনে ও আছে একটা রক্তাক্ত ইতিহাস। ১৯৭১ সালের অগ্নিঝরা মার্চের ২৪ তারিখ সিলেটে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে স্মরণকালের বিশাল মিছিল বের হয়। মিছিলের পর রাতেই খবর এলো মুসলিম নেতা আবদুল মজিদ (পুকরা মজিদ) এর নেতৃত্বে সিলেটে সশস্ত্র পাল্টা মিছিল বের হবে।
এই সংবাদ জেনে সিলেটের আওয়মী লীগের নেতা কর্মীরা এই মিছিল প্রতিহত করতে মাঠে নামলেন। এর গুরুত্ব অনুধাবন করে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ২৫ মার্চ দুপুর থেকেই জনগনকে সংগঠিত করতে ছড়িয়ে পড়লেন শহর ও শহরতলীতে।
২৫ মার্চ রাত থেকেই সারাদেশের ন্যায় সিলেটে পরিস্থিতি ও পাল্টে গেল। পাক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়লো
নিরীহ মানুষের উপর। সারারাত সিলেটের চতুর্থদিকে শোনা গেল গোলাগুলির আওয়াজ। সারা শহর নেমে এলো নীরবতা। ২৬ মার্চ ভোরে এক নেপালি দুধওয়ালা সাইকেলে দুধ দিতে আসেন হাওয়াপাড়া এলাকায়।
নাহার মঞ্জিল এর সামনে সাইকেল দাড় করিয়ে দুধ দেয়ার প্রস্তুতি কালে হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ। মুহুর্তেই
গুলি এসে লাগে দুধওয়ালার শরীরে। সাথে সাথে তিনি ঢলে পড়েন রাস্তার পাশের নালায়। নাহার মঞ্জিলের
শামসুন্নাহার সেই দৃশ্য অবলোকন করেছিলেন বাড়ীর ভেনটিলেটার দিয়ে।
সেই সময় নাহার মঞ্জিলে অবস্থান করছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী, সিরাজ উদ্দিন আহমদ ও এম এ মুনীম। এখানে উল্লেখ্য নাহার মঞ্জিল এর আবদুল হাই আজাদ ও তার সহধর্মিণী শামসুন্নাহার আজাদ ছিলেন সিলেটে আওয়ামী রাজনীতির নিবেদিত প্রাণ। স্বাধিনতা সংগ্রামে তাদের বাড়ীর রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা।
গোলাগুলির আওয়াজ কিছুটা কমলে সিরাজ উদ্দিন আহমদ ও এম এ মুনীম একটি ভ্রম্যমান এম্বুলেন্সে
গুরুতর আহত দুধওয়ালে ও অনতিদূরে নিহত আরেক জনের লাশ তুুলে দেন। হাসপাতালে সেই নেপালি দুধওয়ালারও মৃত্যু হয়। নিহত দুধওয়ালা হাওয়াপাড়া মীরবকস টুলা এলাকা দুধ দেয়ার সুবাদে পরিচিত ছিলেন।
স্বাধিনতার পর হাওয়াপাড়ার যুবকরা দুধওয়ালা যেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন সেখানে এই শহীদ মিনারটি তৈরী করেন। এই শহীদ মিনার তৈরীর নেপথ্য ইতিহাস অনেকেই হয়ত জানেন না। আজ শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি দুধওয়ালার মত নাম না জানা সকল শহীদদের।
পরবর্তিতে বিভিন্ন সময় সিলেটের নাইওর পুল, সোবহানীঘাট, লাক্কাতুরা ও জেলা প্রশাসকের অফিস প্রাঙ্গণে শহিদ মিনার তৈরী করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারনে এগুলোর অস্থিত্ব হারিয়েছে ।
তবে সাম্প্রতিক কালে চৌহাট্রা এলাকায় নির্মিত সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি সিলেট বাসীর গৌরবের প্রতিক হয়ে মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে আছে।
সুত্রঃ মিলু কাসেমের ফেইসবুক পেইজ থেকে নেয়া
