সকালটা আজকে অপূর্ব সুন্দর। টকটকে লাল সূর্য উঠেছে। জ্যোৎস্না নামাজ পড়ে একটু শুয়েছিলেন। পাখির ডাক শুনতে শুনতে মনে হয়েছে সেই কতকাল আগের মতো আকাশ একটু ফরসা হলেই নাশতা খেয়ে তাপসীদের বাসায় দৌড়ে যেতে পারবেন। ছোটবেলার গ্রামের স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে তাঁকে। মার্চ মাস এলে তো কথাই নেই।
নোয়াখালীর ফুলপুর গ্রামে খুব ছোটবেলাটা কেটেছে তাঁর। একান্নবর্তী পরিবারের বাসাটা ছিল নদীর পাড়ে। সকালে উঠে খোলা ঝাঁ পিঠা (চালের গুঁড়া, ডিম লবণ দিয়ে তৈরি পিঠা মাটির খোলায় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বানান হতো) গুড়, নারকেল অথবা তরকারি দিয়ে খেয়ে জ্যোৎস্না চলে যেতেন অতসীদের বাসায় আর শীতকালের নাশতা ছিল পুলি, ভাপা, লাটিম, বিন্নি ভাপা পিঠা। শীতে খেজুরগাছ কেটে রাতে কলস ঝুলিয়ে খেজুর রস সংগ্রহ করা হতো। সেই রস সকালে ছেঁকে জ্বাল দিয়ে বানানো হতো পায়েস বা গুড় বা রাব (রস জাল দিয়ে ঘন করা) আর খাওয়া হতো কত রকমারি পিঠা। অতসীদের বাসার দিকে যেতে যেতে জ্যোৎস্না দেখতেন চিন্তার মা (জেলে) হাতে কোরা (বাঁশের তৈরি) ভর্তি পুকুরের মাছ নিয়ে আসছেন বাড়িতে। সাদা শাড়িতে তাঁর বিধবার সাজ। সঙ্গে ছোট্ট নাতি। মাছ দিয়ে তিনি চলে যেতেই আসতেন দুজন কামলা তরকারি আর মাছ কাটতে। ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ দুপুরে খাবেন। তোড়জোড় শুরু হতো তখনই।
স্কুল না থাকলে তাঁরা যেতেন লাবু জ্যাঠার কুলগাছতলায়। গাছটার গোড়া মাটিতে আর ডালপালাগুলো পুকুরের ওপর। টুপ করে কুল পড়ে ডুবে ভেসে উঠত। লাঠি দিয়ে কাছে এনে বা একটু পানিতে নেমে সেই কুল ভাগাভাগি করে খেতেন তাঁরা।
স্কুল থাকলে দুই বান্ধবী চলে যেতেন হেঁটে হেঁটে স্কুলে। পাঁচটা সাবজেক্ট পড়াতেন তিনজন স্যার। বেঞ্চ বানানো হতো সুপারিগাছ কেটে খুঁটি দিয়ে উঁচু করে। জ্যোৎস্নার বাবা একটা বেঞ্চ দান করেছিলেন প্রতি ক্লাসে, অবধারিতভাবেই জ্যোৎস্না আর অতসী বসতে পারতেন বেঞ্চে। মাঝেমধ্যে ছোট্ট লালু বা গণেশ বসতে চাইত বেঞ্চে। কত কাকুতি–মিনতি তাদের। যেন দয়া করে এক কোনায় বসতে দিতেন তাঁরা। শিক্ষক লিখতেন চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে আর ছাত্রছাত্রীরা লিখতেন স্লেটে। পরীক্ষার খাতায় লেখা হতো বাঁশের হ্যান্ডেলে নিব কালিতে চুবিয়ে কাগজে। ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরে চলে যেতেন শানবাঁধানো পুকুরে দুই বান্ধবী। সাঁতার কাটা বা তালের নৌকায় হাত দিয়ে বেয়ে পুরো পুকুর ঘুরতেন তাঁরা। দুপুরে খেয়ে একেক দিন যেতেন একেক বাসায়। রানুর বাসায় যেতে হতো নদীর পাড় ঘেঁষে রাস্তা দিয়ে। গিয়ে তাঁরা দেখতেন রানুর বাবা হাট থেকে আঁতর কিনে এনে ছোট ছোট শিশিতে ভরে বিক্রির জন্য তৈরি করছেন। পয়সা আর গালা দিয়ে ছোট বোতল সিল তাঁরাও করেছেন কত।
হাট বসত তখন শনি আর মঙ্গলবার। ডুলা (বাঁশের তৈরি) ভরে মাংস বা বোতলে ভরে তেল নিয়ে মানুষ হাঁট থেকে আসতেন দুপুর বা বিকেলে। সপ্তাহের বাকি দিন ওই দুই দিনের আনা বাজার থেকেই সবার চালাতে হতো। সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাঁশঝাড় থাকত সবার। বাঁশের ডালা, কুলা আরও কত–কী যে তৈরি হতো। বাঁশের তৈরি জইন বা আনতা (ঝুড়িজাতীয় ফাঁদ) পুকুরে রেখে পরদিন তুলে আনা হতো, তখন হরেক রকম মাছ। জ্যোৎস্না ও অতসী মুগ্ধ হয়ে দেখতেন পাটখেত থেকে কীভাবে পাট তুলে, পানিতে ভিজিয়ে, পরে পাট আর পাটকাঠি আলাদা করে বাঁশের তৈরি মাচায় পাট শুকাতে দিতেন নারীরা।
বিকেলে দুই বান্ধবী যেতেন চরের ওপর পাখির বাসা দেখতে, আগিলার গোটা (গোলাপি পুঁতি মতো, যার মাঝখানে ছিদ্র থাকত) দিয়ে মালা বানিয়ে পরতেন, যা চৈত্রসংক্রান্তির সময় গরুর গলায় পরানো হতো বা শিমপাতার ওপর তেঁতুল, লবণ, মরিচ দিয়ে মাখিয়ে করি পেয়ারা দিতে খেতে বা বাড়ির পাশের খালের ওপর কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়ে হেঁটে অবন্তির বাসায় গিয়ে জবা বা গাঁদা ফুল তুলতে। দেখতে যেতেন নদীর জোয়ার, খেলতেন ‘খাদ্দা নাচন’ বা গুটি খেলা। পাঁচটা গর্ত করে গুটি ফেলে ফেলে খেলা।
সন্ধ্যায় আসতেন কাছারিঘরে। শিক্ষক পড়াতেন বাসার ছোট–বড় সব বাচ্চাকে। হারিকেনের আলোয় পড়াতেন তিনি আর কুপি বা চেরাগের আলোয় পরে পড়তেন বড়রা, জ্যোৎস্নার তেমন পড়াশোনা ছিল না, এতই ছোট ছিলেন। রাতে ঘুমিয়ে যেতেন এরপর।
যুদ্ধ কী, তা বোঝার মতো বয়স তাঁর ছিল না, কিন্তু শান্ত গ্রামে আঁচ লাগল যুদ্ধের। ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ দেশ স্বাধীন ঘোষণার পরপর। বড়রা ব্যাটারিচালিত রেডিও শুনতেন। কিছু সৈনিকের আনাগোনা শুরু হয়েছিল। জ্যোৎস্না আর অতসীকেও সাবধান করা হয়েছিল দূরে বেড়াতে না যেতে বেশি। তারপর ১৯৭১ সালের এপ্রিলের এক বিকেলে অতসী জ্যোৎস্নাকে বলেছিলেন, তাঁরা অনেক দিনের জন্য ইন্ডিয়া বেড়াতে যাবেন।
দেশ স্বাধীন হলে আসবেন ফিরে। জ্যোৎস্না বোঝেননি তখনো রাতদিনের সঙ্গীকে পরদিন আর খুঁজে পাবেন না। পরদিন গিয়ে দেখলেন, অতসীদের বাসা তালাবন্ধ। সব সময়ের সঙ্গী চলে গেছে কোথায় কেউ জানে না। কতবার ওই বন্ধ দরজায় গিয়ে ফিরে এসেছেন তিনি। গ্রামের রঙিন দিনগুলো সাদাকালো হয়ে গেল শুধু অতসী নেই বলে। তারপর যুদ্ধ, কত চেনাজানা মানুষ হারালেন চোখের সামনে, দেশ স্বাধীনের পর দৌড়ে গেলেন জ্যোৎস্না–অতসীর খোঁজে। কিন্তু অতসী তো আসেনি। কথা রাখেনি। তারপর মেঘে মেঘে কেটে গেল অনেক বেলা। নোয়াখালী শহরে চলে গেলেন জ্যোৎস্নারা। এল কত বন্ধু জীবনে, নিজের সংসার হলো। তাঁর ছোট মেয়ে সেদিন হাপুস নয়নে কাঁদল সবচেয়ে কাছের বান্ধবী বিদেশ চলে যাবে বলে। তিনি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোর কষ্টটা আমি বুঝি রে, মা।’ তিনি বলেননি তাকে, পেপারে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে অতসীকে খুঁজে পেয়েছেন তিনি। সেই অসীম আনন্দের সুর।
এই ২৬ মার্চে দেশে আসছেন অতসী ইন্ডিয়া থেকে। দেখা করবেন জ্যোৎস্নার সঙ্গে স্বাধীনতা দিবসে, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি রাখতে অনেক বছর পর। জ্যোৎস্না পরবেন সবুজ শাড়ি, হাতে রাখবেন একগুচ্ছ লাল গোলাপ অতসীর জন্য।
অতসী গেয়েছেন,
‘স্মৃতি ঝলমল সুনীল মাঠের কাছে ঢেউ ছলছল মেঘনা নদীর কাছে আমার অনেক ঋণ আছে… ’।
*লেখক : ফারহানা আহমেদ লিসা, আমেরিকা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here