হুমায়ুন রশীদের প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা ক’জন – ম আ মোশতাক


১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট ১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বাংলার নন্দিত নেতা জাতিসংঘ ৪১ তম অধিবেশনের সভাপতি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্পীকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর সাথে তার প্রথম নির্বাচনী প্রচারণায় আমরা যে ক’জন সিলেট শহর সালুটিকর কোম্পানীগঞ্জ সহ শহরের আনাচে কানাচে পথসভা সহ সকল কর্মী সমাবেশে পাশে থেকে জনাব হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাহেবের সাথে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল।

জাতীয় এই নির্বাচনে সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান আ ফ ম কামাল ও টুলটিকর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল রকিব আমাদের বাসার সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন আমাকে দেখে রিক্সা থামালেন এবং রকিব সাহেব আমাকে ভাতিজা সম্বোধন করে বললেন, “আমরা হুমাউন রশীদ সাহেবকে নির্বাচনে সহযোগিতা করিতেছি, তাই তুমি আমাদেরকে এই ব্যাপারে সাহায্য করতে হবে”।

সাথে সাথে আমি সিলেট টাইগার্স ক্লাবের সকল কর্মকর্তা ও পূর্বাশা সংঘের সাথে আলোচনা করে সিলেট শহরের আম্বরখানাস্থ হাউজিং ষ্টেইট এলাকার একটি হল রোমে প্রথম নির্বাচনী কর্মী সভা আয়োজন করি। এই সভায় আমরা সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে হুমাউন রশীদ সাহেবকে নির্বাচনী কাজে সহযোগীতা করে যাওয়ার প্রতিশুতি দেই।

এই সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট সমাচারের সম্পাদক জনাব ওয়াহিদ খান, সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আ ফ ম কামাল, টুলটিকর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আব্দুল রকিব । আমি তখনকার সময়ে আমাদের সিলেট টাইগার্স ক্লাবের পক্ষ থেকে মুহিত খাঁন (এনাম), সাব্বির আহমেদ চৌধুরী ও খোকন আহমেদকে সাথে নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হই। পূর্বাশা সংঘের পক্ষ থেকে মিছন আহমেদ সেখানে তার সহকর্মীদের নিয়ে উপস্থিত হন।

প্রথম সভাতে আমি শুভেচ্ছা বক্তব্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার কাজ শুরু করি। আমি আমার বক্তব্যে পরিষ্কার করে বলেছিলাম, আমরা কোন রাজনৈতিক দল করি না, আমরা সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সিলেটবাসীর একজন গর্বিত সন্তানের পাশে থেকে নিঃস্বার্থ ভাবে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশুতি ব্যক্ত করি। বিগত দিনে ওসমানী সাহেবকে সঠিক মূল্যায়ন না করে সিলেটবাসী যে ভুলটি করেছিল, সেই ভুলটি আমরা পুনরাবৃত্তি করতে চাইনা। এই কারণে দল-মত নির্বিশেষে আমরা হুমায়ুন রশিদ সাহেবের নির্বাচনী প্রচারণার কাজে সম্পৃক্ত হয়েছিলাম এবং আমরা কথা দিয়েছিলাম আমরা তার নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার পাশে থাকব এবং নির্বাচনে উনাকে জয়যুক্ত করব।

আমরা নিজস্ব খরচে বিমানবন্দর রোডে তার জন্য একটি অফিস তার পরবর্তীতে চৌকিদিকি, হাউজিং স্টেইট, আম্বরখানা প্রত্যেকটি জায়গায় আমরা অফিস করেছি। আমাদের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয় ছিল দরগা গেইটস্থ হুমায়ুন রশীদ সাহেবের বাসভবন। সেখান থেকে সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। আমরা কামাল ভাই ও আব্দুর রকিব এবং হুমায়ূন রশিদ সাহেবের ছোট ভাই জানঙ্গীর রশিদের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে প্রতিটি প্রচারণা অনুষ্ঠান, পথসভা, গণসংযোগ চালিয়েছি।

হুমায়ুন রশিদ সাহেবের  এই নির্বাচন কালীন সময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দু-একটি কথা আমার খুবই স্মরণ পড়ে। আমরা সিলেট থেকে যখন প্রথম সালুটিকর বাজারে একটি পথসভা করে সেখানে গাড়ি রেখে আমরা নৌকাযোগে যখন কোম্পানীগঞ্জের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন নৌকার মধ্যেই বেশ রসাত্মক  আলাপ আলোচনা চলছিলো। আমরা বয়সে ছোট, তাই শুধু শ্রুতা হিসেবে তাদের কথাগুলো শুনছিলাম।

হুমাউন রশীদ সাহেবের এই নির্বাচন কালীন সময়ে তার সাথে এমব্যাসিতে কাজ করতেন (নামটা মনে নেই) আমাদের পাড়াতেই থাকতেন। তিনি আমাদেরকে প্রায়ই সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতেন কিন্তু আমরা কোনোদিন তার নিকট থেকে কোন টাকা পয়সা নেইনি। আমরা সালুটিকর বাজার থেকে কোম্পানীগঞ্জের মধ্যখানে একটি স্কুল ঘরে যখন পৌঁছাই, তখন গ্রামবাসী সবাই আমাদের জন্য কিছু নাস্তার ব্যবস্থা করেন। এখানে সভাটি শেষ করার পর আমরা কোম্পানীগঞ্জের দিকে রওনা দিয়েছিলাম।

কোম্পানীগঞ্জের স্কুল মাঠে একটি জনসভা হয়। সেই জনসভা শেষে আমরা চলে আসি সিলেটের দরগা গেইটস্থ অফিসে। এখানে আসার পরে যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি তা কোনদিন ভুলবার নয়। রাত অনেকটা হয়ে গিয়েছিল, ঠিক মনে নেই। এগারোটা বা বারোটা হবে। আমরা বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলাম, কিন্তু হঠাৎ দেখি লামা ভাইয়ের নেতৃত্বে একটি মিছিল অফিসে এসে পৌঁছেছে। তখন কামাল ভাই ও জাঞ্জীর রশীদ সাহেব আমাদেরকে বললেন যে, তোমরা এখন বাসায় যেওনা।

তিনি আরও বললেন, “এখন বাসায় যাওয়া নিরাপদ হবে না, কারণ তোমাদের উপর কিছুলোক ক্ষুব্ধ আছে। তারা তোমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে”। তখন আমরা খাবার টেবিলে খাবারের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। তখন হঠাৎ পাঁশের রোমে একটি বিকট শব্দ শোনা গেল। পাশের রুমে কি হচ্ছে আমরা কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু দলীয় নেতা কর্মীর সাথে যে হুমাউন রশীদ সাহেবের বচসা চলছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না।

এক পর্যায়ে জাতীয় পার্টির নেতা কর্মীরা অফিস ত্যাগ করে যখন চলে গেলো তখন আমরা জানতে পারি যে, লামা ভাই নেতা কর্মীদের কিছু পাসপোর্ট এনেছিলেন এবং হুমায়ুন রশিদ সাহেবকে অনুরোধ করেছিলেন যে, যাতে তিনি উনাদেরকে ভিসা লাগিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। কিন্তু আমরা জানতে পারি হুমায়ুন রশীদ সাহেব পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন যে, আমি কোন এম্বেসেডর নই এবং আমি কেন তাদেরকে ভিসা লাগিয়ে দেব?

তিনি বলেন, “আমার জন্য যারা নির্বাচনে কাজ করছে, তারা আমার সাথেই রয়েছে। আমার দলের কর্মীরা আমার জন্য কাজ করছে কিনা না তা সিলেটের মানুষ ভালো করেই জানে। কিন্তু আমার সাথে সিলেটের মানুষ সবাই যার যার জায়গা থেকে আমাদেরকে সাহায্য করে যাচ্ছে”, এটা পরিষ্কার ভাষায় বলেছিলেন।

আরো একটি সত্য ঘটনা আপনাদের সামনে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। আপনারা দেখেছেন কিনা জানিনা, হুমায়ুন রশিদ সাহেব জাতীয় পার্টির একজন মনোনীত প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তখন সিলেটের মানুষের সেন্টিমেন্টের কথা চিন্তা করে তিনি ১০ লক্ষ পোস্টার উনার অফিসে তখন পোড়ানো হয়েছিল। এর পরিবর্তে এরশাদের ছবি বিহীন পোষ্টার ছাপিয়ে ছিলেন। আপনারা যারা সিলেটে বসবাস করেন এবং তখনকার সময়ের এই নির্বাচন দেখেছেন তারা অবশ্যই এ পোস্টার দেখে থাকতে পারেন।

প্রথম নির্বাচনী সভায় হুমায়ুন রশিদ সাহেবের কাছে এটাই ছিল আমাদের অনুরোধ যে, আপনি সিলেটের একজন গুণীজন, সিলেটবাসীর সমর্থন পেতে হলে আপনাকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে যেতে হবে। আমাদের কাছে দল বড় নয়, আপনি ব্যক্তি হিসাবে, যোগ্য ও সম্মানী ব্যক্তি হিসাবে আপনাকে সিলেটবাসী ভোট দিবে। এটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল। সেই দিক লক্ষ্য রেখে উনি এই কাজটি করেছিলেন এবং আমরা যখন লেচুবাগান বিমানবন্দর রোড়ে অফিস করি, তখন আমরা এই পোস্টারগুলি ব্যবহার করেছিলাম।

আমি ও সাব্বির চৌধুরী, খোকন আহমেদকে সাথে নিয়ে প্রচারণার কাজে চারটি গাড়ি ব্যবহার করতাম। আমাদের হেফাজতে দুটি গাড়ি প্রচারণার কাজে ব্যবহার করা হত। প্রচারণার পাশাপাশি প্রত্যেকটি পথসভা ও কর্মী সমাবেশকে সফল করার দায়িত্ব ছিল আমাদের ।

যাই হোক, সিলেট মাদ্রাসা মাঠে যখন শেষ জনসভা হবে, সেই দিন হুমায়ুন রশিদের জনসভাকে প্রতিহত করার জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়ে বসে। তখন সিলেটের মধ্যে একটি থমথমে ভাব ছিল। তখন আমাদেরকে বলা হয়েছিল আমরা যাতে কোন সংঘাতে না জড়াই। তাই আমি সেইদিন মাইকে বারবার বলেছি, আমরা সংঘাতে বিশ্বাস করি না, সিলেটবাসী ভোটের মাধ্যমে তাদের রায় প্রদান করবে এবং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই রায় আমদের পক্ষে আসবে।

ভোটের মাধ্যমে আমরা প্রমান করব হুমায়ুন রশিদ সাহেব নির্বাচিত হবেন এই অনুরোধ আমরা সব সময় করেছি এবং আমাদের কর্মীবাহিনীকে মাদ্রাসার চৌহাট্টা পয়েন্টে থেকে সরিয়ে আনি এবং আমরা সেদিন বড় ধরনের সংঘাত থেকে হাজার হাজার নেতা কর্মীকে বাছিয়ে আনতে সামর্থ্য হয়েছিলাম। জনসভার পরিবর্তে গণ মিছিল করে শহরের বিভিন্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে নির্বাচনী সো-ডাউন শেষ করি।

এই ধরনের উস্কানির পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন আমরা যদি মাঠে ঢুকতাম তাহলে আওয়ামী লীগের সাথে একটা সংঘাত হয়ে যেত, কিন্তু আমরা সেই সংঘাতকে এড়িয়ে সেদিন আমরা জনসভা না করে আমরা মিছিল ও কর্মীসভার মধ্যদিয়ে আমরা এটাই প্রমাণ করতে পেরেছি যে, আমরা সংজ্ঞাতের রাজনীতি পছন্দ করিনা। নির্বাচনের ফলাফলে যখন হুমায়ুন নির্বাচিত হন তখন সারদা হলে নির্বাচনী বিজয় উৎসব অনুষ্টানে আমি শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেছিলাম, আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি, আপনি নির্বাচিত হয়েছেন, আপনি মন্ত্রী হবেন, কিন্তু সিলেটবাসীকে আপনি ভুলে যাবেন না।

তখন পিছন দিক থেকে সিলেট পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কামাল ভাই প্রথমে বুঝতে পারেননি আমি কি বলতে চাচ্ছি। তিনি পিছন থেকে আমার হাত টেনে আমাকে থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আমি খারাপ কিছুই বলিনি। আমি শুধু এটুকুই বলেছিলাম সিলেটবাসী আপনাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, এমপি বানিয়েছে এবং আপনি আশা করি একজন যোগ্য মানুষ হিসেবে আপনি মন্ত্রী হবেন সিলেটের বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে সিলেটের অনেক দাবি-দাওয়ার রয়েছে। এই দাবিদাওয়াগুলো পর্যায়ক্রমে আপনি পূরণ করার চেষ্টা করবেন।

নির্বাচন পরবর্তীতে আমরা যখন তার ইলেকট্রিক সাপ্লাই বাসায় কর্মীসভায় বসি,  তখন দেখতে পাই অনেক লোক ভিড় করেছেন বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা নেওয়ার জন্য। হুমাউন রশীদ সাহেব আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন যে, “ঐ ছেলেরা অনেক কষ্ট করেছে, তারা কিছু বলছে না”। তার জবাবে চেয়ারম্যান রকীব সাহেব আমাদেরকে পুরস্কৃত করার জন্য হুমাউন রশীদ সাহেবকে অনুরুধ করেন। প্রতিউত্তরে, আমরা ক’জন সাথে সাথে দাঁড়িয়ে বলেছি, আমারা কোন কিছু পাওয়ার আশায় নির্বাচনে কাজ করি নাই। আমাদের কোন কিছুর দরকার নেই। আপনাদের দোয়া ও  সকলের ভালোবাসাই আমাদের জন্য যতেষ্ট।

পরবর্তীতে যতবারই হুমায়ুন রশীদ সাহেব সিলেট এসেছেন পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আ ফ ম কামাল আমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে দাওয়াত করেছেন। আমরা উনার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু কোন কিছুর বিনিময় নয়, কিছু চাওয়ার জন্য নয়, শুধু আন্তরিকতার জন্য। কিন্তু আজকে যারা রাজনীতি করেন সবাই নিজের স্বার্থের জন্য কাজ করেন। স্বার্থ ছাড়া, টাকা ছাড়া উনারা এমপির পিছনে বলেন আর চেয়ারম্যান এর পিছনে বলেন তারা কাজ করেন না।

যারা আজকে রাজনীতি করেন, এদের মধ্যে অনেক স্বার্থবাদী নেতাকর্মী রয়েছেন। শুধু নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য রাজনীতি করেন। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রাজনীতি করেন। মুখে বলেন, আমরা জনগণের জন্য কাজ করছি, কিন্তু আপনি কতজন নেতাকর্মী খুঁজে পাবেন, যে দেশ এবং জাতির কল্যাণের জন্য রাজনীতি করেন।

আজকে এই মৃত্যুবাষিকীতে আমি মরহুম জননেতা হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর রুহের মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন উনাকে বেহেশত বাসী করেন আমিন ইয়া রাব্বুল আলামিন।

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *