প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম লন্ডন প্রতিনিধি ময়নূর রহমান বাবুল :: আশির দশকে বৃটেনে বর্ণবাদ বিরোধী বাঙালি কমিউনিটির একজন প্রথম শারীর নেতা, পূর্ব লন্ডনে বাঙালি সংস্কৃতির প্রচার ও প্রশারে নিবেদিত প্রাণ অগ্রসৈনিক, পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেনের প্রিয় মুখ এবং বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, কমিউনিটি নেতা জনাব আব্দুস সালিক গতকাল ১৫ই অক্টোবর লন্ডন সময় সকাল ১১টায় রয়েল লন্ডন হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি—- রাজিউন)। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী হাসনা সালিক, এক কন্যা সংগীত শিল্পী শাপলা সালিক, দুই পুত্র উচ্ছল সালিক ও সচ্ছল সালিক এবং নাতি নাতনিসহ অসংখ্য বন্ধু-বান্ধব গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
জনাব আব্দুস সালিক সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলাধীন কাজির গাঁও গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পরর্তিীতে গোয়ালা বাজার তাজপুরের নিকটবর্তী বর্তমান ওসমানীনগর থানার পার্শবর্তী গ্রাম ইলাশপুরে বসতি স্থাপন করেন। পূর্ব লন্ডনে তিনি বো বেথনালগ্রীণ এলাকায় বাস করলেও ব্রিকলেনে ছিল তার ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ঃ সালিকস্ রেষ্টুরেন্ট। বনফুল এবং মিষ্টিদেশ ।
আব্দুস সালিকের জন্ম ১৯৫১ সালের ১লা আগস্ট। তিনি তাজপুর মঙ্গলচন্ডি নিশিকান্ত উচ্চবিদ্যালয় থেকে মেট্টিক পাশ করেন এবং সিলেট এমসি কলেজ থেকে আই এ পাশ করেন। পরবর্তীতে স্নাতক (বানিজ্য) শ্রেনিতে সিলেট মদমমোহন কলেজে ভর্তি হন। রাজনীতি এবং সমাজ সচেতন জনাব আব্দুস সালিক ছাত্র জীবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।
তিনি তৎকালীন পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সাথে জড়িত ছিলেন। মুলত বাম ধারার চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। তখন থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তার সরব পদচারনা ছিলো। নিজে গান লিখতেন, গান গাইতেন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনে নেতৃত্ব দিতেন।
১৯৭০ সালের ফেব্রæয়ারিতে তিনি যুক্তরাজ্যে চলে আসেন। কর্মস্থল হিসাবে তিনি বেছে নেন বাঙালি অধ্যুসিত পূর্ব লন্ডন এলাকা। এখানে প্রথমে পোশাক শিল্প এবং পরবর্তীতে রেষ্টুরেন্ট ব্যাবসায় মনোনিবেশ করেন। একজন সফল ব্যাবসায়ী জনাব আব্দুস সালিক লন্ডনেও ব্যবসার পাশাপশি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি স্থানীয় লেবার পার্টিতে যোগ দেন এবং ট্রেড ইউনিয়নে যুক্ত হন।
বৃটেনে তখন উত্থাল বর্ণবাদি আক্রমন চলছে। পুর্ব লন্ডনে বাঙালিদের পক্ষে তিনি সামনের সারিতে থেকে বর্ণবাদীদের রুখে দাঁড়ান। তিনি স্থানীয় রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অঙনেও খুবই পরিচিতি লাভ করেন। দিশারী শিল্পী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই আশির দশকেই তিনি মুলধারার টেলিভিশনে বাংলা গানের অনুষ্ঠান করে বঙালিদের মধ্যে সাড়া ফেলে দেন এবং সবার দৃষ্টি কাড়েন।।
তার নিজের কণ্ঠে গাওয়া ‘‘বাউলা কে বানাইলো রে.. এবং সোনা বন্দে আমারে পাগল করিলো… ‘‘ এসব হাসান রাজার গান লোকজন তখন আগ্রহভরে শোনতেন। বেশ কিছুদিন তিনি পূর্বলন্ডনের নজরুল সেন্টার পরিচালনায়ও নিয়োজিত ছিলেন।
নিজ দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি বিদেশে তোলে ধরার পাশাপাশি আব্দুস সালিক নিজ এলাকার উন্নয়নেও ব্যাপক অবদান রাখেন। যুক্তরাজ্যে থেকেও তার নিজ এলাকার ্উন্নয়নে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি বালাগঞ্জ আদর্শ উপজেলা সমাজ কল্যাণ সমিতিতে নেতৃত্ব দেন এবং প্রবাসি বালাগঞ্জ এডুকেশন ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষা উন্নয়নে এ সংগঠনের সুনাম আজ বহুল পরিচিত। তিনি এ সংগঠনের সভাপতি হিসাবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেন এলাকার নাম বাংলা টাউন প্রতিষ্ঠার সাথে আব্দুস সালিক খুবই সক্রিও ছিলেন।
গত কয়েক বছর যাবৎ তিনি বাংলাদেশেই বেশীরভাগ সময় থাকতেন। ঢাকার রামপুরায় তার নিজের ফ্ল্যাট বাসায় অথবা সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার ইলাসপুর গ্রামে ছিলো তার অবসর সময় কাটানোর প্রধানতম স্থান। চলতি বছর আগস্ট মাসের ১০ তারিখে তিনি লন্ডনে ফিরেন। কিন্তু পরের দিন শরীর অসুস্থ বোধ করলে রয়েল লন্ডন হাসপাতালে যান।
সেখানে পরীক্ষার পর তার করোনা ভাইরাস কভিট-১৯ ধরা পড়ে। শরীরে অ·িজেনের মাত্রা কমে যায় আশষ্কাজনক হারে। তারপর দুইমাসেরও অধিক সময় হাসপাতালে থেকে অবশেষে ১৫ই অক্টোবর সকালবেলা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
একজন ন্যায়পরায়ন, প্রতিবাদী, পরপোকারি, স্পষ্টভাসী, সাহসী মানুষ হিসাবে পূর্ব লন্ডনে সবার কাছেই আব্দুস সালিকের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আব্দুস সালিকের মৃত্যুতে কমিউনিটির লোকজন, আত্মীয় স্বজন শুভাকাক্সখীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এই মৃত্যু যেন একটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিলো, নিস্তব্ধ করে দিলো ন্যায়ের পক্ষে কথা বলার একজন সাহসী মানুষের শক্ত উচ্চারণ। তার মৃত্যুতে ¯^জন ও শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গকে আমরা গভীর শোক ও সমবেদনা জানাই।
