আর দেখা হবে না – গোলাম কিবরিয়া


কি আশ্চর্য হঠাৎ করে চলে গেলেন। স্বার্থপরের মতো সামান্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য হয়েছি প্রবাসী। চলে গেলেন আপনি না ফেরার দেশে। যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে সাথে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছি। হ্যাঁ অন্তরে অনেক কিছু বয়ে বেড়ায়। হৃদয়ের একটি কোণায় জায়গা করে নিয়েছেন আপনি জানতেন না। জানাবার চেষ্টাও করি নাই।

আজকের স্মৃতিচারণ করছি সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক মরহুম আবু তৈয়ব চৌধুরীর। উনার সাথে পরিচয় হয়েছিল ৮৩-৮৪ সালে সিলেট এম সি কলেজে ভর্তি হবার সুবাদে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পর্যন্ত আমার তিনটা বছর নষ্ট হয়েছিল। যার কারণে আমার অনেক অনেক ছোট ভাইদের সাথে এমসি কলেজে একসাথে পড়তে হয়েছে।

মেট্রিক পাস করলাম দ্বিতীয় বিভাগে। যদিও আমি একজন বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলাম মেট্রিকের সময়। স্বপ্ন ছিল অনেক বড় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবো। কিন্তু যে রেজাল্ট করেছি মেট্রিকে সকল স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল। বাধ্য হয়ে এম সি কলেজে ভর্তির সময় কলা (মানবিক) বিভাগে ভর্তি হই। ভাবলাম যাহা আছে কপালে হবে ,তা হবে। মানবিক বিভাগে ১০টা বিষয়ের সাথে অতিরিক্ত আরো দুইটা সাবজেক্ট (যাকে বলে ফোর্থ সাবজেক্ট)।

মরহুম আবু তৈয়ব স্যার আমাদের ইসলামের ইতিহাস পড়াতেন। যেহেতু আমি মেট্রিক পাশ করেছি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে। আমার কাছে ইসলামের ইতিহাস এক্কেবারে নতুন ছিল। আইয়ামে জাহেলিয়া যুগের বিস্তারিত সবকিছু ছিল ইসলামের ইতিহাসে। আবু তৈয়ব স্যার খুব সুন্দর করে ক্লাসে বুঝাতেন ইসলামের ইতিহাস। কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ি।

সেই জন্য অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে অধ্যাপকদের চোখে বন্দী হয়ে যাই। অধ্যাপকদের কাছ থেকে নোট আনতে গেলে ৫০০/৭০০ টাকা লাগতো। কিন্তু মরহুম তৈয়ব স্যারের কাছ থেকে নোট পেয়ে যেতাম ফ্রী। শুধু উনার কাছ থেকে যে নোট ফ্রি পেতাম তা নয়। বলতে গেলে আমার সব সাবজেক্ট গুলো ছিল আমার জন্য ফ্রী । কেন আমাকে এত স্নেহ করতেন যোগ বিয়োগ করে কোন কিছু পাই নাই!

কলেজে ভর্তি হবার পর নজরে আসলো কলেজটা বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। অধ্যক্ষ নুরুল গনি স্যার তখন ছিলেন অস্থায়ী অধ্যক্ষ। কলেজে উন্নতির স্বার্থে অধ্যক্ষের সাথে আলাপ করলে কোন লাভ হতো না। তাই কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজের উন্নতির জন্য একসময় তালা ঝুলিয়ে দেয়। কলেজ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দাবি ছিল স্থায়ী অধ্যক্ষ নিয়োগ থেকে শুরু করে আরো পাঁচটি দাবি। কলেজ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাথে সমঝোতা করে তালাবদ্ধ কলেজ খুলে দেওয়া হয়। এই আন্দোলনের সম্মুখভাগে থাকায় অধ্যক্ষ ,অধ্যাপক ,অধ্যাপিকা সবাই ভালোবাসতেন।

১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ সিলেটের মেন্দি বাগে আসেন নতুন পুল উদ্বোধন করার জন্য। সাথে ছিলেন রিয়াল অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান সাহেব। যাই হোক হঠাৎ করে তলব হল আমার মত পাঁচ ছয় জন ছাত্রকে অধ্যক্ষের কার্যালয়। সেখানে বসা ছিলেন মরহুম তৈয়ব আলী স্যার।

অস্থায়ী অধ্যক্ষ নুরুল গনি স্যার আমাদেরকে একটি কথা বললেন এরশাদ সাহেব যেহেতু সিলেটে এসেছেন তাহলে আমরা যেন দাবি-দাওয়া উত্থাপন করি। তাই স্যারদের উপদেশ মেনে আমরা স্মারকলিপি নিয়ে নতুন পুলের কাছে ছুটে যাই। মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন রিয়াল এডমিরাল মাহবুব আলী খান।

উনার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মঞ্চে উঠে আমি। প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেবের কাছে স্মারকলিপি দেয়া হয়। হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন ঢাকায় ফিরে যাবার পর আমাদের দাবি দাওয়া পূরণ করবেন। ঠিকই ঢাকায় যাবার চার দিন পর জেলা প্রশাসকের কাছে টেলেক্স আসলো ছাত্র প্রতিনিধি বঙ্গভবনে যেতে হবে। ঠিকই বঙ্গভবনে যাওয়া হলো। পাঁচটা দাবির মধ্যে দুইটা দাবি পূরণ হয়ে গেল।

দাবির মধ্যে দুইটা দাবি এরশাদ সাহেব পূরণ করে দিলেন (১) অস্থায়ী অধ্যক্ষ নুরুল গনি স্যারকে স্থায়ী অধ্যক্ষ।
(২) কলেজের জন্য বাস সরবরাহ করেন।

একদিন ইসলামের ইতিহাসের ক্লাসে আবু তৈয়ব স্যার কক্ষ ভর্তি ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে থেকে আমাকে দাড় করালেন। আমি ভাবলাম নিশ্চয়ই আমার উপর গরম পানি যাবে। কিন্তু দেখি আমাকে নিয়ে গর্ব করে অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। হ্যাঁ কলেজের উন্নতির জন্য হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ সাহেবের কাছে স্মারকলিপি দেয়া।

আমি যদিও বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থে এরশাদ সাহেবের কাছে যাওয়া অনেকের কাছে ভালো লাগে নাই। তখন সারা বাংলাদেশে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে। অনেক সময় ক্ষুদ্রতম স্বার্থ বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ত্যাগ করতে হয়।

যাই হোক আবু তৈয়ব স্যার বলে উঠলেন”এই গোলাম কিবরিয়া হলো লুৎফুন্নেসা খাতুন মায়ার ভাগনা”। আমার খালার ও উনি স্যার ছিলেন। উনি যখন সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তখন স্যার দেখেছিলেন, আমার খালা কলেজেকে জাতীয়করণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছে কলেজের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান ৭৬/৭৭ সালে সিলেটে আগমন করলে সার্কিট হাউসে উঠেন।

লুৎফুন্নেসা খাতুন মায়া অর্থাৎ আমার খালা এবং তখনকার প্রিন্সিপাল রানী দুইজন সার্কিট হাউসে দুইটি দাবি সম্বলিত স্মারকলিপি নিয়ে গেলেন। স্মারকলিপি খালা জিয়াউর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেখানেই কিন্তু শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলেন দাবিগুলো নিয়ে। শেষ পর্যন্ত দাবিগুলো বাস্তবে রূপান্তরিত হলো। যাক এক সময় সিলেট মহিলা কলেজ (চৌহাট্রা)কিভাবে সরকারি কলেজে রূপান্তরিত হল এ নিয়ে লিখব।

অতীতে মুরারি চাঁদ (এম সি) কলেজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেক কিছু লিখেছি। স্যারদের কাছ থেকে স্নেহ ভালোবাসা একজন সামান্য ছাত্র হিসাবে যা পেয়েছি তা কল্পনাতীত ছিল। কিন্তু বিনিময়ে আমার সেইসব অধ্যাপক, অধ্যাপিকা, অধ্যক্ষের জন্য কোন কিছু করতে পারি নাই। শুধু লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস নিতে হচ্ছে। বার্ধক্য বয়সে উনাদের পাশে থাকতে পারলাম না।

প্রিয় স্যার আপনি চলে গেছেন সত্যি ,কিন্তু হৃদয়ের রেখে গেছেন অনেক স্মৃতি। ছাত্র অবস্থায় অনেক সময় অনেক নিজের অজান্তে বেয়াদবি করেছি মাফ চাওয়ার সময় পেলাম না। আমাকে আপনার আত্মা যেন ক্ষমা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আপনাকে জান্নাত বাসী করেন এই কামনা করি।

গ্রুপ ছবিটা ফেসবুকের বন্ধু রাতান কামালি (Ratan Kamali) কাছ থেকে সংগ্রহ করা। স্যারের গায়ে পরিধান খাকি রঙের স্যুট এবং লাল স্ট্রাইপ টাই। অসংখ্য ধন্যবাদ কামালি।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *