শীতের শেষ বেলা; হালকা উষ্ম চাদরে শরীর জড়িয়ে গন্থ মেলায় পৌঁছালাম; চোখে আমার জগতের বিস্বয়! এ যেন আমার সেই চিরচেনা শহর নয়; এ আমার বাংলা একাডেমি প্রাংগণ নয় । ইট – রড – সিমেন্টের বিশাল স্তূপে ঠাসা মাইলের পর মাইল। ধূলো উড়ছেতো উড়ছেই, একটা ভালো ছবি তুলবো সেই সাধ্য আমার কোথায়! যেখানে বিডিনিউজ২৪ -এ বইমেলা নিয়ে লেখা প্রথম পোস্ট আমার থাকে! আর সম্ভব নয়!
আমি মুহূর্তে ভুলে গেলাম সব ৷ এই বইমেলায় আমার প্রথম পদচারণা শুরু হয়েছিল স্কুল জীবন থেকে আব্বার হাত ধরে। তারপর ধীরে ধীরে বড় হতে থাকা, ধীরে ধীরে একলা হতে থাকা ৷ কাছের বন্ধুরা বেশ মেধাবী, বই মেলায় যেতাম বলে আঁতেল খেতাবী পেয়েছিলাম, তাই একাই চলে যেতাম ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভার্সিটির বাসে করে চলে আসতাম , হুমায়ূন আহমেদ তখন ছিলেন চরম ক্রেজ৷ অটোগ্রাফসহ বই একটা চাই – ই চাই। আমি পড়তাম হুমায়ূন আজাদ, শীর্ষেন্দু , সমরেশ, বুদ্ধদেব গুহ। দিনের পর দিন প্রেসে বসে থেকেছি, সে সব দিন এখন অতীত!
মাথার চুল জুরে থাকতো হোলদে গাদা অথবা গোলাপ- ঘাস ফুল। হাত ভর্তি রেশমী চুড়ি আর কপাল জুরে টিপ। আজো এই পরিণত বয়সে আমি তেমনি আছি ৷ কিন্তু এই শহরে বইমেলা আর আগের মতো নেই। দু’ধার আলো করে বসা রেশমী আপারা নেই, সেখানে জায়গা করে নিয়েছে হাত পাতানো ভিক্ষুক ।
এখানে ফুটপাথ থেকে বিক্রেতা সড়ানো হয়েছে কিন্তু ভাম্যমান ভিক্ষুক বেশে হিজরায় ভরে গেছে শহর ৷ তাদের নাছোড়বান্দা আচরণ গ্রন্থমেলার পড়ুয়াদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে। এতে প্রশাসনের কিছুই করবার নেই।
স্টল ঘুরে ঘুরে বই কেনার সাধ আমার উবে গেল যখন দেখলাম পায়ের চপ্পল কাঁদায় মাখামাখি, একটু ধুঁয়ে নেব তার জন্য পরিষ্কার ফ্রেশরুম খুঁজতে গিয়ে নিজেই ক্লান্ত হলাম ৷ থাক , পাশের দেশ ভারতের গ্রন্থমেলা থেকে কী অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছি তা আর শেয়ার করলাম না এখানে। আমার দেশকে আমি ভালোবাসি, তাকে ছোট করতে কখনোই চাই না।
যতোটা অবহেলা আর অব্যবস্থাপনা এই গ্রন্থমেলাকে ঘিরে থাকে, ততোটা আর কোন মেলাতে নেই । শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা অব্দি সব মেলা আমি যাচাই করে দেখেছি, বইয়ের প্রতি বাংলাদেশিদের এই অবজ্ঞার কারন ধরতে পারিনি ৷ এমন হতে পারে, যারা টাকা লগ্নি করে বইমেলায় বই ছাপান দায় বুঝি তাদের।
গোধুলি আলোয় আমি বেড়িয়ে আসতে বাধ্য হলাম, তখন লক্ষ লক্ষ জনতা ঢুকে পড়েছে ইতিমধ্যে, কিন্তু তাদের হাতে বই থাকবে যত সামান্য । একবার ভেবেছিলাম শিল্পকলায় গিয়ে একটা শো দেখবো,
কিন্তু জনাব ট্রাফিক জ্যাম উপেক্ষা করে নিজেই পৌঁছালেন সন্ধ্যা প্রায় ৬ টায় ।
আমার জীবনের শত কলা এই ভয়াবহ ট্র্যাফিক গিলে খেল ; থাক এ নিয়ে হা পিত্যেশ করে লাভ নেই । মুখে মাস্ক নিয়ে শাড়ি পড়ে এক ভয়ংকর চেহারা বানিয়ে হাঁটতে হবে এই ভয়ংকর শহরে। উন্নয়নের বীষ বাষ্প যখন একবার লেগেছে তাকে ঠেকাবে কেন!!
‘তাহলে চলুন আমরা হুড খোলা রিক্সায় কচি বাদামের খোসা ছাড়িয়ে কাটিয়ে দেই এই জ্যাম বেলা, আপনারতো বাড়তি কোন ছুটি নেই ৷ এই যে এইটুকুন সময় রেখেছেন আমার জন্য এটাই সাত জনমের ভাগ্যি আমার, ‘ এরপর আবার অপেক্ষা নতুন করে পাওয়ার, নতুন এক দিনের জন্য, নতুন একটি ঢাকা শহরের জন্য.
