কুয়াশা মোড়ানো ভোরে কতদিন আড়মোড়া দিয়ে হোস্টেলের কাচেঁর জানালায় সুর্যের আলোয় প্রথম স্নান হয়েছে ঘুমকাতুরে চোখের।
এক কাপ চায়ের নেশায় বালুচর মোড়ে কিংবা স্যারদের বাসায় পড়তে যাওয়া উৎসবের পর্যায়ের ছিল। আমরা পাতলা ডাল – সবজির নাস্তায় আস্থা হারালে, হোস্টেল ক্যান্টিনে মাঝে মাঝে স্বাদের অদল বদল করতে যেতাম। আমাদের সময় মাস কয়েকের জন্যে ক্যান্টিনটা খোলা ছিল, সেই ক্যান্টিনে বিকালের চা আর সিংগারা অমৃত না হলেও আড্ডায় ভাল খোরাক দিতো।

প্রতিটি ব্লকের মাঝের মাঠগুলোর ঘাসে আমাদের কত স্মৃতি, কত ক্রিকেট ম্যাচের জয়-পরাজয়ের হাসি ঠাট্টা মিশে আছে।
সকালে কিংবা দুপুরে ব্লকের হাউসের পানি দিয়ে এক সাথে গোসলে আমরা কোশল বিনিময় সেরে ফেলতাম। মাঝে মাঝে পুকুরে ঝাপাঝাপি। কি যে মধুর সেই সময়, কি যে মধুর!
কংক্রিট পিচে ক্রিকেটে কত পাগলামি, নিজেকে পুরোপুরি ক্রিকেটার ভেবে বাইসাইকেলে চেপে সিলেট স্টেডিয়াম ক্রিকেট কোচিং করতেও গেছি।
এসবের মাঝে পড়ুয়া বন্ধুদের কিংবা সিনিয়র ভাইদের চোখে বাউন্ডুলে উপাদী পেয়ে গেছি। তবুও ইন্টার ব্লক ক্রিকেটে আমরা ভারত-পাকিস্থান মেজাজে লড়তাম। তবে সে জয় পরাজয় মাঠেই মিশে যেত, এরপর সেই আমরা, একই আমরা।
চৌদ্দ কিংবা একুশ ইঞ্চি টেলিভিশনে কত যে ম্যাচ, কত অনুষ্ঠান সময়ের গন্ডিতেও উপভোগ্য ছিল, সেটা বলে বুঝানো যাবে না। শুধু বুঝতে পারছি, সেই সময় আর ফিরে আসবে না। TV রুমে টেবিল টেনিসের টুকটাক শব্দের উল্লাস আর পাওয়া না পাওয়ার হিসেবের মাঝে বিশেষ এক মিল আছে। টেবিলের দুই পাশেই জয়ের সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু জিতেছিল সেই, যে ওই সময়ে ভাল ছিল। আমি হেরে যাওয়া পাশেই আমাকে খোজে পাই এখন।

হোস্টেলের ডাইনিংগুলো যে খাবার জায়গা হিসেবে খুব অপছন্দের ছিল, সেটা আজও তাড়িয়ে বেড়ায়। ডালে অভক্তি কিংবা টেংরামাছে অরুচির জন্ম সে ডাইনিং থেকেই। তবুও ফিস্ট করে মাঝে মাঝে সেই অভক্তিটাকে একটু আকটু বুড়ো আংগুল প্রদর্শন করা কিংবা বাবুর্চিকে বলে একটা ডিম ভাজা করিয়ে নেওয়াটা এক্সটা কারিকুলাম এক্টিভিটির মত ছিল। এসবের মাঝে বাবুর্চি আর বয়দের স্যার ডাকটা শোনা খুবই প্রেস্টিজিয়াস মনে হত।
অনেককিছুই বলবার আছে, অনেক কষ্টের অভিযোগ আছে। তবুও আজ না হয় বর্ষায় বৃষ্টিস্নাত সবুজ পাহাড়ের কথাই বলি, বলি জানালায় পাশে সেই বৃষ্টিধারায় নিজের স্বপ্নগুলো মেঘের উপরে ভেসে যাওয়ার গল্প। যোগ বিয়োগের হিসেব না হয় মিললো না, তবুও আজ একটু খানি তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলি একদিন আমিও এখানে ছিলাম।
সবাই ভাল থাকিস, থেকো আর থাকবেন।
জুবের আজাদ
সেকেন্ড ব্লক ২১০
MC College Boys Hostel
সন ১৯৯৯-২০০১
