করোনায় করুন বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা


প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকমের সহকারী সম্পাদক আবু সাইদ চৌধুরী সাদি :: করোনা ভাইরাস আজ বিশ্বব্যাপী মহামারি রুপ ধারণ করেছে। বাংলাদেশেও এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই মৃত্যেুবরণ করছেন। এই রোগ শনাক্তকরণ বা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন জরুরী স্বাহ্যসেবার।কিন্তু এ রোগের সাধারন লক্ষণ নির্ণয় করার আগে কোন পরীক্ষা ছাড়াই করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক ছড়িয়ে বিনা চিকিৎসা ও অবহেলায় মৃত্যুেবরণ করেছেন কিছু মানুষ।

আর এ আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন স্বয়ং স্বাহ্য সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা । বর্তমানে আমাদের দেশের চিকিৎসার অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কোন সাধারন রোগের স্বাভাবিক চিকিৎসা হচ্ছেনা। বেশীরভাগ ডাক্তার তাঁদের প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখছেন না। মোটামুটি সবার চেম্বার বন্ধ।

বেসরকারি কোন হাসপাতালে গেলে আপনি ডাক্তার পাবেন না।বেসরকারি হাসপাতালগুলো খোলা আছে কিন্তু কোন ডাক্তার নেই। করোনা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাধারন মানুষ দিন-রাত অতিবায়িত করছেন।সব ধরণের রোগী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরকারের দায়িত্বশীলরা দীর্ঘদিন থেকে মানুষকে আশ্বাস দিয়ে আসছেন করোনা মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতির কোন অভাব নেই বলে। করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত। কিন্তু যারা করোনা ভাইরাসে আমাদের চিকিৎসা দিবেন তাঁরা প্রস্তুত কিনা সরকার কি একটিবারের জন্য এ ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করেছেন।

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা দুরে থাক । সাধারন রোগের চিকিৎসা থেকে যে মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে এ ব্যাপারে সরকার কতটুকু অবগত আছেন । সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টরা যতই ঢোল পেটাক আর একেক সময় একেকটি উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের তুলনা করুক। তাতে আমাদের সামর্থ্যের কোন হেরফের হবে না। আমাদের সামর্থ্য কতটুকু আছে আমরা তা ভালকরেই জানি।

সরকার ঘোষিত লকডাউন কিছুদিন যাবত বাংলাদেশে চলছে। তবে এ ব্যাপারে সরকারের আগাম কোন প্রস্তুতি ছিল কিনা বা কতটুকু ছিল তা স্পষ্ট নয়। তবুও সাধারন জনগন এ ব্যাপারে যেভাবে সাড়া দিয়েছে তা অভূতপূর্ব। মানুষ ঘরে ফিরেছে।কিন্তু দিন- মজুর খেটে খাওয়া মানুষদের জন্য সরকারের কোন পরিকল্পনার কথা আমরা এখনো জানতে পারি নাই ।

সরকারের পক্ষ থেকে কোন ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বা হবে এ ধরণের কোন খবর এখনো আমাদের নজরে আসে নাই। মাননীয় মন্ত্রি বা সংসদ সদস্যদের বেশিরভাগের কোন খোঁজ-খবর নাই। কিছু সাধারন মানুষ ও প্রতিষ্ঠান তাঁদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ গরীব ও দিন-মজুর মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্য বিতরণ করছে।

এছাড়া বৃহৎ এ জনগোষ্টির জন্য অন্য কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি।সরকারী উদ্যোগে হয়তবা নিকট ভবিষ্যতে ত্রাণ বিতরণ হবে। তবে সেটি যেন বেশী দেরী না হয়ে যায়। আর এ বিতরণ প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ হয়। কারণ এক ধরণের লোটেরারা ঘাপটি মেরে বসে আসে এসব ত্রাণে ভাগ বসানোর জন্য । যা আমরা অতীতে বারবার লক্ষ্য করেছি। বিতরণ প্রক্রিয়ায় যেন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহীতার ঘাটতি না থাকে।

সরকার তাঁর এবং একশ্রেণীর অভিজাত লোকদের বসবাসের আবাসস্হল রাজধানী ঢাকাকে মোটামুটি নিরাপদ করে ফেলেছে। ঢাকা এখন পুরোটাই ফাঁকা । আর ফাঁকা মানেই নিরাপদ।আর করোনা শনাক্তকরণ কার্যক্রম যেহেতু শুধুমাত্র ঢাকা থেকে পরিচালিত হয় সে ক্ষেত্রে নিজেদের স্বাহ্যসেবা অনেকটা নিশ্চিত।

তবে বিদেশীরা এ উদ্যোগের পরও সরকারের উপর আস্হা রাখতে পারে নাই। বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা- কর্মচারীসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিদেশীরা বাংলাদেশ ত্যাগ করেছে।সরকারের এই লকডাউনের কারণে মানুষ যেভাবে দলে দলে রাজধানী ছেড়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে চলেছে তাতে এ রোগের বিস্তার সহজে গ্রামে-গন্জে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বেশী।

আর যদি এটি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশে এটি মহা-মহামারিতে রুপ নিবে। যেখানে বাংলাদেশে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন মানুষের বসবাস।সেখানে আইইডিসিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী মাত্র এক হাজার একশত পঁচাশি জনগণকে করোনা ভাইরাসের পরীক্ষা করা হয়েছে। যা সংখ্যার দিক দিয়ে অত্যন্ত নগণ্য। যেখানে বিশ্ব স্বাহ্য সংস্হা করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় বেশী বেশী পরীক্ষার উপর জোর দিচ্ছে। সেখানে আমরা কোন কর্ণপাত না করে নিজের মত চলছি।যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

সরকার আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীকে তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে এবং তাঁরা যথাযথভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন করতেছে।কিন্তু সময়ের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় একটি জায়গায় সরকার আটকে গেছে। চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয় জায়গাটি একেবারে নড়বড় হয়ে গেছে।

অনেকেই বলছেন স্বাহ্যসেবা বাড়ানোর জন্য এবং আর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করণের প্রক্রিয়ার সাথে সংযুক্ত করার জন্য।কিন্তু এ ক্ষেত্রে সরকারের এত অনিহা কেন? কারণ নিশ্চয়ই সরকার প্রদত্ত আশ্বাসের কোথাও বড় ধরণের গড়মিল আছে।আর সেটি হল সরকার এ ব্যাপারে মোটেই প্রস্তুত ছিলনা বা এখনও প্রস্তুত নয়। কারণ রোগ শনাক্তকরণ করার জন্য যথেষ্ট উপকরণ সরকারের হাতে ছিলনা বা এখনও নেই।

করোনা হচ্ছে বিশ্ব মহামারি এ ক্ষেত্রে এটি যে সরকারের ব্যর্থতা তা কিন্ত না। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ যখন এ মহামারিতে আক্রান্ত তখন আমাদের উচিত ছিল সত্য জিনিসটা জনগণের সামনে তুলে ধরা।আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা জনগণকে জানিয়ে সতর্কতা জারীকরা।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যখন এ মহামারি মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছে তখন করোনা মোকাবেলায় আমাদের আরো শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। সরকার হয়তবা আশা করছে অন্য দেশের সাহায্য ও সহযোগীতা নিয়ে এই মহামারি মোকাবিলা করবে। সেই আশা নিয়ে যদি বসে থাকে তাহলে মস্ত বড় ভুল করবে।

নিজের সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে আমাদেরকে করোনা মোকাবিলায় প্রস্তুত হতে হবে।সরকারী, বেসরকারি উদ্যোক্তারা মিলে প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে একসাথে কাজ করার মাধ্যমে এই মহামারিকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

মানবতার জন্য যে পেশার মানুষদের আজ বিশ্বের সকল দেশের মানুষ স্যালুট দিচ্ছে। একমাত্র বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।বাংলাদেশের এ অভিজাত শ্রেণীর লোক অর্থাৎ ডাক্তাররা পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে আছেন। তাঁদের উপর যে মানবিক দায়িত্ব তা থেকে অনেকেই সরে গেছেন।

তাঁরা ভুলে গেছেন যে তারা ডাক্তার,মানবসেবা তাঁদের পেশা। তাঁদের অনেকেই যারা প্রাইভেট চেম্বারে প্রতিদিন শত রোগী দেখে পকেটভারী করতেন তাঁরাও চেম্বার বন্ধ করে উধাও। বেসরকারি হাসপাতালগুলো ডাক্তারের অভাবে মৃতপ্রায় ।জনগণের টাকায় যারা সরকারী মেডিকেল কলেজে পড়ে ডাক্তার হলেন,মানবজাতির এই দু:সময়ে যাঁদের প্রয়োজন খুব বেশী। তাঁরা আজ মানবসেবা থেকে অনেক দূরে।

আমরা জানি আমাদের সীমাবদ্ধতা, স্বাহ্য-সেবা খাতে আমরা উন্নত বিশ্ব থেকে অনেক পিছিয়ে। যেখানে বাংলাদেশের সরকার প্রধানরা উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ আসেন। সেখানে এটি এমনিতেই প্রতিয়মান হয় যে, উন্নত চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু পিছিয়ে আছি।তাই বলে সাধারন চিকিৎসার ক্ষেত্রেও যে বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে সেটি জানা ছিলনা। একজন সাধারন মানুষ বিনা চিকিৎসায় অবহেলায় মারা যাবে ।

এটি আমাদের কারও কাম্যনয়। অনেককে করোনা ভাইরাসের দোহাই দিয়ে বিনাচিকিৎসায় অবহেলায় মৃত্যেুবরণ করতে হচ্ছে।মৃতের দাফনের পর আবার বলা হচ্ছে মৃত ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত ছিলেন না। এ রকম একটি মৃত্যেু যে কত পরিবারকে মানসিক কষ্ট ও অশান্তিতে ভোগাচ্ছে শুধুমাত্র তাঁর পরিবারই বলতে পারবে।

ইদানীং মৃত ব্যক্তির দাফন নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিড়ম্বনা, করোনায় মৃত্যেু হয়েছে বলে মৃত ব্যক্তির দাফনে বিভিন্ন জায়গায় বাঁধা দেয়া হচ্ছে। মানুষ ভুলে যাচ্ছে আমাদের সবাইকে একদিন কোন না কোন ভাবে মরতে হবে। আজ আমাদের মানবতা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তার প্রমাণ আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি।

আজ উন্নত বিশ্বে হাজার-হাজার মানুষ প্রতিদিন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। শত-শত মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য প্রতিটি মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছে। ডাক্তাররা নিজের জীবন বাজি রেখে রোগীদের বাঁচানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেশের ক্রান্তিকালে অবসরে যাওয়া ডাক্তার নার্সরা রোগীদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন।

যারা ঘরে আছেন ডাক্তার ও নার্সদের পরামর্শ পাচ্ছেন। আর আমাদের দেশের ডাক্তারদের অনেকের ফোন বন্ধ। অনেকের ফোনে শত চেষ্টা করেও ফোন রিসিভ করছেন না । প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার নাই।অনেকেই ডাক্তারের সাক্ষাত পাওয়ার জন্য আহাজারি করতেছেন।

মানুষ সাধারন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে কিন্তু কেউ একটু পরামর্শ পাচ্ছেনা। একজন পিতা তাঁর অসুস্থ একমাত্র সন্তানের জন্য ভোরবেলা থেকে আর্তনাদ করতেছে। তাঁকে সাহায্যের জন্য অনেকেই এগিয়ে এলেও সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিটির সন্ধান কেউ দিতে পারেনি। ডাক্তার বাবুরা মানুষের রক্তচোষে যে ব্যাংক ব্যালেন্স করেছেন।উনাদের অনেক দিন না কামালেও চলবে। কিন্ত সাধারন মানুষের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার জন্য সরকার যে জনগণের টাকা খরচ করে আপনাদের ডাক্তার বানালো এর জবাব কে দিবে ।

সরকারের এখন গভীরভাবে ভাবা উচিত উন্নত বিশ্বের মত চিকিৎসা সেবায় আমাদের দেশকে কিভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়। এ জন্য একটা আমুল পরিবর্তনের প্রয়োজন। আমার ধারণা এ প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র সরকারের স্বদিচ্ছাই যথেষ্ট। সরকার যদি এবারের এই করোনা ভাইরাস থেকে শিক্ষা নিয়ে,বাংলাদেশের স্বাহ্য সেবার উপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি জেলা শহরে একাধিক আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তুলে।

তাহলে মানুষরুপী অনেক ডাক্তাররা রক্তচোষে কাড়ি কাড়ি টাকা জমাতে পারবেনা। এখন সময়ের দাবি প্রতিটি জেলা শহরে বিভিন্ন রোগের উপর স্পেশাল সরকারী হাসপাতাল গড়ে তোলা।মানুষের উন্নত স্বাহ্যসেবা নিশ্চিত করা।মানুষের পাঁচটি মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে একমাত্র স্বাহ্য সেবায় আমরা অনেক পিছিয়ে।

একটি উন্নত সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে হলে চিকিৎসা সেবায় আমাদের উন্নতি আবশ্যকীয়। যতদিন না সরকার জনগণের জন্য উন্নত স্বাহ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারবে ততদিন সরকার ও সাধারন জনগণ একটি গোষ্টি বা শ্রেণীর কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে। যা উন্নত সমাজ বা জাতী গঠনের জন্য বড় প্রতিবন্ধক।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *