ডাক্তার সাহেবের পরামর্শ নয় যেন নির্দেশ,মানতেই হবে। হোম আইসোলশনে থাকতেই হবে । ডাক্তার সাহেবকে বললাম পরিবারের সদস্যদের সাথে কি দেখা করা যাবে না? তিনি বললেন কোন অবস্থাতেই না? তখন জানতে চাইলাম কোয়ারেন্টাইনে থাকলে কি?
তখন ডাক্তার সাহেব বললেন ‘কোয়ারেন্টাইন’ বলেন আর ‘আইসোলশন’ বলেন এই দুই শব্দের এক কথায় উত্তর হচ্ছে ‘সন্দেহ ভাজন’ কিংবা ‘আক্লান্ত ব্যাক্তি’ বাকি সবার কাছ থেকে আলাদা থাকা।
অতঃপর ডাক্তার সাহেব আরো পরিষ্কার করে বললেন, Quarantine হচ্ছে কোন ব্যাক্তি বা গোষ্ঠী কোন সংক্রামক বা ভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহ করা হচ্ছে কিন্তু কোন রোগের উপসর্গ কার্যতঃ দৃশ্যমান নয়-এ রকম মানুষ বা গোষ্ঠীকে বাকি সবার কাছ থেকে পৃথক করার নাম হচ্ছে ‘কোয়ারন্টাইন’।

আর ‘Isolation ‘হচ্ছে যখন কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোন সংক্রামক ব্যাধি বা ভাইরাসের উপসর্গ আছে বা আক্রমন হয়েছেন এমনটি প্রমানিত হয়েছে, সেক্ষেত্রে সুস্থ মানুষের কাছ থেকে আলাদা রাখার নাম হচ্ছে ‘আইসোলশন’।
ডাক্তার সাহেবের পরামর্শের পর আর কি করা ।রুম বন্দী থাকতেই হলো। একা রুমের মধো থাকা যে কত কষ্টকর তা ভাষা দিয়ে বোঝানো কঠিন । কোনো ক্ষেত্রেই এত সিরিয়াস হওয়া আমার ভালো লাগে না। I don’t to be serious about everything. মরে গেলেই তো শেষ । কি আর করা?
সৃষ্টি কর্তা আল্লাহ ছাড়া আর কে শুনবে আমার কথা? ঐ সময় যে কেউ আল্লাহর এবাদত করতে চাইবে। নামাজ রোজা করতে চাইবে। তবে ঐ সময়ে আল্লাহর এবাদত করা চাট্টিখানি কথা নয়? কারণ বিশ্ববাসী করোনা ভাইরাসে (কমবেশি) আক্রান্ত থাকলে ও ইবলিশ মুক্ত ।
সে তার কাজ করেই যাচ্ছে । মানুষকে ঈমান নিয়ে মরতে দিবে না। তবে ইবলিশের বাধা কোন মুসলমানকে আটকাতে পারবে না ইনশাআললাহ । তারপর ও এ সময় নামাজ রোজা করা খুবই কস্টকর। এমনকি তসবিহ’র দোয়া পড়তে ও ভূল পরে। এ যেন এ কঠিন পরীক্ষা । এসব নিয়েই বন্দী জীবন ।
শুরু হলো এক অন্য ধরনের ‘যুদ্ধ’ । পরিবর্তন হতে লাগলো আমার দিন কালের ছবি । একটা ছকবাধা রুটিনে চলতে লাগলো আমার সব কিছু । এমনকি খাবার দাবারের বেলায় ও এর ব্যতিক্রম নয়।
সকাল সাতটা’য় লেবুর রস মিশ্রিত এক গ্লাস গরম পানি । সেই সাথে এক মগ চা এবং দু’তিন পিস বিস্কিট ।দশটার দিকে নাস্তা খিচুড়ির সাথে শাঁক সব্জি কিংবা সিদ্ধ ডিম, সাথে টক দই (মাঝে মধ্যে খিঁচুড়ি’র স্থলা ভিষিক্ত হয় ভূনাখিঁচুড়ি)।

দুপুরে অরেঞ্জ (মালটা) বা স্টব্যারী।বেলা দুই ঘটিকার দিকে মাছ-ভাত শাঁক সব্জি, ডাল ইত্যাদি, সেই সাথে লেবুর রস মিশ্রিত গরম পানি ।বিকেলের নাস্তা (বিকেল ছয়টার দিকে কিংবা আগে) চানাভূনা, পিয়াজু (মাঝে মধ্যে পরিবর্তন হয়) এবং সেই সাথে এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, তেজপাতা ও আদা মিশ্রিত এক মগ চা।
রাত দশটার দিকে আবার একটু ভাত – তারকারী সাথে লেবুর রস মিশ্রিত গরম পানি ।তা ছাড়া দিনে চার বার ঔষধ সেবন সহ সব কাজগুলো নিজ দায়িত্বে একাই আমার স্ত্রী আখতারুন করতেন ।
সবচেয়ে খারাপ লাগতো হাতে গ্লাভস, মুখে ম্যাক্স, এবং এপ্রোন পরিহিত অবস্থায় আমার রুমে ঢুকেই খাবার, ঔষধ ,পানি এগুলো দিয়ে চলে যেতেন ।
মাঝ মাঝে এসে চেক করতেন ঔষধ ঠিক মতো খেয়েছি কি-না? কারণ জ্বরের তাপমাত্রার কারণে খাবার থেকে শুরু করে ঔষধ পর্যন্ত কোন কিছুই খেতে ইচ্ছে করতো না।এ জন্য আমার রুমে আসা।
তবে কোন কথা বলা হতো না,কারণ একটাই- রোগ সংক্রামকের ভয়।মাঝে মধ্যে চোখ বিনিময় হতো।তবে তা ছিল আমার জন্য খুব কস্টকর ।
ওর দিকে তাকাতে পারতাম না।চোখ বুজে নিতাম। ওর আবেগি চোখের দিকে তাকালে ও হয়তো কেঁদে ফেলতে পারে ।জানি এত সহজে সে ভেঙে পরবে না।
তারপর ও কেন জানি আমি নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।তাই মনে মনে ভাবলাম , হায়রে ‘করোনা’ তুমি চেনা পৃথিবীকে অচেনা করে তুলছো। ——–চলবে ।
