আজ পর্যন্ত বিশ্বে করোনা আক্রান্ত লোকের সংখ্যা প্রায় ২০ লক্ষ আর মৃতের সংখ্যা প্রায় এক লক্ষ পঁচিশ হাজার। এই লেখাটি যখন পড়বেন তখন হয়তো এই সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। প্রতিদিন রাতে বিছানায় যাবার আগে মনে হয় হয়তো আগামীকাল ঘুম থেকে উঠে শুনবো আজ আর কোন করোনা রোগী নাই অথবা আজ আর কোন মানুষ মারা যায়নি।
এই একটি সুন্দর সকালের প্রত্যাশা আমার মতো অনেকেই করেন। কিন্তু আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে। আর এর গতি প্রকৃতি দেখে ভীষণ ভয় হচ্ছে জানিনা এর শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকবে। তবে শত শঙ্কা আর ভয়ের মধ্যে ও করোনা থেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে।
আমেরিকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র। যার কথায় বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খায়। কথা না শুনলে যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক অবরোধ। এই তো কিছুদিন আগে ইরানের এক জেনেরাল কাসেম সোলায়মানিকে ইরাকে হত্যা করা হয়। শুনেছি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নাকি স্বচক্ষে পুরো ঘটনাটিকে অবলোকন করেছেন।
আমি সোলাইমানীর পক্ষে কোন সাফাই গাইছিনা, তবে অপরাধীকে অপরাধের বিচার না করে এভাবে হত্যা করা কতটুকু যুক্তি সঙ্গত ছিলো। প্রশ্নটি করেছিলেন এলবিসির নাম করা রিপোর্টার নিক ফেরারি। উনি বলেছিলেন, তাহলে ধরে নিবো আমেরিকা যাকে অপরাধী হিসাবে গণ্য করবে বিচার ছাড়া তাকে হত্যা করা জায়েজ হবে।
আরেকটি ঘটনা খাশেঘির কথা নিশ্চয় আমরা ভুলে যাইনি? সকল প্রকার আইন এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্গন করে তুর্কি দূতাবাসের মধ্যে শুধু মাত্ৰ সৌদি প্রিন্সের সমালোচনা করার অপরাধে তাকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়। সেই নির্মমতা এবং পৈশাচিকতা সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে কিন্তু আমরা কি তার বিচার করতে পেরেছি? কথায় কথায় যুদ্ধ আর অস্ত্রের হুঙ্কার।
করোনা আমাদের কাছে নিয়ে এসেছে এক অভিনব বার্তা। অর্থাৎ তুমি নিজেকে যত শক্তিশালী মনে করো আসলে তুমি ততো শক্তিশালী নও। একটি ক্ষুদ্র ভাইরাসকে মোকাবেলা করা তোমার পক্ষে কঠিন। সুতরাং আয়নায় নিজের চেহারা দেখার সময় এসেছে।
বিশ্বে রয়েছে ধনী এবং গরিবের একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সকল জায়গায় রয়েছে এক চরম বৈষম্য। কিন্তু করোনা ভাইরাসের কাছে কোন বৈষম্য নাই। তার আক্রমণ থেকে কেহই রেহাই পাচ্ছেননা। তিনি প্রিন্স চার্লস হতে পারেন, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন অথবা হতে পারেন টম কিংবা জেক। অর্থাৎ মানুষে মানুষে যে কোন বৈষম্য নেই সেই শিক্ষাই আমাদের দিয়েছে।
তাছাড়া যারা টাকার গরম দেখান তাদের কাছে পরিষ্কার টাকা জীবনের সব কিছু নয়। করোনা বিশ্বে আপনার পকেটে টাকা থাকবে কিন্তু তার কোন মূল্য থাকবেনা। অর্থাৎ টাকার বিনিময়ে আপনি চাইলেও অনেক কিছু পাবেননা। বাংলাদেশ থেকে কথায় কথায় চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করেন তাদের কাছে ও এখন পুরো বিশ্ব অসার। পাসপোর্টে ভিসা আর একাউন্টে টাকা থাকলে ও আপনি অনেক কিছু করতে পারবেননা।
করোনা বিশ্বে নতুন করে জাগরণ ঘটেছে মানবতার। মানুষ মানুষের জন্য এই স্লোগান নিয়ে ব্রিটেন সহ বিভিন্ন দেশে অনেক সেচ্চাসেবী সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মেডিকেল স্টাফ যেমন ডাক্তার, নার্স তাদের নিজেদের বাঁচানোর জন্য যুগোপযোগী কাপড় চোপড় না থাকলেও তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

শুধু নিজের জীবন নয় বরং অনেকে পরিবার পরিজনের আক্রান্ত হবার শঙ্কাকে দূরে ঠেলে দিয়ে দিন রাত কাজ করে চলেছেন। শুধু মেডিকেল স্টাফদের কথা বলে শেষ করলে ভুল হবে সেই সাথে রয়েছেন পুলিশ, মিলিটারি,প্যারা মিলিটারি, ব্যাংকার, দোকানদার সবাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের সেবা অব্যাহত রেখেছেন। সুতরাং এটাকে শুধুমাত্ৰ দ্বায়িত্ব পালন বললে ভুল হবে, এটা মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আর আমরা যারা বন্ধু-বান্দব, আত্মীয় স্বজন নিয়ে সারাক্ষন ব্যাস্ত থাকি, তাদের কাছে জ্বলন্ত প্রমান হলো বিপদে আপনার পরিবার ছাড়া আর কেউ পাশে থাকবেনা। এখন এমন একটি সময় এসেছে, আপনি সারাদিন ডাকলেও কেউ তার নিজের ভয়ে আপনার কাছে আসবেনা। সুতরাং পরিবারই হলো আপনার আসল ঠিকানা।
তবে এই করোনা বিশ্বে কিছু অমানুষ চেনার ও সুযোগ হয়েছে। দ্রব্য মূল্যের দাম বাড়িয়ে বাড়তি মুনাফা করা থেকে শুরু করে গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে লুটপাট করা এই অমানুষরা আমাদের চারপাশে সারাক্ষন ঘুরে। এবার আমাদের তাদের দেখার ও চেনার সুযোগ হয়েছে।
সবমিলিয়ে করোনাকে শুধু মানব বিশ্বের অভিশাপ বললে ভুল হবে। একদিকে অভিশাপ হলেও অন্যদিকে আশীর্বাদ। তাই আজ প্রত্যাশা করি করোনার কালো গ্রাসে ধুয়ে মুছে যাক বিশ্ব থেকে সকল অন্যায় ও অনাচার, প্রতিষ্টিত হোক সামাজিক ন্যায় বিচার। সেই সাথে করোনা বিশ্বে সৃষ্টি হোক মানবতার এক নতুন জাগরণ।
লন্ডন
