ক্লান্ত হয়ে গেছি, তবে থেমে যাইনি! – মরিয়ম চৌধুরী


ছোটবেলায় বইয়ের কানে ধরে কতকিছুই শিখতাম যার প্রয়োগ জীবনে তেমন হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে আজ “স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল” এই কথাটির তাৎপর্য হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

আপনি যখন অসুস্থ অবস্থায় থাকবেন ঠিক তখনই সুস্থতার স্মৃতিগুলি আপনার চোখের দৃশ্যপটে ভেসে বেড়াবে। নিজেকে তখন খুব বেশি অসহায় মনে হয়। সুস্থতা পৃথিবীতে বড় একটি নেয়ামত। অপরদিকে অসুস্থ শরীর যেন পৃথিবীর ঘন কালো একটি রাত, সেই রাত্রি অনেকটা দীর্ঘ অনেক লম্বা, যেন শেষ হতে চায় না, অপেক্ষার সেই লম্বা প্রহর গুলি প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ায় দিনের আলো আর ঝলমলে এক রোদ্র দুপুর।

যেখানে অন্ধকারের দীর্ঘরাত কে পরাজিত করে আলোকিত ধরণীর রক্তিম বর্ণালীর এক নতুন সকালের অপেক্ষায় আমি। যেখানে আমি দাঁড়িয়ে বড্ড বেশি ক্লান্ত হয়ে গেছি তবে এখনো থেমে যায়নি। কখনো চিন্তা করতে পারেনি নিজের জীবনে অন্ধকারের অমাবস্যা এত কাছে চলে আসবে।

তবে চলে যখন এসেছে নিজেকে বদলে ফেলার রাস্তাটাও নিজেকেই বের করতে হবে। ইদানিং শরীরটা খুবই খারাপ যাচ্ছে, আমার ক্যান্সার ধরা পরার পর থেকে আর কখনোই হয়তোবা বলতে পারব না আগের মত পুরোপুরি ভালো আছি। তবে অপারেশনের পর থেকে নিজের মনোবলকে রঙিন স্বপ্নলোকে নিজের মত করে অসুস্থতাকে কাটিয়ে, প্রাণপণে চেষ্টা করছি জীবনের এই যুদ্ধ জয়ের সেই স্বপ্নলোকের আত্মপ্রত্যয়ের বিজয়ের কথা।

নিজের ভেঙে পড়া দৃঢ় মনোবলকে পুঁজি করে জয়ী হওয়ার মনোবল, সাহস, ধৈর্য নিয়ে এখনো বেশ আছি। সব সময় চেষ্টা করি আমাকে যেন কখনো অসুস্থতা জয় করতে পারে না। মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করি? আমি কি পারব? সুস্থতা কে জয় করে অবারিত নতুন দিগন্তে হাসিমাখা এক সুন্দর ভোর হওয়া সকালে যুদ্ধ জয়ের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে?

আমি কি পারব আগের মত প্রাণ খুলে হাসতে? নিজেকে কখনো একা ভাবি না, নিজেকে ব্যস্ত রাখার প্রয়াসে লেখালেখি করি, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জীবনের গল্প বলি, অসহায় মানুষদের নিয়ে কাজ করি আবার কখনো আমার প্রিয় সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে সমুদ্রের বিশালতা দেখি আর আনমনে কথা বলি।

নিজের হাতে ফুলের বাগান করি, হরেক রকমের ফুল, প্রতিটি ভোরে ফুলের স্নিগ্ধতা আর সৌরভে মন মাতিয়ে তোলে। এ সমস্ত কাজ গুলো আমার নিজেকে বড় আনন্দে দেয়, নিজেকে জয়ের চেষ্টায় জয়ি হওয়ার আনন্দ কজনের ভাগ্যেই বা জোটে, নিজের অসুস্থতা কে জয় করে অন্যদের ভালো রাখা চেষ্টায় কেটে যায় নিজের সুন্দর সময় গুলি।

তবে মাঝে মাঝে জীবন যুদ্ধের এই হার- জিত খেলায় অসুস্থতা বিজয়ের হাসি হেসে নেয়, আর তখনই কিছুটা ক্লান্ত হয়ে যাই। তবে আমি হারিয়ে যাওয়ার ভিড়ে আমি নিজেকে হারাতে চাইনা। এত সহজে হেরে যাবো আমি সেই মেয়ে নই।

আমি সবসময়ই খুব আত্মবিশ্বাসী এবং জীবনের নেমে আসা সব ধরনের প্রতিকুলতার মোকাবেলা করার প্রবণতা বারেবারে রেখেছি। যা একদিনে শিখিনি, চলার পথে নিজের জীবনে এমনও বন্ধু পেয়েছি যারা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অসুস্থতার কাছে হার মানেনি। শারীরিক শত কষ্টের মাঝেও বিজয়ের হাসি হেসে নিজের কষ্ট গুলো কে বারে বারে মাটি চাপা দিয়ে বিজয়ের গল্প বলেছে।

অন্যকে কাঁদিয়ে নয় বরং আনন্দের মাঝে পৃথিবী কে আলোকিত করেছে। আমার সেই সব ফেলে আসা সোনালী অতীত আমি কখনো ধূসর হতে দেব না। আমার সেই শিক্ষাগুলি কখনো মলিন হতে দেব না। আর আমি সেই আমি! কিভাবে আমার অসুস্থতার কাছে নিজের পরাজয় মেনে নেব।

আমার নিজের জীবনের এই যুদ্ধ অনেক দীর্ঘ, যেখানে অনেক কষ্ট দুঃখ অসমাপ্তির কথা, জীবনের এই প্রবাহে তারতম্য থাকবেই যা সবার জীবনে আছে, তাই বলে আপনি সে ভারে নুয়ে পড়বেন না অঝোরে কাঁদবেন না, কারণ পৃথিবীর এই লীলাভূমিতে পরাজয়ের গ্লানি মাখা মানুষকে কেউ পছন্দ করেনা। আর আমিও করি না।

বেঁচে থাকার তাগিদে আমাদের এই যুদ্ধ থামবার নয়। এটি প্রবাহমান এক জলধারা। আমাদের এরই মাঝে বেঁচে থাকা। আজ পৃথিবীর এই ক্রান্তিলগ্নে সবাই দিশেহারা পথ হারা পথিক আল্লাহপাক সবাইকে হেফাজত করবেন। আমার জন্য আপনারা দোয়া করবেন। পরিশেষে বলবো “আমাদের প্রতিটি ভোর হোক নতুন সম্ভাবনাময়ের এক নতুন পৃথিবী, প্রতিটি মানুষের জীবন হোক মেঘমুক্ত এক স্বচ্ছ আকাশ। সবাইকে ধন্যবাদ।

জীবনের ডায়েরী, ৬-৭-২০২০ যুক্তরাজ্য

, ,

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *