প্রবাস বার্তা টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ ডেস্ক :: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এখন প্রতিদিন গড়ে তিনটি করে মামলা হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রগুলো বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর এই মামলার সংখ্যা ৬০ ভাগ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘কটূক্তিমূলক’ পোস্ট দেওয়া, পোস্ট শেয়ার করা, কার্টুন বা ব্যঙ্গাত্মক চিত্র আঁকা, ই-মেইলে যোগাযোগ করা এবং নিজেদের মধ্যে চ্যাট করার দায়ে শিশুসহ বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা ও বয়সের মানুষ এ বছর গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে কমপক্ষে ৩৮ জন সাংবাদিক।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ১০টি সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে মামলার পরিসংখ্যান রাখে। গত বছর মানবাধিকার সংগঠনটি ২৪টি মামলার খবর সংগ্রহ করেছে। এ বছর প্রথম ছয় মাসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪-তে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর মামলার আসামিদের বড় একটি অংশ ত্রাণ চুরি, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অনিয়ম, দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছেন বা কার্টুন এঁকেছেন। তাঁদের কাউকে কাউকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমে তুলে নিয়ে যায়। পরে ডিজিটাল প্রযুক্তি মামলায় তাঁদের আদালতে পাঠানো হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-শিক্ষক, কার্টুনিস্ট ও মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেপ্তারের পর মানবাধিকার কর্মীরা আইনটি বাতিলের দাবি তুলছেন। তাঁরা প্ল্যাকার্ডে দাবির কথা লিখে ছবি পোস্ট করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভার্চ্যুয়াল আলোচনা করছেন।
রাষ্ট্রচিন্তা ফেসবুকে তার দেয়ালে লিখেছে, ‘আমি চোরকে চোর, ভোট চোরকে ভোট চোর, ডাকাতকে ডাকাত, খুনিকে খুনি, আর দুর্নীতিবাজকে দুর্নীতিবাজ বলতে চাই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করো।’
রাজনৈতিক মঞ্চ রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য দিদারুল ভূইয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন। ত্রাণ বণ্টনের অনিয়ম নিয়ে তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁর ফেসবুক পেজে লিখে আসছিলেন।
আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, এই আইনের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষকে হয়রানি করা। ত্রাণ চুরির অভিযোগ উঠলে চোরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে, যিনি চুরির কথা বলছেন, তাঁকে ধরা হচ্ছে। অনেকে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন, নারীরা যখন প্রতারণার শিকার হবেন, তখন এই আইন তাঁকে রক্ষা করবে।
অথচ, এই অন্যায়ের প্রতিকার পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে হতে পারে। এমনকি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ সংশোধন করার সুযোগ ছিল। যে যে ধারায় মামলাগুলো হচ্ছে, সেগুলোর কোনোটিই নারীর সুরক্ষার জন্য ব্যবহার হয় না।
মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীরা বলছেন, মামলাগুলো হচ্ছে মূলত আইনের ২৫, ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায়। এই ধারাগুলোয় সরাসরি নারীদের সুরক্ষা সম্পর্কে কিছু বলা নেই। কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচারের কারণে কেউ অপমানিত বা অপদস্থ বোধ করলে মামলা করতে পারবেন।
রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করা, বিভ্রান্তি ছড়ানো, জেনেশুনে মিথ্যা বলা, সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত করাও আইন অনুযায়ী এই ধারার অভিযোগ। মানহানি হলে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর আশঙ্কা থেকে মামলা করতে পারবেন যে কেউ। অন্য কারও তথ্য সংগ্রহ, বিক্রি, দখল, সরবরাহ ও ব্যবহারের অভিযোগেও মামলা হচ্ছে। আইনের ২৬ ধারায় এগুলোকে অপরাধ বলা হয়েছে।
কাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কী অভিযোগ
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দায়ের হওয়া ৫০টি মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসে জাতির পিতা, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর নামে ‘কটূক্তি’র অভিযোগে মামলা হয়েছে ছয়টি। অপরাধের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকায় আছে ময়মনসিংহের ভালুকার তারাগাঁও উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
মামলার বাদী হানিফ মোহাম্মদ নিপুণ। তাঁর অভিযোগ, মো. ইমন নামের ফেসবুক আইডি থেকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে অশালীন ভাষায় কটূক্তি করা হয়েছে। বাদী ভালুকা থানায় করা মামলায় অভিযুক্তের বয়স লিখেছেন ২৬। যদিও পুলিশ গ্রেপ্তারের পর জানতে পারে তার বয়স ১৫। আদালতে উপস্থাপনের পর শিশুটিকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ভালুকা থানার উপপরিদর্শক মতিউর রহমান মামলাটির তদন্ত করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেটি মোবাইলে ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ২৫ টাকা কাটার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জড়িয়ে কটূক্তি করে। পরে ফেসবুক থেকে পোস্টটি সরিয়ে ফেলে সে ক্ষমা চায়।
তার কাছ থেকে একটি সিম্ফোনি ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। ফোনটি সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে আসলেই এমন কিছু পোস্ট করেছিল কি না, তা ওই প্রতিবেদন পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে। ছেলেটির বাবা পেশায় কৃষক।
এর বাইরে যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটূক্তি, আইনমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তি, সাংসদ মমতাজ, সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতনকে জড়িয়ে অপপ্রচারের অভিযোগেও মামলা হয়েছে।
সাবেক সাংসদ প্রয়াত মকবুল হোসেন ২৬ বছর ধরে অপরের বাড়ি দখল করে আছেন, এমন সংবাদ প্রচারের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। মানহানির অভিযোগ তুলে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর।
লোকসংগীতশিল্পী শরীয়ত বয়াতিসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার দায়ে মামলা হয়। বিচারককে নিয়ে কটূক্তি, জালিয়াতি ও প্রেমিকার ছবি নিয়ে অশ্লীলতার অভিযোগে একটি করে মামলা হয়েছে এ সময়। বিএনপি নেতাদের সমন্বয়ে কল্পিত মন্ত্রিসভার ছবি পোস্ট করায় মামলা হয়েছে পঞ্চগড়ে। সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অনুমতি না নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলে খবর প্রচারের অভিযোগেও মামলা হয়েছে।
করোনাকালীন মামলা হয়েছে ত্রাণ বিতরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলা, লকডাউনের মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের বাস চলা ও ও কৃষকের মাঠ নেমে কাঁচা ধান কাটার ছবি তুলে শেয়ার করার জন্য। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মো. নাসিমকে নিয়ে কটূক্তি করায় মামলা হয়েছে চারটি। মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সাতক্ষীরার এক ব্যক্তি।
মামলা করছেন কারা
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যাঁর বিরুদ্ধে লেখা বা আঁকা হচ্ছে, তাঁকেই মামলা করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সংক্ষুব্ধ যে কেউ মামলা করতে পারেন। সরকারের শীর্ষ পর্যায়, মন্ত্রী বা সাংসদের ‘মানহানি’তে মামলা করছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা, সাংসদ, মন্ত্রী বা সাংসদের পক্ষে তাঁদের বেতনভুক কর্মকর্তা-কর্মচারী বা অনুগতরা।
ভালুকায় নবম শ্রেণির ছাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন ১০ নম্বর হবিবাড়ী ইউনিয়ন শাখা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক হানিফ মোহাম্মদ নিপুণ। বছরের শুরুর দিকে, গত ৭ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনীতি পত্রিকার সম্পাদক এম জি আকবরের বিরুদ্ধে মামলা করেন নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহসভাপতি ও তমা গ্রুপের মালিক আতাউর রহমান ভূঁইয়া।
মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রতিবেদক আল আমিন ও শফিকুল ইসলাম কাজলসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর নিজেই মামলা করেছেন। তা ছাড়া যুব মহিলা লীগের দুই নেত্রী আলাদাভাবেও মামলা করেছেন শফিকুল ইসলাম কাজলের বিরুদ্ধে। সাভারে চুল বিক্রি করে বাচ্চার দুধ কিনলেন নারী শিরোনামে ‘ভুয়া’ খবর ছড়ানোর দায়ে স্থানীয় সাংবাদিকসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ছাত্রলীগ নেতা রমিজউদ্দীন মিশু।
তবে, মামলাগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাদীর তালিকায় বিচারক ও র্যাব-পুলিশের সদস্যরা আছেন। এ বছরের প্রথম মামলাটি করেন বিচারক শওকত হোসেন। নেসারউদ্দীন নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যার হুমকি ও অশ্লীলতা ছড়ানোর দায়ে এই মামলাটি হয়। পুলিশের সঙ্গে কথা না বলে পুলিশকে উদ্ধৃত করার অভিযোগ তুলে তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে নরসিংদীতে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম মামলা করেন। কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে র্যাব।
সাংবাদিক মাহবুবুল আলম লাবলুর বিরুদ্ধে অনুমতি না নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলে খবর প্রচারের অভিযোগেও মামলা হয় এ সময়। ওই মামলার বাদী হোসেনি দালান নিবাসী জনৈক ‘দেশপ্রেমিক নাগরিক’ আশিকুর রহমান।
এ তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিরাজাম মুনিরার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বাদী হয়ে তাজহাট থানায় মামলা করেন। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহির চৌধুরীর বিরুদ্ধেও বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ ইশফাকুল হোসেন।
শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের সমালোচনার মুখে মাহির হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ইশফাকুল সাংবাদিকদের বৃহস্পতিবার বলেন, জালালাবাদ থানায় তাঁরা মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন।
কোথাও কোথাও জোটবদ্ধ হয়ে মামলা করার নজির আছে। যেমন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাজী জাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন আইনজীবী তাপস কুমার সাহা। মামলার এজাহারে তিনি লেখেন, তিনি (জাহিদ) সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ‘আজেবাজে কথাবার্তাসহ বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করেছেন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের অন্যান্য সদস্য, আমার পরিবারের সদস্য এবং নিকটাত্মীয়দের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে থানায় এসে অভিযোগ দায়ের করতে বিলম্ব হলো।’
মামলার এজাহার অনুযায়ী, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অসুস্থতার খবরের লিংক শেয়ার করে জাহিদ পাঠকদের মন্তব্যগুলো সংশ্লিষ্টদের পড়ার অনুরোধ করেছিলেন জাহিদ।
পুলিশ কী বলছে
ডিজিটাল প্রযুক্তি আইনে মামলা গ্রহণের ক্ষেত্রে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা আছে। এতে বলা হয়েছে, মামলা নেওয়ার আগে পুলিশ সদস্যদের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমপক্ষে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, পুলিশ মাঝেমধ্যে নিরুপায় হয়ে মামলা নিচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়, সাংসদ বা নেতাদের মানহানি হয়েছে, এই অভিযোগ নিয়ে কেউ এলে তাঁরা মামলা নিতে অনেক সময় বাধ্য হন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা বলেছেন, মামলা নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পুলিশ সব সময় পূরণ করার চেষ্টা করে থাকে। কখনো এর ব্যত্যয় ঘটলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ খতিয়ে দেখতে পারে।
শেখ সাবিহা আলম, ঢাকা

